সূরা আল-ইসরা’র এই আয়াত এক ভয়ংকর কিন্তু করুণ সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করায়: যে মানুষ এই দুনিয়ায় সত্যকে দেখতে অস্বীকার করে, যে হৃদয় আল্লাহর আয়াত, হেদায়েত, ন্যায় ও জবাবদিহির আলোকে নিজেকে খোলেনা, সে আখিরাতেও অন্ধত্বের আরও গভীর অন্ধকারে পড়ে যেতে পারে। এখানে অন্ধত্ব বলতে চোখের অক্ষমতা নয়; বরং অন্তরের অন্ধত্ব, বিবেকের নিস্তেজতা, সত্যের প্রতি উদাসীনতা, এবং গন্তব্যহীন জীবনের ভয়াবহ পরিণতি বোঝানো হয়েছে। দুনিয়ার জীবন হলো দেখা, বোঝা, চিন্তা করা, ফিরে আসা; আর যে এই পৃথিবীতেই সত্যের পথে চোখ বন্ধ করে রাখে, তার জন্য পরকালের পথ আরও বেশি বিপথে ঢলে পড়া স্বাভাবিক পরিণতি। আয়াতের ভাষা কঠিন, কারণ বিষয়টি নরম নয়—মানুষের অনন্ত গন্তব্য এখানে নির্ধারিত হচ্ছে।

এই আয়াতকে তার বৃহত্তর কুরআনিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সূরা আল-ইসরা বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে বনী ইসরাইলসহ সকল মানবসমাজের সামনে নৈতিক দায়িত্ব আছে: অহংকার, জুলুম, অবাধ্যতা, আর আত্মপ্রবঞ্চনা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এখানে কোনো নির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত একক কারণ-নুযুল বর্ণিত নয়; তবে সূরার সামগ্রিক সুর হলো সত্য ও মিথ্যার সংঘাত, হেদায়েত ও গাফিলতির পার্থক্য, এবং আল্লাহর হুকুমের সামনে মানুষের দায়বদ্ধতা। তাই এই আয়াত কেবল এক শ্রেণির মানুষের জন্য নয়; এটি প্রত্যেক যুগের সমাজের সামনে একটি আয়না—পরিবারে, রাষ্ট্রে, নৈতিকতায়, বিচারবোধে, এমনকি ধর্মীয় পরিচয়ের ভেতরেও যদি সত্যদৃষ্টি না থাকে, তবে বাহ্যিক চোখ খোলা থাকলেও অন্তর অন্ধ থেকে যায়। আখিরাতে সেই অন্ধত্ব আরও প্রকাশমান হয়ে উঠবে; কারণ সেখানে আর ভান, ব্যস্ততা, কিংবা দুনিয়ার পর্দা থাকবে না।

এই আয়াতের কঠোরতা আসলে আল্লাহর করুণারই আরেক রূপ। কারণ মানুষকে শেষ পরিণতির আগে সতর্ক করা—এটাই রহমত। দুনিয়ার অন্ধত্ব মানে শুধু সত্যের খবর না জানা নয়; বরং সত্য সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাকে না দেখা, ন্যায়কে চিনেও অগ্রাহ্য করা, নিজের অন্তরের আয়নায় জমে থাকা মলিনতাকে পরিষ্কার না করা। যে হৃদয় আল্লাহর নিদর্শন, কুরআনের আহ্বান, এবং জীবনের জবাবদিহির ডাক শুনেও নিস্তব্ধ থাকে, তার চোখ থাকলেও সে দেখে না; তার বুদ্ধি থাকলেও সে বোঝে না। এই অন্ধত্ব ধীরে ধীরে মানুষকে এমন এক ভেতরকার শূন্যতায় নিক্ষেপ করে, যেখানে পাপ স্বাভাবিক মনে হয়, অহংকার যুক্তির পোশাক পরে আসে, আর আত্মপ্রবঞ্চনা নৈতিকতার ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।

আখিরাতে এই অন্ধত্ব আরও ভয়াবহ রূপ নেয়, কারণ সেদিনের দৃশ্য আর ইচ্ছাধীন থাকবে না। দুনিয়ায় মানুষ চাইলে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, কিন্তু আখিরাতে সত্য থেকে পালানোর কোনো পথ থাকবে না; বরং যে অন্তর এখানে আলোককে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেখানে সে নিজেরই অন্ধকারের মুখোমুখি হবে। এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন কেবল অনুভবের নয়, সিদ্ধান্তেরও নাম; কেবল ভোগের নয়, দৃষ্টিরও নাম। যে দৃষ্টিতে আল্লাহ নেই, সেই দৃষ্টি যত তীক্ষ্ণই হোক, শেষ পর্যন্ত পথ হারায়। আর যে অন্তর বিনয়ের সঙ্গে হেদায়েত গ্রহণ করে, তার জন্য এই দুনিয়াই আখিরাতের আলো জ্বালানোর ময়দান হয়ে ওঠে।

