۞ هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ — কত দূর, কত অনতিক্রম্য দূরত্বে তারা সরিয়ে ফেলে সেই প্রতিশ্রুতি, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের সামনে উন্মুক্ত হয়েছিল। এই একটি উচ্চারণে যেন ধরা পড়ে আত্মাভিমানী অস্বীকারের কণ্ঠস্বর। তারা আখিরাতকে দূরের কথা বলে, যেন মৃত্যুর পরের জীবন মানুষের চিন্তার বাইরে এক অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কুরআন যখন তাদের মুখের এই তাচ্ছিল্য তুলে ধরে, তখন আমাদের সামনে শুধু তাদের অবিশ্বাসই নয়, মানুষের অন্তরের এক পুরনো রোগও উন্মোচিত হয়—সত্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করার রোগ।

এই আয়াতের সুর মক্কার সেই পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আহ্বান ছিল তাওহীদ, জবাবদিহি, পুনরুত্থান, এবং আল্লাহর সামনে ফিরে যাওয়ার স্মরণ। নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনা এখানে নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারিত না হলেও, সূরার সামগ্রিক প্রবাহ স্পষ্ট করে যে এটি এমন এক সমাজের কথা বলছে, যারা সৃষ্টি, রিসালাত, এবং আখিরাতকে অস্বীকার করে নিজেদের ভোগ, অহংকার, ও পার্থিব নিরাপত্তাকে সত্যের মানদণ্ড বানিয়ে ফেলেছিল। তাদের এই “হেইহাত” আসলে যুক্তির শক্তি ছিল না; ছিল আত্মপ্রবঞ্চনার উঁচু দেয়াল, যার আড়ালে তারা চূড়ান্ত বিচারের কথা শুনতে চাইত না।

মুমিনের হৃদয় এই বাক্য শুনে কেঁপে ওঠে, কারণ সে জানে—যা মানুষ দূর মনে করে, আল্লাহর কাছে তা অনিবার্য সত্য। আজ যারা ওয়াদাকৃত আখিরাতকে ‘কোথায় আছে’ বলে উপহাস করে, কাল তাদেরই সামনে সেই বাস্তবতা দাঁড়াবে, যখন কোনো অস্বীকার আর আশ্রয় দেবে না, কোনো গর্ব আর ঢাল হবে না। এই আয়াত আমাদের অন্তরে প্রশ্ন জাগায়: আমরা কি সত্যকে হৃদয়ের কাছে এনেছি, নাকি নিজেদের কামনা-বাসনার সুবিধার জন্য তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি? মুমিনের জন্য এই প্রশ্ন শুধু চিন্তার বিষয় নয়; এটি জাগরণের দরজা, যেখানে বিশ্বাস আরও গভীর হয়, আর হৃদয় আরও বিনয়ী হয়ে আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত হতে শেখে।

যখন মানুষ বলে, “এ তো অনেক দূরের কথা,” তখন সে শুধু আখিরাতকেই অস্বীকার করে না; সে নিজের সীমাবদ্ধতাকেও ভুলে যায়। এই একটি বাক্যে আত্মগর্বের এমন এক তীব্রতা আছে, যা অন্তরকে শিউরে তোলে। কারণ মানুষ যতই শক্তি, বিত্ত, বুদ্ধি আর ভোগের আলোয় নিজেকে বড় ভাবুক, মৃত্যু তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এক অদৃশ্য দরজার মতো। আর সেই দরজার ওপারে যে জবাবদিহি, যে পুনরুত্থান, যে চূড়ান্ত সত্য অপেক্ষা করে—অস্বীকারকারীর চোখে তা অবাস্তব, কিন্তু মুমিনের হৃদয়ে তা-ই সবচেয়ে নিশ্চিত।

এখানে কুরআন আমাদের কেবল একটি অবিশ্বাসী উক্তি শোনাচ্ছে না; এটি যেন মানুষের ভেতরের সেই পুরোনো প্রবণতাকে উন্মোচন করছে, যেখানে সে যা দেখতে পায় না, তাকে তুচ্ছ করে; যা হাতের মুঠোয় নেই, তাকে দূরে ঠেলে দেয়; আর যা কামনা-বাসনাকে ভেঙে দেয়, তাকে “অসম্ভব” বলে। অথচ আখিরাতের প্রতিশ্রুতি মানুষের স্বাধীনতাকে ছিঁড়ে ফেলার জন্য নয়, বরং তাকে প্রকৃত অর্থে জাগিয়ে তোলার জন্য। এই প্রতিশ্রুতি হৃদয়কে শাসন করে, অহংকারকে ভাঙে, এবং জীবনকে তার আসল দিকে ফিরিয়ে আনে। মুমিন জানে—যা আজ অদৃশ্য, কাল তা-ই হবে চূড়ান্ত দৃশ্য।
তাই এই আয়াত কেবল অস্বীকারকারীর কণ্ঠস্বর নয়, বরং প্রত্যেক অন্তরের জন্য এক নীরব প্রশ্ন: তুমি কি সত্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে নিজেকে নিরাপদ ভাবছ, নাকি নিজের রবের সামনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ? আখিরাতকে “দূর” বলা যত সহজ, তার হিসাব বহন করা ততই কঠিন। কিন্তু বিশ্বাসের পথ সেই মানুষই চেনে, যে চোখে দেখা আর অন্তরে জানা—দুইয়ের মধ্যে আল্লাহর সংবাদকে সবচেয়ে সত্য বলে গ্রহণ করে। মুমিনের জন্য এই আয়াত সতর্কবার্তা: সত্যকে ঠেলে দূরে সরালে সত্য হারায় না, হারায় শুধু সেই হৃদয়, যে তাকে অস্বীকার করেছিল।

