কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে। সূরা মারইয়ামের এই বাক্যটি যেন হৃদয়ের উপর ধীর অথচ গভীর এক আঘাত। দুনিয়ায় মানুষ কত নাম নিয়ে বাঁচে, কত পরিচয়ে নিজেকে ঢেকে রাখে, কত সম্পর্কের ছায়ায় নিরাপদ বোধ করে; কিন্তু সেই দিনের দরজায় দাঁড়িয়ে সব আবরণ খুলে যাবে। না থাকবে বংশের গৌরব, না থাকবে দলের শক্তি, না থাকবে কারও হয়ে কথা বলার সুযোগ। প্রত্যেকে দাঁড়াবে নিজের আমলের ভার নিয়ে, নিজের অন্তরের সত্য নিয়ে, নিজের রবের সামনে। এই একাকীত্ব শূন্যতার নয়; এ হলো চূড়ান্ত সত্যের একাকীত্ব—যেখানে মানুষ আর কাউকে দেখিয়ে বাঁচতে পারে না, শুধু নিজেকে আল্লাহর সামনে উন্মোচিত দেখতে পায়।

সূরা মারইয়ামের বিস্তৃত প্রবাহে এই আয়াতটি রহমত ও হিসাবের মাঝখানে এক তীক্ষ্ণ স্মরণবাণী। যাকারিয়ার কাঁপা দোয়া, মরিয়মের পবিত্র অভিভাবন, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, নবীদের স্মৃতি—সবই এই সূরায় এমনভাবে বোনা যে, আল্লাহর দয়া মানুষের ইতিহাসকে আলোকিত করে। কিন্তু সেই দয়ার সঙ্গেই একটি কঠিন ঘোষণা আসে: দয়া অশেষ, অথচ জবাবদিহিও বাস্তব। মানুষের কৃতকর্ম, তার বিশ্বাস, তার অস্বীকার, তার নীরবতা—সবই শেষ বিচারের দিনে খুলে যাবে। এখানে কোনো ভুল ধারণার জায়গা নেই যে, কেউ কারও ভরসায় নিজের আখিরাত সাজিয়ে নিতে পারবে। প্রতিটি আত্মা আলাদা, প্রতিটি হিসাব ব্যক্তিগত, প্রতিটি দাঁড়ানো একান্ত।

এখানে কোনো বিশেষ একক ঘটনার নির্ভরযোগ্য বর্ণনার উপর দাঁড়ানোর দরকার নেই; বরং আয়াতটি সূরার সামগ্রিক মক্কী-সুরের ভেতর আখিরাতসচেতনতার এক নির্মম আলোকরেখা। যে সমাজ নাম, বংশ, সমর্থক, সামাজিক মর্যাদা এবং মানুষ-নির্ভর নিরাপত্তায় ভরসা করতে অভ্যস্ত, এই আয়াত তাদের সেই ভরসা ভেঙে দেয়—তবে নিরাশ করার জন্য নয়, জাগিয়ে তোলার জন্য। কারণ একা দাঁড়ানোর আগেই মানুষ যদি আজই নিজের রবের দিকে ফিরে আসে, তবে সেই একাকীত্ব ভয়ের নয়, মুক্তির ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে। কেয়ামতের দিন যখন সব সহায়তা শেষ হবে, তখনই বোঝা যাবে সত্যিকার সম্পদ কী ছিল: ঈমান, তাওবা, সৎ আমল, আর আল্লাহর রহমতের দিকে জীবিত এক হৃদয়।

