সূরা মারইয়ামের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের সামনে ইদ্রীস (আ.)-এর নামটি এমনভাবে উচ্চারণ করেন, যেন একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই এক অনন্ত মহিমা জমা হয়ে আছে। “এই কিতাবে ইদ্রীসের কথা আলোচনা করুন” — এই নির্দেশ কেবল স্মরণ করিয়ে দেওয়ার কথা নয়; এটি এক আসমানি আহ্বান, যে আহ্বান মানুষের বিস্মৃত হৃদয়কে সত্যের দিকে ফেরায়। তাঁর পরিচয়ও কত গভীর: তিনি ছিলেন “সিদ্দীক”, অর্থাৎ সত্যকে গ্রহণ করেছেন আন্তরিকভাবে, সত্যের ওপর অবিচল থেকেছেন, এবং সেই সত্য তাঁর নবুয়তের সঙ্গে মিশে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ কোনো দীর্ঘ জীবনী দেননি; দিয়েছেন পরিচয়ের সারাংশ। কারণ কখনও এক বাক্যই একজন বান্দার আসল মর্যাদাকে মানুষের সমস্ত বর্ণনার চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে।

এই সূরার ধারাবাহিকতায় যাকারিয়া (আ.), ইয়াহইয়া (আ.), মারইয়াম (আ.) এবং ঈসা (আ.)-এর স্মৃতি হৃদয়ে এনে দেওয়া হয়েছে—রহমত, দোয়া, পবিত্রতা, মুজিযা, নবুয়তের ধারাবাহিকতা, আর আখিরাতের বাস্তবতার দিকে মানুষকে টেনে নেওয়ার জন্য। ইদ্রীস (আ.)-এর উল্লেখও সেই একই স্রোতের অংশ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য শানে নুযূল বর্ণিত নয়; তবে সূরার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট পরিষ্কার—আল্লাহ তাঁর কিতাবে নবীদের কথা স্মরণ করান, যেন মানুষের ভিতরে অবহেলার পর্দা ছিঁড়ে যায়। নবীদের জীবন এখানে ইতিহাসের অধ্যায় নয়, বরং ঈমানের আয়না। এই আয়না মানুষকে জিজ্ঞেস করে: তুমি কি সত্যকে কেবল শোনো, নাকি সত্যের সামনে নিজেকেও সমর্পণ করো?

ইদ্রীস (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত এই প্রশংসায় এক আশ্চর্য শিক্ষা আছে: আল্লাহর কাছে বড় হওয়া মানে শব্দে বড় হওয়া নয়, মর্যাদায় বড় হওয়া; পরিচিতি নয়, সিদ্দীকিয়্যাহ; বাহ্যিক ভিড় নয়, অন্তরের নিষ্ঠা। নবীদের স্মরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়ার হিসাব ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর কিতাবে নাম ওঠা চিরস্থায়ী। তাই এই আয়াতের মধ্যে কেবল একজন নবীর স্মৃতি নেই, আছে সত্যের পথে ফিরে আসার আহ্বান, আছে আখিরাতের নীরব ঘণ্টাধ্বনি, আছে এমন এক রহমতের ছায়া, যেখানে সত্যবাদী হৃদয় আল্লাহর বিশেষ স্মরণে বেঁচে থাকে।

আল্লাহ যখন বলেন, “এই কিতাবে ইদ্রীসের কথা আলোচনা করুন”, তখন তিনি কেবল একটি নাম স্মরণ করাতে চান না; তিনি হৃদয়ের সামনে একটি আয়না ধরে দেন। সেই আয়নায় দেখা যায়—মানুষের আসল মর্যাদা বংশে নয়, ভিড়ে নয়, কোলাহলে নয়; মর্যাদা সেই অন্তরে, যে অন্তর সত্যকে আলিঙ্গন করে এবং সত্যের সামনে নিজেকে সঁপে দেয়। ইদ্রীস (আ.)-এর পরিচয়ে “সিদ্দীক” ও “নবী” একসঙ্গে উচ্চারিত হওয়া আমাদের শেখায়, নবুয়ত কোনো বিচ্ছিন্ন আসমানি উপাধি নয়; তা এমন এক জীবন, যেখানে ভাষা, বিশ্বাস, আমল, ভেতর-বাইরের সমস্ত সত্তা সত্যের সঙ্গে এক হয়ে যায়। একটিমাত্র বাক্যে আল্লাহ তাঁর সম্মানকে উন্মোচন করেছেন, যেন বান্দা বুঝে—মানুষের লেখনী নয়, আল্লাহর স্মরণই প্রকৃত জীবনী।

