“ওয়া সালামুন আলাইহি”—এই একটি ঘোষণা যেন আকাশ থেকে নেমে আসা শান্তির শীতল ছায়া। জন্ম, মৃত্যু, পুনরুত্থান—মানুষের জীবনের এই তিন মহাদিনে সাধারণত কাঁপুনি নামে, অনিশ্চয়তা নামে, ভয় নামে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য ঘোষণা করলেন, সেই তিন জায়গাতেই থাকবে সালাম, থাকবে নিরাপত্তা, থাকবে রবের পক্ষ থেকে স্নেহময় আশ্বাস। এটি কেবল এক নবীর বিশেষ মর্যাদার কথা নয়; এটি আল্লাহর রহমতের সেই ভাষা, যা বান্দার জীবনের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তগুলোতেও আসমানী সান্ত্বনা হয়ে নামে।

সূরা মারইয়ামে ঈসা আলাইহিস সালাম ও মারইয়াম আলাইহাস সালামের স্মৃতি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, যেন মুমিনের হৃদয় বুঝে নেয়—আল্লাহ যাকে চান, তাঁকে অপমানের গহ্বর থেকে সম্মানের শিখরে তুলে দেন। এই আয়াতে ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মের পবিত্রতা, মৃত্যুর বাস্তবতা, এবং পুনরুত্থানের নিশ্চিততা—তিনটি সত্য এক সুতোয় বাঁধা। এখানে কোনো কল্পকাহিনি নেই, নেই মানবীয় অতিরঞ্জন; আছে আল্লাহর বান্দার জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি রব্বানী আলোকপাত। বিশেষ করে পুনরুত্থানের উল্লেখ মানুষের অন্তরে আখিরাতের দরজা খুলে দেয়, কারণ যে জন্ম একদিন হয়েছিল, যে মৃত্যু একদিন আসবে, সেই জীবনের পরে আবার দাঁড়ানোর মুহূর্তও অনিবার্য।

এই আয়াতের বড় তাৎপর্য হলো, সূরা মারইয়ামের সূচনা থেকেই নবীদের স্মৃতি আমাদের শেখায়—রহমত কখনো ইতিহাসের পাতায় আটকে থাকে না; তা জীবনের দুঃসময়, মৃত্যু-সন্ধ্যা, আর কিয়ামতের অনিবার্য ভোর পর্যন্ত বিস্তৃত। ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে কুরআন যে ভাষায় শান্তির ঘোষণা দিয়েছে, তা একই সঙ্গে তাঁর মর্যাদা জানায় এবং আল্লাহর একচ্ছত্র কর্তৃত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষের হৃদয় যখন জন্মের বিস্ময়, মৃত্যুর অন্ধকার, আর পুনরুত্থানের মহাসত্যের সামনে দাঁড়ায়, তখন এই একটি আয়াত তাকে বলে—তোমার পথ যদি রবের সালামের দিকে যায়, তবে ভয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তেও তুমি একা নও।

জন্মের দিন মানুষ অচেনা জগতে আসে, মৃত্যুর দিন আপন ঘরও পর হয়ে যায়, আর পুনরুত্থানের দিন সব পর্দা সরে গিয়ে সত্যের সামনে দাঁড়াতে হয়। এই তিন দিনে মানুষের ভরসা সাধারণত ভেঙে পড়ে; কারণ এগুলো এমন সময়, যেখানে মা’র স্নেহ, পৃথিবীর পরিচিতি, দেহের শক্তি—কিছুই শেষ আশ্রয় নয়। কিন্তু ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য আল্লাহ তাআলা এই তিন দিনের ওপরই “সালাম” নাযিল করলেন। যেন ঘোষণা করা হলো, যেখানেই বান্দা সবচেয়ে অসহায়, সেখানেই যদি রবের রহমত পৌঁছে যায়, তবে ভয়ও বদলে যায় প্রশান্তিতে, অন্ধকারও বদলে যায় নিরাপত্তায়।

