সূরা আল-ইসরা’র এই আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা এক গভীর সত্য উচ্চারণ করেন: প্রত্যেক মানুষই তার নিজের শাকিলাহ বা অন্তর্গত রীতি, স্বভাব, অভ্যাস, ঝোঁক ও অভিমুখ অনুযায়ী কাজ করে। কারও হৃদয় যদি সত্যের দিকে নরম হয়, তার পদক্ষেপও সত্যের দিকে এগোয়; আর কারও অন্তর যদি অহংকার, কামনা বা গাফলতের দ্বারা বাঁকিয়ে যায়, তার কর্মও সেই বাঁকেই গড়ে ওঠে। এই আয়াত মানুষের বাহ্যিক আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্তরের জগতকে সামনে এনে দেয়। মানুষকে কেবল কাজের দৃশ্যমান রূপে নয়, তার ভেতরের গতি-প্রকৃতি, তার ভালোবাসা-ঘৃণা, তার চাওয়া-পাওয়া এবং তার আত্মিক দিকনির্দেশনার মধ্য দিয়ে বোঝার শিক্ষা দেয়।
এখানে এক অদ্ভুত সতর্কতা আছে: মানুষ নিজের প্রবণতাকে খুব সহজে ন্যায় বলে ভাবতে পারে। সে যে পথে হাঁটে, সেটাকেই সে অভ্যাসের ছদ্মবেশে স্বাভাবিক বলে দাবি করে। কিন্তু কুরআন বলছে, আসল মানদণ্ড মানুষের নিজের দাবি নয়; আসল মানদণ্ড আল্লাহর জানা। তিনি জানেন কে সত্যপথে বেশি দৃঢ়, কে অধিক সোজা, কে অন্তরে হিদায়তের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে, আর কে নিজের কামনা-আসক্তির সঙ্গে। তাই এই আয়াত আমাদের অহংকার ভেঙে দেয় এবং আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়। নিজের চরিত্রকে শুধু ‘আমি এমনই’ বলে স্থির করে রাখা নয়, বরং ‘আমার অন্তর কোন দিকে ঝুঁকছে?’—এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোই মুমিনের কাজ।
এই সূরার বৃহত্তর ধারায় মানুষকে কুরআনের হিদায়ত, দায়িত্ব, এবং আখিরাতের জবাবদিহির দিকে বারবার ফেরানো হয়েছে। এর আগে-পরের আয়াতগুলোতে কুরআনের আলো, নবুওয়াতের সত্যতা, এবং মানুষের প্রতিক্রিয়ার ভিন্নতা প্রসঙ্গ এসেছে; ফলে এই বাক্যটি শুধু ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বের কথা নয়, বরং একটি নৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও মনে করিয়ে দেয়। পরিবারে, সমাজে, এবং দ্বীনের পথে মানুষের আচরণ হঠাৎ তৈরি হয় না; তার ভেতরে জমে থাকা শাকিলাহই তাকে টানে। তাই কারও প্রতি তাড়াহুড়া করে চূড়ান্ত রায় দেওয়া মানবিক নয়, তবে নিজের অন্তরকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত করা অপরিহার্য। শেষ পর্যন্ত হিদায়তের পথ কারও কথায় নয়, অন্তরের সত্যিকারের অভিমুখে ধরা পড়ে; আর সেই অভিমুখ কে কতটা সঠিকভাবে পেয়েছে, তা একমাত্র রবই জানেন।
