সূরা মারইয়ামের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক অপূর্ব দয়া প্রকাশ করেছেন: তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে শুধু একা পাঠাননি, নিজের রহমত থেকে তাঁর ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে নবী করে তাঁর পাশে দাঁড় করিয়েছেন। কোরআনের এই বাক্যটি খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর ভেতরে আছে আসমানি ব্যবস্থার এক গভীর সৌন্দর্য—আল্লাহ চাইলে একাকীকেও শক্তিশালী করেন, আর চাইলে আত্মীয়তার বন্ধনকে নবুয়তের আলোয় আরো মহিমান্বিত করেন। এখানে “আমার রহমত” শব্দটি যেন ঘোষণা করে, নবুয়ত মানুষের অর্জন নয়; এটি নিখাদ অনুগ্রহ, আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত দান।
এ আয়াতে পরিবারও রহমতের অংশ হয়ে ওঠে। হারুন আলাইহিস সালামের নবুয়ত মূসা আলাইহিস সালামের দায়িত্বকে সহজ করেছে, তাঁর দাওয়াতকে শক্তি দিয়েছে, আর সত্যের পথে এক ভাইকে আরেক ভাইয়ের সহায় বানিয়ে দিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এই সম্পর্ক কোনো বংশগৌরবের গল্প নয়; এটি আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের গল্প। তিনি যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দেন, যাকে ইচ্ছা সাহায্যকারী বানান, আর যাকে ইচ্ছা নবীদের পাশে দাঁড় করান—যেন মানুষ বুঝে, সত্যের পথে একা নয়, আল্লাহর দয়া সঙ্গে থাকলে দুর্বলতা-ও শক্তিতে রূপ নেয়।
সূরা মারইয়ামের সার্বিক সুরের ভেতর এই আয়াত এক কোমল কিন্তু হৃদয়বিদারক স্মরণ জাগায়: নবীদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত কাহিনি নয়, তা রহমত, দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, এবং আখিরাতমুখী সত্যের শিক্ষা। যেখানেই আল্লাহর দয়া নাজিল হয়, সেখানেই সম্পর্কগুলো নতুন মর্যাদা পায়, নেতৃত্ব নতুন ভারসাম্য পায়, আর বান্দার চোখে খুলে যায় এই সত্য—রবের অনুগ্রহ ছাড়া না নবুয়তের সম্মান, না সঠিক পথের দৃঢ়তা। এই আয়াত তাই শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি আজও আমাদেরকে শেখায়, আল্লাহর রহমত মানুষকে একা রাখে না, বরং সত্যের কাজে সত্যিকার সহায়কে কাছে এনে দেয়।
আল্লাহর এই বাক্যে যেন রহমতের এক নরম কিন্তু দীপ্ত জ্যোতি নেমে আসে মানুষের হৃদয়ে। তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে একা রেখে দেননি; নিজের দয়ার ভেতর থেকে তাঁর ভাই হারুনকে নবী করে পাশে দাঁড় করিয়েছেন। এটা শুধু সাহায্য নয়, এটা আসমানি কুদরতের এমন এক প্রকাশ, যেখানে দায়িত্বের ভারকে আল্লাহ নিজ হাতে হালকা করে দেন। মানুষ যখন ভাবে, আমি একা; তখন আল্লাহর রহমত বলে, তুমি একা নও। তিনি চাইলে এক হৃদয়ে বহু শক্তি ঢেলে দেন, চাইলে এক পরিবারের ভেতর থেকে দাওয়াতের আলোকে বহুগুণ উজ্জ্বল করে তোলেন।
সূরা মারইয়াম জুড়ে যে কোমলতা আছে, এ আয়াত তারই অন্তঃসলিল। এখানে আখিরাতের জন্যও এক নীরব জাগরণ আছে: মানুষের সম্মান আল্লাহর হাতে, মানুষের সহায়ও আল্লাহর হাতে, আর মানুষের একাকীত্বের শেষ আশ্রয়ও তাঁরই রহমত। আজ যে হৃদয় বুঝবে—আমি নিজেকে দিয়েই সম্পূর্ণ হতে পারি না, আমাকে আল্লাহই সম্পূর্ণ করেন—সে হৃদয় নবীদের স্মৃতির ভেতর দিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরতে শুরু করবে। আর তখন “রহমত” আর কেবল শব্দ থাকে না; তা হয়ে ওঠে জীবনের ভিত, দোয়ার স্বর, এবং ভাঙা অন্তরকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক আল্লাহীয় আলো।
