“সে তো এক উম্মাদ ব্যক্তি বৈ নয়”—এই একটি বাক্যে সত্যের বিরুদ্ধে মানুষের পুরোনো অস্ত্রগুলো যেন একসঙ্গে কথা বলে। যখন হৃদয় নিজের গোঁড়ামিকে রক্ষা করতে চায়, তখন সে যুক্তির জবাব দেয় অবজ্ঞা দিয়ে, দালিলের জবাব দেয় তাচ্ছিল্য দিয়ে, আর নবীর কণ্ঠকে ঢাকতে চায় উন্মাদনার অপবাদে। এই আয়াত আমাদের সামনে মক্কার অবিশ্বাসীদের সেই কুৎসিত ভাষা তুলে ধরে, যেখানে তারা আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতকে বুঝতে না পেরে বা বুঝেও মানতে না চেয়ে তাঁকে হেয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু কুরআনের এই বর্ণনা শুধু অতীতের এক বাক্য নয়; এটি সত্যের সামনে অহংকারের চিরন্তন মুখোশ।
আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়, “সুতরাং কিছুকাল তার ব্যাপারে অপেক্ষা কর।” এখানে যেন উপহাসকারীদের নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের জন্য সময় চেয়ে নিচ্ছে। তারা ভাবে, কিছুদিন ধৈর্য ধরলেই সত্যের স্রোত থেমে যাবে; অথচ আল্লাহর বিধানে সময় কখনো সত্যের শত্রু নয়, বরং সত্য-অস্বীকারকারীর ওপর সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। নবীদের জীবন কখনো তৎক্ষণাৎ জয়-পরাজয়ের সরল রেখা নয়; সেখানে থাকে দীর্ঘ অবমাননা, কঠিন প্রতিরোধ, নিষ্ঠুর অপবাদ, আর তার মাঝেই অটল দাওয়াত। এই আয়াত সেই বাস্তবতাকে খুলে দেয়—যেখানে নবীকে থামানো যায় না, কেবল তার বিরুদ্ধেই অপেক্ষার সময় ফেলা হয়।
তাই এই বাক্য মুমিনের অন্তরে এক অদ্ভুত শিক্ষা জাগায়। যদি সত্যকে আজও কেউ উন্মাদনা বলে, যদি আল্লাহর পথে চলাকে কেউ তাচ্ছিল্য করে, তবে মুমিনের পথ গর্জন নয়; ধৈর্য। কারণ আল্লাহর সত্য মানুষের কৌতুকের চেয়ে বড়, আর আখিরাতের হিসাব দুনিয়ার উপহাসের চেয়ে দীর্ঘ। সূরা আল-মুমিনুনের এই ধারায় আমরা পরে সৃষ্টি, বিশ্বাস, আমল, আখিরাত ও সফলতার যে বিশাল দিগন্ত দেখব, তার শুরু এখানেই—সত্যকে অপমান করা হয়, কিন্তু সত্য অপমানিত হয় না; সত্যবক্তাকে ঘিরে কটু কথা ওঠে, কিন্তু আল্লাহর নূর নিজের পথ খুঁজে নেয়।
যে সমাজ সত্যের মুখোমুখি হয়ে প্রথমে অপমানের আশ্রয় নেয়, তার ভেতরে আসলে যুক্তির শক্তি থাকে না, থাকে অহংকারের কাঁপুনি। নবীর দিকে তাকিয়ে “সে তো উম্মাদ” বলা—এ যেন নিজের অন্তরের অন্ধত্বকে শব্দে মোড়ানো। সত্য যখন মানুষের অভ্যাস ভেঙে দেয়, তখন অনেকেই তাকে বোঝার চেষ্টা করে না; বরং তাকে বিকৃত নামে ডাকতে চায়। এটাই কুফরের পুরোনো ভঙ্গি: আলোর জবাব আলো দিয়ে নয়, কালি দিয়ে দেওয়া। কিন্তু কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নবীদের সংগ্রাম কখনো শুধু কথার নয়; এটি হৃদয়ের যুদ্ধ, যেখানে ঈমান আর ইনকার, বিনয় আর ঔদ্ধত্য, আল্লাহর হেদায়েত আর মানুষের আত্মদম্ভ মুখোমুখি দাঁড়ায়।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাওয়াহর রাস্তা ফুলের বিছানা নয়; সেখানে কটাক্ষ আছে, অবজ্ঞা আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে, এমনকি পাগল বলে ছুড়ে ফেলার নিষ্ঠুরতাও আছে। তবু সত্যবক্তা থেমে যায় না, কারণ তার ভরসা মানুষের স্বীকৃতি নয়, আল্লাহর দৃষ্টি। আর মুমিন যখন নবীদের এই কষ্টের কথা পড়ে, তখন সে নিজের জীবনের ছোটখাটো উপহাসকেও নতুন চোখে দেখে—সবকিছুই এক পরীক্ষা, সবকিছুই ধৈর্যের মসৃণতা ভেঙে ঈমানকে পরিণত করার সুযোগ। শেষ পর্যন্ত উন্মাদনা বলে যাকে ঢাকতে চেয়েছিল, ইতিহাস তাকে সত্যের নামেই মনে রেখেছে; আর যারা উপহাস করেছিল, তাদের কণ্ঠই সাক্ষ্য হয়ে গেছে যে সত্যকে অস্বীকার করা যায়, কিন্তু সত্যের মালিককে অস্বীকার করা যায় না।
