মারইয়াম আলাইহাস সালামের এই বাক্যটি যেন এক পবিত্র বিস্ময়ের কাঁপন। তিনি প্রশ্ন করছেন, “কীভাবে আমার পুত্র হবে?”—এ প্রশ্নে অবিশ্বাস নেই, আছে বিস্ময়ের মধ্যে লুকানো ইমান। কারণ তিনি নিজেই জানেন, মানব-জীবনের সাধারণ নিয়মে মাতৃত্বের একটি পরিচিত পথ আছে; আর সেই পথ তাঁর জীবনে আসেনি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন, কোনো মানুষ তাঁকে স্পর্শ করেনি, আর তিনি কখনও অশ্লীলতা বা ব্যভিচারের পথে ছিলেন না। এই ঘোষণা তাঁর চরিত্রের অমলিনতা, তাঁর লজ্জাশীলতার পবিত্রতা, আর তাঁর অন্তরের নির্মলতার সাক্ষ্য বহন করে। যেন কুরআন এখানে মানবসমাজের সামনে এক নারীর সম্মানকে আসমানি ভাষায় প্রতিষ্ঠা করছে—গোপন নয়, দুর্বল নয়, কলুষিত নয়; বরং আল্লাহর নির্বাচিত বান্দীর মর্যাদায় দীপ্ত।
এই আয়াতে আমরা দেখি, আল্লাহর কুদরতের সামনে মানবীয় হিসাব কত ক্ষুদ্র। যেখানে কারণ-পরিণামের পরিচিত নিয়ম ভেঙে যায়, সেখানে ঈমানের কাজ হলো মাথা নত করা। কিন্তু এই নত হওয়া অন্ধ আত্মসমর্পণ নয়; বরং পরিচয়ের ভিতর দিয়ে বিস্ময়কে বরণ করা। মারইয়ামের প্রশ্ন তাই একেবারে মানবিক, একেবারে স্বাভাবিক; এবং ঠিক সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই আল্লাহর অসাধারণ ক্ষমতা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সূরা মারইয়াম শুরু থেকেই যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়া, ইয়াহইয়ার শুভ সংবাদ, তারপর মারইয়ামের নির্জনতা ও ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মবৃত্তান্ত—এসবকে এক সুরে বুনে নেয়, যাতে হৃদয় বুঝতে শেখে: আল্লাহ যখন চান, তখন বার্ধক্য সন্তান পায়, শূন্যতা কথা বলে, আর পবিত্র গর্ভে নিদর্শন জন্ম নেয়।
এই প্রসঙ্গে কোনো নির্ভরযোগ্য, নির্দিষ্ট শানে নুযূলের বর্ণনা নেই; তাই আয়াতটিকে কুরআনের নিজস্ব বর্ণনাপ্রবাহের মধ্যেই বুঝতে হয়। এটি কেবল এক নারীর ব্যক্তিগত বিস্ময় নয়, বরং ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনকে ঘিরে মানুষের সীমাবদ্ধ ধারণার ওপর আসমানি জবাব। সামাজিকভাবে এ আয়াত শিখিয়ে দেয়, পবিত্র চরিত্রের ওপর অপবাদ হালকা কোনো কথা নয়; আর আখিরাতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের মুখের সত্য-মিথ্যা সব উন্মোচিত হবে। তাই মারইয়ামের এই বক্তব্য আমাদেরও জাগিয়ে তোলে—আমরা কি আমাদের হৃদয়ের পবিত্রতা আল্লাহর কাছে তুলে ধরতে পারছি? আমরা কি জানি, মানুষ যা বোঝে না, তা আল্লাহর কুদরতের সামনে অসম্ভব নয়? সূরা মারইয়াম এখানে শুধু এক মুজিজার সংবাদ দেয় না; এটি আমাদের লজ্জা, আশা, ভয়, আর রহমতের বোধকে একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে।
মারইয়াম আলাইহাস সালামের এই প্রশ্নে কোনো বিদ্রোহ নেই, নেই সন্দেহের বিদঘুটে ছায়া; আছে পবিত্রতার স্বাভাবিক বিস্ময়, যেমন এক নির্মল হৃদয় হঠাৎ আসমানী ঘোষণার ভারে কেঁপে ওঠে। তিনি জানেন, মানুষের জীবনে সন্তানের আগমনের পরিচিত নিয়ম কী; তাই তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে নিজের পবিত্র ইতিহাসের সাক্ষ্য দিলেন। আমি কেমন করে মা হব, যখন কোনো মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি, আর আমার চরিত্রে কখনোই অশ্লীলতার দাগ লাগেনি—এই বাক্য যেন কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়, বরং আল্লাহর সামনে এক পবিত্র আত্মার জবানবন্দি। এখানে নারীর মর্যাদা অবমানিত নয়, বরং আসমানের আলোয় পুনরুদ্ধারিত; লজ্জা এখানে দুর্বলতা নয়, ইমানের সৌন্দর্য।
ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের প্রাক্কালে এই প্রশ্ন আমাদের হৃদয়ের দরজায়ও কড়া নাড়ে। পবিত্রতার সম্মান কত সহজে ভাষাহীন অপবাদে ক্ষতবিক্ষত হতে পারে, আর আল্লাহ কত দ্রুত তাঁর বান্দীর পবিত্রতাকে স্বর্গীয় সত্যে প্রতিষ্ঠা করেন—এই আয়াত তা স্মরণ করায়। নবীদের স্মৃতি এখানে কেবল ইতিহাস নয়, রহমতের ধারাবাহিকতা; যাকারিয়ার দোয়া যেমন আকাশ খুলেছিল, মারইয়ামের বিস্ময়ও তেমনি আসমানের এক নতুন দিগন্তের আগমনবার্তা। যে হৃদয় আখিরাতকে মনে রাখে, সে জানে: দুনিয়ার কোলাহল নয়, আল্লাহর ঘোষণাই শেষ কথা; আর সেই ঘোষণার সামনে সবচেয়ে সুন্দর অবস্থান হলো বিস্ময়ের সঙ্গে সিজদাবনত হওয়া।
মারইয়ামের এই প্রশ্নের ভিতরে মানুষের চিরন্তন সীমাবোধ জেগে ওঠে। যে হৃদয় আল্লাহকে চেনে, সে জানে—অলৌকিকতা কল্পনার খেলা নয়, বরং কুদরতের সামনে বান্দার নত হওয়ার নাম। তাই মারইয়াম বিস্মিত হন, কিন্তু বিদ্রোহ করেন না; প্রশ্ন করেন, কিন্তু সন্দেহে ডুবে যান না। এ এক পবিত্র বিস্ময়, যেখানে লজ্জাশীলতা নিজের সম্মান রক্ষা করে, আর ঈমান নিজের সীমানায় দাঁড়িয়ে বলে: আমি জানি না, কিন্তু আমার রব জানেন। মানুষের সমাজ যখন চরিত্রকে সন্দেহের চশমায় দেখে, তখন এই আয়াত একজন নিষ্পাপ নারীর সততাকে আসমানি সাক্ষ্যে উজ্জ্বল করে। এখানে কেবল মারইয়ামের কথা নয়, এখানে মুমিনের অন্তরেরও শিক্ষা আছে—নিজেকে আল্লাহর সামনে পরিষ্কার রাখা, গোপনে-প্রকাশ্যে পবিত্র থাকা, আর নিজের সম্পর্কে এমন জবাবদিহির অনুভব বয়ে চলা, যা কিয়ামতের দিনের বিচারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এ আয়াত আমাদের ভয় ও আশার মাঝখানে দাঁড় করায়। ভয়, এই কারণে যে মানুষের ধারাবাহিক অভ্যাস আল্লাহর কুদরতের কাছে কোনো আইন নয়; তিনি চাইলে যা চান, তা-ই হয়। আর আশা, এই কারণে যে যিনি বন্ধ দরজাকে খুলতে পারেন, তিনি ভাঙা হৃদয়কেও জোড়া দিতে পারেন, অপমানিত আত্মাকেও সম্মান দিতে পারেন, তাওবা করা বান্দাকেও ফেরাতে পারেন। সমাজের কলুষ, অপবাদ, রটনা, আর হৃদয়ের অন্ধকার—সবকিছুর ভিড়ে মারইয়ামের এই বাক্য আমাদের শেখায়, সত্য পবিত্র থাকলেও তা অনেক সময় বিস্ময়ের ভাষায় উচ্চারিত হয়। তাই যে মুমিন নিজের গোনাহের ভার অনুভব করে, সে যেন ভুলে না যায়: আল্লাহর রহমত মানুষের সীমার চেয়েও বড়। শেষ পর্যন্ত এই আয়াত আমাদের আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে নেয়; কারণ যিনি দুনিয়ায় কুদরতের অধিপতি, তিনি হাশরের ময়দানেও বিচারকের আসনে আছেন। আজ আত্মাকে যদি তাঁর দিকে না ফেরাই, তবে কাল ফিরতে হবে এমন এক দিনে, যখন প্রশ্ন হবে না শুধু ‘কীভাবে’, বরং জিজ্ঞেস করা হবে, ‘তুমি কোন হৃদয় নিয়ে এসেছো?’