আল্লাহ তাআলা এখানে মূসা আলাইহিস সালামের পাশে তাঁর ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে নবীর মর্যাদায় দান করার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এটি শুধু এক ভাইয়ের জন্য আরেক ভাইয়ের সহায়তার গল্প নয়; এটি রহমতের এমন এক প্রকাশ, যেখানে আল্লাহর নির্বাচন মানুষের সম্পর্ককেও আসমানি আলোয় উজ্জ্বল করে দেন। নবুয়ত কারও উত্তরাধিকার নয়, কারও চেষ্টায় পাওয়া পদ নয়; তা সম্পূর্ণরূপে রহমতের দান। তাই এই আয়াত হৃদয়কে শেখায়—যে সাহায্য আল্লাহ দেন, তা কখনো দুর্বলতা লুকোনোর জন্য নয়; বরং সত্যের বোঝা বহনের শক্তি বাড়ানোর জন্য।
এই দৃশ্যের ভেতরে সমাজের জন্যও এক নীরব শিক্ষা আছে। সত্যের পথে মানুষ একা নয়, আর আল্লাহর দীন এমন নাজুক জিনিস নয় যে একটি হৃদয় ভেঙে পড়লেই তা ভেঙে যাবে। তিনি প্রয়োজনে ভাইকে ভাইয়ের পাশে দাঁড় করান, সহায়ককে সহায়ক করেন, দায়িত্বকে ভারসাম্যপূর্ণ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে এই আয়াত আমাদের আত্মসমালোচনার দরজাও খুলে দেয়: আমরা কি সত্যকে সহায়তা করি, নাকি সত্যের আহ্বানকারীর একাকিত্বকে বাড়িয়ে দিই? আমরা কি আল্লাহর দানের কদর করি, নাকি মানুষের মর্যাদা দেখে হিংসায় জ্বলি?
সূরা মারইয়ামের এই অংশে রহমত কেবল আবেগ নয়, বরং আখিরাতমুখী এক জাগরণ। আল্লাহ যাকে চান, তাকে সম্মান দেন; যাকে চান, তাকে সাহায্যের মাধ্যম বানান; আর যাকে চান, তার জীবনকে অন্যদের জন্য হেদায়াতের সেতু করে তোলেন। তাই মানুষ যদি নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে, ‘আমার জীবনে আল্লাহর রহমতের চিহ্ন কোথায়?’—তবে উত্তর হয়তো এইখানেই: পরিবারে, সহায়তায়, দায়িত্বে, এবং সৎপথে অবিচল থাকার তাওফিকে। শেষাবধি সবাইকে ফিরতে হবে আল্লাহর কাছেই। সেদিন বংশ, পদ, সম্পর্ক নয়; বরং কে রহমতকে চিনেছে, কে নবীদের স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিয়েছে, আর কে তার হৃদয়কে তাঁর রবের সামনে নত করতে পেরেছে—এটাই হবে আসল পরিচয়।
এই আয়াত আমাদের অন্তরে নরম কিন্তু গভীর এক প্রশ্ন ফেলে দেয়: আমার জীবনে আল্লাহ কি এমন কাউকে রেখেছেন, যিনি আমার বোঝা হালকা করেন, আমার সত্যের পথে সঙ্গ দেন, আমার ঈমানকে জাগিয়ে তোলেন? আর আমি কি নিজেও কারও জন্য রহমতের হাত হতে পেরেছি, না কি শুধুই দাবি করেছি, অথচ সহায়তা দিতে কৃপণ থেকেছি? কত মানুষ আছে, যাদের কাছে সম্পদ আছে, অথচ রহমত নেই; সম্পর্ক আছে, অথচ সহযোগিতা নেই; ধর্মের কথা আছে, অথচ নবীদের পথে চলার বিনয় নেই। সূরা মারইয়াম আমাদের শেখায়—আল্লাহর দান যখন নামে, তখন তা শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার চারপাশকেও আলোকিত করে।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের অহংকার গলতে শেখা উচিত। যদি আল্লাহ কাউকে মর্যাদা দেন, তা তাঁর অনুগ্রহ; যদি কাউকে সাহায্যকারী বানান, তা তাঁর বেছে নেওয়া দয়া। আজ আমরা যেন এ কথাই হৃদয়ে নিই—নবীদের স্মৃতি কেবল ইতিহাসের পাতায় নয়, আত্মসমর্পণের প্রতিটি শ্বাসে বেঁচে থাকে। আমাদেরও দরকার এমন এক হৃদয়, যা নিজের জন্য কিছু চায় না শুধু; বরং চায় আল্লাহ যেন আমাদেরকে কারও জন্য রহমত বানান, সত্যে স্থির রাখেন, আখিরাতের কথা মনে করিয়ে দেন, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর দয়ার ছায়ায় ফিরিয়ে নেন। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য সম্পদ নয়, বংশ নয়, বাহ্যিক মর্যাদাও নয়; সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো—আল্লাহর রহমতের ভেতর থেকে এক মুহূর্তও বিচ্ছিন্ন না হওয়া।