মানুষের বিস্ময় আর অস্বীকার যখন একসাথে মুখ খুলে, তখন সে এমন এক প্রশ্ন তোলে যা কেবল দেহের নয়, হৃদয়েরও ভাঙন প্রকাশ করে: আমরা যখন অস্থিতে পরিণত হয়ে যাব, যখন শরীরের গঠন চূর্ণবিচূর্ণ রফাতে মিলিয়ে যাবে, তখনও কি আবার নতুন করে উঠব? এ প্রশ্নে আত্মাভিমান যেমন আছে, তেমনি আছে মৃত্যুকে মেনে নিতে না পারার অস্থিরতা। সূরা আল-ইসরা-এর এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সেই চিরচেনা মানসিকতাকেই সামনে আনেন—যে মানুষ নিজের চোখে ধ্বংস দেখতে পেয়ে ভাবে, এর পরে আর কিছুই সম্ভব নয়। অথচ কুরআন আমাদের শেখায়, মানুষের দেখা শেষ মানেই সৃষ্টির শেষ নয়; ভাঙা কঙ্কালও আল্লাহর কুদরতের কাছে অসহায় নয়।
এই আয়াতের ভাষা খুব তীক্ষ্ণ, কারণ এটি শুধু দেহের অবশিষ্টাংশের কথা বলে না; এটি মানুষের অন্তরের সেই বিদ্রোহী প্রশ্নকে উন্মোচিত করে, যা আখিরাতকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। মক্কার মুশরিক সমাজে পুনরুত্থান অস্বীকার করা ছিল এক ধরনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অন্ধতা—যেন মানুষ নিজেকে মাটির ওপর অস্থায়ী নয়, বরং চূড়ান্ত সত্তা মনে করতে চায়। কিন্তু কুরআন বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়: তোমাদের প্রথম সৃষ্টি যেমন সত্য, তেমনি দ্বিতীয় সৃষ্টিও সত্য; যে সত্তা নিঃশূন্যতা থেকে জীবন দিয়েছেন, তিনি ছিন্নভিন্ন হাড় থেকে জীবন ফিরিয়ে আনতে অপারগ নন। তাই এই প্রশ্ন আসলে আল্লাহকে নয়, প্রশ্নকারী মানুষের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকেই উন্মোচিত করে।
ইসরা-প্রসঙ্গের এই অংশে আখিরাতের বিশ্বাস শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি নৈতিক জীবনের শিকড়। যে জানে তাকে আবার উঠতে হবে, সে নিজের জবাবদিহির আগে ভেঙে পড়ে না, পরিবারে, সমাজে, অধিকার-অধিকার্যে, ন্যায়-অন্যায়ে আরও সংযত হয়। পুনরুত্থানকে অস্বীকার করা মানে কেবল মৃত্যুর পরের জীবনকে অস্বীকার করা নয়; তা হলো এই দুনিয়ার প্রতিটি কাজের অর্থকেই ফাঁপা করে দেওয়া। আর কুরআন মানুষের সেই ফাঁপা বিশ্বাস ভেঙে দিয়ে মনে করিয়ে দেয়—চূর্ণ অস্থিও আল্লাহর কাছে হারিয়ে যায় না; বরং তা সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়, এবং একদিন ‘المبعوثون’ বাস্তব হয়ে উঠবে, যখন মানবজাতি নীরব মাটি থেকে আবার ডাকা হবে।
মানুষের এই প্রশ্নে শুধু অবিশ্বাস নেই, আছে ভাঙনের সামনে দাঁড়িয়ে অহংকারের শেষ স্পন্দন। যখন সে দেখে, শরীরের সৌন্দর্য মাটি হয়ে যায়, অস্থি শুকিয়ে যায়, রফাতে চূর্ণ হয়ে বায়ুর সঙ্গে মিশে যায়, তখন তার সংকীর্ণ দৃষ্টি বলে: এর পর আর কিছুই নেই। কিন্তু কুরআন এই অস্বীকারের ভেতরের শূন্যতাকে উন্মোচন করে দেয়। যে চোখ নিজের ধ্বংস ছাড়া আর কিছু দেখে না, সে কিভাবে আল্লাহর কুদরতকে চিনবে? মানুষের চোখে যা বিলীন, আল্লাহর জ্ঞানে তা হারায় না; মানুষের কাছে যা শেষ, আল্লাহর কাছে তা নতুন সৃষ্টির আরেক দরজা।
এই সত্যের সামনে ঈমানের মানুষ ভয়ে নয়, বিনয়ে কেঁপে ওঠে। কারণ সে বুঝে, জীবন কেবল চলমান শ্বাস নয়; জীবন হচ্ছে এমন এক সফর, যার শেষ প্রান্তে আবার দাঁড়াতে হবে স্রষ্টার সামনে। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়—নিজেকে চিরস্থায়ী ভেবে পাপকে হালকা করো না, আর মৃত্যু দেখে নিরাশ হয়ো না; বরং প্রতিটি ভাঙা অঙ্গ, প্রতিটি ক্ষয়মান দেহ, প্রতিটি কবরের নীরবতা আখিরাতের দিকে ইশারা করে। আল্লাহ চাইলে রফাতে পরিণত দেহকেও আবার জাগাতে পারেন; এবং যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কাছে পুনরুদ্ধার কোনো বিস্ময় নয়। যে হৃদয় এ কথা মানে, সে পৃথিবীর মোহে ডুবে যায় না; সে প্রতিটি শ্বাসকে আমানত জানে, আর প্রতিটি দিনকে শেষ সাক্ষাতের প্রস্তুতি মনে করে।