মারইয়ামের এই প্রশ্ন আমাদেরও দাঁড় করায় সেই জায়গায়, যেখানে মানুষ নিজের সীমা চিনে নিতে শেখে। আমরা কত সহজে সম্ভাব্যতার দরজায় ঈমানকে বন্দি করতে চাই, আর আল্লাহর কুদরতের সামনে নিজের অভ্যাস, অভিজ্ঞতা, হিসাব—সবকিছুকে মানদণ্ড বানাই। কিন্তু পবিত্রতার এই কাঁপা জিজ্ঞাসা জানিয়ে দেয়, আল্লাহ যদি চান, তবে কারণের শৃঙ্খলও তাঁর সামনে আজ্ঞাবহ; আর যদি তিনি রক্ষা করতে চান, তবে নির্দোষকে কলুষের দাগ থেকেও উঁচু করে রাখেন। তাই এই আয়াত শুধু ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের কথা বলে না, বলে আল্লাহর কুদরত সেই দীপ্তি, যা মানুষের ভাঙা যুক্তিকে ভরসা নয়, নম্রতা শেখায়।
মারইয়াম আলাইহাস সালামের লজ্জাশীলতা, নির্লিপ্ত পবিত্রতা, এবং সত্যভাষণ আমাদের সময়ের মানুষের কাছে এক কঠিন আয়না। আজ যখন চরিত্রের উপর মিথ্যার ধুলো জমে, যখন সন্দেহ দ্রুত ছড়ায় আর পবিত্রতাকে প্রমাণ করতে হয়, তখন কুরআন এক নারীর পক্ষে স্বয়ং আসমানি সাক্ষ্য দেয়। এই সাক্ষ্য আমাদের শেখায়—আল্লাহর বান্দার সম্মান মানুষের হাতে নয়, আল্লাহর ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত। তাই গুনাহের দৃষ্টি থেকে চোখ ফেরানো, জিহ্বার অপবাদ থেকে মুখ বাঁচানো, হৃদয়ের কুপ্রবণতাকে দমন করা—এসবই সেই ঈমানের অংশ, যা মারইয়ামের ঘটনাকে কেবল কাহিনি নয়, আত্মশুদ্ধির আহ্বান করে তোলে।
আর শেষত, এই আয়াত আমাদের আখিরাতের দিকে ফিরিয়ে দেয়। কারণ যে আল্লাহ নিষ্পাপ মাতৃত্বকে তাঁর কুদরতে প্রকাশ করেন, তিনিই মৃতকে জীবিত করতে, লুকানোকে প্রকাশ করতে, আর প্রতিটি অন্তরের খবর জেনে ন্যায়ের মীযানে দাঁড় করাতে সক্ষম। সুতরাং আজ যদি আমাদের অন্তর কঠিন হয়ে থাকে, তবে এই পবিত্র বিস্ময়ের সামনে নরম হোক; যদি পাপের ভার থাকে, তবে তা টের পাক; যদি বিশ্বাসে ধূলি জমে থাকে, তবে তা ধুয়ে যাক। মারইয়ামের প্রশ্নের ভেতর আমাদেরও একটি নীরব দোয়া জন্মাক—হে আল্লাহ, আমাদের হৃদয়কে তোমার কুদরতের সামনে বিনয়ী করো, আমাদের লজ্জা ও পবিত্রতা রক্ষা করো, আর এমন ঈমান দাও যা বিস্ময়ের পরেও তোমার হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করতে জানে।