এই আয়াতে মেরিয়াম আ. এর বিস্ময়ভরা প্রশ্ন আমাদের সামনে মানবিক অনুভূতির এক গভীর দৃশ্য খুলে দেয়। তিনি সন্তান লাভের কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে এমনটি হবে, যখন কোনো মানুষের স্পর্শও তাঁর জীবনে হয়নি। এখানে অবিশ্বাস নেই; আছে বিস্ময়, পবিত্রতার সাক্ষ্য, আর আল্লাহর কুদরতের সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি। উত্তরটি ছিল অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অসীম তাৎপর্যময়: আল্লাহ যা চান, তা-ই সৃষ্টি করেন। মানুষের পরিচিত নিয়ম, কারণ-পরিণামের হিসাব, সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাঁর ইচ্ছা কাজ করে।
সুরা আলে-ইমরানের এই অংশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মূলত হযরত মেরিয়াম আ. এবং হযরত ঈসা আ. কে কেন্দ্র করে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো পৃথক শানে নুযুল খুব বেশি প্রসিদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং পুরো আয়াতটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈসা আ. এর জন্মসংবাদ, মেরিয়ামের হৃদয়ের প্রতিক্রিয়া, এবং মানবজাতিকে এক মহান নিদর্শন দেখানোর বৃহত্তর কুরআনিক প্রেক্ষাপটে এসেছে। পরিবারে ইমরান, মেরিয়াম ও ঈসা আ. সম্পর্কিত এই বর্ণনা শুধু একটি অলৌকিক জন্মের কাহিনি নয়; এটি তাওহীদের এক জোরালো শিক্ষা—আল্লাহর জন্য অসম্ভব বলে কিছু নেই, এবং তিনি সৃষ্টিতে কারও সহযোগী নন।
‘কুন ফাইয়াকুন’—এই শব্দদ্বয় যেন বিশ্বাসের হৃদয়ে বজ্রের মতো আঘাত করে আবার শান্তিও দেয়। যখন মানুষ পথ খুঁজে পায় না, যখন যুক্তি থেমে যায়, যখন উপায়-উপকরণ শেষ হয়ে আসে, তখন আল্লাহর এই ঘোষণা স্মরণ করিয়ে দেয়: তাঁর সিদ্ধান্তের সামনে অক্ষমতা বলে কিছু নেই। তাই মেরিয়াম আ. এর প্রশ্ন আমাদের প্রশ্ন হয়ে ওঠে, আর আসমানী উত্তর আমাদের ঈমান হয়ে ওঠে। যে আল্লাহ শূন্যতা থেকে সৃষ্টি করেন, তিনিই আশা ভাঙা হৃদয়কে নতুন করে দাঁড় করাতে পারেন; কারণ তাঁর ইচ্ছার সামনে নামুমকিনও সম্ভাবনার রূপ নেয়।
এই জবাবের মধ্যে তাওহীদের এক মহিমান্বিত দরজা খুলে যায়। মানুষ জীবনের ঘটনার পেছনে কারণ খোঁজে, নিয়ম খোঁজে, সম্ভাবনা খোঁজে; কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি কোনো কারণের দাস নয়। তিনি কারণ সৃষ্টি করেন, আবার চাইলে কারণ ছাড়াই ফল ঘটান। তাই এখানে বার্তা শুধু মেরিয়াম আ. কে সান্ত্বনা দেওয়ার নয়; বরং মানবহৃদয়কে শেখানো যে রবের ইচ্ছা যখন উপস্থিত হয়, তখন অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। আমাদের চোখে যা বন্ধ, তাঁর কুদরতে তা সহজ; আমাদের হিসাব যেখানে থেমে যায়, তাঁর ফায়সালা সেখান থেকেই শুরু হয়।
কুরআন এখানে শুধু একটি অলৌকিক জন্মের খবর দিচ্ছে না; এটি আমাদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি আস্থা পুনর্গঠন করছে। জীবন যখন অযৌক্তিক লাগে, যখন প্রার্থনার উত্তর দেরি হয়, যখন উপায়হীনতা ঘনিয়ে আসে—এই আয়াত তখন বলে, তোমার রবের জন্য ‘কিভাবে’ প্রশ্নটি সীমাবদ্ধতা, কিন্তু তাঁর জন্য নয়। তিনি যখন কোনো বিষয় স্থির করেন, তখন সেটি অস্তিত্বের পথে চলে আসে। এই উপলব্ধি হৃদয়কে আল্লাহমুখী করে, অহংকার ভেঙে দেয়, আর বান্দাকে শিখিয়ে দেয় যে সত্যিকারের নিরাপত্তা মানুষের হাতে নয়, বরং সেই রবের হাতে যিনি বলেন, হয়ে যাও, আর তা হয়ে যায়।