এই প্রশ্নের মধ্যে কেবল কৌতূহল নেই, আছে মানুষের অহংকারের শেষ আশ্রয়। সে নিজের ভাঙন দেখে ভাবে, যা একবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, তা আর জোড়া লাগবে না। কিন্তু কুরআন মানুষকে তার সীমার মুখোমুখি দাঁড় করায়—তুমি যে দেহকে শেষ মনে করছ, সেই দেহের কণাগুলোর উপরও আল্লাহর কুদরত আচ্ছাদিত; তুমি যে চূর্ণ রফাতকে নিঃশেষ ভাবছ, তা-ও তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। পুনরুত্থান মানে কেবল কবর থেকে শরীর উঠে আসা নয়; পুনরুত্থান মানে মানুষের সকল অজুহাতের পতন, সকল আত্মপ্রবঞ্চনার অবসান, এবং সত্যের সামনে নিরাবরণ হয়ে দাঁড়ানো।
এই আয়াত আমাদের অন্তরের দিকে তাকাতে শেখায়। আমরা কি মৃত্যুকে শুধু দূরের খবর ভেবে বেঁচে আছি, নাকি প্রতিটি কাজের মধ্যে আখিরাতের ওজন অনুভব করছি? মানুষ যখন পুনরুত্থানকে অসম্ভব বলে, তখন সে আসলে নিজের হিসাবকে অসম্ভব করতে চায়। অথচ আল্লাহর সামনে ফিরে যাওয়া অনিবার্য। পরিবারে, সমাজে, লেনদেনে, কথায়-কর্মে, গোপন অভ্যাসে—সব জায়গায় এই আয়াত একটি নিঃশব্দ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়: তুমি কি চাও এমন এক দিনের জন্য, যেদিন তোমার অস্থিও সাক্ষ্য দেবে? যে হৃদয় আজ আখিরাতকে দূরে ঠেলে রাখে, সে হৃদয়ই একদিন ভয়ে কাঁপবে; আর যে হৃদয় আজ আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেকে সংশোধন করে, তার জন্য এই পুনরুত্থান ভয় নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা। মানুষের দেহ ভাঙতে পারে, সমাজ ভেঙে পড়তে পারে, আশা ক্ষয়ে যেতে পারে; কিন্তু যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কাছে নতুন করে সৃষ্টি করা কেবল তাঁর ইচ্ছার প্রকাশ। আর এ সত্যই বান্দাকে ভেঙে না ফেলে জাগিয়ে তোলে, যাতে সে নিজের ধ্বংসের দিকে নয়, রবের দিকে ফিরে যায়।
এই প্রশ্নটি শুধু অস্বীকারের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞানেরও স্বীকারোক্তি। আমরা যেটুকু ভাঙন দেখি, সেটুকুকেই শেষ ভেবে নিই। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানের সামনে মৃত্যু কোনো বিলোপ নয়, শুধু এক পর্দার নাম। যে সত্তা একফোঁটা তুচ্ছ জল থেকে আমাদের গড়ে তুলেছেন, তিনি অস্থি ও রফাতের ভেতর থেকেও পুনরায় সৃষ্টি করতে অপারগ নন। এখানে কুরআন আমাদের তর্কে হারাতে চায় না, আমাদের অন্তরকে জাগাতে চায়—যেন আমরা বুঝি, জীবন আমার নিয়ন্ত্রণে নয়, জবাবদিহিও আমার ইচ্ছায় মুছে যাবে না।
মানুষ যখন আখিরাতকে দূরে ঠেলে দেয়, তখন সে আসলে নিজের সীমা ভুলে যায়। সে ভাবে, ভাঙা দেহ মানে চূড়ান্ত নীরবতা; অথচ আল্লাহর ঘোষণায় সেই নীরবতার মধ্যেই আবার ডাক আছে, হিসাব আছে, ন্যায় আছে, ফয়সালা আছে। এই আয়াত হৃদয়কে কাঁপায়, কারণ এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—আমাদের অস্তিত্ব কেবল এই দুনিয়ার ব্যস্ততা নয়, আমাদের গন্তব্যও এ দুনিয়ার ধুলোতে শেষ নয়। সুতরাং অন্তরকে অহংকার থেকে নামিয়ে আনুন, গোনাহের অন্ধকারে না থেকে তাওবার আলোয় ফিরুন। যে দিন আমাদের গুঁড়ো হয়ে যাওয়া দেহকে দেখেও আমরা বিস্মিত হব, সেই দিনটি আসার আগেই কুরআনের সত্যকে মেনে নেওয়া কত যে জরুরি।