পৃথিবীতে দম্ভভরে চলো না—এই একটি বাক্যেই কুরআন মানুষের ভেতরের সবচেয়ে লুকানো ব্যাধির সামনে আয়না ধরেছে। দম্ভ শুধু হাঁটার ভঙ্গি নয়; এটি হৃদয়ের এক নীরব বিকৃতি, যেখানে মানুষ নিজের সীমাকে ভুলে যায়, নিজের অস্তিত্বকে বড় করে দেখে, আর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে অকারণে নিজের ছায়াকে দীর্ঘ ভাবতে শুরু করে। সূরা আল-ইসরা-এর এই আয়াত আমাদের শেখায়, মানুষের উচ্চতা তার অহংকারে নয়; বরং তার বিনয়ে। জমিনকে সে বিদীর্ণ করতে পারবে না, পাহাড়ের সমানও হতে পারবে না—এ কথা কেবল শারীরিক অসম্ভবতা নয়, বরং এক গভীর আত্মিক স্মরণ: তুমি যত বড় দাবি-ই করো, সৃষ্টির সীমা তুমি অতিক্রম করতে পারো না।
এই আয়াতের ভাষা এমন, যেন কুরআন মানুষের বাড়তি ভঙ্গি, উদ্ধত চলন, এবং অন্তরের গোপন আত্মম্ভরিতাকে একসঙ্গে থামিয়ে দিচ্ছে। এখানে কোনো কল্পলোকের কথা নয়; বরং আমাদের প্রতিদিনের সমাজ, পরিবার, আচরণ, কথাবার্তা, পদচারণা—সবখানে যে অহংকার ঢুকে পড়ে, তারই বিরুদ্ধে এই ঘোষণা। কুরআন বারবার মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, জ্ঞান, সম্পদ, বংশ, পদ—কিছুই চূড়ান্ত নয়। যে হৃদয় নিজেকে বড় মনে করে, সেই হৃদয়ই আসলে সবচেয়ে ছোট; আর যে আল্লাহর সামনে নত হয়, সেই-ই সত্যিকার অর্থে উঠে দাঁড়ায়।
সূরা আল-ইসরা মূলত বানী ইসরাইল, নৈতিক বিধান, সমাজের ভারসাম্য, পরিবার ও আখিরাতের স্মৃতি—এই বিস্তৃত পরিসরে মানুষকে সোজা পথে ফিরিয়ে আনে। এই আয়াতও সেই বৃহৎ প্রবাহেরই অংশ: কেবল গুনাহ থেকে বাঁচা নয়, বরং চরিত্রের ভেতরকার বিষকে চিনে ফেলা। এর নির্দিষ্ট কোনো সহীহভাবে প্রতিষ্ঠিত কারণ-নুযূল না থাকলেও, এর সাধারণ প্রেক্ষাপট স্পষ্ট—মানুষের আত্মগর্ব, সামাজিক শ্রেণি-অহংকার, এবং অন্যকে তুচ্ছ করার মানসিকতা। কুরআন যেন বলছে, পৃথিবীর মাটিতে এমনভাবে চলো, যেন তুমি এর মালিক নও; বরং এর উপর আল্লাহর এক নির্ভরশীল বান্দা, যার আসল মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে নীরবতা, সংযম, এবং স্রষ্টার সামনে ভাঙা হৃদয়ে।
মানুষের অহংকার অনেক সময় শব্দে আসে না, আসে ভঙ্গিতে। আসে হাঁটার ঢঙে, দৃষ্টির কঠোরতায়, মুখের তাচ্ছিল্যে, কথা বলার ভঙ্গুর উদ্ধততায়। কুরআন এখানে কেবল পা ফেলার কথা বলেনি; সে যেন হৃদয়ের ভিতরের এক গোপন রোগকে ধরে ফেলেছে। মেরাজ-অযোগ্য এক প্রাণ যখন নিজেকে আকাশের সমান ভাবতে শুরু করে, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপেই এক প্রকার মিথ্যা জন্ম নেয়। অথচ এই জমিন আল্লাহর, এই দেহ আল্লাহর, এই শ্বাস আল্লাহর, এই ক্ষমতাও আল্লাহর দেওয়া ধার। তাই দম্ভভরে চলা শুধু সৌন্দর্যের অভাব নয়; তা এক ধরনের বিস্মৃতি—নিজেকে ভুলে গিয়ে মালিককে ভুলে যাওয়ার বিস্মৃতি।
এই আয়াত আমাদের শিখিয়ে দেয়, আসল উচ্চতা মাটির উপরে নয়, আত্মার ভেতরে। যে মানুষ বিনয়ে হাঁটে, সে ছোট নয়; সে-ই প্রকৃত অর্থে বড়, কারণ সে নিজের সীমা জেনেও আল্লাহকে ভুলে যায় না। সে জানে, একদিন এই দেহ মাটিতে ফিরে যাবে, আর সেই দিন দম্ভের সব সাজসজ্জা নিঃশব্দে ঝরে পড়বে। তাই দম্ভভরা পদচারণা কেবল বাহ্যিক আচরণ নয়, বরং আখিরাতকে ভুলে জীবনের ভারসাম্য হারানোর এক লক্ষণ। কুরআন আমাদের ডাকে এমন এক জীবনের দিকে, যেখানে চলা হবে শান্ত, কথা হবে পরিমিত, হৃদয় হবে নত, আর চোখে থাকবে দায়িত্বের আলো। কারণ আল্লাহর কাছে প্রিয় সেই বান্দা, যে পৃথিবীতে পা রাখে, কিন্তু তার অহংকার দিয়ে আকাশে উঠতে চায় না।
