সূরা হূদের এই আয়াতে শু‘আয়ব (আ.)-এর কণ্ঠে এক অগ্নিময় প্রশ্ন উঠে আসে: মানুষের গোত্র, আত্মীয়তা, দলীয় প্রভাব—এসব কি আল্লাহর চেয়ে বেশি শক্তিশালী? তিনি যেন তাঁর জাতির অন্তরের কৃত্রিম ভরসাগুলো ভেঙে দিচ্ছেন। মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে গিয়ে কোনো ব্যক্তি, বংশ, বাজার-ক্ষমতা, কিংবা সামাজিক অবস্থানকে আশ্রয় বানায়, তখন সেই আশ্রয়ই একদিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। আয়াতের ভাষা খুব তীক্ষ্ণ, কিন্তু এর ভেতরেই আছে দয়ার শেষ আহ্বান—অহংকারের আগে জেগে ওঠো।

‘তোমরা তাঁকে পেছনে ফেলে রেখেছ’—এই কথাটির মধ্যে কেবল গাফিলতি নয়, আছে ইচ্ছাকৃত অবহেলার তীব্রতা। আল্লাহকে সামনে না রেখে জীবন সাজানো মানে সত্যকে জানার পরও তাকে দূরে সরিয়ে রাখা; হৃদয়ের কেন্দ্র থেকে তাঁকে সরিয়ে মানুষের হাতিয়ার ও সমর্থনের দিকে ঝুঁকে পড়া। আর নবীর এ সতর্কবাণী আমাদেরও ছুঁয়ে যায়, কারণ কেবল কোনো প্রাচীন জাতি নয়, প্রতিটি যুগেই মানুষ প্রভাবের নেশায় আল্লাহকে পিছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যার সামনে সবকিছু খোলা, যাঁর জ্ঞান ঘিরে রাখে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছু, তাঁর কাছ থেকে কোনো কাজই আড়াল থাকে না।

এই প্রসঙ্গে শু‘আয়ব (আ.)-এর জাতির ঐতিহাসিক-সামাজিক বাস্তবতাও স্মরণীয়: তারা ছিল এমন এক সমাজ, যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, মাপে-ওজনে প্রতারণা, সামাজিক প্রভাব এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষার জাল জড়িয়ে গিয়েছিল। নির্দিষ্ট কোনো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে যেটুকু নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তা হলো—একজন নবী তাদের অর্থনৈতিক ও নৈতিক বিকৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাওহীদ ও ইনসাফের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। এই আয়াত সেই বৃহত্তর সংঘাতেরই হৃদয়স্পন্দন: যখন আল্লাহর আদেশ বনাম মানুষের প্রভাব, তখন নবী কখনো কূটকৌশলের কাছে মাথা নত করেন না; তিনি মনে করিয়ে দেন, মানুষের ভরসা ভাঙতে পারে, কিন্তু আল্লাহর পরিবেষ্টন থেকে কেউ বেরোতে পারে না।

শু‘আয়ব (আ.)-এর এ কথায় জাতির সামনে এক নির্মম আয়না ধরা পড়ে। তোমাদের কাছে কি মানুষের দল, বংশ, পরিচিতি, প্রভাব আল্লাহর চেয়ে বড় হয়ে গেল? যে হৃদয় আল্লাহকে ছোট করে দেখে, সে আসলে নিজের ধ্বংসের পথই প্রশস্ত করে। মানুষ ভেবে নেয়—আমার পক্ষে আছে আমার লোক, আমার পেছনে আছে আমার শক্তি, আমার জন্য দাঁড়াবে আমার সমাজ; কিন্তু নবীর প্রশ্ন সেই সব মিথ্যা আশ্রয়কে মুহূর্তে নগ্ন করে দেয়। যাকে পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে, তিনি তো তবু সামনেই আছেন—দেখছেন, জানছেন, ঘিরে রেখেছেন; মানুষের বিস্মৃতি তাঁর আয়ত্তকে কমায় না, বরং মানুষেরই অন্ধকার বাড়ায়।

