সামুদের ইতিহাসে সালেহ (আ.)-এর ডাক কোনো সাধারণ উপদেশ ছিল না; তা ছিল গুমরাহির জমাট পাহাড়ে নেমে আসা এক তীক্ষ্ণ আলোর রেখা। তিনি নিজের জাতিকে সম্বোধন করে বলেন, আল্লাহরই ইবাদত করো—তাঁকে ছাড়া তোমাদের আর কোনো সত্য উপাস্য নেই। এই বাক্যেই ভেঙে পড়ে মানুষের তৈরি সব ভরসা, সব মিথ্যা আশ্রয়, সব অহংকারের দেয়াল। যে জাতি নিজেদের শক্তি, শিল্প, স্থাপত্য, প্রাচুর্য আর জমিনে দাপট নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়ে, তাদের সামনে নবী এসে দাঁড়িয়ে বলেন: তোমাদের প্রথম সত্য হলো তোমাদের রবকে চেনা, তাঁর সামনে নত হওয়া। কারণ তোমরা শূন্য থেকে আসোনি; মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি, আর মাটির বুকেই তোমাদের জীবন ও বসতি—এই স্মরণই মানুষকে বিনয়ী করে, আর বিনয়ই তাওহীদের দরজা খুলে দেয়।
আয়াতের আরেকটি গভীর স্তর হলো ইস্তিগফার ও তাওবার ডাক। সালেহ (আ.) শুধু শিরক ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেননি; তিনি বলেছেন, ক্ষমা চাও, তারপর আল্লাহর দিকে ফিরে এসো। অর্থাৎ গুনাহের অন্ধকার থেকে বের হওয়ার পথ কেবল আফসোস নয়, কেবল ভয়ও নয়—আছে প্রত্যাবর্তন, আছে সংশোধন, আছে রবের দিকে ফিরে আসার বাস্তব যাত্রা। এখানে আল্লাহকে এমন এক রব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যিনি দূরে নন, বরং নিকটে; যিনি শুধু নির্দেশ দেন না, আহ্বান শুনেও থাকেন। এ কথায় মুমিনের অন্তর আশায় ভরে ওঠে: যে সত্তা মানুষকে মাটি থেকে গড়েছেন, তিনি তার ভাঙা হৃদয়কেও পুনর্গঠন করতে পারেন। যে সত্তা বান্দাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর কাছে ফিরে আসা কখনো ব্যর্থ হয় না।
সামুদ জাতির প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান বিশেষভাবে অর্থবহ। তারা ছিল শক্তি, স্থায়িত্ব ও নির্মাণকুশলতার জন্য পরিচিত এক সমাজ; কিন্তু বাহ্যিক উন্নতি যখন অন্তরের ঈমানকে ঢেকে ফেলে, তখন জাতির পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা। এই আয়াত আমাদের শেখায়—সভ্যতার উচ্চতা মানুষের নিরাপত্তা নয়, নৈতিক দৃঢ়তাই নিরাপত্তা। নবীদের সংগ্রাম বারবার একই সত্য উচ্চারণ করে: সমাজ যতই অগ্রসর হোক, যদি তাওহীদের ভিত না থাকে, তবে তা বালির ওপর নির্মিত প্রাসাদের মতো। সালেহ (আ.)-এর এই ডাক আজও জীবন্ত; এটি প্রত্যেক হৃদয়কে প্রশ্ন করে—আমি কি সত্যিই আল্লাহর দিকে ফিরছি, নাকি নিজের গড়া মিথ্যা আশ্রয়েই পড়ে আছি?