এই আয়াত আমাদের শুধু রাস্তায় হাঁটার ভঙ্গি শেখায় না; এটি হৃদয়ের হাঁটার ধরনও পরীক্ষা করে। মানুষ যখন নিজের জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ, পদ, প্রভাব—সবকিছুকে নিজের স্থায়ী অধিকার মনে করতে শুরু করে, তখনই তার অন্তরে মَرَحًا জন্ম নেয়। সে আর বিনয়ের মানুষ থাকে না; হয়ে ওঠে নিজেরই প্রশংসার বন্দী। কুরআন যেন নরম কিন্তু তীব্র কণ্ঠে বলে, তুমি যে মাটির ওপর হাঁটো, সেই মাটিই তোমার অহংকারের সীমা ঘোষণা করছে। তুমি চাইলে বুক ফুলিয়ে চলতে পারো, কিন্তু সত্য বদলাবে না: তুমি জমিনকে ফাঁক করতে পারবে না, পাহাড়ের উচ্চতাকেও ছুঁতে পারবে না। মানুষের শক্তি যতটা বড় মনে হয়, আল্লাহর সামনে তা ততটাই ক্ষুদ্র; আর এই উপলব্ধিই ঈমানকে জাগিয়ে তোলে।
সমাজে দম্ভ ছড়িয়ে পড়ে তখনই, যখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে নিজেকে কেন্দ্র বানায়। তখন পরিবারে কথা কঠিন হয়, সম্পর্ক তিক্ত হয়, দুর্বল মানুষ অবহেলার শিকার হয়, আর অন্তর থেকে মমতা সরে গিয়ে তার জায়গা নেয় আত্মগর্ব। কিন্তু কুরআনের শিক্ষা মানুষকে আবার নিজের আসল ঠিকানায় ফিরিয়ে আনে—তুমি সীমাবদ্ধ, তুমি দায়বদ্ধ, তুমি ফেরত যাওয়ার পথে আছো। এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় কেঁপে ওঠে: আমি কি কেবল চলাফেরায় নয়, কথায়, দৃষ্টিতে, আচরণে, আচমকা রাগে, গোপন ঔদ্ধত্যে দম্ভ বহন করছি? যদি করে থাকি, তবে আজই নত হতে হবে, কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ভারী কিছু নয়, সবচেয়ে সত্যিকারের কিছুই গ্রহণযোগ্য। দম্ভ ভাঙলে আত্মা হালকা হয়; বিনয় এলে অন্তরে নেমে আসে আলো। আর যে আলো মানুষকে নিজের সীমা চিনিয়ে দেয়, সেই আলোই তাকে আখিরাতের পথে সোজা করে দাঁড় করায়।
এ আয়াত আমাদের চোখের সামনে এক নির্মম কিন্তু মমতাময় সত্য তুলে ধরে: তুমি যতই বুক ফুলিয়ে চলো, জমিনের এক কণাও তোমার অহংকারে নড়ে না; তুমি যতই ঘাড় উঁচু করো, পাহাড়ের সমান হওয়া যায় না। মানুষের দম্ভ আসলে শক্তি নয়, এক ধরনের আত্মভ্রান্তি। সে ভাবে, সে বড়; অথচ তার হাঁটার নিচে মাটিই তাকে বহন করছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাসও তার নিজের দখলে নেই, তার একটি হৃদস্পন্দনও তার ইচ্ছার বন্দি নয়। যে মানুষ এই সীমাবদ্ধতা ভুলে যায়, সে নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়। আর যে মানুষ তা স্মরণ করে, সে নরম হয়, শান্ত হয়, আল্লাহর সামনে নত হয়।
তাই কুরআন এখানে শুধু বাহ্যিক চলনকে থামায় না; অন্তরের উদ্ধত স্বভাবকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। পরিবারে, সমাজে, জ্ঞানে, সম্পদে, পদে, সৌন্দর্যে কিংবা বংশগৌরবে মানুষ যখন নিজেকে অন্যের চেয়ে উঁচু ভাবতে শেখে, তখন তার ভেতরে এক সূক্ষ্ম অন্ধকার নামে। সেই অন্ধকারে সে আর মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে না; সে দেখে তুলনা, তুচ্ছতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অথচ ঈমানের সৌন্দর্য হলো এই—নিজেকে ছোট করে দেখা নয়, বরং নিজেকে সত্যের সামনে যথাস্থানে দেখা। বান্দার মর্যাদা তার অহংকারে নয়, তার বিনয়ে; তার উত্থান তার প্রদর্শনীতে নয়, তার সিজদায়। তাই আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তরকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন: আমি কি চলি দম্ভ নিয়ে, না কি চলি কৃতজ্ঞতার ভারে? আমি কি নিজের প্রতাপে মুগ্ধ, না কি আমার প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সামনে লজ্জা ও ভয়ের কোমল আলো আছে?