ধন, সন্তান, অর্জন, পরিচিতি—এসবই মানুষের জীবনে এক ধরণের ঝিলিক আনে। ঘর আলোকিত হয়, মুখে হাসি আসে, সমাজে অবস্থান বাড়ে; কিন্তু এই সবই শেষ পর্যন্ত দুনিয়ার সাজসজ্জা, ক্ষণিকের অলংকার। সূরা আল-কাহফের এই আয়াত আমাদের সামনে এক নির্মম-সুন্দর সত্য তুলে ধরে: যা চোখে সবচেয়ে উজ্জ্বল মনে হয়, তা-ই সবসময় আত্মার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান নয়। আল্লাহ তাআলা যেন হৃদয়কে জাগিয়ে বলছেন, তুমি যদি কেবল যা দেখা যায়, যা ধরা যায়, যা মুহূর্তে মুগ্ধ করে—সেইখানেই ভরসা খুঁজো, তবে তুমি বিভ্রান্ত হবে।
এই সূরার সামগ্রিক ধারার সঙ্গে এই কথার এক গভীর মিল আছে। গুহাবাসীদের কাহিনি আমাদের শেখায় সংখ্যার চেয়ে ঈমান বড়; মুসা ও খিজিরের ঘটনায় শেখা যায়, বাহ্যদৃষ্টি সব সত্য ধরতে পারে না; যুলকারনাইনের বর্ণনায় ফুটে ওঠে ক্ষমতার পেছনে দায়িত্ব; আর দাজ্জালের ফিতনা-সতর্কতা মনে করিয়ে দেয়, মানুষকে সবচেয়ে বেশি ঠকায় মায়ার জাল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত যেন দুনিয়ার বড় বড় জিনিসকে তাদের প্রকৃত আসনে বসায়: ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, প্রতিপত্তি—সবই নিয়ামত, কিন্তু এগুলো হৃদয়ের কিবলা হতে পারে না। এগুলো হাতে থাকতে পারে, কিন্তু অন্তরে রাজত্ব কেবল আল্লাহর জন্য।
আর আল্লাহ তাআলা যখন বলেন, স্থায়ী সৎকর্মসমূহ তাঁর কাছে প্রতিদানে এবং আশায় উত্তম, তখন তিনি আমাদের জীবনের মানদণ্ড বদলে দেন। এখানে ‘বাকি’ কাজগুলো মানে এমন আমল, যা আল্লাহর জন্য হয়, তাঁর স্মরণে বাঁচে, তাঁর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়—যে আমল সময়ের ধুলোতে মুছে যায় না, মনের অন্ধকারে হারিয়ে যায় না, কবরের নিঃসঙ্গতাতেও সঙ্গ দেয়। এই আয়াত কোনো নির্দিষ্ট, সুপ্রমাণিত একটি ঘটনার সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মক্কি সূরার সেই বৃহৎ নৈতিক শিক্ষা, যেখানে মুমিনকে বলা হচ্ছে—দুনিয়ার জৌলুস দেখেই দিশাহারা হয়ো না, কারণ একদিন সব ঝরে যাবে, কিন্তু আল্লাহর জন্য করা নীরব সিজদা, একটি সদয় কথা, একটি গোপন দান, একটি সত্যিকারের তওবা—এসবই আখিরাতের পথে জমা হতে থাকবে।
ধন মানুষকে ঘিরে রাখে, সন্তান মানুষকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়, সাফল্য মানুষকে নিজের চোখে বড় করে তোলে—কিন্তু কুরআন এখানে মৃদু অথচ অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠে বলে দেয়, এগুলো দুনিয়ার সৌন্দর্য মাত্র, দুনিয়ার অলংকার মাত্র। অলংকার জিনিসকে সুন্দর করে, কিন্তু অস্তিত্বকে স্থায়ী করে না। আজ যা হৃদয়কে টানে, কাল তা হাতছাড়া হতে পারে; আজ যার জন্য গর্ব জন্মায়, কাল তা পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই আয়াত আমাদের সম্বোধন করে—তুমি যা অর্জন করেছ, তার মধ্যে ডুবে যেও না; কারণ যা আল্লাহর জন্য নয়, তা সময়ের স্রোতে মিলিয়ে যাবে।
অতএব স্থায়ী সৎকর্মই সেই সম্বল, যা চোখে হয়তো তেমন ঝলমল করে না, কিন্তু আল্লাহর কাছে তার ওজন আছে, গ্রহণযোগ্যতা আছে, আর এমন এক ভবিষ্যৎ আছে যা মৃত্যুও কেড়ে নিতে পারে না। মানুষ অনেক কিছু জমায়, কিন্তু সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যা—তা হলো একনিষ্ঠ সিজদা, একটিমাত্র সত্য কথা, গোপনে করা একটুকরো দান, ভাঙা হৃদয়ে উচ্চারিত এক দোয়া, কারও উপকারে নীরবে এগিয়ে যাওয়া একটি হাত। এই আয়াত যেন আত্মাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি এমন কিছু সঞ্চয় করছ, যা কবর পর্যন্ত সঙ্গী হবে? নাকি কেবল এমন কিছু, যা দুনিয়ার দরজায় পৌঁছে শেষ হয়ে যাবে?