এই আয়াত আমাদের ভেতরের অদৃশ্য ভূগোলকে উন্মোচন করে। মানুষ শুধু কাজ করে না; মানুষ আসলে একেকটি অন্তর্গত অভিমুখ নিয়ে কাজ করে। তার চোখ, তার জিহ্বা, তার নীরবতা, তার পছন্দ-অপছন্দ—সবকিছুই কোনো না কোনো শাকিলাহর ছাপ বহন করে। তাই একই কথা কেউ শুনে নরম হয়, কেউ শুনে আরও শক্ত হয়; একই নসিহত কারও হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে, কারও হৃদয়ে শুধু প্রতিরোধের দেয়াল তোলে। বাহ্যিক কর্ম এক, কিন্তু অন্তরের গন্তব্য আলাদা। এভাবেই আল্লাহ আমাদের শেখান, মানুষের কৃতকর্মের পেছনে তার গোপন গঠন, তার ভেতরের স্বভাব, তার অদৃশ্য ঝোঁকও বড় এক বাস্তবতা। ঈমান শুধু মুখের ঘোষণা নয়; তা হৃদয়ের দিকনির্দেশ। আর গোমরাহীও কেবল ভুল তথ্যের ফল নয়; অনেক সময় তা হয় অহংকারে পাথর হয়ে যাওয়া অন্তরের ফল।
এই আয়াত আমাদের আখিরাত-চেতনা জাগিয়ে দেয়। দুনিয়ায় মানুষ নিজের রীতি অনুযায়ী চলতে পারে, নিজের পছন্দকে স্বাভাবিক বলতে পারে, নিজের ভুলকেও অভ্যাসের নাম দিতে পারে; কিন্তু শেষ বিচারে একমাত্র আল্লাহই জানবেন কে ছিল সত্যের পথে অধিক সোজা। সেদিন বাহ্যিক শোভা নয়, অন্তরের অভিমুখ প্রকাশ পাবে। সেদিন প্রমাণ হবে—মানুষের সবচেয়ে বড় পুঁজি ছিল তার হৃদয়ের দিক, তার রবের প্রতি ঝোঁক। তাই আজই প্রয়োজন নিজের শাকিলাহকে কুরআনের সামনে সোপর্দ করা; যাতে মানুষ তার প্রবণতার দাস না থাকে, বরং আল্লাহর হিদায়তের বান্দা হয়ে ওঠে।
মানুষের জীবন কেবল কাজের তালিকা নয়; তা আসলে অন্তরের একটি নীরব মানচিত্র। কে কোন দিকে মুখ করে আছে, কে কোন বাসনাকে সত্যের আসনে বসিয়েছে, কে কোন অভ্যাসকে নিজের পরিচয় বানিয়েছে—এসবই তার শাকিলাহ। তাই কুরআনের এই বাক্য আমাদের ভেতরে এক অদ্ভুত আয়না তুলে ধরে। আমরা অনেক সময় নিজের চলাকে সঠিক ভাবি, কারণ তা আমাদের কাছে পরিচিত, দীর্ঘদিনের, স্বাভাবিক। কিন্তু পরিচিত হওয়া আর সত্য হওয়া এক জিনিস নয়। অভ্যাস অনেক সময় মানুষের অন্তরে এমন শিকড় গেড়ে বসে যে সে নিজেকে আর পরিবর্তনশীল মনে করে না; অথচ আল্লাহর সামনে হৃদয়ও জবাবদিহির অধীন, স্বভাবও সংশোধনের অধীন।
এই আয়াত সমাজকেও এক নির্মম কিন্তু কল্যাণকর সত্য শোনায়। মানুষ যখন নিজের প্রবণতার বন্দি হয়ে পড়ে, তখন পরিবারে জেদ বাড়ে, সম্পর্কে কঠোরতা নামে, সমাজে পক্ষপাত জন্ম নেয়, আর ন্যায়ের ভাষা ক্ষীণ হয়ে যায়। কেউ নিজের রাগকে ন্যায্যতা দেয়, কেউ প্রবৃত্তির দাবি দিয়ে অন্যায়কে ঢেকে ফেলে, কেউ দল-পরিচয়কে সত্যের চেয়ে বড় করে দেখে। কিন্তু আল্লাহ জানেন কে সত্যিই সোজা পথে আছে। মানুষের মুখোশ, যুক্তি, সুনাম, কিংবা বাহ্যিক ধার্মিকতা—কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। এ কারণেই এই আয়াত মুমিনের অন্তরে ভয় জাগায়, আবার আশা-ও জাগায়: যদি আমার ভিতর বাঁকা হয়, রব তা জানেন; আর যদি আমার ভাঙা হৃদয় সত্যের দিকে ফিরতে চায়, রব তাও জানেন।
