সূরা আল-মুমিনূনের এই আয়াত মানুষের অন্তরের সবচেয়ে নগ্ন মুহূর্তটিকে সামনে এনে দাঁড় করায়। মৃত্যু যখন এসে পৌঁছে যায়, তখন গর্বের প্রাসাদ এক মুহূর্তে ধুলায় মিশে যায়; পদ, প্রতাপ, ধন, সাফল্যের গল্প—সবই নিঃশব্দ হয়ে পড়ে। তখন মানুষ আর কিছু দাবি করে না, শুধু বলে: “হে আমার রব, আমাকে ফিরিয়ে দিন।” এই আর্তি এক ধরনের স্বীকারোক্তি—যে জীবনকে এত দীর্ঘ, এত নিরাপদ, এত নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হয়েছিল, তার শেষ প্রান্তে এসে মানুষ বুঝে যায়, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আল্লাহরই হাতে। আয়াতটি আমাদের কানে কেবল মৃত্যু-সংবাদ দেয় না; এটি আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে সময়ের ভয়াবহ অপচয়ের হিসাব।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশেষ কারণ-নুযূল বর্ণিত নেই; বরং এটি মানুষের সার্বজনীন অবস্থার ওপর এক চিরন্তন আয়াত। কুরআন এখানে একটি সাধারণ অথচ চূড়ান্ত দৃশ্য এঁকেছে—যে দৃশ্য প্রতিটি অস্বীকারকারী, প্রতিটি গাফেল, প্রতিটি দুনিয়ামগ্ন মানুষের অন্তিম দ্বারে এসে দাঁড়ায়। দুনিয়াতে যত দেরি, যত “পরে দেখব”, যত “এখনও সময় আছে”—মৃত্যুর কাছে সেগুলো সব ভেঙে পড়ে। এই আয়াত সেই কঠিন সত্য স্মরণ করায় যে জীবন শুধু ভোগের নাম নয়; এটি প্রস্তুতির সময়, ফিরে-যাওয়ার আগেই ফিরে আসার চেষ্টার সময়।
মুমিনের জন্য এই আয়াত আতঙ্কের নয় শুধু, জাগরণেরও। কারণ এটি আমাদের শেখায়, শেষ মুহূর্তে আফসোস জেগে ওঠার আগেই তাওবার দরজা খোলা থাকতে চায়, সৎকর্মের হাঁক ডাক আজই শুনতে চায়। মানুষ যখন বুঝতে পারে, তখন সময় শেষ—এটাই মহাবিপদ। তাই কুরআনের এই উচ্চারণ আমাদের কাঁধে হাত রেখে বলে: আজই সত্যকে ধারণ করো, আজই রবের দিকে ফিরো, আজই আখিরাতকে দুনিয়ার ওপরে স্থান দাও। কারণ মৃত্যু এসে গেলে আর “ফিরিয়ে দিন” বলা যায়, কিন্তু ফিরিয়ে আনা হয় না; তখন শুধু আফসোসের আগুন, আর হারিয়ে ফেলা সুযোগের নীরব দহন।
এই আর্তির ভেতরে এক নির্মম সত্য আছে: মানুষ যখন মৃত্যু-দ্বারে দাঁড়ায়, তখন সে আল্লাহকে অচেনা ভাবে না, বরং নিজের গাফিলতিকে চিনে ফেলে। সে বুঝতে পারে—যে দুনিয়াকে সে স্থায়ী ভেবেছিল, তা আসলে এক ক্ষণস্থায়ী ছায়া; যে সময়কে সে অপচয় করেছে, তা ছিল পরকাল গড়ার মূলধন। তাই “হে আমার রব, আমাকে ফিরিয়ে দিন”—এটি কেবল ভয় নয়, এটি দেরিতে জেগে ওঠা বিবেকের কান্না। কিন্তু মৃত্যু এমন দরজা, যেখানে পৌঁছে গেলে আর ইচ্ছা দিয়ে সব ফিরিয়ে আনা যায় না। তখন অনুতাপ জাগে, কিন্তু সুযোগ আর জাগে না; হৃদয় ভেঙে পড়ে, কিন্তু আমলের জমিন শূন্য হয়ে যায়।
মৃত্যু যখন সত্যি সত্যি এসে দাঁড়ায়, তখন মানুষের মুখ থেকে যে কথা বের হয়, তা ক্ষমতার ভাষা নয়, পরাজয়ের ভাষা; দম্ভের ভাষা নয়, ভাঙনের ভাষা। সে বলে, হে আমার রব, আমাকে ফিরিয়ে দিন। এই এক আর্তির ভেতর লুকিয়ে আছে কত বড় স্বীকারোক্তি—আমি যেটাকে স্থায়ী ভেবেছিলাম, তা অস্থায়ী; আমি যেটাকে সময় ভেবেছিলাম, তা ছিল ফুরিয়ে যাওয়া শ্বাসের মতো; আমি যেটাকে নিজের হাতে ধরে রেখেছি মনে করেছিলাম, তা আসলে কখনোই আমার ছিল না। মৃত্যু মানুষের সব অভিনয় খুলে দেয়। তখন আর পরের দিকে তাকানোর অবকাশ থাকে না, থাকে শুধু এক অসহায় অনুভব—ইশ, যদি আরেকটু সময় পেতাম!
