মানুষের জীবনে কত আয়োজন, কত স্বপ্ন, কত দাবি—কিন্তু এই আয়াত সব কিছুর ওপর নীরব অথচ অদম্য এক সত্য রেখে দেয়: এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। সৃষ্টির কথা বলার পরেই আল্লাহ মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেন, যেন মানুষ বুঝতে শেখে—জন্ম কোনো স্থায়ী অধিকার নয়, জীবন কোনো চূড়ান্ত বাসস্থান নয়। দেহের শুরু যেমন আল্লাহর কুদরতের হাতে, তেমনি এর শেষও তাঁরই নির্ধারিত হুকুমে। এই সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই; মানুষ যতই শক্তি, সৌন্দর্য, সম্পদ বা প্রভাবের ওপর ভর করে বাঁচতে চাইুক, মৃত্যু এসে বলে দেয়—তোমার পথের শেষ এ দুনিয়ায় নয়।

সূরা আল-মুমিনুনের এই অংশে মানুষের সৃষ্টি, তার পরিণতি, এবং আল্লাহর নিখুঁত ক্ষমতার ধারাবাহিকতা এক গভীর ছন্দে বর্ণিত হয়েছে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনার সীমায় আয়াতটি আবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবজীবনের সর্বজনীন বাস্তবতা, যা প্রত্যেক যুগের মানুষকে একইভাবে স্পর্শ করে। সৃষ্টির বিস্ময় যেমন মানুষকে অহংকার থেকে ফেরায়, মৃত্যুর নিশ্চিততা তেমনি তাকে গাফলত থেকে জাগায়। এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অন্তরভেদী স্মরণ—তুমি যেখান থেকে এসেছ, সেখানেই ফিরে যাবে; তাই তোমার দম্ভ, তোমার ব্যস্ততা, তোমার সংগ্রাম—সবই একদিন এ সত্যের সামনে নত হবে।

মুমিনের জন্য এই আয়াত শোকের ভাষা নয়, বরং জাগরণের ভাষা। কারণ মৃত্যু দুনিয়ার পরাজয় নয়; ঈমানের চোখে মৃত্যু হল সফরের সমাপ্তি, পরের জগতের দরজায় পৌঁছে যাওয়া। যে মানুষ জানে সে মরণশীল, সে আর দুনিয়াকে চূড়ান্ত মনে করে না; সে আমলকে সঞ্চয় মনে করে, তওবাকে আশ্রয় মনে করে, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের মানদণ্ড বানায়। এই আয়াত তাই হৃদয়ের ওপর এক মৃদু কিন্তু গভীর আঘাত হানে—তুমি তো যাবেই, তবে কোথায় যাবে? এই প্রশ্নই মানুষকে সফলতার সত্যিকারের পথে ফিরিয়ে আনে, যেখানে ঈমান, আনুগত্য এবং আখিরাতের প্রস্তুতিই শেষ পর্যন্ত রয়ে যায়।

মানুষের শরীর যত যত্নে গড়া হোক, যত শক্তির ভরসায় সে দাঁড়াক, তার ভেতরে এক নীরব ঘোষণা লেখা থাকে—এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। জন্মের আলোকে মানুষ যতই স্থায়িত্বের স্বপ্ন বুনুক, এই আয়াত সেই স্বপ্নের কিনারায় মৃত্যু নামের অবশ্যম্ভাবী ছায়া ফেলে দেয়। এখানে মৃত্যু কোনো আকস্মিক ব্যর্থতা নয়, বরং সৃষ্টিরই পূর্ণতা-অভিমুখী এক সত্য; দেহ যিনি শুরু করেছেন, তার শেষও তিনি নির্ধারণ করেছেন। তাই মুমিনের কাছে মৃত্যু ভয়ংকর অন্ধকার নয়, বরং দুনিয়ার মিথ্যা স্থায়িত্ব ভেঙে দেওয়া এক কঠিন কিন্তু করুণ সত্য, যা হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে।

