আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমরা অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব।” এ এক ভয়ানক দৃশ্য—যেখানে মানুষ আর নিজের গতির মালিক নয়, নিজের ইচ্ছারও আর কোনো দাম নেই। দুনিয়ায় যে অন্তর গুনাহে কঠিন হয়ে গিয়েছিল, কুফর ও জুলুমে পাথর হয়ে উঠেছিল, কিয়ামতের দিন সে-ই অসহায় তৃষ্ণার্ত দেহে হাশরের ময়দান থেকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত হবে। এখানে ‘পিপাসার্ত’ অর্থ শুধু পানির অভাব নয়; এটি অপমান, শূন্যতা, আর এমন এক তীব্র আর্তি, যার কোনো সান্ত্বনা নেই। অপরাধের শেষ পরিণতি এই—সুখের মতো মনে হওয়া বিদ্রোহ একদিন টেনে নিয়ে যায় এমন এক দ্বারে, যেখানে তৃষ্ণা নিবারণ নয়, শাস্তিই অপেক্ষা করে।
সূরা মারইয়াম-এর এই অংশে রহমতের বর্ণনার পাশে আখিরাতের কঠোরতা এসে দাঁড়ায়। যাকারিয়ার দোয়া, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের অলৌকিক জন্ম—এসব স্মৃতি মানুষকে আল্লাহর কুদরতের দিকে ডাকছে; আর এই আয়াত বলছে, যে হৃদয় সেই ডাকেও জাগে না, সে শেষ বিচারে ন্যায়ের সামনে মুখোমুখি হবে। এখানে কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং কুরআনের সামগ্রিক সতর্কবার্তা—মানবজাতির সামনে সত্য, জবাবদিহি, আর প্রতিদানের অনিবার্য বাস্তবতা। নবীদের স্মৃতি যেমন আশা জাগায়, তেমনি এই আয়াত জাগায় ভয়: ঈমানকে বাঁচিয়ে না রাখলে মানুষকে নিজের গুনাহই একদিন জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবে।
এই দৃশ্য কেবল শাস্তির বর্ণনা নয়, এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের প্রতি এক কাঁপিয়ে দেওয়া ঘোষণা। দুনিয়ার বাজারে অপরাধ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে, ক্ষমতা তাকে আড়াল করে, ভিড় তাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়; কিন্তু আখিরাতে কিছুই ঢাকা থাকবে না। সেখানে পিপাসা থাকবে, ক্লান্তি থাকবে, অপমান থাকবে, এবং থাকবে সেই সত্য—আল্লাহর সামনে কেউ অবিচারে হারিয়ে যায় না, আর কেউ বিনা হিসাবেও বাঁচে না। তাই এই আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে জাগিয়ে তোলে: গুনাহ থেকে ফেরার দরজা এখনো খোলা, তওবার অশ্রু এখনো মূল্যবান, আর আজকের নরম হৃদয়ই কালকের সেই কঠিন হাশরের থেকে রেহাই পাওয়ার আশ্রয় হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা যখন বলেন, “আর আমরা অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব,” তখন শব্দের ভেতরেই যেন কিয়ামতের ধ্বনি শোনা যায়। এ কেবল গন্তব্যের ঘোষণা নয়, এ হলো এক চূড়ান্ত টেনে নেওয়া—যেখানে মানুষ আর নিজের পথ বেছে নেয় না, বরং তার গুনাহই তাকে টেনে নিয়ে যায়। দুনিয়ায় যে হৃদয় সত্যের ডাককে অবহেলা করেছিল, যে আত্মা বারবার তাওবার দরজা দেখে ফিরে গিয়েছিল, সে-ই সেদিন অপমানিত তৃষ্ণায় কাঁপতে কাঁপতে সামনে অগ্রসর হবে। এখানে তৃষ্ণা শুধু পানির অভাব নয়; এটি আত্মার শূন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা, আর সেই অনিবার্য অনুশোচনা—যার কোনো ভাষা নেই, কোনো আশ্রয় নেই।