“হায়হাত, হায়হাত”—কত দূরে, কত অসম্ভব বলে তারা ঠেলে দিল সেই প্রতিশ্রুতিকে। যেন মৃত্যুর পর আর কোনো সকাল নেই, কবরের পর আর কোনো হিসাব নেই, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর কোনো ভয়ংকর সত্য নেই। মানুষের অহংকার যখন সত্যের ওপর পর্দা ফেলে, তখন সে আখিরাতকে শুধু দূর বলে না; তাকে সে অবাস্তব বলেও মনে করে। এই উচ্চারণে মক্কার অস্বীকারকারীদের কণ্ঠ ধরা পড়ে, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি আজও থামে না। যে হৃদয় দুনিয়ার ধুলায় এতটাই মগ্ন যে আসমানের ডাক শুনতে পায় না, তার কাছে প্রতিশ্রুত আখিরাত অবশ্যই দূরের মনে হয়।

কিন্তু মুমিন এই বাক্য শুনে আতঙ্কিত হয় না, বরং জেগে ওঠে। কারণ সে জানে, যা মানুষ “দূরে” ঠেলে দেয়, আল্লাহর কাছে তা অনিবার্য সত্য। দুনিয়ার ব্যস্ততা, সম্পদের মোহ, ক্ষমতার গর্ব, আর ভোগের নেশা মানুষের অন্তরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে সে নিজের পরিণতি ভুলে যায়। এ আয়াত যেন নীরবে আমাদেরই মুখের দিকে আঙুল তোলে—আমরাও কি কোনো কোনো পাপে, কোনো কোনো গাফিলতিতে, কোনো কোনো আত্মপ্রতারণায় শেষ দিনের সত্যকে দূরে সরিয়ে দিই না? নিজের হিসাব নেওয়ার সাহস যেদিন অন্তরে জন্ম নেয়, সেদিনই “হায়হাত” শব্দটি গর্বের না হয়ে ভয়ের হয়ে ওঠে।

তাই এই আয়াত মুমিনকে শেখায়, বিশ্বাস মানে কেবল মুখে আখিরাতের কথা বলা নয়; বিশ্বাস মানে আখিরাতের আলোকে আজকের জীবনকে বদলে ফেলা। যে জানে সে একদিন ফিরে যাবে, সে জুলুমে হাত কাঁপে, গুনাহে লজ্জা পায়, তওবায় নত হয়, আর আশা ও ভয়ের মাঝখানে আল্লাহর রহমত আঁকড়ে ধরে। যারা সত্যকে দূরে বলে দূরে রাখতে চায়, তারা আসলে নিজেদেরই ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করে। কিন্তু মুমিনের হৃদয় জানে, আল্লাহর ওয়াদা দূরের নয়; বরং সেই সত্যই নিকটতম, যার দিকে মৃত্যুর প্রতিটি নিঃশ্বাস নীরবে আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে।

মানুষ যখন বলে, “এটা কোথায়?”—তখন অনেক সময় প্রশ্নটি আল্লাহর ওয়াদাকে নয়, নিজের হৃদয়ের শূন্যতাকেই উন্মোচন করে। আখিরাতকে দূরে ঠেলে দেওয়া সহজ, কিন্তু মৃত্যু দূরে রাখা যায় না; হিসাবকে অস্বীকার করা সহজ, কিন্তু আমলকে মুছে ফেলা যায় না। এই আয়াতের তীব্রতা আমাদের কানে শুধু মক্কার অস্বীকারকারীদের কণ্ঠ শোনায় না, শোনায় সেই পুরোনো মানব-অহংকারের সুর, যে সুর সত্যকে সামনে দেখেও তাকে অবিশ্বাসের অন্ধকারে সরিয়ে দিতে চায়।

মুমিনের জন্য এই বাক্য ভয়ের নয় শুধু, জাগরণের। কারণ সে জানে—যা আল্লাহ বলেছেন, তা অনিবার্য; যা তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা মানুষের ধারণার চেয়ে অগণিত গুণ বেশি বাস্তব। আজ যে অন্তর এ আয়াতের সামনে নরম হয়ে যায়, সে-ই বাঁচে; যে অন্তর তাওবার দরজায় দাঁড়ায়, সে-ই নিরাপদ হয়। আমরা যেন সেই আত্মপ্রবঞ্চনার মানুষ না হই, যারা সত্যকে “দূরে” বলে নিজেকে সাময়িক শান্তি দেয়। বরং অন্তর নত করে বলি, হে আল্লাহ, আমাদেরকে সেই সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত কোরো না যারা তোমার ওয়াদাকে তুচ্ছ ভেবেছিল; আমাদেরকে এমন ঈমান দাও, যা আখিরাতকে দূরের স্বপ্ন নয়, নিকটতম সত্য হিসেবে দেখে।