সূরা মারইয়ামের এই আয়াত যেন ইতিহাসের বুক চিরে আসা এক নীরব বজ্রধ্বনি। আল্লাহ তাআলা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠীকে তিনি ধ্বংস করেছেন। একদিন যাদের পদধ্বনি পৃথিবী কাঁপাত, যাদের কণ্ঠে ছিল ক্ষমতার অহংকার, যাদের ঘরে ছিল সমৃদ্ধির প্রদীপ—আজ তাদের কোনো সাড়া নেই, কোনো উত্তর নেই, কোনো ফিরে-আসার চিহ্ন নেই। মানুষের জীবন যতই দীর্ঘ মনে হোক, যতই শক্তিশালী মনে হোক, সে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কুদরতের সামনে এক ক্ষণস্থায়ী ছায়া। এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে দাঁড় করায় এক ভয়াবহ সত্য: পৃথিবীর ইতিহাস গৌরবের নয়, বরং বিলীন হওয়ারও ইতিহাস।
এখানে আল্লাহ তাআলা কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কেবল বিবরণ দিচ্ছেন না; বরং মানবজাতির সাধারণ পরিণতি স্মরণ করাচ্ছেন। সূরা মারইয়াম সমগ্রভাবে নবীদের স্মৃতি, রহমত, দয়া, তাওহিদ এবং আখিরাতের জবাবদিহির কথা বলে—যাকারিয়া আলাইহিস সালাম-এর দোয়া, মারইয়াম আলাইহাস সালাম-এর পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালাম-এর অলৌকিক জন্ম, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর সত্যের আহ্বান—সবখানেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আশা ও ভয়, সান্ত্বনা ও সতর্কতা একসাথে প্রবাহিত হয়েছে। এই আয়াত সেই প্রবাহের গভীরে দাঁড়িয়ে বলে: যারা আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়েছিল, তাদের শক্তির শেষ ঠিকানা ছিল ধ্বংস; আর ধ্বংসের পর তাদের অস্তিত্ব এমন নিঃশব্দ হয়ে গেছে যে এখন তাদের কোনো কাহিনিও সাড়া দেয় না।
আয়াতের শেষাংশের প্রশ্নটি হৃদয় বিদীর্ণ করে দেয়: আপনি কি তাদের কাহারও সাড়া পান, অথবা তাদের ক্ষীণতম আওয়াজও শুনতে পান? এ প্রশ্নের মধ্যে কেবল শূন্যতার বর্ণনা নেই, আছে এক গভীর তাফাক্কুর—মানুষের সুনাম, জনপদ, বংশ, বিজয়, প্রাসাদ, বিতর্ক, প্রতিপত্তি—সবই একদিন নিঃশব্দে মিশে যেতে পারে। আজ যারা নিজেদেরকে স্থায়ী ভাবে, আল্লাহ এই আয়াতে তাদের সামনে কবরের নীরবতা, ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ, এবং আখিরাতের অনিবার্য ডাকে দাঁড় করান। যেন বলা হচ্ছে: তোমাদের গলার জোরে প্রতারণা কোরো না; তোমাদের ভবিষ্যৎও একদিন এ নীরবতার দোরগোড়ায় এসে থেমে যাবে।
সূরা মারইয়ামের এই আয়াত যেন সময়ের বুকে খচিত এক নীরব কবরফলক। আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করছেন না কেবল তাদের পতনের কথা; তিনি আমাদের হৃদয়কে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে, যেখানে একদিনের কোলাহল আজ নিস্তব্ধতা হয়ে আছে। কত মানবগোষ্ঠী ছিল, কত নগরী ছিল, কত প্রতাপ, কত দাবি, কত শক্তির আস্ফালন ছিল—কিন্তু আজ তাদের কোনো সাড়া নেই, কোনো জবাব নেই, কোনো কণ্ঠস্বর নেই। মানুষ যখন নিজের অস্তিত্বকে চিরস্থায়ী মনে করে, তখন এই আয়াত তার অহংকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। যে মুখ একদিন অবাধে কথা বলত, যে বুক দম্ভে ফুলে উঠত, যে হাত ক্ষমতার হিসাব গুনত—আল্লাহর কুদরতের সামনে তারা সবই একদিন এমন নীরব হয়ে যায়, যেন পৃথিবীতে তাদের ছিলই না।
আল্লাহ তাআলা এখানে এক অদ্ভুত নীরবতার কথা শোনাচ্ছেন—এমন নীরবতা, যা কানে শোনা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে কেঁপে ওঠে। তাদের আগে কত মানবগোষ্ঠীকে তিনি ধ্বংস করেছেন; তারা ছিল শক্তিতে দাপুটে, কথায় উদ্ধত, পৃথিবীতে নিজেদের চিহ্ন স্থায়ী মনে করেছিল। কিন্তু আজ? আজ তাদের কাহারও সাড়া নেই, ক্ষীণতম আওয়াযও নেই। এই নীরবতা শুধু ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ নয়; এটি মানুষের অহংকারের কবর। যে সত্তা নিজেকে বড় মনে করে, যে সমাজ আল্লাহকে ভুলে নিজের প্রাচীর, সম্পদ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর প্রতাপকে নিরাপদ ভেবে বসে—এই আয়াত তাদের কানে এক নীরব হুঁশিয়ারি হয়ে পৌঁছে যায়: তোমাদেরও শেষপরিণতি এভাবেই মুছে যাওয়া হতে পারে।
