আল্লাহ তাআলা বলেন, যেদিন তিনি তোমাদেরকে আহ্বান করবেন, তখন তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে সাড়া দেবে। এই বাক্যে কিয়ামতের এক বিস্ময়কর ছবি আঁকা হয়েছে—মানুষের সমস্ত অহংকার, দেরি, অস্বীকার, অবহেলা যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। যে দেহ মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, যে সত্তা মৃত্যুকে শেষ ভেবেছিল, সে-ই হঠাৎ রবের ডাকে জেগে উঠবে। আর সেদিনের সাড়া কোনো অনিচ্ছুক টলমলে পদক্ষেপ নয়; তা হবে এমন এক প্রত্যাবর্তন, যেখানে প্রশংসা জড়িয়ে থাকবে নিজস্ব কণ্ঠে, কারণ সত্য সামনে উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। যিনি ডাকবেন, তিনিই পুনরুজ্জীবন দেবেন; যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার দাঁড় করাবেন।
আয়াতটি কেবল পুনরুত্থানের সংবাদ নয়, এটি হৃদয়ের পর্দা সরিয়ে দেয়। দুনিয়ায় মানুষ সময়কে দীর্ঘ মনে করে, পরিকল্পনাকে স্থায়ী ভেবে বসে, সম্পর্ক, ভোগ, ক্ষমতা—সবকিছুকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যেন এগুলো কখনো ছেড়ে যেতে হবে না। অথচ আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, সেদিন দীর্ঘতা মিলিয়ে যাবে; যে জীবনকে আমরা পাহাড়ের মতো ভারী জেনেছিলাম, তা স্মৃতিতে ছোট্ট ছায়ার মতো হয়ে যাবে। মানুষ তখন বুঝবে, সে আসলে কত অল্প সময়ের জন্যই এখানে ছিল। এই উপলব্ধি শুধু ভয়ের নয়, এটি তাওবারও দরজা। কারণ যে অন্তর আজ অল্পতার সত্য বুঝে, সে আখিরাতের জন্য বেশি সঞ্চয় করতে শেখে।
সূরা আল-ইসরা মক্কী পরিমণ্ডলের এমন এক সূরা, যেখানে বনী ইসরাইলের ইতিহাস, নৈতিক বিধান, পরিবার ও সমাজের শৃঙ্খলা, অহংকারের পরিণতি এবং আখিরাতের চূড়ান্ত বাস্তবতা বারবার সামনে আসে। এই আয়াতও সেই বৃহৎ ধারার অংশ—মানুষকে যেন বলা হচ্ছে, কুরআনের সতর্কবাণীকে হালকা ভেবো না; কারণ শেষ বিচারে প্রতিটি আত্মাই নিজের রবের ডাকে দাঁড়াবে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনাভিত্তিক কারণের ওপর জোর দেওয়া হয়নি; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সার্বজনীন আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে। তাই আয়াতটি আমাদের আজই নরম করে: পরিবারে, সমাজে, লেনদেনে, দায়িত্বে, গোপন ও প্রকাশ্যে—সবখানে এমন জীবন গড়তে, যাতে সেই দিনের ডাকে সাড়া দেওয়া লজ্জার নয়, বরং রবের প্রশংসায় ভরা এক প্রত্যাবর্তন হয়।
এই আয়াতের গভীরে শোনা যায় কিয়ামতের সেই অদ্ভুত নীরবতা, যখন মানুষের সব হিসাব, সব অহংকার, সব বিলম্ব এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যাবে। আজ যে মানুষ বলে, “এখন নয়”, “পরে ভাবব”, “সময় আছে”—সেদিন তারই ভেতরে জেগে উঠবে এক নতুন বোধ: সে তো দীর্ঘদিন কিছুই ধরে রাখেনি, কেবল ভেবেছিল ধরে রেখেছে। আল্লাহর আহ্বান যখন আসবে, তখন দুনিয়ার গতি থেমে যাবে, আর বান্দা বুঝবে—তাকে টেনে নেওয়া হচ্ছে তার প্রকৃত ঠিকানার দিকে। সে সাড়া দেবে, কিন্তু সাড়া দেওয়ার ভেতর থাকবে কৃতজ্ঞতার স্বর; কারণ অবশেষে অস্বীকারের পর্দা সরে গিয়ে সত্যের আলো সামনে দাঁড়াবে।