এই স্মরণ আমাদেরকে আবার সেই পুরোনো অথচ চিরনতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: আমরা কি সত্যের সঙ্গে আছি, নাকি সত্যকে শুধু কথা দিয়ে ভালোবাসি? ইদ্রীস (আ.)-এর নাম উচ্চারণ যেন অন্তরের ধুলো সরিয়ে দেয়। কারণ সত্যবাদিতা কেবল জবানসুদ্ধ কোনো গুণ নয়; তা হলো আল্লাহর সামনে ভাঙা হৃদয়ের অটলতা, গোপনে-প্রকাশ্যে একই রকম থাকা, ন্যায়ের পাশে একাকী দাঁড়ানোর সাহস। এ আয়াতে ইতিহাসের ধ্বনি আছে, কিন্তু তার গভীরে আছে আত্মার ডাক—যে ডাক আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়া মানে দুনিয়ার প্রশংসা পাওয়া নয়; বরং সত্যের বোঝা কাঁধে নিয়ে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাওয়া।
আর এই স্মরণ আখিরাতের কথাও নিঃশব্দে উচ্চারণ করে। নবীদের নাম কুরআনে আসে, যেন মানুষ বুঝে—এই পৃথিবী শেষ ঠিকানা নয়; এখানে যে জীবনকে সত্যে গড়া হয়, তা কিয়ামতের দিনে আলোর রূপ নেয়। ইদ্রীস (আ.)-এর মতো এক সত্যবাদী নবীর উল্লেখ আমাদের বিবেককে জাগায়: আমরা কি আমাদের জীবনকে এমন করে তুলছি, যা মৃত্যুর পরও আল্লাহর স্মরণে টিকে থাকতে পারে? সূরা মারইয়ামের এই সুরে রহমত আছে, কারণ আল্লাহ তাঁর নবীদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমাদেরও ফেরার পথ খুলে দেন। তিনি আমাদের ভুলে যাওয়া হৃদয়ে নাম উচ্চারণ করেন, যাতে হৃদয় আবার কাঁপে, আবার জাগে, আবার বুঝে—সত্যের দিকে ফেরা মানেই আল্লাহর রহমতের দিকে ফেরা।

আল্লাহ তাআলা যখন বলেন, “এই কিতাবে ইদ্রীসের কথা আলোচনা করুন”, তখন তা কেবল এক নবীর নাম উচ্চারণ নয়; তা হলো বিস্মৃত আত্মাকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। ইদ্রীস (আ.)-এর পরিচয় আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন—তিনি ছিলেন সিদ্দীক, সত্যকে যিনি শুধু মুখে মানেননি, হৃদয়ে ধারণ করেছেন, জীবনে বহন করেছেন, আর নীরবে তার সাক্ষী হয়েছেন। মানুষের কাছে অনেক পরিচয় জমা হয়: বংশ, পেশা, পদ, খ্যাতি। কিন্তু আসমানের দরবারে বান্দার বড় পরিচয় হলো সত্যনিষ্ঠা। যে হৃদয় মিথ্যার সঙ্গে সন্ধি করে না, যে আত্মা আল্লাহর কথার সামনে মাথা নত করে, সে-ই ধীরে ধীরে নবীদের পথে হাঁটে।

এই আয়াতে ইদ্রীস (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত স্মরণ আমাদের সমাজের কোলাহলের মধ্যে এক গভীর নীরবতা এনে দেয়। চারদিকে যখন কথার ভিড়, দাবির ভিড়, আর নিজেদের বড় করে দেখানোর ভিড়, তখন আল্লাহ আমাদের সামনে এমন একজন বান্দাকে আনেন, যাঁর মহিমা সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের মধ্যেই দীপ্ত হয়ে ওঠে। নবীদের জীবন আমাদের জন্য কেবল ইতিহাসের পাতা নয়; তা আত্মসমালোচনার আয়না। আমি কি সত্যের সঙ্গে আছি, নাকি সত্যের নাম নিয়ে নিজের প্রবৃত্তির সঙ্গে আপস করছি? আমি কি আখিরাতকে মনে রাখছি, নাকি দুনিয়ার ধুলায় চোখ ঢেকে ফেলেছি? এই প্রশ্নগুলোর সামনে মানুষ যখন থেমে যায়, তখন ঈমান কাঁপে, আর সেই কাঁপনই কখনও জাগরণের শুরু।

