সূরা মারইয়ামের এই আয়াতটি তাওহীদের এমন এক দীপ্ত উচ্চারণ, যেখানে মানুষের ধারণা, কল্পনা, আর সীমাবদ্ধ বোধের দেয়াল ভেঙে পড়ে। আল্লাহর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি এমন নন যে সন্তান গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ, তাঁর সত্তা কারও মুখাপেক্ষী নয়, তাঁর পূর্ণতা কারও দ্বারা বৃদ্ধি পায় না, তাঁর মহিমা কোনো সম্পর্কের যোগে পূর্ণ হয় না। মানুষের জীবনে সন্তান বংশধারা, উত্তরাধিকার, সান্ত্বনা, শক্তি, আশ্রয়ের প্রতীক হতে পারে; কিন্তু আল্লাহর জন্য এসব অর্থহীন। তিনি পবিত্র, তিনি সকল অপূর্ণতা, প্রয়োজন, সাদৃশ্য ও সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। তাঁর পবিত্রতার উচ্চারণে কেবল একটি শব্দই যথেষ্ট: سُبْحَٰنَهُ। যেন কুরআন আমাদের হৃদয়ের ভিতর থেকে এমন সব ধারণা মুছে দিতে চায়, যা রবকে সৃষ্টির মতো করে ভাবতে শেখায়।

এই আয়াতের আশপাশের প্রসঙ্গও গভীরভাবে মনোযোগ দাবি করে। সূরা মারইয়ামের ধারায় যাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, মারইয়াম ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের স্মৃতি আমাদের সামনে আসে—রহমতের এমন সব দৃশ্য, যেখানে আল্লাহ শূন্যতার ভেতর থেকে জীবন দান করেন, অসম্ভবের মাঝখানে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেন। ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিস্ময়কর সৃষ্টি-নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে, তা কোনোভাবেই আল্লাহর জন্য সন্তানত্বের প্রমাণ নয়; বরং তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার নিদর্শন। এখানে কুরআন যেন খুব নরম কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় বলে: অলৌকিক জন্ম মানেই ঐশী সন্তান নয়, এবং একক সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমতা প্রকাশ পাওয়া মানেই তাঁর সত্তায় কোনো অংশীদারিত্ব নয়। এই আয়াত মূলত সেইসব ভ্রান্ত বিশ্বাসের জবাব, যেখানে মানুষ স্রষ্টার মর্যাদাকে সৃষ্টির ভাষায় বর্ণনা করতে চায়।

এরপর আসে কুন ফাইয়াকুন—আদেশের এমন এক বাস্তবতা, যা সময়ের বিলম্ব, উপকরণের অভাব, কিংবা সম্ভাবনার অপ্রাপ্যতায় আটকে যায় না। আল্লাহ যখন কোনো বিষয় স্থির করেন, তাঁর জন্য কোনো শ্রমের ক্লান্তি নেই, কোনো প্রতিবন্ধকতার সংঘর্ষ নেই; তিনি বলেন, হও, আর তা হয়ে যায়। এই বাক্য আমাদের আখিরাতের দিকে তাকাতে শেখায়, কারণ যিনি প্রথম সৃষ্টিকে এমন সহজে অস্তিত্বে আনেন, তাঁর কাছে পুনরুত্থান আরও সহজতর বাস্তবতা। তাই এই আয়াত শুধু ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে একটি জবাব নয়; এটি মুমিন হৃদয়ের জন্যও এক অবিরাম স্মরণিকা—তুমি যা অসম্ভব ভাবছ, তোমার রবের কাছে তা কেবল ইচ্ছার বিষয়। হৃদয় যদি সত্যিই এই তাওহীদের সামনে নত হয়, তবে সে শিরকের ধুলো ঝেড়ে ফেলে, রহমতের দিকে ফিরে আসে, আর আখিরাতের দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে।

এখানে কুরআন আমাদের চোখ তুলে আকাশের দিকে নয়, আগে অন্তরের দিকে তাকাতে বলে। আল্লাহর জন্য সন্তান গ্রহণের ধারণাই শোভন নয়—কারণ সন্তান মানে যেমন মানবজীবনে উত্তরাধিকার, নির্ভরতা, ধারাবাহিকতা, তেমনি তা এক অভাবেরও চিহ্ন; আর যিনি সকল অভাবের ঊর্ধ্বে, তাঁর সঙ্গে এমন অর্থ জুড়ে দেওয়া তাঁর মাহাত্ম্যকে না বোঝারই নাম। তাই সূরা মারইয়ামে ঈসা, মারইয়াম, যাকারিয়া আলাইহিমুস সালামকে স্মরণ করিয়ে এই আয়াত আমাদের শেখায়: নবীদের স্মৃতি যতই বিস্ময়কর হোক, তারা কখনোই আল্লাহর সত্তাকে সৃষ্টির গণ্ডিতে নামিয়ে আনে না; বরং তাদের প্রতিটি মুজিযা, প্রতিটি দোয়া, প্রতিটি রহমতের দরজা আমাদের সামনে একটিই সত্য খুলে দেয়—আল্লাহর ক্ষমতা অসীম, আর তাঁর পবিত্রতা অস্পর্শ্য।

