আল্লাহ তাআলা বলবেন: “তোরা পৃথিবীতে কতদিন ছিলে—বছরের গণনায়?” এই প্রশ্নে শুধু সময়ের হিসাব চাওয়া হচ্ছে না; এই প্রশ্নে মানুষের সমগ্র আত্মপ্রবঞ্চনা উন্মোচিত হয়ে যায়। দুনিয়ার দিনগুলো যাকে আমরা দীর্ঘ মনে করেছি, যার ভেতর দুঃখ-আনন্দ, অর্জন-পরাজয়, ব্যস্ততা-ভোগের এত আয়োজন, আখিরাতের দরজায় দাঁড়িয়ে তা যেন অবর্ণনীয়ভাবে ক্ষুদ্র হয়ে যায়। কুরআনের এই বাক্য হৃদয়কে থামিয়ে দেয়, কারণ আল্লাহর সামনে সময় আর কেবল ক্যালেন্ডারের সংখ্যা নয়; সময় হচ্ছে আমলের সাক্ষী, জীবনের আমানত, এবং চূড়ান্ত জবাবদিহির প্রস্তুতি।

সূরা আল-মুমিনুনের ধারাবাহিকতায় এ প্রশ্নটি এসেছে সেই মহান দৃশ্যপটে, যেখানে মুমিন ও অবিশ্বাসীর পরিণতি, সৃষ্টি-রহস্য, নবীদের সংগ্রাম, এবং শেষ বিচারের বাস্তবতা একে অন্যকে গভীরভাবে আলোকিত করে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো একক ঐতিহাসিক ঘটনার দাবি না করে, কুরআনের সামগ্রিক সতর্কবাণীই প্রকাশ পায়: মানুষ পৃথিবীতে অল্প সময়ের মেহমান, অথচ সে এই সাময়িক অবস্থানকে স্থায়ী বসতি ভেবে বসে। তাই আয়াতটি আমাদের কানে নয়, আত্মার ভিতরে আঘাত করে—জিজ্ঞেস করে, এই ক্ষণিকের জীবনকে কি আমরা চিরস্থায়ী নেকির পুঁজিতে রূপ দিতে পেরেছি?

এই প্রশ্নের ভেতরে আখিরাতের এক বিস্ময়কর শিক্ষা আছে: যেটা দুনিয়ায় দীর্ঘ, তা আল্লাহর মীযানে ছোট; যেটা আজ বড় মনে হয়, কাল তা স্মৃতির ধূসরতায় মিশে যাবে। মুমিনের জন্য এ আয়াত ভয়ের পাশাপাশি সান্ত্বনাও বয়ে আনে, কারণ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব মানে হতাশা নয়, বরং মুক্তির সুযোগ। যে হৃদয় বুঝে ফেলে—এখানে থাকার মেয়াদ সীমিত, সে হৃদয় আর ধন-সম্পদ, পদ-মর্যাদা, ভোগ-বিলাসের গোলাম থাকে না; সে চিরন্তনের দিকে মুখ ফেরায়। আর এভাবেই সূরা আল-মুমিনুন আমাদের ভেতরে সেই জীবন্ত জিজ্ঞাসা জাগিয়ে তোলে: আমি কী নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে যাব, এবং আখিরাতের সামনে দাঁড়িয়ে আমার বছরগুলো কি সত্যিই কোনো ওজন বহন করবে?

আল্লাহ তাআলা যখন জিজ্ঞেস করবেন, “পৃথিবীতে তোমরা কতদিন ছিলে—বছরের গণনায়?” তখন এই প্রশ্নের ভেতরেই খুলে যাবে মানুষের জীবনবোধের পর্দা। যে দুনিয়াকে আমরা দীর্ঘ মনে করেছি, যার জন্য কত পরিকল্পনা, কত উদ্বেগ, কত প্রতিযোগিতা—আখিরাতের দরজায় দাঁড়িয়ে তা হঠাৎই অচেনা এক ক্ষণিক ছায়া হয়ে যায়। বছরের হিসাব আসলে এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই সময়কে আমরা কী দিয়ে ভরেছি। দিনগুলো কি গর্বের স্মৃতি হয়ে রইল, না কি তাওবার কান্নায় ধোয়া আমলের সাক্ষ্য হয়ে উঠল? এই প্রশ্ন মানুষের আত্মাকে তার প্রকৃত মাপের সামনে দাঁড় করায়—মানুষ বড় নয়, তার সময়ও বড় নয়; বড় কেবল সেই রব, যাঁর সামনে সব সময় একদিন সাক্ষ্য দেবে।