এই আয়াত আমাদের হৃদয়ের দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন কিয়ামতের আগেই এক বিচার শুরু হয়ে গেছে। দুনিয়ার অন্ধত্ব শুধু তথ্যের অভাব নয়; কখনো তা অহংকারের পর্দা, কখনো লোভের ধুলো, কখনো গুনাহের দীর্ঘ অভ্যাস, কখনো সত্যের ডাককে উপেক্ষা করার ক্লান্ত অভ্যাস। মানুষ যখন নিজের ভেতরের আয়নাকে ভেঙে ফেলে, তখন বাইরের আলোও তার কোনো উপকার করে না। সে কুরআন শোনে, কিন্তু কুরআন তাকে নাড়িয়ে না; ন্যায় দেখে, কিন্তু ন্যায়ের কাছে ঝুঁকে না; মৃত্যু দেখে, কিন্তু জাগে না। এভাবেই হৃদয়ের উপর জমে ওঠে নীরব অন্ধকার, আর সেই অন্ধকার একদিন পরকালের পথে তার সঙ্গী হয়।

আখিরাতের অন্ধত্ব মানে শুধু শাস্তি নয়, গন্তব্যহীনতার চূড়ান্ত অপমানও। যে আত্মা দুনিয়ায় আল্লাহকে চিনতে চায়নি, সেই আত্মা আখিরাতে কোথায় যাবে? যে মন নিজের রবের সামনে নত হয়নি, সে সেখানে দাঁড়াবে কী ভরসায়? এই আয়াত ভয় দেখায়, কিন্তু সেই ভয় ধ্বংসের জন্য নয়; বরং ফিরে আসার জন্য। মানুষ যেন এখনই থামে, নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি সত্যিই দেখছি, নাকি শুধু দেখার ভান করছি? পরিবার, সমাজ, নৈতিকতা—সবকিছুই তখন ভেঙে পড়ে যখন মানুষ ভেতর থেকে অন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যে অন্তর আজই কাঁপে, যে চোখ আজই অশ্রুতে ভিজে ওঠে, তার জন্য তওবার দরজা খোলা। আল্লাহর দিকে ফেরা কখনো দেরি হয় না, যদি হৃদয় সত্যের আলো গ্রহণ করতে চায়।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষ শুধু চোখে দেখে না; সে হৃদয় দিয়েও দেখে। আর হৃদয়ের দৃষ্টি হারালে রাস্তাঘাট, যুক্তি, ক্ষমতা, সম্পদ—কিছুই তাকে বাঁচাতে পারে না। দুনিয়াতে যে সত্যের ডাকে সাড়া দেয় না, যে নিজের ভুলকে ভুল বলে মানতে শেখে না, যে আল্লাহর সামনে নত হতে অস্বীকার করে, তার ভেতরে এক ধরনের অন্ধকার ধীরে ধীরে জমতে থাকে। সেই অন্ধকার একদিন আখিরাতে গিয়ে আর কেবল পরিণতি হয় না, সেটিই হয়ে ওঠে শাস্তির আকার। তখন পথ থাকে, কিন্তু পথ চেনার শক্তি থাকে না; আলো থাকে, কিন্তু আলো গ্রহণের চোখ থাকে না।

তাই আজকের প্রশ্ন চোখের নয়, হৃদয়ের। আমি কি সত্যকে দেখছি? আমি কি নিজের গুনাহকে চিনছি? আমি কি কুরআনের সামনে নরম হচ্ছি, নাকি নিজের অহংকারকে বুদ্ধি বলে চালিয়ে দিচ্ছি? এই আয়াত আমাদের ভয় দেখায় শুধু শাস্তির জন্য নয়, জাগিয়ে তোলার জন্য। এখনো সময় আছে—অন্তরকে ধোয়ার, ভুল স্বীকার করার, তাওবার দরজায় ফিরে যাওয়ার। কারণ যে মানুষ দুনিয়ার অন্ধত্ব থেকে আল্লাহর রহমতে বেরিয়ে আসতে পারে, আখিরাতে তার জন্য আশা আছে। কিন্তু যে নিজেই নিজের চোখের ওপর পর্দা টেনে রাখে, তার জন্য পথ আরও দীর্ঘ, আরও কঠিন, আরও নিঃসঙ্গ। আল্লাহ যেন আমাদের অন্তর্দৃষ্টি দান করেন, আমাদের হৃদয়কে সত্যের সামনে বিনীত করেন, আর সেই ভয়ংকর অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করেন, যা মানুষকে তার চূড়ান্ত গন্তব্যেই পথহারা করে দেয়।