কেয়ামতের দিন মানুষ একাকী আসবে—এই বাক্যটি শুধু ভবিষ্যতের কোনো দৃশ্য নয়, এটি দুনিয়ার সমস্ত ভরসাকে আজই নীরবে প্রশ্ন করে। আজ যে মানুষ নামের ভারে, পদমর্যাদার ছায়ায়, পরিবার-গোষ্ঠীর আশ্রয়ে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, সেই মানুষই একদিন এমন এক দাঁড়-প্রান্তে পৌঁছাবে, যেখানে কারও পরিচয় আর কারও পক্ষপাত কাজ করবে না। সেখানে ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন, যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়া, মরিয়ম আলাইহাস সালামের পবিত্রতা—সবকিছুই স্মৃতি হয়ে থাকবে; কিন্তু হিসাবের ময়দানে প্রত্যেক আত্মা নিজের সত্য নিয়ে, নিজের আমল নিয়ে, নিজের লুকোনো ভয়ের সঙ্গে উপস্থিত হবে। এটা একাকীত্বের হাহাকার নয়; এটা মিথ্যার সমস্ত পর্দা ছিঁড়ে গিয়ে সত্যের সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়ানোর মুহূর্ত।

আল্লাহর কাছে মানুষ যখন ফারদা হয়ে আসবে, তখন বোঝা যাবে—দুনিয়ার সম্পর্ক স্রোতের মতো, আর আখিরাতের দায় সমুদ্রের মতো গভীর। যে হাতে ছিল ক্ষমতা, সেই হাতও শূন্য; যে মুখে ছিল আত্মবিশ্বাস, সেই মুখও স্তব্ধ। মানুষ তখন বুঝবে, যার ভরসা ছিল মানুষ, তার ভরসার মূলে কতই না দুর্বলতা; আর যার ভরসা ছিল রব, তার জন্যই ছিল প্রকৃত নিরাপত্তা। সূরা মারইয়াম রহমতের সূরা—কিন্তু এই রহমত আমাদের ঘুম পাড়ানোর জন্য নয়, জাগিয়ে তোলার জন্য। এখানে আল্লাহ তাঁর নবিদের স্মৃতি এনে হৃদয় কোমল করেন, তারপর কেয়ামতের এই একক উপস্থিতির কথা শুনিয়ে অন্তরকে কাঁপিয়ে দেন, যাতে মানুষ দুনিয়ার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে নিজের পরিণতি মনে রাখে।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, সত্যিকারের প্রস্তুতি মানে বাহ্যিক সাজ নয়, অন্তরের জবাবদিহি। যখন একদিন সব দরজা বন্ধ হয়ে যাবে, তখন সঙ্গে যাবে শুধু ঈমান, তাওবা, নেক আমল, আর আল্লাহর রহমতের দিকে ঝুঁকে থাকা এক ভাঙা কিন্তু সত্যিকারের হৃদয়। তাই আজই নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয়—আমি কি শুধু মানুষের চোখে বাঁচছি, নাকি আমার রবের সামনে দাঁড়ানোর জন্য নিজেকে গড়ে তুলছি? কেয়ামতের সেই নিঃসঙ্গতা ভয়াবহ, যদি দুনিয়ায় রবকে ভুলে থাকা হয়; কিন্তু একই নিঃসঙ্গতা আনন্দেরও হতে পারে, যদি আজই মানুষ তার স্রষ্টার দিকে ফিরে আসে। কারণ যিনি দুনিয়ায় একাকী হয়ে আল্লাহকে খুঁজে নেন, কেয়ামতের দিন তাঁর একাকীত্ব হবে লজ্জার নয়, নাজাতের দ্বার।

কেয়ামতের দিন তারা সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে—এই বাক্যটি মানুষকে তার সবচেয়ে গভীর ভ্রম থেকে জাগিয়ে তোলে। দুনিয়ায় আমরা কতভাবে নিজেকে সাজাই: পদ, পরিচয়, পরিবার, অনুসারী, প্রভাব, সাফল্যের গল্প—সবকিছু দিয়ে যেন নিজের শূন্যতাকে ঢেকে রাখি। কিন্তু সেই মহাদিবসে এসব কিছুই আর আশ্রয় হবে না। মানুষ আসবে একা, তার জন্ম যেমন একা ছিল, তার মৃত্যুও যেমন একা, তেমনি পুনরুত্থানের দ্বারেও সে একাই প্রবেশ করবে। সঙ্গে থাকবে শুধু তার আমল, তার অন্তরের সত্য, তার রবের সামনে লুকোনো-না-লুকোনো সমস্ত বাস্তবতা।