সূরা মারইয়াম আমাদের সামনে মারইয়াম, ঈসা, যাকারিয়া, ইবরাহিম আলাইহিমুস সালাম-এর স্মৃতি এনে দেয়; আর এই স্মৃতির ভেতরেই আল্লাহ তাআলা আমাদের শেখান—রহমত যেমন সত্য, তেমনি আখিরাতও সত্য। দোয়ার দরজা খোলা, মুজিযার দরজা খোলা, তাওবার দরজা খোলা; কিন্তু একই সঙ্গে জবাবদিহির দরজাও খোলা। মানুষের জীবন যদি কেবল ভোগের জন্য হতো, তবে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর এই নীরবতা আমাদের এতটা নাড়া দিত না। কিন্তু যেহেতু আমাদের ফিরে যেতে হবে, যেহেতু প্রতিটি হৃদয়কে একদিন রবের সামনে দাঁড়াতে হবে, তাই ইতিহাসের এই শুন্যতা আসলে আমাদের নিজের ভবিষ্যতেরই আয়না। আজ যে কণ্ঠে গর্ব আছে, কাল সে কণ্ঠ মাটির নিচে নীরব হয়ে যেতে পারে; আজ যে চোখ দুনিয়ার আলোয় উজ্জ্বল, কাল সে চোখ হিসাবের মুহূর্তে অশ্রুতে ভরে উঠতে পারে।
এই আয়াত আত্মাকে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি এখনো শব্দ, সুনাম, উপস্থিতি আর ভিড়ের উপর নির্ভর করবে, নাকি সেই আল্লাহর দিকে ফিরবে যিনি জাতিকে মুছে দিতে পারেন এবং আবার জীবিতও করতে পারেন? মানুষের সমাজ যখন আল্লাহকে ভুলে নিজেদের টিকে থাকার মিথ্যা নিশ্চয়তায় মেতে ওঠে, তখনই এই নীরব ধ্বংসের আয়াত তাদের জন্য দর্পণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের প্রতিটি সাফল্যের মধ্যে যেন অহংকার না জমে, প্রতিটি নিরাপত্তার মধ্যে যেন গাফিলতি না জন্মায়, প্রতিটি দিনের ভিতর যেন আখিরাতের স্মরণ জেগে থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিয়ে যাবে না তার গর্জন, যাবে তার আমল; থাকবে না তার শোরগোল, থাকবে শুধু রবের সামনে উপস্থিত আত্মা।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে বুঝি, মানুষের সবচেয়ে বড় পরাজয় মৃত্যুই নয়—বরং মৃত্যুর পরেও কোনো নাম-নিশানা না থাকা। একদিন যাদের নিয়ে কাহিনি লেখা হতো, যাদের ঘিরে লোকসমাগম হতো, যাদের প্রতাপে ভয়ে কেঁপে উঠত চারপাশ—আজ তাদের কোনো সাড়া নেই, কোনো ক্ষীণতম আওয়াজও নেই। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের কানের পর্দা সরিয়ে দেখাচ্ছেন: পৃথিবীর যাবতীয় গর্জন শেষ পর্যন্ত নীরবতায় ডুবে যায়। এই নীরবতা ভয়ংকর, কারণ এটি শুধু ইতিহাসের নীরবতা নয়; এটি সতর্কবার্তা—যে মানুষ আল্লাহকে ভুলে বাঁচে, তার পরিণতি হয় স্মৃতিহীন এক শূন্যতা।
সূরা মারইয়াম আমাদের শেখায়, রহমতের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, আখিরাতের স্মরণ ততই তীক্ষ্ণ থাকতে হবে। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম-এর কান্নাভেজা দোয়া, মারইয়াম আলাইহাস সালাম-এর পবিত্রতার পরীক্ষা, ঈসা আলাইহিস সালাম-এর সত্যের নিদর্শন, ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর তাওহিদ—সবকিছু মিলিয়ে এই সূরা হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফেরায়; আর শেষের এই আয়াত বলে, যে পথেই মানুষ হাঁটুক, একদিন তাকে ইতিহাসের বাইরে নয়, বরং হিসাবের সামনে দাঁড়াতেই হবে। তাই আজ যদি আমাদের কণ্ঠে অহংকার থাকে, তবে তা ভেঙে যাক; যদি অন্তরে গাফলত থাকে, তবে তা জাগুক; যদি জীবনে তওবার দরজা খোলা থাকে, তবে আমরা যেন সে দরজার দিকে ফিরে যাই। কারণ যাদের সাড়া আজ নেই, তাদের চেয়ে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে—মানুষের সব জৌলুস শেষ পর্যন্ত মাটির নীরবতায় মিশে যায়, আর অবশিষ্ট থাকে শুধু আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়া হৃদয়ের সত্য।