সূরা আল-ইসরা’র এই আয়াত আমাদের সামনে এক কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্য তুলে ধরে: অপব্যয় কোনো নিরীহ অভ্যাস নয়, এটি আত্মার ভেতরে এক ধরনের নৈতিক পতন। আল্লাহ বলেন, অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। এ ভাষা কেবল অর্থনীতি শেখায় না; এটি হৃদয়ের অবস্থান প্রকাশ করে। যে মানুষ আল্লাহর দেওয়া রিজিককে মর্যাদা দেয় না, প্রয়োজনের সীমা চেনে না, আল্লাহর নি‘আমতের সুরক্ষা ও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, সে ধীরে ধীরে কৃতজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যায়। আর কৃতজ্ঞতার সেই শূন্য জায়গায় প্রবেশ করে আত্মপ্রবঞ্চনা, অহংকার, ভোগের নেশা—যা শয়তানের চালের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।

এখানে ‘শয়তানের ভাই’ বলা মানে এই নয় যে মানুষ তার সত্তায় শয়তান হয়ে যায়; বরং বোঝানো হচ্ছে, অপচয়ের পথ শয়তানের পথেরই সঙ্গী। শয়তান নিজে তার রবের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ—এই শেষ বাক্যটি বিষয়টিকে আরও গভীর করে। কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের প্রশংসা নয়, বরং নেয়ামতকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। খাবারে, পোশাকে, সম্পদে, সময়ের ব্যবহারে, পরিবারের হক আদায়ে, সমাজের প্রয়োজন বুঝতে—এই সবখানেই শোকর বা কৃতজ্ঞতার সত্য রূপ ধরা পড়ে। অপব্যয় তাই কেবল টাকা নষ্ট করা নয়; এটি আল্লাহর দানকে অবহেলা করা, এবং অবহেলার ভেতর দিয়ে হৃদয়কে কঠিন করে ফেলা।

এ সূরার সামগ্রিক সুরও এখানে সহায়ক: বনী ইসরাইলের প্রসঙ্গ, নৈতিক বিধান, পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব—সবকিছু মিলে মানুষকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের দিকে ডাকে। এই আয়াতের সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা সর্বজনস্বীকৃতভাবে স্থির নয়; তবে এর সাধারণ বার্তা এমন এক সমাজের জন্য, যেখানে সম্পদ কখনো পরীক্ষায় পরিণত হয়, কখনো ফিতনায়। তাই কুরআন অপচয়কে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক ক্ষয়ের দ্বার হিসেবে চিহ্নিত করছে। যে ঘরে সংযম নেই, সেখানে বরকত ক্ষীণ হয়; যে সমাজে দায়িত্ববোধ নেই, সেখানে অভাব বাড়ে; আর যে হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা নেই, সেখানে নেয়ামতও নিরাপদ থাকে না।

অপব্যয়ের ভেতরে শুধু সম্পদের অপচয় নেই, আছে হৃদয়েরও অপচয়। যে মানুষ প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে ভোগকে অভ্যাস বানায়, সে আসলে নিজের ভেতরের সংযমকে ছিন্ন করে ফেলে। তখন টাকা শুধু বেরিয়ে যায় না, বেরিয়ে যায় শোকর, বেরিয়ে যায় জবাবদিহির বোধ, বেরিয়ে যায় বান্দা হিসেবে নিজের অবস্থানও। কুরআন এমন ব্যক্তিকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করছে, কারণ অপচয় ধীরে ধীরে মানুষকে শেখায় যে নেয়ামত তার অধিকার, দান নয়; আর যে এই ভুল বিশ্বাসে বাঁচে, তার হাত আর দোয়ার জন্য খুলে না, বরং লোভের জন্য খুলে যায়।

এ আয়াত পরিবার ও সমাজের দিকে এক গভীর নৈতিক আলো ফেলেছে। ঘরে অযথা ব্যয়, দায়িত্বহীন ভোগ, দেখনদারি, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আহরণ—এসব একদিন শুধু ব্যক্তিকে নয়, সম্পর্ককেও ক্ষয় করে। যে রিজিককে আমানত মনে করে না, সে সন্তানকে মিতব্যয়িতা শেখাতে পারে না, অভাবী প্রতিবেশীর হক চিনতে পারে না, সমাজের ভারসাম্যও রক্ষা করতে পারে না। অথচ কৃতজ্ঞতার পথ মানুষকে শেখায়, কমের ভেতরে বরকত খুঁজতে, বেশি পেলে ভাগ করে দিতে, আর প্রতিটি নেয়ামতের সামনে আল্লাহর প্রশংসায় নত হতে।
শয়তানের সঙ্গে আত্মিক সাদৃশ্যের এই সতর্কবাণী আসলে আমাদের অন্তরে আয়না ধরছে। শয়তান যেমন তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞতার পথ ছেড়েছিল, অপব্যয়ও তেমনি এক ধরনের অকৃতজ্ঞ বিদ্রোহ—যেখানে মানুষ নেয়ামত পেয়ে নেয়ার বাহাদুরিতে ডুবে যায়, কিন্তু দাতার দিকে ফিরে তাকায় না। তাই এই আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়: আমার ব্যয় কি আমাকে আল্লাহর নিকট আরও নরম করছে, নাকি হৃদয়কে আরও কঠিন করছে? আমি কি রিজিককে ইবাদতে রূপ দিচ্ছি, নাকি ভোগের আগুনে পুড়িয়ে শেষ করছি? কুরআনের এই প্রশ্নের ভেতরেই বেঁচে ওঠে সংযম, এবং সংযমের ভেতরেই মানুষ ফিরে পায় তার হারানো মর্যাদা।