সূরা মারইয়ামে যাকারিয়ার মধুর মিনতি, মারইয়ামের পবিত্র পরীক্ষা, ঈসা আলাইহিস সালামের আলোকিত নিদর্শন, আর নবীদের স্মৃতিমাখা ধারাবাহিকতায় এই আয়াত হৃদয়ে একটি অদ্ভুত ভারসাম্য এনে দেয়: আল্লাহর রহমত কত বিস্তৃত, কিন্তু সেই রহমতের ছায়াতেও আখিরাতের জবাবদিহি কত অবিচল। সমাজে মানুষ একে অন্যকে আড়াল করতে শেখে, দোষকে ভাগ করে নেয়, সম্পর্ক দিয়ে সত্যকে নরম করে ফেলে; কিন্তু কেয়ামতের দিন সমস্ত পর্দা ছিঁড়ে যাবে। তখন কোনো জনসমর্থন নয়, কোনো বংশগৌরব নয়, কোনো পরিচয়ের মোহ নয়—শুধু মানুষ, তার রব, আর তার নির্জন হিসাব। এই একাকীত্ব ভয় জাগায়, আবার জাগিয়ে তোলে; কারণ যে দিন মানুষ বুঝে নেয় সে শেষ পর্যন্ত একা, সে দিন থেকেই সে আল্লাহর দিকে সত্যিকারভাবে ফিরতে শুরু করে।

দুনিয়ায় আমরা কতবার অন্যের হাত ধরে দাঁড়াই, কতবার নামের আড়ালে নিজেকে নিরাপদ ভাবি, কতবার প্রিয় মানুষের উপস্থিতিকে ঢাল মনে করি। কিন্তু কেয়ামতের দিনে সেই সব ঢাল গলে যাবে, সেই সব হাত ছেড়ে যাবে, সেই সব নাম নিঃশব্দ হয়ে যাবে। মানুষ আসবে ফারদান—একাকী, নিঃসহায়, নিজের সঙ্গেই নয়, বরং নিজের সত্যের সঙ্গে মুখোমুখি। তখন কারও বংশ মর্যাদা নয়, কারও দলের ভিড় নয়, কারও পরিচিত মুখ নয়—শুধু আমল, শুধু অন্তরের গোপন, শুধু রবের সামনে খোলা জীবন। এই কথা ভয় জাগায়, আবার জাগায় জাগরণের আলোও; কারণ যে দিন মানুষকে একা আসতেই হবে, সে দিনটির জন্য প্রস্তুতি শুরু করতে হয় আজই, যখন এখনো তাওবা সম্ভব, যখন এখনো হৃদয় নরম হতে পারে।

সূরা মারইয়াম আমাদের শেখায়—আল্লাহর রহমত নবীদের জীবন দিয়ে, মরিয়ম ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের পবিত্র স্মৃতি দিয়ে, যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কান্নামাখা দোয়া দিয়ে মানুষের অন্তরে নেমে আসে; আর সেই রহমতের ভেতরেই আখিরাতের হিসাবকে ভুলতে দেয় না। তাই মুমিনের চোখে জীবন আর কেবল জমা করার ময়দান নয়, বরং প্রস্তুতির পথ। যদি শেষ পর্যন্ত একাই দাঁড়াতে হয়, তবে দুনিয়ার ভিড় নিয়ে এত অহংকার কেন? যদি একাই জবাব দিতে হয়, তবে গোনাহের সঙ্গে এমন মিতালি কেন? এই আয়াত হৃদয়ে নীরবভাবে বলে: ফিরে এসো, লজ্জা নিয়ে এসো, ভেঙে পড়া হৃদয় নিয়ে এসো, কারণ যে রবের সামনে একা দাঁড়াতে হবে, তিনি তাওবা গ্রহণকারী, দয়ালু, এবং তাঁর দয়ার দরজা এখনো খোলা।