সূরা আল-ইসরার এই আয়াতে আল্লাহ এক ভয়ঙ্কর-সুন্দর সত্যকে সামনে আনেন: সময় কারও হাতে স্থির থাকে না। আজ যে জাতি দুর্বল, পরাজিত, ছিন্নভিন্ন; কাল আল্লাহ চাইলে তার দিকেই ফিরে যেতে পারে বিজয়ের দরজা, প্রতিপত্তির রাস্তা, শক্তির বিস্তার। “অতঃপর আমি তোমাদের জন্যে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুয়িয়ে দিলাম”—এই বাক্যে শুধু সামরিক সাফল্যের কথা নেই, আছে ইতিহাসের দোলাচল। মানুষের পরিকল্পনা যেখানে থেমে যায়, আল্লাহর ফয়সালা সেখানে নীরবে নতুন অধ্যায় শুরু করে। বিজয়ও তাই কেবল গৌরব নয়; তা কখনো কখনো এক কঠিন জবাবদিহির নাম।

এখানে ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান বৃদ্ধির কথাও এসেছে, আর এটাই আয়াতের হৃদয়বিদারক শিক্ষা: যা আমরা সাধারণত নেয়ামত বলে দেখি, তা-ই আল্লাহর হাতে পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। সম্পদ শক্তি দেয়, সন্তান আশ্রয় দেয়, জনসংখ্যা জনবল বাড়ায়; কিন্তু এসব যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, তখন সেগুলো আর শুধু দয়া থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় জবাবদিহির ভার। বনু ইসরাইলের ইতিহাসের এই পর্যায়ে আল্লাহ তাদেরকে আবার বিস্তার দিয়েছিলেন, জনশক্তিতে সমৃদ্ধ করেছিলেন, যেন তারা বোঝে—ক্ষমতার পুনরাবির্ভাব মানে আত্মশ্লাঘার অনুমতি নয়; বরং কৃতজ্ঞতা, ন্যায় ও আনুগত্যের নতুন আহ্বান।

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট সামগ্রিকভাবে বনু ইসরাইলের ইতিহাসের উত্থান-পতনের কথা মনে করিয়ে দেয়। কুরআন কোনো একক ঘটনার খুঁটিনাটি জানাতে এখানে ব্যস্ত নয়; বরং একটি বড় নৈতিক বাস্তবতা শেখায়—জাতির শক্তি যখন ফিরে আসে, তখন তাদের অন্তরেও কি ফিরে আসে বিনয়? পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে যখন ধন-সন্তান ও জনবল বাড়ে, তখন কি মানুষ আল্লাহর বিধানের কাছে আরও নত হয়, না কি আরও উদ্ধত হয়ে ওঠে? এই প্রশ্ন আজও তীব্রভাবে জাগে, কারণ আল্লাহর দেয়া কোনো বিস্তারই নিরর্থক নয়; প্রতিটি সম্প্রসারণের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হয় রহমতের দরজা, নয়তো পরীক্ষার গহ্বর।

আল্লাহ যখন কোন জাতির জন্য পালা ফিরিয়ে দেন, তখন তা কেবল ভাগ্যের উল্টো-পিঠ নয়; তা তাঁর ন্যায়বিচারের নিঃশব্দ ঘোষণাও বটে। আজ যে মাথা নত, কাল সেই মাথাই উঁচু হতে পারে—কিন্তু এই উঁচু হওয়া কখনোই মানুষের নিজস্ব অধিকার নয়। আয়াতের এই অংশে যেন ইতিহাসের ভেতর থেকে এক কাঁপন উঠে আসে: ক্ষমতা ফিরে এলে মানুষ ভাবে সে জিতে গেছে, অথচ আল্লাহ দেখিয়ে দেন—তুমি জিতোনি, তুমি কেবল আবার পরীক্ষার মুখে দাঁড় করানো হলে। বিজয়ের সঙ্গে যে দায় আসে, তা পরাজয়ের যন্ত্রণার চেয়েও ভারী হতে পারে; কারণ পরাজয় মানুষকে ভাঙে, আর বিজয় অনেক সময় মানুষকে ভুলিয়ে দেয়।

ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান—এই দুইটি শব্দ মানুষের হৃদয়ে নিরাপত্তার সবচেয়ে গভীর স্বপ্ন জাগায়। সম্পদ হাতকে শক্ত করে, সন্তান হৃদয়কে বিস্তৃত করে, জনশক্তি সমাজকে দৃশ্যত অজেয় মনে করায়। কিন্তু এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে বলে, যা তুমি শক্তি মনে করো, তা আল্লাহর কুদরতে এক ভয়াবহ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ সম্পদ যদি অহংকার বাড়ায়, সন্তান যদি কৃতজ্ঞতার বদলে গর্ব শেখায়, আর জনবহুলতা যদি তাকওয়ার বদলে আত্মপ্রশংসা জন্ম দেয়, তবে নেয়ামতই শাস্তির মুখ হয়ে ওঠে। আল্লাহ বান্দাকে শুধু অভাব দিয়ে পরীক্ষা করেন না; কখনো ভরপুরতা দিয়েও পরীক্ষা করেন—দেখেন, হৃদয় কাকে মনে রাখে।
বনী ইসরাইলের এই ইতিহাস আমাদেরও আয়না দেখায়। সমাজে শক্তি বাড়লেই মানুষ কি নৈতিকতা বাড়ায়? পরিবার বিস্তৃত হলেই কি দয়া বাড়ে? জনসংখ্যা বাড়লেই কি দায়িত্ব বাড়ে? আল্লাহর বিধান আমাদের শেখায়, বাহ্যিক সম্প্রসারণের ভেতরেও অন্তরের মরুভূমি জমতে পারে, যদি ইমান না থাকে। তাই এই আয়াত কানে নয়, হৃদয়ে পড়তে হয়। কেননা আল্লাহ কখনো কখনো পরাজয়ের পরে যে দান দেন, তা দিয়ে বান্দার কৃতজ্ঞতা মাপেন, তার নরম হওয়া মাপেন, তার ফিরে আসা মাপেন। আর যে জাতি নিজের সমৃদ্ধিকে আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে, তার জন্যই সম্পদ সম্পদ থাকে, সন্তান রহমত থাকে, এবং জনশক্তি হয় দায়িত্ব পালনের একটি প্রশস্ত দরজা।

এই আয়াতে আল্লাহ যেন ইতিহাসের পাতায় এক নীরব কাঁপন রেখে যান: পরাজয়ের পর আবার পালা ঘুরে গেল, আবার তাদের হাতে এলো শক্তির সুযোগ, ধন-সম্পদের বিস্তার, সন্তান-সন্ততির আধিক্য, জনবলের প্রাচুর্য। বনু ইসরাইলের প্রেক্ষাপটে এই বাক্যকে বুঝতে হয়—এটি কোনো সাধারণ সাফল্যের গল্প নয়; এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের অধীন এক জাতির ওঠানামার ছবি। মানুষ ভাবে, ক্ষমতা মানে নিরাপত্তা; কিন্তু কুরআন শেখায়, ক্ষমতা অনেক সময় নিরাপত্তার ছদ্মবেশে আসা এক কঠিন পরীক্ষা। যে জাতি দুর্বল ছিল, সে আবার শক্তিশালী হলো; কিন্তু সেই শক্তি তাদের কিসের দিকে নিয়ে গেল, সেটাই আসল প্রশ্ন।

ধন-সম্পদ মানুষকে এগিয়ে দেয়, সন্তান মানুষকে বিস্তার দেয়, জনসংখ্যা সমাজকে বড় করে; কিন্তু এই সবকিছু তখনই কল্যাণ, যখন তা আল্লাহর আনুগত্যে, ন্যায়ের পথে, শোকর ও দায়িত্ববোধে বাঁধা থাকে। অন্যথায় যা আশীর্বাদ বলে মনে হয়, তা-ই অন্তরের ওপর ভার হয়ে দাঁড়ায়। সম্পদ বাড়লে হিসাবও বাড়ে, সন্তান বাড়লে আমানতও বাড়ে, জনবল বাড়লে জবাবদিহিও বেড়ে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—আল্লাহ কখনো শুধু হরণ করেন না, কখনো দান করেও পরীক্ষা করেন; কখনো পরাজয়ে জাগান, কখনো বিজয়ে তাড়না দেন। হৃদয় যদি জাগ্রত না থাকে, তবে বিজয়ও মানুষকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে।

