সূরা আল-ইসরা’র এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এক ভয়ংকর মানসিক বিপর্যয়কে উন্মোচন করেন: মানুষ নিজের জন্য পুত্রকে সম্মানজনক মনে করে, আর আল্লাহর জন্য এমন কিছু আরোপ করে যা সে নিজেই অপছন্দ করে। এতে তাওহীদের হৃদয়বিদারক আঘাত লুকিয়ে আছে। সৃষ্টিকর্তার সম্পর্কে এমন কথা বলা, যেন তিনি মানুষের মতো প্রয়োজনের অধীন, বণ্টনের অধীন, উত্তরাধিকারের অধীন—এ সবই ঈমানের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ। আল্লাহ প্রশ্নের ভঙ্গিতে এমন কথাকে সামনে আনেন, যাতে বিবেক জেগে ওঠে: যিনি সব কিছুর মালিক, যাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর সম্পর্কে এ কেমন নীচ ধারণা?
এই আয়াতের পেছনে আরবের মুশরিকদের সেই বিশ্বাসের জগৎ দেখা যায়, যেখানে তারা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে কল্পনা করত; অথচ নিজেদের জন্য তারা পুত্রকেই পছন্দ করত। এ ছিল শুধু ভুল বিশ্বাস নয়, বরং মর্যাদার মাপকাঠিকে উল্টে দেওয়ার অপরাধ—যেখানে নিজেদের জন্য ভালো, আর রবের জন্য অপমান জুড়ে দেওয়া হয়। কুরআন এই বিকৃত ভাষাকে নিঃসন্দেহে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ ফেরেশতারা আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টি; তাদের সম্পর্কে এমন লিঙ্গভিত্তিক আরোপও অজ্ঞতার ভাষা, অহংকারের ভাষা, এবং সত্যের প্রতি অবিচারের ভাষা।
‘নিশ্চয় তোমরা গুরুতর গর্হিত কথাবার্তা বলছ’—এই বাক্যটি শুধু একটি কল্পিত বিশ্বাসকে নয়, বরং ভাষার নৈতিক দায়কে আঘাত করে। মানুষ মুখে যা বলে, তা কখনো শুধু শব্দ থাকে না; তা অন্তরের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা রচনা করা, তাঁর জন্য অপমানজনক ধারণা বানানো, অথবা পবিত্র সৃষ্টির প্রতি অপবাদ আরোপ করা—এসব জিহ্বার সহজ উচ্চারণ নয়, এগুলো আত্মার রোগ। এই আয়াত আমাদের শেখায়, তাওহীদ কেবল ‘আল্লাহ এক’ বলার নাম নয়; তাওহীদ মানে আল্লাহর সম্পর্কে সব বিকৃতি, সব কল্পিত অংশীদারি, সব গর্হিত আরোপ থেকে হৃদয় ও জিহ্বাকে পবিত্র রাখা।
মানুষের অন্তর যখন অহংকারে অন্ধ হয়, তখন সে সত্যকে শুধু অস্বীকার করে না, সত্যকে অপমানও করতে চায়। এই আয়াতে সেই অপমানেরই নগ্ন রূপ ধরা পড়েছে—নিজের জন্য যা সে শ্রেষ্ঠ মনে করে, আল্লাহর ব্যাপারে তা-ই বলে বসে এমন কিছু, যা তাঁর মহিমার সাথে কোনোভাবেই মানায় না। এ যেন সীমিত সত্তার সীমাহীন রব্বকে নিজের ক্ষুদ্র মানদণ্ডে মাপার দুঃসাহস; যেন সৃষ্টির জিহ্বা বলে, আমরা ভাগ করি, আমরা পছন্দ করি, আমরা মর্যাদা নির্ধারণ করি। অথচ আল্লাহর মর্যাদা মানুষের কল্পনার মাপে নয়, মানুষের ভাষার কাঠামোতেও নয়; তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলা শুধু ভুল নয়, তা তাওহীদের হৃদয়ে ছুরি চালানো।
এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভয়ংকর আয়না ধরে: আমরা কি কখনো আল্লাহর বিষয়ে এমন ধারণা পোষণ করি না, যা বাহ্যত ছোট মনে হলেও অন্তরে তাঁর পূর্ণত্বকে সীমিত করে ফেলে? যখন মানুষ রব্বকে নিজের ইচ্ছা, নিজের পছন্দ, নিজের সামাজিক ধারণার কাঠামোয় আটকে ফেলে, তখন সে আসলে নিজের অজ্ঞতাকে ধর্মের পোশাক পরায়। তাই এই আয়াত শুধু প্রাচীন এক বিভ্রান্তির প্রতিবাদ নয়, আজকের প্রতিটি আত্মাও এখানে পরীক্ষা দেয়—আমি কি আল্লাহকে তাঁর যথাযোগ্য মহিমায় মানছি, নাকি নীরবে তাঁকে মানুষের মতো করে কল্পনা করছি? যে হৃদয় এই প্রশ্নে কেঁপে ওঠে, সে-ই তাওহীদের আলোয় ফিরতে শুরু করে।
