নিশ্চয় যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত—এই সংক্ষিপ্ত আয়াতের ভেতরে যেন মুমিনের হৃদয়ের এক গভীর ভূমিকম্প লুকিয়ে আছে। এখানে ভয় মানে পলায়ন নয়, অন্ধকারে কুঁকড়ে যাওয়া নয়; বরং এমন এক জাগ্রত অবস্থা, যেখানে হৃদয় আল্লাহর মহত্ত্বকে স্মরণ করে কাঁপে, আর সেই কাঁপুনির মধ্যেই নিজেকে সংশোধন করতে শেখে। এই خشية এমন এক অন্তর্গত অনুভব, যা মানুষকে গাফিল করে না; তাকে নরম করে, বিনয়ী করে, হিসাবী করে। মুমিনের চোখে তাই জীবন শুধু ভোগের ময়দান নয়—এটি এমন এক সফর, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের শেষে রবের সামনে দাঁড়ানোর দিন অপেক্ষা করছে।
সূরা আল-মুমিনূন মূলত মুমিনের পরিচয়, সৃষ্টির বিস্ময়, নবীদের সংগ্রাম, আখিরাতের বাস্তবতা এবং সফলতার প্রকৃত মানদণ্ডকে সামনে আনে। এই সূরার শুরুতেই যে গুণগুলো বলা হয়েছে, সেগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন নৈতিক সাজসজ্জা নয়; বরং একটি জীবন্ত ঈমানের পূর্ণ অবয়ব। ২৩:৫৭ আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই হৃদয়ের কথা বলেন, যে হৃদয় রবের ভয়কে অবহেলা করে না, বরং সেই ভয়কে ঈমানের জাগরণ হিসেবে বহন করে। এ ভয় মানুষকে ভেঙে দেয় না; বরং তাকে নীচতা, অহংকার, পাপের অন্ধতা এবং দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচিয়ে আখিরাতমুখী করে তোলে।
এই আয়াতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট, নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত শানে নুযূল বর্ণিত নেই; তাই এটিকে একটি সার্বজনীন ঈমানি বাণী হিসেবেই বুঝতে হয়। কুরআনের ব্যাপক ধারায় এটি সেইসব অন্তরের কথা বলে, যারা আল্লাহকে জানে বলে তাঁকে ভয় করে, এবং ভয় করে বলেই তাঁকে ভুলে থাকতে পারে না। মুমিনের ভয় এখানে রবের প্রতি অমর্যাদার আশঙ্কা, অবাধ্যতার বিপদ, এবং হাশরের দিনের জবাবের স্মৃতি—যা মানুষকে আখিরাতের জন্য প্রস্তুত করে। এই প্রস্তুতিই সত্যিকারের সফলতার দরজা খুলে দেয়; কারণ যে হৃদয় আজই কাঁপে, কাল সে নিরাপদ থাকে।
রবের ভয়ে সন্ত্রস্ত হৃদয় আসলে দুর্বল হৃদয় নয়; এ সেই হৃদয়, যেখানে ঈমান জেগে আছে, বিবেক জেগে আছে, আখিরাত জেগে আছে। মানুষের জীবনে ভয় বহু রূপে আসে—কখনো ক্ষতির, কখনো অপমানের, কখনো দুনিয়াবি অনিশ্চয়তার। কিন্তু خشية আলাদা; এটি এমন ভয়, যা আল্লাহর মহত্ত্ব, তাঁর জবাবদিহি, তাঁর অসীম ন্যায় ও করুণার সম্মিলিত স্মৃতি থেকে জন্ম নেয়। এই ভয় মানুষকে পালিয়ে যেতে শেখায় না, বরং নিজেকে শুদ্ধ করতে শেখায়। সে জানে, আমি চোখে দেখা দুনিয়ার সামনে শুধু একজন পথিক নই; আমি সেই সত্তার সামনে দাঁড়াব, যিনি অন্তরের গোপন কথাও জানেন। তাই এই ভয় মুমিনকে নরম করে, অহংকার ভেঙে দেয়, গুনাহের প্রতি আকর্ষণকে কাঁপিয়ে তোলে।
নিশ্চয় যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে সন্ত্রস্ত—এই বাক্যটি এমন এক অন্তরের ছবি আঁকে, যা নিজের ভেতরের শব্দকেও শুনতে পায়। এই ভয় বাহ্যিক আতঙ্ক নয়; এটি সেই সচেতন কম্পন, যখন মানুষ উপলব্ধি করে—আমি একা নই, আমার প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি লুকানো ইচ্ছাও রবের জ্ঞানের বাইরে নয়। মুমিনের হৃদয় তাই গাফিল ঘুমে ডুবে থাকে না; সে নিজের হিসাব নিজেই করতে শেখে, যেন আখিরাতের হিসাবের দিন তার জন্য নতুন কোনো বিস্ময় না হয়। এই خشية মানুষকে কঠোর করে না, বরং নরম করে; অহংকার ভেঙে দেয়, অন্তরকে ধুয়ে দেয়, আর পাপের দিকে বাড়তে থাকা পা-কে থামিয়ে দেয়।