সূরা আল-মুমিনুনের এই সুরে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব আর আখিরাতের অনিবার্যতা এমনভাবে একে অন্যকে জাগিয়ে তোলে যে, হৃদয় নিজের অসতর্কতার জন্য লজ্জিত না হয়ে পারে না। আমরা যে জীবনে এত নিরাপত্তা খুঁজি, তা আসলে স্থায়ী নয়; যে অর্জনে এত গৌরব করি, তা আসলে হিসাবের আগে মূল্যহীন হতে পারে; যে ব্যস্ততাকে জীবন বলে ধরে নিই, তা হয়তো আত্মাকে আচ্ছন্ন করার এক নীরব পর্দা মাত্র। এই আয়াত আমাদের শেখায়—সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে নয়, আল্লাহর আনুগত্য দিয়ে জীবনকে বিচার করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হবে না, কত বছর বেঁচেছিলে; প্রশ্ন হবে, কতটুকু আল্লাহর জন্য বেঁচেছিলে।
তাই মুমিনের অন্তর এই আয়াত শুনে ভেঙে পড়ে না, জেগে ওঠে। সে বুঝে যায়, দুনিয়া কর্মক্ষেত্র, বসবাসের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়; আর আখিরাতই সেই সত্য ঘর, যেখানে প্রতিটি ক্ষুদ্র মুহূর্তের হিসাব আছে, প্রতিটি নীরবতারও অর্থ আছে। এই উপলব্ধি মানুষকে হতাশ করে না, বরং মুক্ত করে—কারণ যে ব্যক্তি বুঝে যায় সময় অল্প, সে তওবা ত্বরান্বিত করে; যে বুঝে যায় দুনিয়া ক্ষণিক, সে আমলকে সুন্দর করে; যে বুঝে যায় আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, সে অন্তরকে গাফিলতির ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে। তখন জীবন আর দৌড় নয়, প্রস্তুতি হয়; আর এই প্রস্তুতির শেষেই আছে চিরসফলতার আলোকিত দ্বার।

আল্লাহ যখন জিজ্ঞেস করবেন, “তোরা পৃথিবীতে কতদিন ছিলে—বছরের গণনায়?” তখন প্রশ্নটি শুধু স্মৃতির নয়, আত্মারও পরীক্ষা। আমরা যে জীবনকে এত দীর্ঘ, এত জটিল, এত ভারী বলে অনুভব করি, আখিরাতের দরজায় তা যেন এক অনুল্লেখযোগ্য ক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ এখানে দিন গোনে, পরিকল্পনা আঁকে, স্বপ্নকে সাজায়; কিন্তু মৃত্যুর পরে বুঝতে পারে, দুনিয়ার দীর্ঘতা আসলে অনুভূতির বিভ্রম, আর বাস্তবতা হলো—এই সময় ছিল আমল জমা করার নির্ধারিত সুযোগ। যে চোখে আমরা কত দৃশ্য দেখেছি, যে হৃদয়ে কত আকাঙ্ক্ষা বহন করেছি, সেসব সবই তখন এক প্রশ্নের সামনে নত হয়ে যায়: আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য কী প্রস্তুতি ছিল?

এই আয়াত হৃদয়কে এমন এক নীরবতায় নিয়ে যায়, যেখানে আত্মপ্রবঞ্চনা আর টিকে থাকতে পারে না। সমাজের ব্যস্ততা, ভোগের হুল্লোড়, মর্যাদার প্রতিযোগিতা, সঞ্চয়ের অস্থিরতা—এসবের মধ্যে মানুষ প্রায় ভুলেই যায় সে আসলে মুসাফির। দুনিয়া তাকে ঘিরে ধরলেও দুনিয়া তাকে ধরে রাখে না; সম্পদ, সম্পর্ক, ক্ষমতা—কোনোটিই তাকে কবরের অন্ধকার পেরিয়ে আল্লাহর বিচারের সামনে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তাই এই প্রশ্নে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয়ের ভেতরেই রহমতের দরজাও খোলা: এখনো সময় আছে, এখনো ফেরা যায়, এখনো হৃদয় জাগানো যায়, এখনো তাওবা করে জীবনকে সত্যের দিকে ফেরানো যায়।