এই স্মরণ মানুষকে অহংকারের উঁচু প্রাসাদ থেকে নামিয়ে আনে। যে আজ শক্তিশালী, সে কাল নিস্তব্ধ; যে আজ কথা বলছে, সে একদিন নীরব হবে; যে আজ সম্পদ, সৌন্দর্য, পদমর্যাদা নিয়ে মোহিত, সে একদিন সব রেখে চলে যাবে। কুরআন যেন এভাবেই জীবনের মাঝখানে মৃত্যু বসিয়ে দেয়, যাতে মানুষ ভুলে না যায়—দুনিয়া শেষ গন্তব্য নয়। এই জগৎ পরীক্ষার মাঠ, আর মৃত্যু সেই দ্বার, যেখান দিয়ে প্রত্যেকে একা, নিঃসহায়, নিজের আমল নিয়ে অচেনা এক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হয়। এ কথা হৃদয়ে বসলে ভোগের উন্মাদনা কমে, হিসাবের ভয় জাগে, আর আল্লাহর দিকে ফিরে আসার তৃষ্ণা গভীর হয়।
তাই মুমিন মৃত্যুকে এড়িয়ে নয়, প্রস্তুতি নিয়ে বাঁচে। সে জানে, জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাস আসলে আখিরাতের দিকে গোনা হচ্ছে; প্রতিটি দিন, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি অর্জন একদিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু ঈমান, তাওবা, সিজদা, ন্যায় ও খাঁটি আমলের মূল্য থেকে যাবে। এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে অন্তর কেঁপে ওঠে—কারণ মৃত্যু শুধু শেষ নয়, সে হল জাগরণের ডাক; শুধু বিচ্ছেদ নয়, সে হল সাক্ষাতের পথে অগ্রযাত্রা। যে এই সত্য স্মরণে বাঁচে, সে দুনিয়ার বন্দী থাকে না; সে ধীরে ধীরে আখিরাতের মানুষ হয়ে ওঠে, আর সেটাই তার প্রকৃত সফলতার শুরু।

মানুষের জীবন যতই দীর্ঘ মনে হোক, আল্লাহর এই এক বাক্য তাকে তার প্রকৃত সীমা দেখিয়ে দেয়: এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। জন্মের বিস্ময়ের পরেই মৃত্যু—যেন কুদরতের একই সুতায় বাঁধা দুই প্রান্ত। এ কথা শুধু দেহের শেষকথা নয়; এ হচ্ছে অন্তরের জন্য এক কঠিন জাগরণ। কারণ আমরা দুনিয়াকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরি, যেন এটাই স্থায়ী ঠিকানা, যেন এখানকার ঘর, সঞ্চয়, সম্মান, সম্পর্ক—সবই চিরদিনের। অথচ এই আয়াত নীরবে বলে, তোমার ভেতরে যে প্রাণ আজ স্পন্দিত, একদিন তা ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তখন শক্তি থাকবে না, দাবি থাকবে না, বাহাদুরি থাকবে না; থাকবে শুধু আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সত্য।

এই মৃত্যুস্মরণে মুমিন ভেঙে পড়ে না; বরং তার হৃদয় নরম হয়, তার দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়, তার আমল জেগে ওঠে। যে জানে শেষ অনিবার্য, সে জীবনের প্রতিটি শ্বাসকে হিসাবের মধ্যে আনতে শেখে। সে গাফেলভাবে হাঁটে না, অহংকারে ফুলে-ফেঁপে থাকে না, মানুষের প্রশংসাকে নিজের স্থায়ী সম্বল মনে করে না। সমাজ যখন বাহ্যিক সাফল্যের মোহে ডুবে যায়, তখন এই আয়াত তাকে জাগিয়ে বলে—দেখো, তোমরা যাকে স্থায়ী ভাবছ, তা ভেঙে যাবে; আর যার প্রস্তুতি নিচ্ছ, সেই আখিরাতই হবে সত্য জীবন। তাই মুমিনের জন্য মৃত্যু ভয়ের অন্ধ গুহা নয়; তা দুনিয়ার ভীড় থেকে আল্লাহর দিকে ফেরার দ্বার, যদি সে ঈমান ও তওবা নিয়ে সেই দ্বারে পৌঁছে।