এখানেই আয়াতের কাঁপিয়ে দেওয়া সত্যটি আমাদের সামনে দাঁড়ায়: যেদিন আল্লাহ ডাকবেন, সেদিন মানুষের আর কোনো নিজস্ব ভারী পরিচয় থাকবে না—না সম্পদের অহংকার, না বংশের গৌরব, না সমাজের কোলাহল, না নিজের গুনাহ ঢাকার নানান অজুহাত। সবাই একই সুরে ফিরবে, কারণ সেই ডাকে অস্বীকার করার শক্তি কারও থাকবে না। জীবনভর যে মানুষ নিজেকে অনেক দূরে, অনেক স্বাধীন, অনেক সময়ের মালিক ভেবেছিল, সে তখন বুঝবে—আসলে তার সবটুকু অস্তিত্বই ছিল রবের হাতে। আর “হামদ” দিয়ে সাড়া দেওয়া মানে এই নয় যে মানুষ কেবল মুখে প্রশংসা করবে; বরং তার সত্তা মেনে নেবে, সব সত্য প্রকাশ পেয়ে গেছে, সবকিছুর শেষ-নিশানা আল্লাহরই দিকে ফিরে গেছে।
দুনিয়ার জীবন তখন কত ক্ষুদ্র মনে হবে! যে দিনগুলোকে আমরা লম্বা ভেবেছি, যে রাতগুলোতে দুশ্চিন্তা জমিয়েছি, যে বছরগুলোতে কামনা, প্রতিযোগিতা, অভিমান, ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব জমতে জমতে হৃদয় ভারী হয়েছে—সেগুলো আল্লাহর সামনে এসে যেন এক নিঃশ্বাসের মতো ছোট হয়ে যাবে। এ আয়াত পরিবারকে, সমাজকে, প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে জাগিয়ে দেয়: তুমি যেহেতু ফিরে যাবেই, তবে তোমার সম্পর্কগুলো কেমন? তোমার দায়িত্বগুলো কেমন? তোমার চোখে হারাম, তোমার জিহ্বায় গীবত, তোমার হাতে জুলুম, তোমার অন্তরে কপটতা কতটা জায়গা দখল করেছে? আখিরাতের সেই ডাক যখন আসবে, তখন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেমে যাবে; আর মানুষ দেখবে—যে জীবনকে এত দীর্ঘ মনে হয়েছিল, তা আসলে পরীক্ষার একটি ক্ষণমাত্র। তাই আজই হৃদয়কে নরম করো, হিসাবের জন্য প্রস্তুত হও, এবং এমনভাবে বাঁচো যেন রবের সামনে দাঁড়ানোর এই সংবাদটাই তোমার প্রতিটি দিনের ছায়া হয়ে থাকে।
যেদিন আল্লাহ ডাকবেন, সেদিন মানুষের ভেতরের সব বাহানা নীরব হয়ে যাবে। আজ যে হৃদয় অবকাশ খোঁজে, বিলম্বকে নিরাপদ ভাবে, আর নিজেকে সময়ের মালিক মনে করে—সেই হৃদয়ও তখন বুঝবে, সময় কখনো তার ছিল না। কিয়ামতের সে আহ্বান এমন নয় যে মানুষ অনিচ্ছায় টেনে আনা হবে; বরং সত্তার গভীর থেকে এক জাগরণ ঘটবে, আর জবাবের ভেতরই লুকিয়ে থাকবে প্রশংসা। কারণ সত্যকে আর অস্বীকার করা যাবে না, রবের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝবে—তিনি যে ডেকেছেন, সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ।
আর দুনিয়ার দীর্ঘতা? তা তখন ধুলোর মতো উড়ে যাবে। যে বছরগুলোকে আমরা ভারী করে বহন করেছি, যে রাতগুলোকে আমরা অনন্ত ভেবেছি, যে স্বপ্নগুলোকে আমরা জীবন মনে করেছি—সবই অল্প সময়ের ছায়া হয়ে ধরা দেবে। এই আয়াত যেন আজই আমাদের কাঁধে হাত রেখে বলে: ঘুম ভাঙো, হৃদয় নরম করো, ফিরে এসো। যে রব একদিন ডাকবেন, তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য আজই পথ খুলে রাখো। কারণ শেষ সত্যটি খুব সহজ, খুব কঠিন, খুব সুন্দর: মানুষ যাবে, কিন্তু আল্লাহর আহ্বান থেকে কেউ পালাতে পারবে না; আর যে সে ডাকে আগে থেকেই মাথা নত করে, তার ফেরা হবে ভয়ের নয়, বরং রহমতের।