ধন-সম্পদ আর সন্তান-সন্ততি—এগুলো আল্লাহর দেওয়া দুনিয়ার সৌন্দর্য, অস্বীকার করার মতো নয়; কিন্তু এই সৌন্দর্যই যদি হৃদয়ের কেবলা হয়ে ওঠে, তবে মানুষ অজান্তেই বন্দী হয়ে যায় এক ঝলমলে কারাগারে। সুরা আল-কাহফের ধারায় এই আয়াত যেন আমাদের কানে কানে বলে, গুহাবাসীদের মতো ঈমানের মূল্য সংখ্যা দিয়ে মাপো না, মুসা-খিজিরের মতো বাহ্যিক দৃশ্যকে চূড়ান্ত সত্য ভেবো না, আর যুলকারনাইনের মতো ক্ষমতাকেও দুনিয়ার অলংকারের বাইরে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখো। যা চোখে পড়ে তা সব নয়; যা আত্মাকে বাঁচায়, সেটাই সত্যিকারের সম্পদ।
মানুষ কত কিছু জড়ো করে—অর্থ, প্রভাব, সন্তান, নাম, নিরাপত্তা—তবু অন্তরের গভীরে এক অদৃশ্য শূন্যতা থেকে যায়, কারণ দুনিয়ার সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। আজ যে ঘর আলোয় ভরা, কাল তা নীরব হতে পারে; আজ যে সন্তানকে শক্তি ভেবে বুক চওড়া হয়, কাল সে-ই এক পরীক্ষায় হৃদয় ভেঙে দিতে পারে; আজ যে সম্পদকে স্থায়িত্ব মনে হয়, কাল তা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। আর এ কারণেই আল্লাহ বলেন, স্থায়ী সৎকর্মই উত্তম। নামাজ, যিকির, সদকা, সত্যবাদিতা, ধৈর্য, ক্ষমা, ন্যায়, তাওবা, গোপন ইখলাস—এগুলোই সেই আমল, যা মুছে যায় না; বরং কিয়ামতের অন্ধকারে মুমিনের জন্য আলো হয়ে ওঠে।
এই আয়াত মানুষের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাই, যেখানে মূল্যবান মনে হয় যা দেখা যায়, যা গোনা যায়, যা প্রদর্শন করা যায়; অথচ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হতে পারে এমন কিছু, যা মানুষ দেখে না—কাঁপতে থাকা হৃদয়ে গোপনে করা এক সিজদা, ক্ষোভের মুখে সংযত থাকা এক জিহ্বা, অভাবের রাতে নিঃশব্দে দেওয়া এক দান। তাই নিজের হিসাব নিজে নাও: আমি কী জমাচ্ছি, আর কী পাঠাচ্ছি আখিরাতের দিকে? ধন ও সন্তান আনন্দের উপকরণ হতে পারে, কিন্তু ভরসার আসন নয়। ভরসা সেই রবের ওপর, যাঁর কাছে স্থায়ী সৎকর্মের প্রতিদান সবচেয়ে উত্তম, আর ভবিষ্যতের আশা সবচেয়ে নিরাপদ।
কখনো মানুষ নিজের সঞ্চয় দেখে নিশ্চিন্ত হয়, কখনো সন্তানকে দেখে ভবিষ্যতের ভরসা বানায়, কখনো নিজের অর্জনকে স্থায়িত্বের মতো মনে করে। কিন্তু সূরা আল-কাহফের সুর আমাদের স্মরণ করায়—দুনিয়ার ফিতনা কেবল ভয়ঙ্কর নয়, খুব সুন্দরও হতে পারে। তাই ধন-সন্তানকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাদের আসল স্থান বুঝে নেওয়াই ঈমান। এগুলো নিয়ামত, কিন্তু এগুলোর ছায়ায় হারিয়ে গেলে মানুষ নিজের রবকে ভুলে যায়; আর রবকে স্মরণ রেখে এগুলো ব্যবহার করলে, সেগুলোও আখিরাতের পাথেয় হয়ে যায়।
আর যে জিনিস স্থায়ী, তা হয়তো দৃষ্টিতে ছোট—একটি ইখলাসের সিজদা, একটি গোপন সদকা, একটি অশ্রুভেজা তাওবা, একটি সত্য কথা, একটি সহনশীলতা, একটি আল্লাহমুখী হৃদয়। এটাই الباقيات, যা ক্ষয়ে যায় না, যা কবরের মাটি ঢেকে দিতে পারে না, যা কিয়ামতের ভিড়ে মুছে যায় না। তাই আজ যদি কিছু হারানোর ভয় থাকে, তবে শুধু এই ভয়টুকু থাকুক—আমি যেন দুনিয়ার অলংকারে মুগ্ধ হয়ে আখিরাতের সম্বল হারিয়ে না ফেলি। হে আল্লাহ, আমাদের চোখকে ধন-সন্তানের মোহ থেকে বাঁচান, আর হৃদয়কে এমন সৎকর্মের দিকে ফিরিয়ে দিন, যা আপনার কাছে উত্তম প্রতিদান ও উত্তম আশার কারণ।