এখানেই এই আয়াতের হৃদয়বিদারক সৌন্দর্য—মানুষকে ভীত করার জন্য নয়, বরং জাগানোর জন্য মৃত্যু স্মরণ করানো হয়েছে। যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে থাকে, তার কাছে মৃত্যু হঠাৎ এসে সব কিছুকে তুচ্ছ করে দেয়; আর যে হৃদয় প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করে, আমি কোথায় যাচ্ছি, কেন বাঁচছি, কাকে ফিরে দেখাব—তার কাছে মৃত্যু হয় প্রস্তুতির আহ্বান। এই সত্যের সামনে দাঁড়ালে দুনিয়ার রঙ ম্লান হয়, পাপের স্বাদ তিক্ত লাগে, আর নেক আমলের মূল্য আকাশ ছুঁয়ে যায়। কারণ আমাদের যাত্রা এখানেই থেমে যায় না; দেহ মাটিতে যাবে, কিন্তু আত্মার হিসাব যাবে রবের দরবারে। আর সেই দরবারের জন্যই তো মুমিনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিজদা, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি তওবা—একটি নীরব প্রস্তুতি।

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, সে নিজের চলমানতাকেই স্থায়িত্ব ভেবে বসে। অথচ এই আয়াত এক কঠিন সত্য উচ্চারণ করে—এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে। জন্মের কোলেই মৃত্যুর ছায়া, শ্বাসের ভাঁজে বিদায়ের ইশারা, স্বপ্নের ভিতরেই শেষ সফরের প্রস্তুতি। যে দেহ একদিন কাদামাটির দুর্বলতাকে বহন করে আল্লাহর কুদরতে প্রাণ পেয়েছিল, সেই দেহকেই একদিন ফিরতে হবে নীরবতার গভীরে। এই সত্য কাউকে থামিয়ে দেয় না, কিন্তু যারা হৃদয় খুলে শোনে, তাদের ভেতর ভেঙে দেয় অহংকারের প্রাচীর।
মৃত্যু আমাদের শত্রু নয়, বরং এমন এক দরজা, যা দুনিয়ার প্রতারণাকে উন্মোচিত করে দেয়। সে বলে, তোমার সম্পদ তোমার সঙ্গে যাবে না, তোমার শক্তি থাকবে না, তোমার পরিচয় থাকবে না, শুধু থাকবে সেই অন্তর—যা আল্লাহর সামনে কী নিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই মুমিন মৃত্যুকে ভয় পায় না অন্ধকারের মতো, বরং তাকে মনে করে জাগরণের ডাক, ফিরে আসার আহ্বান, হিসাবের প্রস্তুতি। যে অন্তর এই আয়াতের সামনে নত হয়, সে দুনিয়ার মোহে আর মত্ত হতে পারে না; সে জানে, এই সফর শেষ না হলে সত্যিকারের বাসস্থান শুরু হয় না।
হে মানুষ, তুমি আজ যেটাকে জীবন বলে আঁকড়ে ধরছ, তা আসলে প্রস্থান-সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তাই গাফলতকে এখনই বিদায় দাও, অন্তরকে এখনই পরিষ্কার করো, তওবার দরজায় এখনই কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়াও। কারণ মৃত্যু যখন আসে, তখন অবকাশ শেষ; আর যখন আখিরাতের দ্বার খুলে যায়, তখনই বোঝা যায়—আসল সফলতা দুনিয়া জেতা ছিল না, বরং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া ছিল।