“সে তো এক উম্মাদ ব্যক্তি বৈ নয়”—এই কথাটি শুধু এক অবিশ্বাসীর মুখের কটু উচ্চারণ নয়; এটি হলো অহংকারের সেই পুরোনো ভাষা, যা সত্যের সামনে দাঁড়াতে না পেরে তাকে পাগলামি বলে দাগিয়ে দিতে চায়। যখন মানুষ নিজের অন্তরের অন্ধকারকে রক্ষা করতে চায়, তখন সে আলোকে দোষ দেয়। নবীকে অস্বীকারকারীরা তাই যুক্তির পথ ছেড়ে অপমানের পথ বেছে নেয়; কারণ সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া মানে নিজের সারা জীবনকে বদলে ফেলা, আর অহংকারের কাছে সেটাই সবচেয়ে কঠিন। কুরআন যেন আমাদের শিখিয়ে দেয়—নবীদের কথা সব সময়ই মানুষের কমফোর্ট জোন ভেঙে দেয়, আর যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরতে চায় না, সে সত্যের ডাককে উন্মাদনার শব্দ বলে ভুলতে চায়।
“সুতরাং কিছুকাল তার ব্যাপারে অপেক্ষা কর”—এই বাক্যের মধ্যে যেন অবিশ্বাসীদের নিজেরাই নিজেদের জন্য অপেক্ষার ফাঁস তৈরি করে দিয়েছে। তারা ভাবে, সময় পেরোলেই দাওয়াত নিভে যাবে; কিন্তু সময় আল্লাহর হাতে, আর সময়ই শেষ পর্যন্ত সাক্ষ্য দেয় কার কথা ছিল সত্য, কার জেদ ছিল মিথ্যা। এ দুনিয়ায় সত্যবক্তার পথ সহজ নয়: অবজ্ঞা আসবে, কটূক্তি আসবে, সমাজের চাপ আসবে, কখনো আপন মানুষও ভুল বুঝবে। তবু মুমিনের কাজ হলো বিচলিত না হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, নিজের ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখা, আর আল্লাহর ফয়সালার প্রতীক্ষায় হৃদয়কে সজাগ রাখা। কারণ নবীদের ইতিহাস আমাদের বলে—তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি নয়, দীর্ঘ ধৈর্যই আল্লাহর কাছে বড় নিদর্শন।
এই আয়াত মানুষের ভেতরের আদালতকে জাগিয়ে তোলে। আমি কি সত্য শুনে তা গ্রহণ করি, নাকি নিজের স্বার্থ বাঁচাতে তার ওপর অপবাদ চাপাই? আমি কি অন্যায়ের পাশে থেকে সত্যকে হেয় করি, নাকি নীরব থেকেও গোনাহের অংশী হই? সমাজ যখন বিদ্রূপে ভরে যায়, তখন মুমিনের দায়িত্ব হলো অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া, কারণ শেষ ফিরে যাওয়া তো তাঁরই দিকে। নবীর দাওয়াত আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—নরম কিন্তু অটল, করুণাময় কিন্তু নির্ভীক। যে অন্তর এই আহ্বানকে গ্রহণ করে, সে ধীরে ধীরে সফলতার দিকে হাঁটে; আর যে অন্তর অবজ্ঞার মধ্যে আটকে থাকে, সে সময়ের কাঁটায় নিজেরই বুক ক্ষতবিক্ষত করে।
“কিছুকাল অপেক্ষা কর”—এই বাক্যে অবিশ্বাসীরা হয়তো তুচ্ছ এক বিলম্ব দেখেছিল, কিন্তু আসলে তারা নিজেদের জন্যই সময়ের ফাঁস টানছিল। সময় মুমিনের শত্রু নয়; সময় হল পরীক্ষা, পরিষ্কার আয়না, এবং এমন এক মঞ্চ যেখানে সত্য ও মিথ্যা আলাদা হয়ে যায়। আজও যখন দীনের কথা শুনে কেউ বিরক্ত হয়, যখন হিদায়াতকে দুর্বলতা আর আনুগত্যকে পশ্চাৎপদতা বলে ঠেলতে চায়, তখন এই আয়াত হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়—তুমি ভয় পেও না, ধৈর্য ধরো, কারণ যারা আল্লাহর পথে কষ্ট সহ্য করে, তাদের পথ বৃথা যায় না।
এই সূরার আলো আমাদের আবার সৃষ্টি, সংগ্রাম ও আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে আনে। মানুষ মাটি থেকে এসেছে, অহংকারের জন্য নয়; মানুষ পরীক্ষা দিয়ে গেছে, অবজ্ঞার কাছে হার মানার জন্য নয়; মানুষ ফিরবে সেই রবের কাছে, যিনি প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি তাচ্ছিল্য, প্রতিটি অশ্রু জানেন। তাই আজ যদি কেউ সত্যকে উপহাস করে, আমাদের জবাব হোক নম্রতা, দৃঢ়তা, তওবা ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। কারণ শেষ বিজয় উচ্চস্বরে নয়, শেষ বিজয় সেই হৃদয়ের, যে ভেঙে গিয়েও রবের সামনে সেজদায় ফিরে আসে।