এই আয়াতে গাফিলতির এক গভীর, কাঁপিয়ে দেওয়া ছবি আছে। আল্লাহকে পেছনে ফেলে রাখা মানে কেবল ভুলে যাওয়া নয়; মানে জীবনকে এমনভাবে সাজানো, যেন তাঁর সন্তুষ্টি শেষ বিবেচনা, তাঁর হুকুম শেষ কথা, তাঁর ভয় শেষ সীমা। তখন মানুষ বাজার, গোত্র, ক্ষমতা, সম্পর্ক, কৌশল—সবকিছুকে সামনে আনে, আর রবকে সরিয়ে দেয় অন্তরের পর্দার আড়ালে। কিন্তু নবী স্মরণ করিয়ে দেন: আমার প্রতিপালক তোমাদের সব কাজকে ঘিরে আছেন। অর্থাৎ কোনো প্রতারণা আড়ালে থাকে না, কোনো অন্যায় হারিয়ে যায় না, কোনো অহংকার আকাশে উঠে অদৃশ্য হয় না; সবই আল্লাহর ব্যাপক জ্ঞানে বন্দী, সবই একদিন হিসাবের নীরব দরজায় পৌঁছে যাবে।
শু‘আয়ব (আ.)-এর এই সতর্কবাণী শুধু এক জাতির জন্য নয়, প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য। যখন মানুষ আল্লাহর চেয়ে মানুষকে বেশি ভয় পায়, তখন সে আল্লাহর সামনে নয়, ভিড়ের সামনে জীবন কাটায়; আর ভিড়ের বিচার কখনো ন্যায় হয় না, কখনো স্থায়ী হয় না। কিন্তু তাওহীদ শেখায়—আল্লাহই যথেষ্ট, আর তাঁর সামনে দাঁড়ানো মানুষই সবচেয়ে দুর্বল। তাই যে অন্তর আজও জেগে আছে, সে শুনুক: প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, সম্পর্ক ভঙ্গুর, শক্তি ধার করা; আর আল্লাহর আয়ত্ত চিরন্তন। তাঁকে সামনে না রাখলে জীবনই পিছনের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, আর তাঁকে সামনে রাখলে ধ্বংসের মুখেও হৃদয় আলো পায়।

শু‘আয়ব (আ.)-এর এই প্রশ্নে কেবল তাঁর জাতির কানে নয়, মানুষের আত্মতৃপ্ত হৃদয়ের ভেতরেও আঘাত লাগে। তিনি যেন জিজ্ঞেস করছেন—তোমরা কি সত্যিই মানুষের গোত্র, পরিচিতি, প্রভাব, দল, সুরক্ষা-জালকে আল্লাহর চেয়ে বড় মনে করছ? যে সমাজে ন্যায়ের বদলে স্বার্থ, তাওহীদের বদলে লোকদেখানো ভরসা, আল্লাহভীতির বদলে লোকলজ্জা বড় হয়ে ওঠে, সেখানে অবাধ্যতা শুধু ব্যক্তিগত পাপ থাকে না; তা পুরো সমাজের ভিত নরম করে দেয়। মানুষ যখন আল্লাহকে পিছনে সরিয়ে দেয়, তখন তার সামনে থাকা জিনিসগুলোও একদিন পিছলে পড়ে যায়—কারণ আল্লাহর বদলে যা-ই ভরসা বানানো হোক, তা নড়বড়ে, ক্ষণস্থায়ী, এবং পরীক্ষা-সাপেক্ষ।

‘তোমরা তাঁকে পেছনে ফেলে রেখেছ’—এই কথার মধ্যে আছে গাফিলতির চেয়েও বেশি কিছু। এখানে আছে ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা, হৃদয়ের অবমাননা, এবং সেই অহংকার, যা সত্যকে জানার পরও মানতে চায় না। শু‘আয়ব (আ.) তাদের স্মরণ করিয়ে দেন: আমার আপনজন, আমার গোত্র, আমার চারপাশের মানুষ—এসব কি তোমাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে? নবীর কণ্ঠে এ প্রশ্ন একদিকে দয়া, অন্যদিকে সতর্ক আগুন; কারণ যারা শক্তিকে ভুল জায়গায় রাখে, তাদের শক্তিই একদিন পরীক্ষার কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। আল্লাহকে পেছনে রেখে মানুষ সামনে দৌড়ালে, সে দৌড় শেষ পর্যন্ত শূন্যতার দিকে যায়।