যে সমাজে আল্লাহর ভয় মরে যায়, সেখানে মানুষ বাহ্যিকভাবে হাসে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নৈতিকতা শুকিয়ে যায়; সেখানে শক্তির ভাষা কথা বলে, প্রবৃত্তি সিদ্ধান্ত নেয়, আর সত্যের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে। কিন্তু যে সমাজে কিছু হৃদয় এখনো রবভীত থাকে, সেখানে অন্যরকম এক আলো জ্বলে—সেখানে মানুষ একে অন্যের দিকে তাকায় দায়িত্বের চোখে, ক্ষমতা আমানত হয়ে ওঠে, সম্পর্ক নিষ্পাপ না হলেও জবাবদিহির স্মৃতি হারিয়ে যায় না। এমন ভয় মুমিনকে হতাশ করে না; বরং আশা ও ভয়ের মাঝখানে তাকে ঠিক রাখে। সে জানে, রব কঠিন শাস্তিদাতা, আবার পরম দয়ালুও; তাই সে দৌড়ে যায়, তাওবা করে, নিজেকে সংশোধন করে, আর বারবার ফিরে আসে সেই দরজায়, যা গোনাহগারের জন্যও বন্ধ হয় না।
সূরা আল-মুমিনুনের এই ধারাবাহিক আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সফলতা কেবল বাহ্যিক অর্জনের নাম নয়; সফলতা হলো এমন এক অন্তর, যা রবকে ভুলে না, এবং এমন এক জীবন, যা আখিরাতকে স্মরণ করে গড়ে ওঠে। মানুষ যতই দুনিয়ার ব্যস্ততায় হারিয়ে যাক, তার ভেতরের আত্মা জানে—ফিরে যেতে হবে। মাটি থেকে সৃষ্ট সেই মানুষকে একদিন আবার তার রবের সামনে দাঁড়াতে হবে; তখন দুনিয়ার চাকচিক্য, মানুষের প্রশংসা, গোপন লেনদেন, লুকানো দুর্বলতা—সবই উন্মোচিত হবে। তাই মুমিনের ভয় মূলত ফিরে আসার প্রস্তুতি; সে জানে, যাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে, তাঁর কাছে লুকানোর কিছু নেই। আর এই উপলব্ধিই অন্তরকে জাগিয়ে তোলে: হে আত্মা, তুমি কোথায় যাচ্ছ? যদি গন্তব্য রবের সান্নিধ্য হয়, তবে আজ থেকেই তোমার পদচিহ্নকে বিশুদ্ধ করো।
যে হৃদয়ে রবের ভয় জেগে থাকে, সেই হৃদয় কখনো হালকাভাবে বাঁচতে পারে না। সে জানে—আমি একা নই, আমি অবহেলিত নই, আমি নিজের কাছে জবাবদিহিহীনও নই। আল্লাহর خشية মানুষের ভেতরের অহংকারকে নরম করে, দম্ভকে গলিয়ে দেয়, আর গোপন পাপের ওপরও একটি অদৃশ্য আলো ফেলে। তাই মুমিনের কান্না দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং তা সেই অন্তরের ভাষা, যে অন্তর মহান রবকে চিনেছে এবং নিজের সীমা উপলব্ধি করেছে। এই ভয় তাকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে না, বরং দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচিয়ে আখিরাতের সত্যকে আরো জীবন্ত করে।
আজ আমরা যদি নিজের ভেতরে তাকাই, তবে কতটা কম্পন পাব? কতটা জাগরণ, কতটা লজ্জা? আমরা কি সত্যিই রবকে স্মরণ করি, নাকি শুধু প্রয়োজনের সময় ডাক দিই? এই আয়াত যেন নরম কিন্তু অনড় কণ্ঠে বলে—ভয়কে হারিও না, কারণ এই ভয়ই তোমাকে মরচে ধরা গাফলাত থেকে বাঁচাবে। যে অন্তর রবের ভয়ে সজাগ, সে অন্তর তওবার দরজা খোলা রাখে, গুনাহকে হালকা ভাবে না, আর নেক আমলকে ছোট মনে করে না। শেষ পর্যন্ত সফলতা তারই, যে ভয়কে নিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে; কারণ এমন ভয়ই মানুষকে ভেঙে নয়, বরং সোজা করে দাঁড় করায়, আর রবের সামনে বিনীত হয়ে বাঁচতে শেখায়।