তাই এই আয়াত আমাদেরকে আত্মসমালোচনার দরজায় দাঁড় করায়। আমার রীতি কি আমাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাচ্ছে, না ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দিচ্ছে? আমার স্বভাব কি কুরআনের আলোতে নরম হচ্ছে, না গুনাহের অন্ধকারে শক্ত হয়ে উঠছে? শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক আত্মাই তার অভিমুখ নিয়ে ফিরে যাবে সেই রবের দিকে, যিনি কেবল কাজ দেখেন না, কাজের পেছনের ঝোঁকও দেখেন। সুতরাং হিদায়ত চাইতে লজ্জা নেই, পরিবর্তন চাইতে অপমান নেই। বরং সত্য হলো—নিজের শাকিলাহকে আল্লাহর সামনে ভেঙে দিয়ে নতুন করে গড়ার সাহসই মুমিনের বড় ইবাদত। কারণ যে নিজের ভেতরকে সংশোধন করে, সে আসলে আখিরাতের পথটিকেই মসৃণ করে।
এই আয়াত আমাদের চোখ ফিরিয়ে দেয় মানুষের বাহ্যিক সাফল্য থেকে অন্তরের আসল দিকনির্দেশনার দিকে। আমরা অনেক সময় কাউকে তার কথায়, তার সাজে, তার পরিচয়ে, এমনকি তার ধার্মিকতার দাবিতেও মেপে ফেলি; কিন্তু আল্লাহ তাআলা মাপেন অন্তরের শাকিলাহ—সে কিসের দিকে ঝুঁকে আছে, কোন জিনিস তাকে টানে, কোন সত্যকে সে ভালোবাসে, আর কোন নসিহতকে সে এড়িয়ে চলে। মানুষের পথচলা কেবল পা দিয়ে নয়, হৃদয়ের অদৃশ্য অভিমুখ দিয়ে নির্ধারিত হয়। তাই কেউ যখন বারবার সত্যের কাছাকাছি এসে আবার সরে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে শুধু তার জানা-শোনা নয়, তার অন্তরের নরম হওয়া কতটা বাকি রইল।
এখানেই আসে ভয় ও আশা—ভয়, কারণ আমি নিজেও নিজের ভালো লাগাকে সত্য ভেবে ভুল করতে পারি; আশা, কারণ শাকিলাহ পরিবর্তনহীন শিকল নয়, আল্লাহর হিদায়তে হৃদয়ের বাঁক সোজা হতে পারে। আজ যে মানুষ গাফলতের ঘুমে আছে, সে তাওবায় জেগে উঠতে পারে। আজ যে অন্তর কঠিন, সে যিকিরে নরম হতে পারে। আজ যে অভ্যাস তাকে নিচে টেনে নামাচ্ছে, সে ইচ্ছা করলে কুরআনের আলোয় তা ভাঙতে শুরু করতে পারে। আর শেষ বিচারে আমাদের সবার কৃতিত্বও একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে; তখন থাকবে শুধু আল্লাহর জানা, আমাদের ভেতরের সত্য অবস্থান, আর তাঁর ন্যায়বিচার। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায় আত্মপ্রশংসা কমাতে, নিজের ওপর ভরসা কমাতে, আর রবের কাছে বারবার বলতে: হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে এমন শাকিলাহ দাও যা তোমার পছন্দের দিকে ঝুঁকে থাকে, এবং আমার পথকে এমন সোজা করো, যাতে আমি শেষ পর্যন্ত তোমারই সামনে লজ্জাহীন হতে পারি।