সুবহানাহু—এই এক শব্দ যেন মানুষের সব অপূর্ণ ধারণাকে ধুয়ে দেয়। ঈসার জন্মকে ঘিরে মানুষের বিস্ময়, যাকারিয়ার দোয়ায় বার্ধক্যের বুক চিরে সন্তানের আগমন, শূন্যতার ভিতর জীবন, নিরাশার ভিতর আশা—এসবই বলে যে আল্লাহ কারণের মুখাপেক্ষী নন, তিনি কারণ সৃষ্টি করেন। তাই ‘কুন ফাইয়াকুন’ কেবল একটি ক্ষমতার ঘোষণা নয়; এটি হৃদয়ের ওপর আঘাত করা এক তাওহীদের আহ্বান, যেখানে আমরা বুঝতে পারি—যিনি বলেন ‘হও’, তাঁর সামনে অসম্ভব বলে কিছু নেই, দূর বলে কিছু নেই, দেরি বলে কিছু নেই। মানুষ অপেক্ষা করে; আল্লাহ ইচ্ছা করেন। মানুষ পরিকল্পনা করে; আল্লাহ বাস্তবতা সৃষ্টি করেন।
এই আয়াতের আলো আখিরাতের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। যিনি মুহূর্তে অস্তিত্ব দান করতে পারেন, তিনিই তো কিয়ামতের দিন মৃতকে পুনর্জীবিত করতে সক্ষম; যিনি শূন্য থেকে জীবন রচনা করেন, তাঁর কাছে পুনরুত্থান কোনো প্রশ্ন নয়, বরং এক অবধারিত সত্য। তাই যারা আল্লাহকে সন্তানের ধারণায় সীমাবদ্ধ করতে চায়, তারা কেবল আকীদার ভুল করছে না; তারা আসলে রবের মহিমার সামনে নিজেদের বোধহীনতাকেই উন্মোচিত করছে। আর মুমিনের জন্য এই আয়াত এক আশ্রয়: যখন পথ বন্ধ মনে হয়, যখন দোয়ার জবাব বিলম্বিত হয়, যখন হৃদয় ভেঙে যায়—তখন স্মরণ রাখা উচিত, আল্লাহর ইচ্ছার সামনে সব জটিলতা নত, সব অন্ধকার পরাস্ত, আর তাঁর কুন ফাইয়াকুন-এ রহমতও জেগে ওঠে, ন্যায়ও জেগে ওঠে, আখিরাতও জেগে ওঠে।

এই আয়াতের সামনে এসে মানুষের অহংকার নীরবে ভেঙে যায়। আল্লাহ এমন নন যে সন্তান গ্রহণ করবেন—এ কথা কেবল একটি আকীদাগত সংশোধন নয়, এটি হৃদয়ের ভেতর জমে থাকা সব ভুল ধারণার বিরুদ্ধে এক মহান তাওহীদী ঘোষণা। মানুষ প্রায়ই নিজের দুর্বলতা, শূন্যতা, একাকীত্ব ঢাকতে সম্পর্কের আশ্রয় খোঁজে; কিন্তু রব্বুল আলামীন মুখাপেক্ষিতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁর জন্য না আছে উত্তরাধিকারীর প্রয়োজন, না আছে সহায়তার অভাব, না আছে পূর্ণতা লাভের কোনো সম্ভাবনা। সুতরাং ‘سُبْحَٰنَهُ’—তিনি পবিত্র, তিনি মহিমান্বিত—এই শব্দটি যেন আমাদের অন্তরের মিথ্যা আশ্রয়গুলোকে পুড়িয়ে দেয়, আর শেখায়: আল্লাহকে সৃষ্টির সীমায় বাঁধা যায় না।

তারপর আসে কুন ফাইয়াকুনের বিস্ময়। তিনি যখন কোনো কাজ স্থির করেন, তখন তার সামনে কোনো বাধা দাঁড়াতে পারে না, কোনো দূরত্ব দীর্ঘ হয় না, কোনো অক্ষমতা তাঁকে স্পর্শ করে না। ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের বিস্ময়, মারইয়ামের পবিত্রতার আলোক, যাকারিয়্যার দোয়ার উত্তরে ইয়াহইয়া দানের সৌন্দর্য—সবই এই সত্যের দিকে ইশারা করে যে, আসমান-জমিনের সব রহস্য আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নত। মানুষ যখন কারণ-উপকরণের জালে জড়িয়ে পড়ে, তখন এই আয়াত তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়: কারণও তাঁর সৃষ্টি, ফলও তাঁর দান। তাই যে সমাজ আল্লাহর সম্পর্কে অপূর্ণ ধারণা পোষণ করে, সে ধীরে ধীরে তাওহীদের আলো হারায়; আর যে হৃদয় তাঁর পবিত্রতা বুঝে, সে নিজের পাপ, নিজের জেদ, নিজের ছোট্ট অহংকারকে দেখেই কেঁপে ওঠে।