কুরআন এখানে আমাদের হৃদয়ের সামনে এক আয়না ধরে। অপব্যয় মানে শুধু টাকাপয়সা উড়িয়ে দেওয়া নয়; অপব্যয় মানে আল্লাহ যে আমানত দিলেন, তাকে হালকাভাবে নেওয়া; প্রয়োজনের মাপে না থেকে প্রবৃত্তির টানে চলা; রিজিককে ইবাদতের বদলে ভোগের উপকরণ বানিয়ে ফেলা। তাই এই আয়াত আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়: আমি কি আমার জীবনে আল্লাহর নি‘আমতকে সংরক্ষণ করছি, নাকি অজান্তে তা নষ্ট করছি? আমার ঘরের খরচ, আমার সময়, আমার শক্তি, আমার কথা, আমার চাহিদা—এসব কি শোকরের পথে, নাকি অপচয়ের পথে যাচ্ছে? যে হৃদয় নিজেকে জিজ্ঞেস করতে শেখে, সে ধ্বংসের আগে জেগে ওঠে।

আয়াতটি সমাজের বাস্তবতাকেও ছুঁয়ে যায়। অপব্যয় কেবল ব্যক্তিগত পাপ নয়, তা পরিবারে অস্থিরতা আনে, ঘরে অসংযম ঢুকায়, দরিদ্রের হককে আড়াল করে, এবং সমাজে মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়। যেখানে নি‘আমতের কদর নেই, সেখানে কল্যাণও দীর্ঘস্থায়ী হয় না; যেখানে সীমা নেই, সেখানে শান্তিও টেকে না। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পদ আল্লাহর দান—এটি অহংকারের জিনিস নয়, বরং দায়িত্বের বোঝা। তাই মুমিনের জীবন হবে ভারসাম্যের জীবন: দান থাকবে, সঞ্চয়ও থাকবে; খরচ থাকবে, কিন্তু হেকমত থাকবে; প্রয়োজন পূরণ হবে, কিন্তু নফসের বেপরোয়া দাবি পূজিত হবে না।

সবচেয়ে গভীর কথা হলো, কৃতজ্ঞতা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফেরায়, আর অকৃতজ্ঞতা তাকে অন্ধকারের সঙ্গে আত্মীয় করে তোলে। শয়তান নিজ রবের প্রতি কফুর—অতিশয় অকৃতজ্ঞ—এই কথার মধ্যে এক ভয়ংকর শিক্ষা আছে: যে নেয়ামত পেয়ে মালিককে ভুলে যায়, সে ধীরে ধীরে নিজের অন্তরকেই হারায়। সুতরাং এই আয়াত আমাদের ভয়ও জাগায়, আশাও জাগায়। ভয় এই যে, অপচয়ের অভ্যাস আত্মাকে শয়তানের পথে টেনে নিতে পারে; আর আশা এই যে, ফিরে আসার দরজা এখনো খোলা। যে ব্যক্তি আজই থেমে যায়, সীমা শেখে, শোকর করে, ব্যয়কে পবিত্র করে, সে তার ঘরকে প্রশান্তির দিকে, সমাজকে ভারসাম্যের দিকে, আর নিজের আত্মাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ফিরিয়ে নেয়।

অতএব অপব্যয় কেবল হিসাবের ভুল নয়; এটি অন্তরের বিপর্যয়। যে হাত আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে ছড়িয়ে ফেলে অথচ তার হক চিনে না, সে ধীরে ধীরে নিজের ভেতরকার আলোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কখনো তা সম্পদের অপচয়, কখনো খাবারের অপমান, কখনো সময়ের নষ্ট হওয়া, কখনো সন্তানের সামনে এমন অভ্যাস গড়ে তোলা—যে অভ্যাস পরিবারকে শৃঙ্খলার বদলে ভোগে শাসিত করে। কুরআন আমাদের শেখায়, রিজিক আল্লাহর আমানত; আমানতকে হেলায় হারালে হৃদয়ও হেলায় নরম হয়, আর সেই নরম ভেতরেই শয়তানের পদচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের আয়, ব্যয়, আনন্দ, অভ্যাস, এমনকি নীরবতাকেও বিচার করে। আমি কি সত্যিই কৃতজ্ঞ, নাকি কেবল গ্রহণে অভ্যস্ত? আমি কি নিয়ামতকে আল্লাহর পথে ব্যবহার করছি, নাকি নিজের কামনা-বাসনার সামনে তা ভস্ম করে দিচ্ছি? যে অন্তর কৃতজ্ঞ, সে সংযমে সুন্দর হয়; যে পরিবার কৃতজ্ঞ, সেখানে সম্পদ বরকতের রূপ নেয়; যে সমাজ কৃতজ্ঞ, সেখানে ভোগ নয়, দায়িত্ব বড় হয়ে ওঠে। তাই আজ হৃদয়ের ভেতরে একটুকু তাওবা জাগুক—যেন আমরা অপচয়ের অন্ধকার ছেড়ে শোকরের আলোয় ফিরি, আর আল্লাহর সামনে নত হয়ে বলি: হে রব, তুমি যা দিয়েছ তা তোমারই পথে রাখতে শেখাও; আমাদেরকে শয়তানের সঙ্গ থেকে বাঁচিয়ে তোমার প্রিয় বান্দাদের কাতারে লিখে নাও।