আল্লাহ কি তাদের দেখেন না?—এই প্রশ্নের ভেতরে তিরস্কার আছে, আছে জাগরণের আহ্বানও। যিনি আসমান ও যমিনকে শূন্য থেকে অস্তিত্ব দিলেন, তাঁর কাছে মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করা কি দুরূহ কোনো ব্যাপার? সূরা আল-ইসরার এই আয়াত আমাদের চোখের সামনে সৃষ্টিজগতের বিশালতা এনে দাঁড় করায়, তারপর খুব শান্ত কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ভঙ্গিতে বলে দেয়: যে শক্তি মহাবিশ্বকে তুলে ধরতে পারে, সে-ই শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত দেহকেও নতুন করে জাগাতে পারে। মানুষের অহংকার এখানে ভেঙে পড়ে; কারণ যে নিজেকে বড় মনে করে, সে-ও আসলে মহান স্রষ্টার ক্ষমতার সামনে এক মুঠো মাটির চেয়ে বেশি কিছু নয়।

এই আয়াতে আরও আছে একটি ভীতিপ্রদ সত্য: আল্লাহ মানুষের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করেছেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ এই জীবন এলোমেলো নয়, এই শ্বাস-প্রশ্বাসেরও হিসাব আছে, এই যাত্রারও শেষ আছে। কার কখন বিদায় হবে, তা মানুষের জ্ঞানের বাইরে; কিন্তু সবার জন্যই যে একটি নির্ধারিত কাল আছে, তা নিশ্চিত। এ কথাই হৃদয়কে নরম করে, নফসকে কাঁপিয়ে দেয়, আর অলস জীবনকে ধাক্কা দেয়—কারণ মৃত্যু শুধু শেষ নয়, তা জবাবদিহির দোরগোড়াও। যারা অন্যায়কে আঁকড়ে ধরে, তারা এই সত্যের সামনে এসে সত্যকে মানে না; তাই আয়াতের শেষভাগে বলা হয়েছে, জালেমরা অস্বীকার ছাড়া কিছুই করেনি। তাদের সমস্যা প্রমাণের অভাব নয়, তাদের সমস্যা হৃদয়ের অন্ধকার।

সূরা আল-ইসরা মক্কী সূরা; এর ধারাবাহিকতায় তাওহিদ, আখিরাত, নৈতিক বিধান, পরিবার ও সমাজের শৃঙ্খলা—সবই এক মহৎ সুরে বাঁধা। এখানে পুনরুত্থানের যুক্তি কেবল দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর নয়, বরং মানবজীবনের নৈতিক ভিত্তি। যদি আমরা জানি যে ফেরত যাওয়ার একটি দিন আছে, তবে জুলুম, অহংকার, অবাধ্যতা আর দায়িত্বহীনতা আর নিরীহ থাকে না। এই আয়াত তাই শুধু মৃতদের পুনর্জীবনের ঘোষণা নয়; এটি জীবিতদের অন্তরকে জাগিয়ে তোলার ডাক। আসমান-যমিনের স্রষ্টা যখন বলেন, “আমি তোমাদের জন্য একটি সময় নির্ধারণ করেছি,” তখন আসলে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—প্রতিটি অবহেলারও, প্রতিটি অন্যায়েরও, প্রতিটি তওবারও একটি বাস্তব মূল্য আছে।

মানুষ কত দ্রুত ভুলে যায়—তার চোখে দেখা আকাশ, তার পায়ে চেপে থাকা পৃথিবী, তার বুকের ভেতর ধুকধুক করা প্রাণ—সবই এক অসীম কুদরতের নিদর্শন। যে আল্লাহ এই আসমান-যমিনকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর কাছে মানুষকে আবার সৃষ্টি করা কোনো দূরাশা নয়। মৃত্যু যাকে ছিন্ন করে, কিয়ামত তাকে জোড়া লাগাতে পারে না—এ কথা মানুষের অহংকারের, কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতার সামনে তা ধুলোর মতো উড়ে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের শুধু আখিরাতের কথা শোনায় না; এটি আমাদের অন্তরের মিথ্যা নিরাপত্তাকে ভেঙে দেয়, যেন আমরা বুঝি—যে স্রষ্টা প্রথমবার আনলেন, তাঁর কাছে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে আনা আরও সহজ, আর সেই ফিরিয়ে আনা থেকেই শুরু হবে চূড়ান্ত হিসাব।

এখানে আরও আছে সময়ের কঠিন সত্য। আল্লাহ মানুষের জন্য একটি নির্ধারিত কাল রেখেছেন, যার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের জীবন যে অনির্দিষ্ট নয়, এই শ্বাস যে চিরস্থায়ী নয়, এই দেহ যে অবিনশ্বর নয়—এ কথা যত গভীরভাবে হৃদয়ে নামে, ততই দুনিয়ার মোহ পাতলা হয়ে আসে। মানুষ ভাবে, সময় তার হাতে; অথচ সময়ই তাকে নিঃশব্দে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। একেকটি সকাল, একেকটি বিকেল, একেকটি রাত আমাদেরকে সেই অদেখা সীমার দিকে এগিয়ে দেয়, যেখানে আর পেছনে ফেরা নেই। তাই ঈমান মানে কেবল বিশ্বাস নয়—ঈমান মানে জেগে থাকা, নিজের সীমা জানা, এবং সেই নির্ধারিত দিনের জন্য অন্তরকে প্রস্তুত করা।
আর যখন এই প্রস্তুতি থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন জুলুমের রংই ফুটে ওঠে। জালেমরা অস্বীকার ছাড়া আর কিছুই করে না—এ বাক্য যেন মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার শেষ পর্দাটিও সরিয়ে দেয়। সত্যের সামনে নতি স্বীকার না করে তারা অস্বীকারকে আশ্রয় করে, কারণ স্বীকার করলেই বদলাতে হবে, জবাবদিহির সামনে দাঁড়াতে হবে, নৈতিকতার কঠিন পথে ফিরতে হবে। কিন্তু অস্বীকারের এই কণ্ঠস্বরও নির্ধারিত কালের দেয়ালে আটকে থাকবে। সূরা আল-ইসরার এই আয়াত আমাদের বলে: জীবনকে হালকা ভাবো না, কারণ এর পেছনে আখিরাত দাঁড়িয়ে আছে; অন্যায়কে সাধারণ মনে করো না, কারণ এর শেষে জবাব আছে; আর আল্লাহকে ছোট ভাবো না, কারণ তিনি আসমান-যমিনেরও স্রষ্টা, মানুষের পুনরুত্থানও তাঁর জন্য ততটাই সম্ভব যতটা প্রথম সৃষ্টি ছিল।