এখানে মুমিনের জন্য ভয়ও আছে, আশাও আছে। ভয় এই যে, আমি যে নিয়ামতকে গর্বের আসন বানাই, তা আমার পতনের সোপান হয়ে যেতে পারে; আর আশা এই যে, আল্লাহ যাকে পতনের কিনারায় রেখে দেন, তাকেও চাইলে আবার উঠিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু সেই উঠানোকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে জানতে হয়—অহংকারে নয়, কৃতজ্ঞতায়; প্রতিশোধে নয়, ন্যায়বোধে; আত্মম্ভরিতায় নয়, সিজদায়। সূরা আল-ইসরা আমাদের হৃদয়ে যে কথাটি স্থাপন করতে চায়, তা হলো: সমাজের শক্তি, পরিবারের বৃদ্ধি, সম্পদের সঞ্চয়—সবই শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার একটি রাস্তা। আর যে মানুষ নিজের সাফল্যের মাঝেও রবকে স্মরণ করে, তার জন্যই বিজয় সত্যিকারের হিদায়াত হয়ে ওঠে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষ বুঝতে শেখে—আল্লাহ কখনো শুধু হরণ করেন না, কখনো আবার ফিরিয়েও দেন; কিন্তু ফিরিয়ে দেওয়া মানেই ক্ষমা পাওয়া নয়, আর বাড়িয়ে দেওয়া মানেই সন্তুষ্টি নয়। অনেক সময় পরাজয়ের পরে ক্ষমতা আসে, দারিদ্র্যের পরে সম্পদ আসে, নিঃসঙ্গতার পরে সন্তান-পরিজন আসে, জনশক্তির পরে জনসমুদ্র আসে; তখন মনে হয় জীবন আবার আমাদের পক্ষে চলে এসেছে। কিন্তু কুরআন আমাদের কানে ধীরে ধীরে বলে, সাবধান, এই ফিরে আসাও পরীক্ষা। যে হৃদয় বিজয়ের মুহূর্তে নরম হয় না, সে হৃদয় সমৃদ্ধির মুহূর্তে আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। আর যে জাতি ধন-সন্তান ও ভিড়কে নিজের কৃতিত্ব মনে করে, সে আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক সূক্ষ্ম জবাবদিহির মুখে দাঁড়িয়ে যায়।
বনী ইসরাইলের এই দৃশ্য কেবল এক অতীত জাতির কাহিনি নয়; এটা আমাদের নিজেদের আয়না। আজ আমরা যে সম্পর্ক, সম্পদ, সন্তান, সংখ্যা, প্রভাব, পরিচিতি নিয়ে নিরাপদ বোধ করি, সেগুলোও তো আল্লাহর দেওয়া পালা-ফিরে আসা অনুগ্রহ হতে পারে। কিন্তু সেই অনুগ্রহ যদি নামাজকে ভার করে, ইনসাফকে দুর্বল করে, পরিবারে দয়া কমিয়ে দেয়, সমাজে অহংকার বাড়িয়ে দেয়, তবে বুঝতে হবে হৃদয়ের ভিতরেই আবার পরাজয় শুরু হয়েছে। কুরআন তাই আমাদের শেখায়, আল্লাহর দানকে বাহবা দিয়ে নয়, সেজদায় গ্রহণ করতে হয়; কারণ দান যত বড় হয়, জবাবদিহিও তত গভীর হয়।
হে রব, আমাদের এমন দাওয়াত দাও, যেখানে সম্পদ আমাদেরকে গর্বিত না করে কৃতজ্ঞ করে, সন্তান আমাদেরকে গাফেল না করে দোয়ার দিকে ফেরায়, আর জনবল আমাদেরকে বড় না করে বিনয়ী বানায়। আমাদের সেই ভেতরের নিরাপত্তাহীন অহংকার ভেঙে দাও, যা মনে করে শক্তি চিরস্থায়ী; আমাদের শেখাও, সব ফিরে আসা আসলে তোমারই ফয়সালা। কারণ যার হাতে ‘الكرة’ ঘুরে যায়, তাঁর সামনে মাথা নত করাই মুক্তি; আর যে এটা বুঝে ফেলে, সে হারলেও ভেঙে পড়ে না, আর জিতলেও হারিয়ে যায় না।