মুমিনের জন্য এই আয়াত পরাজয়ের নয়, জাগরণের আয়াত। কারণ যে মানুষ বুঝে ফেলে দুনিয়ার দিনগুলো অল্প, সে আর জীবনকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নষ্ট করে না; সে প্রতিটি শ্বাসকে আমানত মনে করে, প্রতিটি সিজদাকে আশ্রয় মনে করে, প্রতিটি ভালো কাজকে আখিরাতের পাথেয় মনে করে। তখন দুনিয়া আর লক্ষ্য থাকে না, হয় পথ; আর আখিরাত আর দূরের কোনো কথা থাকে না, হয় আসল গন্তব্য। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিন যখন সমাগত, তখন সফলতা কেবল তাদেরই, যারা এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে চিরস্থায়ী সত্যকে বেছে নিয়েছিল। এই আয়াত আমাদের কানে নয়, অন্তরে বলে—তোমার সময় ছোট, কিন্তু তোমার রবের দরবার বিশাল; তাই ফিরে এসো, যতদিন ফিরতে পারো।

আল্লাহর সেই প্রশ্নের সামনে মানুষের সব জৌলুস ম্লান হয়ে যায়: পৃথিবীতে কতদিন ছিলে? যে জীবনকে আমরা এত দীর্ঘ ভেবেছিলাম, যে দিনের ভেতর সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, ব্যস্ততা-অবসর, সঞ্চয়-ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে নিজের এক জগত বানিয়ে নিয়েছিলাম, আখিরাতের দরজায় দাঁড়িয়ে তা কতই না ক্ষীণ, কতই না সংক্ষিপ্ত মনে হয়। সেখানে আর সময়ের দাম নেই, কেবল আমলের সত্য আছে; আর ক্যালেন্ডারের সংখ্যা নেই, কেবল হৃদয়ের অবস্থা প্রকাশ পায়।
এই আয়াত আমাদের ঘুম ভাঙাতে এসেছে। দুনিয়া আমাদের বাসস্থান নয়, পরীক্ষার মাঠ; এখানে যে ক’টি শ্বাস পেয়েছি, তা-ও আল্লাহর আমানত। তাই আজ যদি আমরা নিজেদের জীবনকে শুধু জমা, ভোগ, প্রতিযোগিতা আর আত্মমুগ্ধতার ভেতর ব্যয় করি, তবে মৃত্যুর পর সেই সংক্ষিপ্ত জীবনের হিসাব আমাদেরই মাথায় বজ্র হয়ে নেমে আসবে। কিন্তু যে বান্দা বুঝে ফেলে—আমি অল্পের পথিক, স্থায়িত্বের অধিকারী নই—তার অন্তর নরম হয়, তার চোখ ভিজে ওঠে, তার সিজদা গভীর হয়, আর তাওবার দরজা তার জন্য একান্ত প্রিয় হয়ে ওঠে।
সূরা আল-মুমিনুনের এই সমাপ্তিমুখী বাণী আমাদের হাতে আরেকটি আয়না তুলে দেয়: নিজেকে দেখি, সময়কে দেখি, শেষ গন্তব্যকে দেখি। তারপর আল্লাহর কাছে ফিরে যাই এমন অন্তর নিয়ে, যা দুনিয়ার মোহে আর কঠিন নয়, গুনাহের ভারে আর অহংকারে আর পাথর নয়। হে রব, আমাদের দিনগুলোকে আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী কোরো না; বরং এগুলোকে তোমার সন্তুষ্টির পক্ষে সাক্ষী বানিয়ে দাও। আমাদের অল্প জীবনকে বরকত দাও, অল্প আমলকে কবুল করো, আর সেই দিনটিতে আমাদের লজ্জিত কোরো না, যেদিন মানুষ বুঝবে—পৃথিবীতে সে কত অল্পই ছিল।