এই আয়াত আমাদেরকে আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। যিনি সন্তান গ্রহণ করেন না, যিনি কারও মুখাপেক্ষী নন, তিনি-ই একদিন আমাদের সব গোপন কথা, সব ভাঙা নিয়ত, সব লুকানো পাপ, সব নীরব কান্না হিসাব করবেন। তখন মানুষের আত্মরক্ষা থাকবে না, বংশমর্যাদা থাকবে না, আরোপিত পবিত্রতার আবরণ থাকবে না; থাকবে কেবল বান্দার বাস্তবতা আর রবের ন্যায়বিচার। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মুমিনের অন্তরে একসঙ্গে ভয় ও আশা জাগে—ভয়, কারণ তিনি মহান; আশা, কারণ তিনি যাঁর কাছে অসম্ভব কিছু নয়, তাঁর কাছে তওবা, ক্ষমা আর নতুন জীবনও অসম্ভব নয়। সূরা মারইয়াম আমাদের শেখায়: নবীদের স্মৃতি কেবল ইতিহাস নয়, এটি আত্মাকে জাগিয়ে তোলার ডাক; আর এই ডাকের কেন্দ্রে আছে সেই মহান সত্য—আল্লাহ পবিত্র, আল্লাহ ক্ষমতাবান, আর তাঁরই দিকে একদিন সব হৃদয় ফিরে যাবে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের অহংকার ধুলো হয়ে যায়। আমরা কত সহজে আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে নিজের মাপের ধারণা আরোপ করতে চাই, যেন অনন্তকে সীমাবদ্ধ বুদ্ধির ঘরে বন্দি করা যায়। অথচ তিনি এমন নন যে সন্তান গ্রহণ করবেন—নাউজুবিল্লাহ—কারণ তাঁর পূর্ণতা কারও যোগে বাড়ে না, তাঁর রাজত্ব কারও উত্তরাধিকার দিয়ে টিকে থাকে না, তাঁর কুদরত কোনো সহায়ের মুখাপেক্ষী নয়। তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত; তাঁর সম্পর্কে যে-কোনো অসম্পূর্ণ ধারণা, যেকোনো মানবিক সাদৃশ্য, যেকোনো সীমাবদ্ধতার ছায়া—সবই এই একটি শব্দে ভেঙে যায়: سُبْحَٰنَهُ।
সূরা মারইয়ামের স্মৃতিভাণ্ডারে যাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, মারইয়াম ও ঈসা আলাইহিমুস সালামের ঘটনা আমাদের শেখায়—আল্লাহ যখন দেন, তখন শূন্যতা লজ্জিত হয়, অসম্ভব নত হয়, আর রহমত তার পথ খুঁজে নেয়। এখানে তাওহীদ শুধু একটি বিশ্বাস নয়, এটি হৃদয়ের পুনর্জন্ম। যিনি মরিয়মকে মর্যাদা দিয়েছেন, যিনি বৃদ্ধ বয়সে দোয়ার দরজা খুলে দিয়েছেন, যিনি মায়ের কোলেই নিদর্শন প্রকাশ করেছেন—তিনি কখনো সৃষ্টির গুণে সীমাবদ্ধ নন। তাঁর কাজের জন্য মাধ্যমের দরকার নেই; তিনি ইচ্ছা করলে বলেন, ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।
তাই এই আয়াত আমাদের ভেতরের সব অবিনম্রতার বিরুদ্ধে এক নীরব বজ্রধ্বনি। যদি আল্লাহ সন্তান গ্রহণ না করেন, তবে আমরা কেন তাঁকে মানুষের ভাষায়, মানুষের সম্পর্কের ছাঁচে, মানুষের অভাবের চোখে দেখতে চাই? যদি তিনি সবার ঊর্ধ্বে পবিত্র ও পরিপূর্ণ হন, তবে আমাদের ইমানও পবিত্র হতে হবে—শির্কের ধূলি থেকে, ধারণার অহংকার থেকে, গোনাহের ঘন অন্ধকার থেকে মুক্ত। কুরআনের এই ঘোষণা শেষে হৃদয় শুধু একটিই কথা শেখে: হে রব, আপনি যেমন বলেছেন তেমনই আপনি মহান; আমাদের ভুল ধারণা নয়, আপনার সত্যই আমাদের আশ্রয়। আমাদের অন্তরকে আপনার তাসবীহে ভিজিয়ে দিন, আর আখিরাতের আগে তওবার আলোয় জাগিয়ে দিন।