আল্লাহ তাআলার এই বাণী মানুষের অন্তরকে থামিয়ে দেয়: “আর আমরা অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব।” এখানে শুধু গন্তব্যের কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে সেই অদ্ভুত, অপমানজনক, অসহায় যাত্রার কথা। যে মানুষ দুনিয়ায় নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার উপর বসিয়েছিল, যে গুনাহকে সঙ্গী, জুলুমকে অভ্যাস, এবং অবাধ্যতাকে স্বাধীনতা ভেবেছিল, সে কিয়ামতের দিন আর কোনো দাবিদার থাকবে না। সে হবে চালিত, টেনে নেওয়া এক আত্মা—তৃষ্ণায় কাতর, ভীতিতে নিথর, নিজের ওপর নিজেই বিদেশি।
‘পিপাসার্ত’ শব্দটি এখানে কেবল পানির অভাব নয়; এটি হৃদয়ের শূন্যতা, আত্মার পোড়া, আর এমন এক চাওয়া যা কখনো পূরণ হবে না—এই অর্থকেও বয়ে আনে। দুনিয়ায় মানুষ যতই পান করুক, যতই ভোগ করুক, যতই নিজেকে ভরিয়ে রাখুক, গুনাহের আগুন যদি অন্তরে জ্বলে ওঠে, তবে আখিরাতে সেই তৃষ্ণা আর কেবল দেহের থাকে না, তা হয় লাঞ্ছনার, অনুশোচনার, এবং চূড়ান্ত বঞ্চনার তৃষ্ণা। সূরা মারইয়ামের রহমতের স্মৃতিগুলোর পাশে এই ভয়াবহ দৃশ্য আমাদের বলে—আল্লাহর দয়া অগাধ, কিন্তু ন্যায়বিচারও সত্য। যাকারিয়ার প্রার্থনা, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের বিস্ময়—সবই আমাদের ডাকছে ফিরে আসতে; আর এই আয়াত সতর্ক করছে, ফিরে না এলে পথের শেষে কী অপেক্ষা করে।
এ আয়াত তাই কেবল শাস্তির সংবাদ নয়, আত্মসমালোচনার দরজা। আমরা কি গুনাহকে হালকা ভেবেছি? কারো হক নষ্ট করেছি? চোখ, জিহ্বা, লেনদেন, সম্পর্ক, এবং গোপন অভ্যাসে কি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করেছি? সমাজ যখন অপরাধকে স্বাভাবিক করে, তখন কুরআন সেই স্বাভাবিকতাকে ভেঙে দেয়—এবং হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে: শেষ বিচারের ময়দানে কেউ কারও জন্য দৌড়াবে না, শুধু ন্যায়ের সামনে দাঁড়াবে। তাই ভয় এখানে নিষ্ঠুর করার জন্য নয়; ভয় আমাদের নরম করার জন্য, চোখ ভেজানোর জন্য, তওবার দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য। যে হৃদয় আজ এই সতর্কবার্তায় কেঁপে ওঠে, সে-ই আল্লাহর রহমতের পথ খুঁজে পায়।
এই একটি বাক্যেই যেন হাশরের মরুর উত্তাপ নেমে আসে। মানুষ দুনিয়ায় কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে—ভোগ, অহংকার, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রবৃত্তি—কিন্তু শেষ দৃশ্যে সে আর নিজের জন্য কিছুই বহন করতে পারে না; তাকে হাঁকিয়ে নেওয়া হয়, তৃষ্ণার্ত অবস্থায়, অপমানিত ও অসহায় হয়ে। “وِرْدًا” শব্দের মধ্যে শুধু পিপাসা নেই, আছে ধাক্কা খাওয়া আত্মার আর্তি, আছে সেই চূড়ান্ত লাঞ্ছনা, যখন গুনাহের সারা জীবন অবশেষে নিজের আসল রূপ দেখায়। যে পথ আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথই তাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যায়—এ এক ভয়াবহ ন্যায়বিচার, যার সামনে কোনো বাহানা দাঁড়ায় না।
সূরা মারইয়াম আমাদের সামনে রহমতের দরজা খুলে দিয়েছে, তারপর একই সূরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বিচার দিনের কঠিন সত্য। যাকারিয়ার আশা, মারইয়ামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শন—সবই বলছে, আল্লাহর কুদরত অগাধ, তাঁর দয়া প্রশস্ত; কিন্তু সেই দয়ার প্রতি অবহেলা করা হৃদয়কে শেষ পর্যন্ত কঠিন পরিণতির জন্য প্রস্তুত হতে হয়। তাই এই আয়াত কেবল ভয়ের নয়, জাগরণেরও আয়াত। এখনো সময় আছে চোখের জল দিয়ে অন্তর ধুয়ে নেওয়ার, গোপন পাপের ভার নামিয়ে রাখার, আর সেই রবের দিকে ফিরে যাওয়ার যাঁর সামনে একদিন সবাইকে দাঁড়াতেই হবে।