সূরা আন-নাহলের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কথা স্মরণ করিয়ে দেন—যে হৃদয় তাওহীদের জন্য একা ছিল, কিন্তু আল্লাহর কাছে ছিলেন সম্মানিত। তিনি ছিলেন সত্যের পথে অবিচল, মিথ্যার ভিড়ে এক উজ্জ্বল একক সত্তা; আর সেই অবিচলতার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাঁকে দুনিয়ায়ও দিয়েছেন কল্যাণ, এবং আখিরাতেও রেখেছেন সৎকর্মশীলদের কাতারে। এখানে ‘হাসানাহ’ কেবল বাহ্যিক সুখ বা স্বস্তি নয়; এর মধ্যে আছে প্রশান্ত হৃদয়, সম্মানিত স্মৃতি, সৎ সন্তান-সন্ততির বরকত, সত্যের উত্তরাধিকার, আর মানুষের অন্তরে জেগে থাকা এমন এক মহিমা—যা আল্লাহর দান ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়, দুনিয়ার কল্যাণ নিজে নিজে কখনো চূড়ান্ত সফলতা নয়; তা আসলে একটি নিদর্শন, একটি দরজা, একটি আমানত। আল্লাহ যখন বান্দাকে নিয়ামত দেন, তখন তিনি শুধু ভোগের ব্যবস্থা করেন না—তিনি কৃতজ্ঞতার পরীক্ষা নেন। যে হৃদয় তাওহীদে স্থির, সে নিয়ামতকে অহংকারে নষ্ট করে না; বরং তাকে সেজদায় রূপ দেয়, হালালকে ভালোবাসে, হারাম থেকে দূরে সরে যায়, এবং জানে—সফলতা কেবল অর্জনে নয়, বরং অর্জনকে আল্লাহর পথে ব্যবহার করায়। ইবরাহিম আলাইহিস সালামের জীবন যেন এ কথার জীবন্ত তাফসির: আল্লাহর জন্য ত্যাগ, আল্লাহর উপর ভরসা, আর আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি কল্যাণকে আল্লাহর দিকেই ফেরানো।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট একটি ঘটনাকে টেনে আনতে চেয়ে বরং গোটা সূরার ধারার দিকে তাকানোই বেশি নিরাপদ ও উপকারী। এই সূরায় নিয়ামত, তাওহীদ, কৃতজ্ঞতা, দাওয়াত ও ধৈর্যের যে সুর বারবার বেজে উঠেছে, এই আয়াত তারই এক কোমল কিন্তু গভীর পরিণতি—যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে সৎকর্মশীলভাবে জীবন কাটায়, তার জন্য দুনিয়ার কল্যাণও রয়ে যায়, আখিরাতেও রয়ে যায় মর্যাদা। তাই মুমিনের অন্তর এ আয়াত পড়ে কেঁপে ওঠে: আমার জীবনের হাসানাহ কি আমাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করছে, নাকি কেবল আমাকে ব্যস্ত করে রাখছে? কারণ সত্যিকারের কল্যাণ সেই, যা দুনিয়াকে আল্লাহমুখী করে এবং আখিরাতকে উজ্জ্বল করে।
আল্লাহ যখন বলেন, “আমি তাঁকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করেছি”, তখন এই কল্যাণকে কেবল স্বচ্ছলতা, সুখ, বা বাহ্যিক সফলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিলে আয়াতের নরম আলো হারিয়ে যায়। দুনিয়ার হাসানাহ হলো এমন এক অনুগ্রহ, যার ভেতরে থাকে সঠিক পথের তাওফিক, ইমানের দৃঢ়তা, অন্তরের প্রশান্তি, সম্মানের ছায়া, এবং এমন এক জীবনযাপন যা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ঝুঁকে থাকে। অনেকেই দুনিয়ায় কিছু পায়, কিন্তু তার অন্তর পায় না; আবার কেউ খুব কম পায়, কিন্তু তার ভেতরে এমন এক আলো থাকে যা প্রাসাদকেও অতিক্রম করে যায়। কুরআন আমাদের শেখায়, প্রকৃত কল্যাণ হলো সেই দান যা বান্দাকে তার রবের আরও কাছে নিয়ে যায়, এবং নিয়ামতকে গাফলতের নয়, কৃতজ্ঞতার সিঁড়ি বানিয়ে দেয়।
এবং শেষে আল্লাহ বলেন, তিনি আখিরাতেও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। এ বাক্যে এমন এক শান্ত মহিমা আছে, যেন বলা হচ্ছে—দুনিয়ার গল্প শেষ নয়, বরং আসল বিচার এখনো বাকি। সৎকর্মশীলদের কাতার মানে এমন লোকদের কাতার, যাদের অন্তর, আমল, ও আশা আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে সমর্পিত। সেখানে বংশ বড় কথা নয়, সম্পদ বড় কথা নয়, পৃথিবীর প্রশংসাও শেষ কথা নয়; শেষ কথা হলো, বান্দা আল্লাহর কাছে কার দলে গণ্য হলো। এই আয়াত তাই আমাদের হৃদয়ে এক মধুর-তীক্ষ্ণ প্রশ্ন রেখে যায়: আমার দুনিয়ার কল্যাণ কি আমাকে আল্লাহর দিকে টেনে নিচ্ছে, নাকি আমাকে আরও দূরে ছড়িয়ে দিচ্ছে? যে নিয়ামত কৃতজ্ঞতাকে জাগায়, যে জীবন সৎকর্মের দিকে চালিত করে, সেটাই সত্যিকার হাসানাহ—আর সেটাই আখিরাতের স্থায়ী সৌভাগ্যের আগাম ছায়া।
