এক ফোঁটা পানি—অথচ তাতে লুকিয়ে থাকে কত বিস্ময়, কত আয়োজন, কত দয়া। সূরা আল-মুমিনূনের এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দেন, সেই পানির ভেতর থেকেই তিনি মানুষের জন্য গড়ে তুলেছেন খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান; সেখানে আছে অফুরন্ত ফল, আর সেখান থেকেই মানুষের আহার জোটে। এ শুধু কৃষির কথা নয়, এ হলো সৃষ্টির গভীর কাব্য। নির্জীবতার বুক চিরে জীবন উঠছে, তৃষ্ণার জায়গায় ছায়া নেমে আসছে, রুক্ষতা থেকে জন্ম নিচ্ছে কোমলতা। মানুষ যখন নিজের হাতে গড়া সামান্য ব্যবস্থাকেই বড় মনে করে, তখন কুরআন তাকে দেখায়—আল্লাহর এক ইশারায় জলও বাগান হয়ে যায়, বাগানও রিজিক হয়ে যায়।
এই আয়াত মুমিনের চোখ খুলে দেয়: আমরা যা খাই, যা উপভোগ করি, যা দিয়ে বেঁচে থাকি—সবই এক অদৃশ্য দয়ার প্রবাহ। খেজুরের মিষ্টি, আঙ্গুরের রস, ফলের প্রাচুর্য—এগুলো শুধু স্বাদ নয়, এগুলো মাবুদের করুণার সাক্ষ্য। আর এ করুণা একা ভোগের জন্য নয়; এটি কৃতজ্ঞতার দরজা খুলে দেয়। মুমিন যখন ফল হাতে নেয়, তখন সে কেবল ক্ষুধা মেটায় না; সে আল্লাহকে স্মরণ করে। যখন সে বাগানের দিকে তাকায়, তখন সে কেবল সৌন্দর্য দেখে না; সে বুঝতে শেখে, জীবনকে এত সুন্দর করে তুলেছেন যিনি, তিনি আখিরাতের হিসাবও অনর্থক ছেড়ে দেবেন না।
এই আয়াতের বৃহত্তর প্রসঙ্গও গভীর। সূরা আল-মুমিনূন মূলত মুমিনের গুণ, মানুষের সৃষ্টি, নবীদের সংগ্রাম, আখিরাতের নিশ্চিততা এবং সফল মুমিনের পরিণতি নিয়ে কথা বলে। এখানে সৃষ্টিজগতের নিদর্শনগুলো বারবার সামনে আসে, যেন মানুষ নিজের উৎস, নিজের প্রয়োজন, আর নিজের পরিণতি ভুলে না যায়। পানি, গাছ, ফল—এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে শেখান যে রিজিকের উৎস প্রকৃতপক্ষে তিনিই; আর যে হৃদয় এ সত্য বুঝে, তার জীবনে অহংকারের বদলে আসে বিনয়, অবহেলার বদলে আসে শোকর, আর দুনিয়ার নেয়ামতের মাঝেও জেগে থাকে আখিরাতের ভয় ও আশা।
এক ফোঁটা পানি যখন আল্লাহর হাতে পড়ে, তখন তা আর শুধু পানি থাকে না; তা হয়ে ওঠে জীবন, সৌন্দর্য, রিজিক, আর বিস্ময়ের এক দীর্ঘ কাহিনি। তিনি সেই জল থেকে তোমাদের জন্য গড়ে তুললেন খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান—যেন নিষ্প্রাণ মাটির বুকেও তাঁর ক্ষমতার লিপি লেখা থাকে। রুক্ষ ভূমি, শুষ্ক তৃষ্ণা, পোড়া প্রান্তর—সবকিছুর মাঝখানে হঠাৎ সবুজের নরম হাতছানি, মিষ্টির সম্ভার, ফলের প্রাচুর্য। মানুষ যা দেখে অভ্যস্ত, কুরআন তার ভেতরের অলৌকিকতা খুলে দেয়; আর মুমিন বুঝে যায়, প্রতিদিনের আহারও আসলে এক মহাকরুণার দরজা।
এ আয়াতের কোমলতার মধ্যে আখিরাতেরও ইশারা আছে। যে রব এক ফোঁটা জলকে বাগানে বদলে দিতে পারেন, তিনি মৃতকেও জীবিত করতে অপারগ নন; যে সত্তা দুনিয়ার জন্য এমন নান্দনিক রিজিক সাজাতে পারেন, তিনি আখিরাতের জন্য কী না প্রস্তুত রেখেছেন! তাই এই পৃথিবীর ফল শুধু জিহ্বার আনন্দ নয়, ঈমানের স্মরণিকা। এগুলো আমাদের বলে, জীবন নিছক ভোগের জন্য নয়; জীবন হলো কৃতজ্ঞতার, জবাবদিহির, আর ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতির সফর। মুমিন যখন বাগানের দিকে তাকায়, সে আনন্দ পায়, কিন্তু সে থেমে থাকে না; সে আরও গভীর এক সুর শুনে—এই নিয়ামতের পেছনে আছেন সেই পালনকর্তা, যাঁর দিকে একদিন সকল রিজিকের হিসাবসহ ফিরতে হবে।