এই আয়াতে শুধু একজন নবীর সম্মান নেই; আছে মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে ঘিরে আল্লাহর গভীর শিক্ষা। জন্ম, মৃত্যু, পুনরুত্থান—এই তিনটি সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। তাই মুমিনের হৃদয় যখন এই আয়াত পড়ে, তখন সে বুঝে যায়: জীবন কোনো এলোমেলো যাত্রা নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত সীমার ভিতর দিয়ে একদিন শুরু হওয়া, একদিন শেষ হওয়া, এবং একদিন আবার উঠিয়ে নেওয়া। ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য যে সালাম ঘোষণা করা হয়েছে, তা কেবল তাঁর মর্যাদার চিহ্ন নয়; তা আমাদেরও স্মরণ করিয়ে দেয় যে আল্লাহ যাকে চান, তাঁকে দুনিয়ার লাঞ্ছনা থেকে আখিরাতের সম্মান পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেন। তাঁর রহমত মানুষের ধারণার চেয়েও প্রশস্ত, আর তাঁর প্রতিশ্রুতি মৃত্যুর পরেও জীবন্ত।
তাই এই আয়াত হৃদয়ে এক অদ্ভুত কাঁপুনি জাগায়—কখনো মমতা হয়ে, কখনো ভয় হয়ে, কখনো আশা হয়ে। কারণ আমরা জানি, একদিন আমাদেরও জন্মের মতোই একা হতে হবে, মৃত্যুর মতোই নিঃশব্দ হতে হবে, আর পুনরুত্থানের মতোই অনিবার্যভাবে দাঁড়াতে হবে। সেইদিন যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম না থাকে, তবে কে বাঁচাবে? আর যদি তাঁর রহমত থাকে, তবে কিসের ভয়? সূরা মারইয়ামের এই আয়াত আমাদের শেখায়, নবীদের স্মৃতি কেবল ইতিহাস নয়; তা আখিরাতের প্রস্তুতির আহ্বান। আল্লাহর শান্তি যার ওপর নাযিল হয়, সে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী শোরগোলে হারায় না; সে রবের স্মরণে বেঁচে থাকে, এবং রবের সামনে ফিরে যাওয়ার দিনকে ভয় নয়, বরং ভরসার সঙ্গে স্মরণ করে।

ওয়া সালামুন আলাইহি—এই বাক্যটি যেন শুধু ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য নয়, বরং মানবহৃদয়ের ভেতরে গেঁথে থাকা ভয় আর অস্থিরতার ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রশান্তিকর হাত রাখে। জন্মের মুহূর্ত, মৃত্যু-যন্ত্রণার দ্বার, আর পুনরুত্থানের বিস্ময়—এই তিনটি জায়গায় মানুষ সাধারণত আশ্রয় খোঁজে, অথচ কোথাও স্থির হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এখানে দেখিয়ে দিলেন, যাকে তিনি মর্যাদা দিতে চান, তাকে জীবনের সবচেয়ে নাজুক তিন সন্ধিক্ষণেও নিরাপত্তা দেন। এই সালাম এক নবীর জন্য বিশেষ সম্মান, আবার মুমিনের অন্তরে একটি গভীর শিক্ষা: আল্লাহর রহমত এমন, যা সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তকেও আসমানী আশ্বাসে ভরে দিতে পারে।

আমাদের সমাজ জন্মকে উদযাপন করে, মৃত্যুকে আড়াল করে, আর পুনরুত্থানকে ভুলে যেতে চায়; ফলে মানুষ বাইরের আলোয় হাসে, কিন্তু ভেতরে অনিশ্চয়তার অন্ধকার বহন করে। সূরা মারইয়ামের এই আয়াত সেই ভাঙা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন শেষ কথা নয়, মৃত্যু হারানোর নাম নয়, আর কিয়ামত কেবল ভয়াবহতা নয়—ঈমানের জন্য তা আল্লাহর সামনে ফিরে দাঁড়ানোর দিন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম থেকে মারইয়াম আলাইহাস সালাম, আর ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত যে ধারাবাহিক স্মৃতি এখানে বোনা হয়েছে, তা আমাদের শেখায়: আল্লাহর নেক বান্দাদের জীবন কেবল ইতিহাস নয়, আত্মশুদ্ধির আয়না।

তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে নিজের জীবনকে প্রশ্ন করতে হয়—আমার জন্ম কি আমাকে কৃতজ্ঞ করেছে, মৃত্যু কি আমাকে প্রস্তুত করেছে, আর পুনরুত্থান কি আমার হৃদয়ে জাগরণ এনেছে? যে অন্তর আজ আল্লাহকে ভুলে আছে, তার জন্যও তওবার দরজা খোলা; যে আত্মা পাপের ভারে ক্লান্ত, তার জন্যও রহমতের ডাক অব্যাহত। ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য ঘোষিত সালাম আমাদের কানে বলে, আল্লাহ চাইলে অন্ধকারের ভেতরেও শান্তি নামাতে পারেন, আর বান্দাকে এমন নিরাপত্তা দিতে পারেন যা দুনিয়ার কোনো বাহু দিতে পারে না। সুতরাং যে চোখ আজ অশ্রুসিক্ত, যে বুক আজ শঙ্কিত, সে যেন এই আয়াতের দিকে ফিরে বলে—হে রব, আমার জন্মে, আমার মৃত্যুর দ্বারে, এবং আমার পুনরুত্থানের সকালে তুমিই আমার সালাম, তুমিই আমার আশ্রয়।

এই আয়াতের শেষে এসে হৃদয় আরেকবার স্থির হয়ে যায় না; বরং আরও বেশি কেঁপে ওঠে। কারণ জন্মের দিন, মৃত্যুর দিন, আর পুনরুত্থানের দিন—এগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা তিনটি দিগন্ত, যেখানে আমাদের সমস্ত অহংকার ভেঙে পড়ে। আল্লাহ তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্য এই তিন মহাদিনেই “সালাম” ঘোষণা করেছেন; যেন বুঝিয়ে দেন, যাঁর হাতে জীবন শুরু, যাঁর হাতে জীবন শেষ, আর যাঁর হাতে আবার জীবন জেগে ওঠে—তাঁর রহমতই ভয়কে অতিক্রম করতে পারে। মানুষ দুনিয়ায় যতই শক্ত দেখাক, কবরের সীমানায় পৌঁছালে সে নিঃসঙ্গ; কিন্তু আল্লাহর শান্তি যার সঙ্গে থাকে, সে অন্ধকারেও হারিয়ে যায় না।
সূরা মারইয়াম আমাদের শেখায়, নবীদের স্মৃতি শুধু ইতিহাসের পাতায় রাখার বিষয় নয়; তা আত্মাকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। যাকারিয়া আলাইহিস সালামের দোয়া, মারইয়াম আলাইহাস সালামের পবিত্রতা, ঈসা আলাইহিস সালামের সম্মান—সব মিলিয়ে এই সূরায় রহমতের এমন এক আবহ, যেখানে বান্দা বুঝে যায় আল্লাহর দয়ার দরজা মানুষের ধারণার চেয়েও প্রশস্ত। কিন্তু সেই দয়ার আলোই আবার আখিরাতকে স্মরণ করায়। কারণ যাঁর জন্য জন্ম, মৃত্যু ও পুনরুত্থানে সালাম লেখা আছে, তাঁর রবই আমাদেরও সেই দিনগুলোর জন্য প্রস্তুত হতে ডাকছেন।
তাই আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরকে একবার জিজ্ঞেস করতে হয়: আমার জন্মের উদ্দেশ্য কী, আমার মৃত্যুর প্রস্তুতি কোথায়, আর আমার পুনরুত্থানের জন্য আমি কী জমা করছি? যে হৃদয় আজ দুনিয়ার শব্দে ভরা, সে কবরের নীরবতায় হঠাৎ কেঁপে উঠবে। কিন্তু যে হৃদয় আল্লাহর কাছে নত হয়েছে, সে বলবে: হে রব, তুমি আমাকে তোমার সালামের ছায়ায় রেখো, আমার গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহগুলো মাফ করো, আমার মৃত্যুকে সহজ করো, আর পুনরুত্থানের দিন আমাকে তোমার রহমতের মধ্যে দাঁড় করিও। সূরা মারইয়ামের এই শেষ প্রতিধ্বনি আমাদের কানে শুধু কাহিনি নয়, তওবার ডাক হয়ে থাকুক।