এই “কুন ফায়াকুন” আমাদের ঈমানকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে বান্দা আর তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যায়, আর রবের অসীম ক্ষমতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা সাধারণত জীবনকে দেখি সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার কষ্টকর হিসাব দিয়ে; কিন্তু আল্লাহর জন্য কোনো জটিলতা নেই, কোনো অসহায়ত্ব নেই, কোনো দেরি নেই। মেরিয়াম আ. এর বিস্ময় আমাদেরও শেখায়—দোয়া করতে করতে কখনো যদি হৃদয় কেঁপে ওঠে, তবুও তা দুর্বলতা নয়; বরং সেই সত্যের সামনে থেমে যাওয়া, যে সত্য বলে: আল্লাহ চাইলে শূন্য থেকেও জীবন ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
এই আয়াত কেবল হযরত ঈসা আ. এর জন্মের অলৌকিক সংবাদ নয়, এটি প্রতিটি মুমিনের অন্তরে তাওহীদের এক গভীর দরজা খুলে দেয়। কারণ এখানে শিক্ষা শুধু একটি বিশেষ ঘটনা নিয়ে নয়; শিক্ষা হলো আল্লাহর ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণের সৌন্দর্য। বান্দা যখন বুঝে ফেলে যে তার পরিকল্পনা সীমিত, তার শক্তি ভঙ্গুর, তার হাতের কারণগুলোও আল্লাহরই সৃষ্টি—তখন সে আল্লাহর ওপর ভরসার আসল মানে উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে নামিয়ে আনে, আর হৃদয়কে বিস্ময়, বিনয় এবং দৃঢ় ঈমানে ভরে দেয়।
মেরিয়াম আ. এর জীবনে যে পবিত্রতা, যে নির্লিপ্ততা, যে নির্ভরতা ছিল, এই আয়াত তারই ওপর আল্লাহর কুদরতের মুকুট পরিয়ে দেয়। আল্লাহ যখন কোনো বিষয় স্থির করেন, তখন কোনো মানবিক যুক্তি সেই সিদ্ধান্তকে আটকে রাখতে পারে না। তাই মুমিনের কাজ হলো প্রশ্নের শেষে সন্দেহ নয়, বিশ্বাস রাখা; সীমার সামনে বিদ্রোহ নয়, সিজদা রাখা। আজও এই আয়াত আমাদের বলে—অসম্ভব বলে তুমি যা ভাবছ, তা হয়তো শুধু তোমার দৃষ্টির সীমা; তোমার রবের জন্য তা এক নিমেষের আদেশমাত্র।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মুমিনের হৃদয় নরম হয়, অহংকার ভেঙে যায়, আর দোয়ার ভাষা বদলে যায়। আমরা বুঝি, আমাদের দুর্বলতা কোনো শেষ কথা নয়; বরং সেটাই আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দরজা। জীবনের অসম্ভব মনে হওয়া জায়গাগুলোতে হতাশা নয়, আল্লাহর উপর আস্থা চাই; কারণ যিনি মেরিয়াম আ. কে মা হওয়ার সুসংবাদ দিতে পারেন, তিনি তাঁর বান্দার জন্যও এমন পথ খুলে দিতে পারেন, যা কল্পনায়ও আসেনি। এই আয়াত আমাদের শেখায়—প্রতিদিনের ভরসা মানুষ নয়, পরিকল্পনা নয়, নিজের শক্তিও নয়; একমাত্র আল্লাহ।
অতএব, যখন অন্তর ক্লান্ত হবে, যখন যুক্তি থেমে যাবে, যখন দুনিয়ার হিসাব অচল হয়ে পড়বে, তখন এই আয়াতকে মনে রাখা উচিত—আল্লাহ যা চান, তাই হয়। এখানেই মুমিনের শান্তি, এখানেই তাওহীদের সৌন্দর্য, এখানেই দোয়ার সাহস। অসম্ভবের দেয়ালও তাঁর সামনে কেবল একটি পর্দা; ইচ্ছা করলেই তিনি তা সরিয়ে দেন। এই বিশ্বাস নিয়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, সে হারিয়ে যায় না—সে নতুন করে জেগে ওঠে।