কিন্তু কুরআন আমাদের সামনে এই দৃশ্য দেখিয়ে কেবল কান্না জাগায় না, জাগায় জবাবদিহির তীব্র বোধও। সমাজ যতই মানুষকে ভুলিয়ে রাখুক, ভোগে মাতিয়ে রাখুক, বিলাসের আলোয় সত্য ঢেকে দিতে চাইুক, মৃত্যু এসে সেই সব পর্দা ছিঁড়ে ফেলে। তখন বোঝা যায়, সম্মান মানুষের পদে নয়, ঈমানের সততিতে; সাফল্য মানুষের জমা সম্পদে নয়, আল্লাহর সামনে নির্ভার হয়ে দাঁড়াতে পারায়। যে অন্তর গাফেল ছিল, সে তখন বুঝতে পারে—দুনিয়ার প্রতিটি অবহেলা একদিন নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। এই আয়াত আমাদের কানে এক অনিবার্য প্রশ্ন রেখে যায়: আমরা কি ফিরে আসার আগেই ফিরে যাচ্ছি, অর্থাৎ আল্লাহর দিকে?
আরও গভীর কথা হলো, এই ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি কোনো অলৌকিক সৌভাগ্যের প্রার্থনা নয়; এটি এক অসমাপ্ত জীবনের হাহাকার। মানুষ তখন চায়, নতুন করে সেজদা করতে, হারানো সময়ের ঋণ শোধ করতে, ভুল পথ থেকে সরে দাঁড়াতে। কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন আমাদের শেখায়, এমন আকুতি কেবল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নয়, জীবনের মাঝেও জাগতে হবে। যে হৃদয় আজই জেগে ওঠে, আজই নিজের হিসাব নেয়, আজই তওবার দরজা খোলে—সে-ই আসলে সফল। কারণ প্রকৃত সফলতা মৃত্যু এলে মরিয়া হয়ে ফিরে যেতে চাওয়ায় নয়; বরং মৃত্যু আসার আগেই রবের পথে ফিরে আসায়।
মৃত্যু এসে যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন মানুষের জবান থেকে যে আর্তি বের হয়, তা কোনো তর্ক নয়, কোনো দাবি নয়; তা হলো ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের কাঁপা কাঁপা স্বর। “হে আমার রব, আমাকে ফিরিয়ে দিন”—এই এক বাক্যে লুকিয়ে আছে জীবনের সব অনুশোচনা, সব অপূর্ণতা, সব অবহেলার হিসাব। দুনিয়ায় যে সময়টাকে আমরা ছোট ছোট প্রয়োজন, বিলম্ব, অজুহাত আর মোহে নষ্ট করেছি, মৃত্যুর এক মুহূর্তে সে-ই সময় অমূল্য হয়ে ওঠে। তখন মানুষ বুঝে যায়, যার পেছনে ছুটেছিল, তা হাতছাড়া; আর যার দিকে ফিরে তাকায়নি, তিনিই একমাত্র আশ্রয়।
কিন্তু কুরআন এখানে আমাদের শুধু এক মৃতপ্রায় মানুষের আর্তি শোনাতে চায় না; সে আমাদের বর্তমানকে জাগিয়ে তুলতে চায়। কারণ সেই “ফিরে দিন” বলার সময় তখন আর ফিরে আসা থাকে না। তাওবার দরজা তখন আর কর্মের দরজা নয়, হয়ে ওঠে আফসোসের দরজা। এ আয়াত যেন জীবিতদের কানে ফিসফিস করে বলে—যে হৃদয়ে এখনো নরম আলো বাকি আছে, সে যেন দেরি না করে; যে চোখ এখনো অশ্রু ফেলতে পারে, সে যেন আজই আল্লাহর দিকে ফিরে আসে; যে অন্তর এখনো কেঁপে ওঠে, সে যেন গাফেলতার আবরণ ছিঁড়ে ফেলে।
মানুষের সফলতা এই নয় যে সে কত দূর গেছে, কত পেয়েছে, কত জমিয়েছে; সত্য সফলতা হলো—মৃত্যুর আগে সে তার রবের দিকে ফিরে যেতে শিখেছে কি না। যে ফিরে আসে দুনিয়ায়, সে আসলে পথ খোঁজে; আর যে পথ এখনই খুঁজে নেয়, মৃত্যুর মুহূর্তে তার আর ‘ফিরিয়ে দিন’ বলার করুণতা থাকে না, থাকে প্রশান্ত সাক্ষাৎকারের আশা। তাই আজই যদি এই আয়াত তোমার হৃদয়ে আঘাত করে, সেটাই রহমত। আল্লাহ আমাদের সেই বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা মৃত্যুর আগে জেগে ওঠে, অনুতাপের আগে আনুগত্য বেছে নেয়, আর দুনিয়ার মোহে হারিয়ে না গিয়ে আখিরাতের জন্য সত্যিকার প্রস্তুতি নেয়।