আল্লাহ তাআলা পানিকে থামিয়ে রাখেন না; তিনি তাকে জীবন বানান। আর জীবনকে তিনি নিছক বাঁচার উপকরণে সীমাবদ্ধ করেন না; তিনি তাকে সৌন্দর্য, স্বাদ, ছায়া, বিস্তার ও আহারের নেয়ামতে রূপ দেন। খেজুর আর আঙ্গুরের বাগান—এ শুধু ফলের নাম নয়, এ হলো আসমানী করুণার দৃশ্যমান সাক্ষ্য। যে মাটি আগে নিস্তব্ধ, যে ডাল আগে শূন্য, যে শেকড় আগে অদৃশ্য—সেইখানেই আল্লাহর আদেশে প্রাচুর্য জেগে ওঠে। মুমিন যখন এ দৃশ্য দেখে, তখন তার অন্তর কেঁপে ওঠে; সে বোঝে, নিজের শক্তি নয়, নিজের কৌশল নয়, নিজের পরিকল্পনাও নয়—আসল মালিক আল্লাহ। মানুষ যতই সভ্যতার গর্ব করুক, এক বিন্দু পানির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কত সামান্য! অথচ সেই পানি থেকেই আল্লাহ আমাদের জন্য এমন নি’মাতের দরজা খুলে দেন, যেখানে ক্ষুধা মেটে, জীবন টেকে, এবং অন্তর যদি জাগ্রত থাকে, ঈমানও পুষ্ট হয়।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। আমরা অনেক সময় রিজিককে শুধু উপার্জনের হিসাব মনে করি, আর উপভোগকে ভাবি নিজের প্রাপ্য অধিকার। কিন্তু কুরআন শেখায়, খাদ্যও একটি আমানত; বাগানও একটি পরীক্ষার স্থান। তোমার হাতে যে ফল, তা তোমার কৃতিত্বের নয়; তা তোমার রবের দান। কাজেই ভোগের সঙ্গে যেন অহংকার না আসে, সম্পদের সঙ্গে যেন গাফিলতি না জন্মায়, আর নিয়ামতের সঙ্গে যেন নাফরমানির অন্ধকার না মেশে। যে সমাজ রিজিক পেয়েও কৃতজ্ঞ হয় না, সে ধীরে ধীরে হৃদয়ের মৃত্যুর দিকে এগোয়। আর যে বান্দা খায়, কিন্তু মালিককে ভুলে না; নেয়, কিন্তু অস্বীকার করে না; উপভোগ করে, কিন্তু জবাবদিহি স্মরণ রাখে—সেই বান্দার ভেতরে নরম হয়ে আসে তাকওয়ার আলো।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞেস করি: আমি কি শুধু ফলের স্বাদ নিচ্ছি, নাকি ফলদাতা রবকে চিনছি? আমি কি শুধু পৃথিবীর সবুজে হারিয়ে যাচ্ছি, নাকি আখিরাতের জন্য জাগছি? কারণ এ বাগানও স্থায়ী নয়, এই আহারও শেষ হয়, এই দুনিয়ার মিষ্টি স্বাদও একদিন ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু যে অন্তর আল্লাহকে চিনে নেয়, সে জানে—রিজিকের প্রতিটি দানা আসলে ফিরে যাওয়ার পথের স্মরণ। মানুষের জীবন যদি কৃতজ্ঞতায় ভরে না ওঠে, তবে প্রাচুর্যও শূন্য; আর যদি হৃদয় আল্লাহমুখী হয়, তবে সামান্য খাদ্যেও নূর নেমে আসে। সুতরাং, পানির মধ্যে যে বাগান, বাগানের মধ্যে যে ফল, আর ফলের মধ্যে যে আহার—সবকিছুর ভিতর দিয়ে আল্লাহ আমাদের ডাকছেন: ফিরে এসো, জেগে ওঠো, নিজের হিসাব নাও, আর সেই রবের দিকে ফিরে চলো, যিনি শূন্যকে সবুজ করেন এবং অনুগ্রহের ভিতর লুকিয়ে রাখেন আখিরাতের প্রস্তুতি।
কিন্তু এই বাগান, এই ফল, এই আহার—সবই তো ক্ষণিকের অতিথিশালা। খেজুরের ডালি, আঙ্গুরের গুচ্ছ, নানান ফলের ভরপুরতা—এগুলো দেখে যদি হৃদয় আল্লাহর দিকে না ফেরে, তবে চোখ আছে কিন্তু দৃষ্টি নেই; হাত আছে কিন্তু কৃতজ্ঞতা নেই। যিনি পানিকে জমিনের বুকে বাগান বানান, তিনিই তো চাইলে সেই বাগানকে শুষ্ক ধূলায় পরিণত করতে পারেন। তাই মুমিন যখন রিজিকের দিকে তাকায়, সে লোভে অন্ধ হয় না; সে ভয়ে কাঁপে, কৃতজ্ঞতায় নত হয়। কারণ নেয়ামত কেবল ভোগের বস্তু নয়, এ হলো পরীক্ষা—আমার অন্তর কোন দিকে ঝুঁকে: দাতার দিকে, নাকি দানের দিকে?
আজকের মানুষ ফলের মিষ্টি চেনে, কিন্তু সেই মিষ্টতার পেছনের রহমতকে কত কম চিনে। আমরা আহার করি, তৃপ্ত হই, তারপর ভুলে যাই; অথচ প্রতিটি লোকমা আমাদেরকে একটাই কথা শোনায়—তুমি একা নও, তোমার ওপর এক মহান প্রতিপালকের অনুগ্রহ প্রবাহিত হচ্ছে। এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর যেন নরম হয়ে আসে: হে আল্লাহ, তুমি আমাদের পানিকে বাগান বানিয়েছ, বাগানকে ফল বানিয়েছ, ফলকে আহার বানিয়েছ; এখন আমাদের অহংকারকে ভেঙে দাও, আমাদের অকৃতজ্ঞতাকে ধুয়ে দাও, আমাদের দৃষ্টিকে আখিরাতের দিকে ফেরাও। কারণ শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখে খেজুরের মিষ্টি নয়, আঙ্গুরের রসও নয়—বাঁচিয়ে রাখে সেই ঈমান, যা নেয়ামত দেখে দাতা-স্মরণে কেঁপে ওঠে।