এই আয়াত মানুষের হৃদয়ের এক গভীর অসততা উন্মোচন করে। মানুষ নিজের জন্য যা ভালো, সম্মানজনক, মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করে, আল্লাহর সম্পর্কে এসে তা-ই বিকৃত করে অপমানের রূপ দেয়। যেন নিজের পক্ষের জন্য পুত্র চাইবে, আর রবের দিকে অনুচিত ধারণার অন্ধকার ছুড়ে দেবে। এ কেবল একটি ভ্রান্ত কথা নয়; এটা তাওহীদের বিরুদ্ধে জিহ্বার বিদ্রোহ। যাঁর মালিকানা আকাশ ও জমিন জুড়ে, যাঁর কোনো প্রয়োজন নেই, কোনো অংশীদার নেই, কোনো তুলনা নেই—তাঁর সম্পর্কে এমন কথা বলা মানুষের অন্তরের অহংকার, অজ্ঞতা আর কৃতঘ্নতার চূড়ান্ত প্রকাশ। কুরআন আমাদের শেখায়, আল্লাহকে নিয়ে কল্পনা করা নয়; বরং তাঁর সামনে বিনম্র হওয়া।
এই আয়াতে ফেরেশতাদের মর্যাদাও রক্ষা করা হয়েছে। আল্লাহর সম্মানিত সৃষ্টিকে মানুষের কু-ধারণার হাতে তুলে দিয়ে তাঁদের সম্পর্কে অশোভন ধারণা পোষণ করা হৃদয়ের শুদ্ধতা নষ্ট করে। সমাজ যখন সত্যের বদলে ধারণাকে, ওহীর বদলে রুচিকে, আর আল্লাহর মর্যাদার বদলে মানুষের সংস্কারকে মানদণ্ড বানায়, তখন ভাষা কলুষিত হয়, ঈমান দুর্বল হয়, আর বিবেক ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়। তাই এই আয়াত আমাদের জিজ্ঞেস করে: আমি কি আল্লাহ সম্পর্কে এমন কোনো ধারণা পোষণ করছি যা আমার নিজের অন্তরেও ন্যায্য নয়? আমি কি আমার কথায়, চিন্তায়, বিচারবোধে এমন কিছু বলছি যা রবের মহত্ত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রূপ হয়ে দাঁড়ায়?
এখানে আত্মসমালোচনার আগুন খুব নীরবে জ্বলে। কারণ মানুষের জিহ্বা কেবল শব্দ উচ্চারণ করে না; সে তার অন্তরের পর্দাও ফাঁস করে দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না, তার জীবনে নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়তে শুরু করে। আর যে ব্যক্তি নিজের বক্তব্য, বিশ্বাস, পছন্দ-অপছন্দ সব কিছুকে ওহীর সামনে নত করে, তার হৃদয় তাওহীদের আলোয় জেগে ওঠে। এই আয়াত আমাদের ভয় শেখায়, আবার আশা-ও শেখায়: আল্লাহ এমন এক রব, যিনি মিথ্যাকে সহ্য করেন না, তবে বান্দাকে সত্যের দিকে ফিরতেও ডাকেন। তাই আজ যদি আমাদের অন্তরে কোনো ভুল ধারণা, জিহ্বায় কোনো অবিবেচনা, অথবা সমাজের ভেতরে কোনো ধর্মহীন অপবাদ বাসা বেঁধে থাকে, তবে নীরবে তাওবা করাই মুক্তি। আল্লাহর সামনে ফিরে আসাই মর্যাদা। তাঁর নামের সামনে ভেঙে পড়াই হৃদয়ের প্রকৃত উত্থান।
আজকের মানুষও হয়তো এভাবে বলে না, তবু অনেক সময় অন্তরে, আচরণে, উপমায়, ধারণায় আল্লাহকে এমনভাবে বুঝতে চায় যেন তিনি সৃষ্টির মতোই সীমাবদ্ধ। অথচ যিনি সব সীমা সৃষ্টি করেছেন, তিনি সীমার মধ্যে নন। যাঁর ওপর কোনো প্রয়োজন আরোপ করা যায় না, তাঁর সম্পর্কে অপমানজনক কল্পনা দাঁড় করানোই সবচেয়ে বড় জুলুম। তাই এই আয়াত শুধু প্রাচীন এক ভ্রান্ত বিশ্বাসকে আঘাত করে না; এটি আমাদের ভেতরের প্রতিটি অসম্মানজনক ধারণাকেও বিচারের সামনে দাঁড় করায়। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যেন খুব নরম কণ্ঠে বলি—হে রব, তোমার সম্পর্কে জ্ঞানহীন কথা বলতে আমাদের মুখকে রক্ষা করো, আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করো, আমাদের ভাবনাকে তাওহীদের আলোয় স্থির করো।
আর যদি কখনো জিহ্বা ভুল পথে যায়, তবে তাওবা তাকে ফিরিয়ে আনুক। কারণ আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপের চেয়ে বড় হারানো আর কিছু নেই, আর তাঁর দিকে ফিরে আসার চেয়ে বড় আশ্রয়ও কিছু নেই। এ আয়াত শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্মুখে একটিই সত্য রেখে যায়: আল্লাহ মহান, পবিত্র, অতুলনীয়; তাঁর জন্য অপমান বেছে নেওয়া মানুষের কাজ নয়, তাঁর প্রশংসা, তাঁর তাসবীহ, তাঁর মহিমা স্বীকার করাই বান্দার আসল সৌন্দর্য। যে বান্দা এই সত্য হৃদয়ে গ্রহণ করে, তার মুখ নরম হয়, চোখ ভিজে, অহংকার ভেঙে পড়ে, আর তাওহীদ তার ভেতরে আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।