এই আয়াত যেন আমাদের হাতের আয়না। আল্লাহ ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দুনিয়ায় কল্যাণ দিয়েছিলেন, আর আখিরাতেও তাঁকে সৎকর্মশীলদের কাতারে রেখেছেন। এখানে এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে: দুনিয়ার কল্যাণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এলে তা কখনো একা আসে না; তার সঙ্গে আসে দায়িত্ব, পরীক্ষার ভার, আর অন্তরের হিসাব। আমরা যা পাই, তা নিয়ে শুধু আনন্দের নয়, জবাবদিহিরও দিন আসে। নিয়ামত যত বড়, জিজ্ঞাসাও তত গভীর। ধন, সম্মান, পরিবার, নিরাপত্তা, সুস্থতা, জ্ঞান—সবই যদি আল্লাহর পথে না ফেরে, তবে তা হৃদয়ের জন্য শীতলতা নয়, বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর যে বান্দা মনে রাখে, আমি যা পেয়েছি তা আমার অর্জন নয়, আমার রবের দান; সে-ই সত্যিকার অর্থে কৃতজ্ঞতার পথে হাঁটে।
সমাজ যখন নিয়ামতে ডুবে গিয়ে কৃতজ্ঞতা ভুলে যায়, তখন তার ভেতরে রূপ নেয় এক নিষ্ঠুর আত্মপ্রেম—হালালকে হালকা করা, হারামকে স্বাভাবিক মনে করা, মানুষের হককে তুচ্ছ করা, আর ধর্মকে কেবল নামের অলংকার বানিয়ে ফেলা। কিন্তু তাওহীদ এ সবকিছুর বিরুদ্ধে এক অন্তর্যুদ্ধ। তাওহীদ শেখায়, আল্লাহই দানকারী; তাই দান তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই ব্যয় করতে হবে। আল্লাহই রিযিকদাতা; তাই রিযিকের ভেতর অপবিত্রতা ঢোকানো যাবে না। আল্লাহই পথপ্রদর্শক; তাই জীবনের ব্যস্ততা, অভ্যাস, ব্যবসা, সম্পর্ক—সবকিছুর মাপে তাঁর বিধানকে উপরে রাখতে হবে। যে হৃদয় এ সত্য ধরে রাখে, সে দুনিয়ার কল্যাণকে ভোগের নেশায় হারায় না; বরং তাকে আখিরাতের পাথেয় বানিয়ে নেয়।
এই আয়াত শেষ পর্যন্ত আমাদের আখিরাতের দিকে তাকায়। সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া কোনো মুখের দাবি নয়, তা জীবনের ধারাবাহিকতা। আজ যে হৃদয় আল্লাহর নেয়ামতে নরম হয়, আজ যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রুসজল হয়, আজ যে হাত হালাল পথে চলে, আজ যে জিহ্বা সত্য বলে, আজ যে আত্মা ধৈর্য ধরে দাওয়াতের পথকে সম্মান করে—সেই হৃদয়ই আখিরাতে সৎকর্মশীলদের সঙ্গ পায়। আমরা সবাই নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করি: আমার দুনিয়ার কল্যাণ কি আমাকে আল্লাহর কাছে টেনেছে, নাকি দূরে সরিয়েছে? আমার সুখ কি আমাকে কৃতজ্ঞ করেছে, নাকি গাফেল করেছে? আয়াতটি ভয়ও জাগায়, আশা-ও জাগায়—কারণ আল্লাহ দুনিয়ায় কল্যাণ দেন, আর আখিরাতে সৎকর্মশীলদের জন্য রাখেন স্থায়ী সম্মান। বান্দা যখন ফিরে আসে, তখন রবের দরজা বন্ধ থাকে না; তবে সেই ফিরে আসা হতে হবে সত্যিকারের, ভেতর থেকে ভাঙা, আর নিজের অবস্থার হিসাব নিয়ে।
এই আয়াতের নীরব শিক্ষা খুব গভীর: তাওহীদের পথে চলা মানুষ কখনো দুনিয়ার কল্যাণ হারায় না, বরং দুনিয়া তার জন্য অর্থ পায়। হালাল তার খাদ্য হয়ে ওঠে, হারাম থেকে বাঁচা তার সম্মান হয়ে ওঠে, ধৈর্য তার শক্তি হয়ে ওঠে, আর দাওয়াত তার হৃদয়ের দায়িত্ব হয়ে ওঠে। যে মানুষ আল্লাহকে এক মানে, সে জানে—কিছু পেতে হলে আগে নিজের অহংকার ছাড়তে হয়; কিছু হতে হলে আগে নিজের ভেতরের মিথ্যা ভাঙতে হয়।
তাই আজ এই আয়াত আমাদের সামনে আয়নার মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি আল্লাহর দেওয়া কল্যাণে আরও কৃতজ্ঞ হয়েছি, নাকি সেই কল্যাণই আমাদের গাফিল করে দিয়েছে? আমরা কি আখিরাতের সৎকর্মশীলদের পথ ধরেছি, নাকি দুনিয়ার সাময়িক মোহে স্থায়ী ঠিকানা ভুলে গেছি? হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরও এমন কল্যাণ দিন, যা অন্তরকে আপনার দিকে ফিরিয়ে আনে; এমন ঈমান দিন, যা নিয়ামতে অহংকার নয়, তাওবা শেখায়; আর এমন পরিণতি দিন, যাতে আমরা সৎকর্মশীলদের কাতারে আপনার রহমতের ছায়ায় পৌঁছাতে পারি।