আল্লাহর সৃষ্টির দিকে তাকালে মানুষের সব অজুহাত ভেঙে যায়। যিনি আসমান ও যমিনকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর কাছে মৃত মানুষকে আবার জীবন্ত করা কোনো বিস্ময় নয়—বরং তাঁর ক্ষমতারই আরেক প্রকাশ। এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিয়ামত কোনো কল্পনা নয়, পুনরুত্থান কোনো দূরের গল্প নয়; বরং সেই মহান রবের অনিবার্য প্রতিশ্রুতি, যাঁর ইচ্ছার সামনে প্রথম সৃষ্টি যেমন সত্য, পুনরায় সৃষ্টি হওয়াও তেমনি সত্য। মানুষ নিজের দেহের ক্ষয় দেখে দুর্বলতা ভাবে, কিন্তু আল্লাহর কুদরতের সামনে ক্ষয়ও শুধু আরেকটি অবস্থা, অক্ষমতা নয়।

আর এই আয়াতের মধ্যে আছে আখিরাতের শীতল অথচ জাগানিয়া স্মরণ—আল্লাহ তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় স্থির করেছেন, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ জীবন এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে নেই; প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি গোপন পাপও একটি নির্ধারিত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষ কত পরিকল্পনা করে, কত আয়ু ধরে, কত নিরাপত্তা বানায়; অথচ আসল নিরাপত্তা একমাত্র সেই রবের হাতে, যিনি সময়কে নিজেই সীমিত করেছেন। এই নির্ধারিত কাল জানিয়ে দেয়, এখনো ফিরে আসার সুযোগ আছে, হিসাবের আগে নিজেকে শোধরে নেওয়ার সময় আছে—কিন্তু সে সময় চিরস্থায়ী নয়।

তারপর আয়াতটি কঠোর এক সত্য উচ্চারণ করে: জালেমরা অস্বীকার ছাড়া আর কিছুই বেছে নেয়নি। জালেম শুধু অন্যের প্রতি অবিচারকারী নয়; জালেম সেই হৃদয়ও, যে সত্যকে জেনেও অহংকারে নত হয় না, যে নসিহত শুনেও নিজের পথ ছাড়ে না। সমাজ যখন এ ধরনের অস্বীকারে ভরে যায়, তখন পরিবারে, বাজারে, রাষ্ট্রে, অন্তরে সবখানে ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। তাই এই আয়াত আমাদের ডাক দেয়—নিজের নফসকে প্রশ্ন করো, তুমি কি সেই নিশ্চিত আখিরাতের জন্য প্রস্তুত? তুমি কি আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর দিনটির জন্য অন্তরকে সচ্ছ করতে পারছ? যে হৃদয় আজ সত্যের কাছে নত হয়, তার জন্য সে দিন ভয় নয়; আর যে হৃদয় আজও অস্বীকারে শক্ত হয়ে থাকে, তার জন্য সে দিনই হবে চরম পরাজয়ের শুরু।

মানুষ কত সহজে নিজেকে স্থায়ী ভেবে বসে। অথচ এই আয়াত এসে বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভ্রান্তি সরিয়ে দেয়—আসমান ও যমিনের স্রষ্টা যখন আছেন, তখন পুনরুত্থান কী এমন অবিশ্বাস্য কথা? আমরা যে দেহকে দুর্বল, ক্ষয়মান, মাটির দিকে ফেরার জন্য প্রস্তুত এক আশ্রয়মাত্র মনে করি, আল্লাহর কাছে তা আবার গঠিত হওয়া কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়। বিস্ময়টা আল্লাহর ক্ষমতায় নয়; বিস্ময়টা মানুষের অহংকারে। সে দেখে, তবু ভাবে না; জানে, তবু নরম হয় না। তাই কুরআন বলছে—জালেমরা সত্যকে অস্বীকার ছাড়া আর কিছুই বেছে নেয়নি।

আরও ভীতিকর হলো এই সত্য যে, আমাদের সবার জন্যই একটি নির্ধারিত কাল আছে, যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মৃত্যু হঠাৎ নয়; মৃত্যু অবিচার নয়; মৃত্যু সেই সুনির্দিষ্ট দরজার নাম, যার সামনে পৌঁছালে কোনো দাবি, কোনো প্রাচুর্য, কোনো সম্পর্ক, কোনো প্রভাব কাজে আসে না। আজ যে মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করছে, কাল হয়তো সে-ই হিসাবের সামনে দাঁড়িয়ে যাবে। তাই এই আয়াত আমাদের ভাঙতে আসে, আবার জোড়াও দেয়—গুনাহের জেদ ভাঙে, তাওবার দরজা খুলে দেয়, আর অন্তরে এক নরম ভয় জাগিয়ে তোলে: আমি কোথায় যাচ্ছি, আর আল্লাহর সামনে কী নিয়ে দাঁড়াব?