ইদ্রীস (আ.)-এর স্মরণে রহমতেরও এক সূক্ষ্ম দরজা খুলে যায়। আল্লাহ যাঁকে স্মরণ করতে বলেন, তিনি কখনোই সেই স্মরণকে বৃথা যেতে দেন না। নবীদের আলোচনা হৃদয়কে নরম করে, পাপের মোহ ভাঙে, এবং মৃত্যুর পরের জীবনকে বাস্তব করে তোলে। এই আয়াত যেন আমাদের বলে—তুমি যে কাহিনিতে ডুবে আছ, তা শেষ পর্যন্ত কবরের মাটিতেই থামবে না; তোমার পথের হিসাব আছে, সত্যের ওজন আছে, সাক্ষ্যের দিন আছে। তাই ইদ্রীস (আ.)-এর নাম উচ্চারিত হলে তা যেন আমাদের অন্তরেও উচ্চারিত হয়: সত্যবাদী হও, আল্লাহর দিকে ফিরে এসো, এবং সেই দিনের জন্য প্রস্তুত হও যখন মানুষের সব ভণিতা ঝরে যাবে, আর কেবল ঈমান, সত্য এবং আল্লাহর রহমতই অবশিষ্ট থাকবে।

আল্লাহর কিতাবে ইদ্রীস (আ.)-এর নাম এভাবে আসা আমাদের ভিতরটা নীরবে কেঁপে উঠতে শেখায়। দুনিয়ার বাজারে মানুষ বড় হয় কণ্ঠস্বর দিয়ে, পরিচিতি দিয়ে, উপস্থিতির জৌলুস দিয়ে; কিন্তু আল্লাহর দরবারে মূল্যবান হয় সেই হৃদয়, যা সত্যের সঙ্গে এক হয়ে যায়। “সিদ্দীক” হওয়া মানে কেবল মিথ্যা না বলা নয়; এর মানে সত্যকে এমনভাবে ধারণ করা, যেন জীবন, নীরবতা, দোয়া, ত্যাগ, অপেক্ষা—সবকিছুর ওপরই সত্যের সিলমোহর থাকে। ইদ্রীস (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত স্মরণ আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে দীর্ঘ গল্পের চেয়ে প্রিয় হতে পারে একটি খাঁটি জীবন; আর মানুষের বিস্মরণের ভেতরেও আল্লাহর স্মরণে কোনো বান্দা অমর হয়ে যেতে পারে।
এই আয়াত পড়লে মনে হয়, আমরা কি সেই সত্যের সঙ্গে আছি, নাকি কেবল সত্যের কথা বলি? আমাদের আমল কি অন্তরের ভাষা হয়ে উঠেছে, নাকি আমরা শুধু বাহ্যিক ছায়া আঁকড়ে বেঁচে আছি? যাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া, মারইয়াম (আ.)-এর পবিত্রতা, ঈসা (আ.)-এর নিদর্শন, ইদ্রীস (আ.)-এর সত্যনিষ্ঠা—সবই একই মহাসূত্রে বাঁধা: আল্লাহর রহমত এমন হৃদয়ের ওপর নাজিল হয়, যা বিনয়ী, বিশ্বাসী, এবং আখিরাতমুখী। তাই এই কিতাব যখন ইদ্রীস (আ.)-এর কথা স্মরণ করায়, তখন আসলে আমাদেরকেই স্মরণ করায়—তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছ? তোমার হৃদয় কি সত্যের পক্ষে, নাকি নিজের প্রবৃত্তির পক্ষে?
আজকের এই স্মরণ আমাদের মাথা নত করুক। হয়তো আমরা গাফিল, হয়তো আমাদের অন্তর অনেকদিন ধরে কুয়াশায় ঢাকা, হয়তো দুনিয়ার শব্দে আখিরাতের ডাক ক্ষীণ হয়ে গেছে। তবু আল্লাহর কিতাব বন্ধ করে দেয় না; সে ডাক দেয়, জাগায়, ফিরিয়ে আনে। ইদ্রীস (আ.)-এর নাম উচ্চারিত হওয়া মানে এই নয় যে কেবল একজন নবীর কাহিনি শেষ হলো; বরং এর মানে আমাদের ভেতরেও সত্যের একটি দরজা খুলে গেল। যে দরজায় প্রবেশ করবে, সে বুঝবে—সত্যবাদিতা শুধু মুখের ভাষা নয়, তা ঈমানের ভেতরকার দৃঢ়তা; আর নবীদের স্মৃতি কেবল ইতিহাস নয়, তা আখিরাতের প্রস্তুতির জন্য হৃদয়ের ওপর আল্লাহর এক কোমল কিন্তু অমোঘ আঘাত।