আর আয়াতের শেষ বাক্যটি হৃদয়কে থামিয়ে দেয়: ‘নিশ্চয় আমার রব তোমাদের কাজসমূহ পরিবেষ্টন করে আছেন।’ কী নিখুঁত, কী ভীতিকর, কী শান্তিময় ঘোষণা! কিছুই আড়ালে নেই, কিছুই হারায় না, কিছুই অদৃশ্য হয় না। মানুষের সামনে লুকোনো আচরণ, মাপে কারচুপি, নীরব জুলুম, অন্তরের কপটতা—সবই সেই পরিবেষ্টনের মধ্যে ধরা। তবু এ কথায় শুধু শাস্তির ভয় নেই; আছে ফিরে আসার দরজা। কারণ যে রব সবকিছু ঘিরে আছেন, তিনি তাওবাকেও ঘিরে আছেন, কান্নাকেও ঘিরে আছেন, ভাঙা হৃদয়ের আশ্রয়কেও ঘিরে আছেন। তাই আজ আমাদেরও শুনতে হয় শু‘আয়ব (আ.)-এর সেই জাগিয়ে তোলা আহ্বান—আল্লাহকে পেছনে ফেলে নয়, তাঁকেই আগে রেখে বাঁচো; কারণ শেষ পর্যন্ত শুধু তাঁরই সামনে দাঁড়াতে হবে, আর তখন মানুষের প্রভাব নয়, আমলের সত্যটাই কথা বলবে।

শু‘আয়ব (আ.)-এর এ উচ্চারণে একদিকে যেমন আছে নরম অথচ অটল তিরস্কার, তেমনি আছে ঈমানের ভারী সাক্ষ্য। তিনি তাঁর জাতিকে যেন বলছেন, তোমরা যাকে অবলম্বন ভেবেছ, তা কত ক্ষণস্থায়ী! ভাই-বন্ধু, গোত্র, লোকবল, সামাজিক প্রভাব—এসব কি আল্লাহর সামনে কোনো দেয়াল হতে পারে? মানুষ যখন ক্ষমতার নেশায় সত্যকে উপেক্ষা করে, তখন তার সবচেয়ে বড় বিপদ হয় এই যে, সে আল্লাহকে দূরে ঠেলে দেওয়াকেই নিরাপত্তা মনে করতে শুরু করে। অথচ যিনি সবকিছুকে ঘিরে আছেন, তাঁর জ্ঞান থেকে একটি নিঃশ্বাসও আড়াল নয়; প্রকাশ্য আচরণ যেমন ধরা পড়ে, অন্তরের গোপন কৌশলও তেমনি তাঁর আয়ত্তে।

এই আয়াত হৃদয়কে একটা কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: আমি কাকে পেছনে ফেলে এগোচ্ছি? যদি আমার সিদ্ধান্তে আল্লাহর ভয় না থাকে, যদি আমার সম্পর্ক, সম্পদ, প্রভাব, পরিচয়—সবকিছুই আমাকে তাঁর স্মরণ থেকে সরিয়ে দেয়, তবে আমি ধীরে ধীরে এমন এক অন্ধতার দিকে চলেছি, যেখানে মানুষ নিজের পতনকেই সাফল্য ভাবতে শেখে। নবীদের আহ্বান কখনো কেবল অতীতের জাতির জন্য ছিল না; তা আজও আমাদের ঘরের ভেতর, আমাদের ব্যবসায়, আমাদের ন্যায়-অন্যায় বাছাইয়ে, আমাদের গোপন ও প্রকাশ্য জীবনে কড়া নীরবতার মতো দাঁড়িয়ে আছে। আল্লাহকে পেছনে ফেলে এগোনো মানে আসলে নিজের বুকের ওপর হিসাবের পর্দা টেনে রাখা—যা একদিন হঠাৎ সরে যাবে। তখন ভরসার নামে যা আঁকড়ে ধরা হয়েছিল, তার কিছুই পাশে থাকবে না; থাকবে শুধু সেই প্রভু, যাঁর আয়ত্ত থেকে কোনো কাজই বেরিয়ে যায় না।