সালেহ (আ.)-এর দাওয়াতের ভিতরে একটি গভীর স্মরণ আছে—মানুষকে সে তার নিজের মূলের কাছে ফিরিয়ে আনা। আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর সেই পৃথিবীতেই তোমাদের বসতি দিয়েছেন। এই কথার মধ্যে শুধু সৃষ্টি-রহস্য নেই, আছে অহংকার ভাঙার অমোঘ ঔষধ। মানুষ যখন নিজেকে মজবুত, স্বয়ংসম্পূর্ণ, ক্ষমতাবান ভেবে ফুলে ওঠে, তখন কুরআন তাকে মাটির দিকে ফেরায়। যে দেহ মাটি থেকে, যে শক্তি আল্লাহর দান, যে শ্বাস তাঁর অনুগ্রহ—তার পক্ষে গর্বের কি আছে? পৃথিবী আমাদের সম্পত্তি নয়, আমানত। বসতি মানে মালিকানা নয়; মানে দায়িত্ব, পরীক্ষা, আর একদিন ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি।
এরপর সালেহ (আ.)-এর ডাক আরও কোমল, আরও কাঁপানো: ক্ষমা চাও, তারপর তাঁরই দিকে ফিরে এসো। যেন বলা হচ্ছে, শুধু ভুল স্বীকার করলেই হয় না; আল্লাহর দরবারে প্রত্যাবর্তন চাই। ইস্তিগফার হৃদয়কে পরিষ্কার করে, আর তাওবা পথের দিক ঠিক করে। কারণ রব দূরে নন, তিনি নিকটেই আছেন; তিনি শুধু শাস্তির মালিক নন, তিনি ডাকার উত্তরদাতা, ভাঙা হৃদয়ের আশ্রয়, ফিরে আসা বান্দার করুণা। এই আয়াত আমাদের শেখায়—মানুষের পতন শুরু হয় যখন সে নিজের মাটির কথা ভুলে যায়, আর মুক্তি শুরু হয় যখন সে আবার নত হয়, ক্ষমা চায়, এবং রবের দিকে ফিরে আসে।
সালেহ (আ.)-এর এই আহ্বান মানুষের অন্তরের ভেতরকার সবচেয়ে গভীর ভুলকে স্পর্শ করে। মানুষ যখন নিজের শক্তি, বংশ, সম্পদ, স্থাপত্য কিংবা সভ্যতাকে ভরসা বানায়, তখন সে ধীরে ধীরে রবের স্মৃতি থেকে দূরে সরে যায়। আর তখনই নবী এসে বলে দেন—তোমাদের সৃষ্টি মাটি থেকে, তোমাদের বসতি মাটির বুকেই, তোমাদের গৌরবেরও শেষ ঠিকানা সেই মাটিই। এ কথা অবমাননা নয়; এ কথা জাগরণ। তুমি মাটি থেকে উঠেছ, তাই অহংকারের শিখরে নয়, বিনয়ের মেহরাবে তোমার দাঁড়ানো উচিত। যে মানুষ নিজের উৎস ভুলে যায়, সে নিজের গন্তব্যও ভুলে যায়; আর যে নিজের রবকে ভুলে যায়, সে জীবনের মানেও হারায়।
এই আয়াতে ইস্তিগফার আর তাওবা যেন দুটি দরজা নয়, বরং একেকটি শ্বাসের মতো আবশ্যক সত্য। গুনাহ মানুষকে শুধু অপরাধী করে না, তাকে কঠিনও করে তোলে; হৃদয় ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায়, চোখের জল শুকিয়ে যায়, তাওবার তৃষ্ণা মরে যায়। তাই সালেহ (আ.) বলেন, ক্ষমা চাও, তারপর ফিরে এসো। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ফেরা কোনো দূরের যাত্রা নয়; এটি ভাঙা হৃদয়ের স্বর, অনুতপ্ত জিহ্বার দোয়া, আর সংশোধিত জীবনের সংকল্প। এখানে ভয় আছে—কারণ গাফলতের পথ বিপজ্জনক; আবার আশা আছে—কারণ তোমাদের রব দূরে নন, তিনি নিকটে, ডাকে সাড়া দেন, প্রত্যাবর্তনকারীর জন্য দরজা বন্ধ করেন না।
সামুদের মতো এক জাতির সামনে এই ডাক ছিল কেবল ব্যক্তিগত নসিহত নয়; তা ছিল সমগ্র সমাজের আত্মরক্ষার শেষ আহ্বান। যখন সমাজ আল্লাহর আনুগত্য ছেড়ে শক্তি, ঐশ্বর্য ও অহংকারে ডুবে যায়, তখন তার ভেতরেই ধ্বংসের বীজ জন্ম নেয়। সালেহ (আ.) সেই পতনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিলেন—তোমাদের আসল নিরাপত্তা আল্লাহর দিকে ফেরা, আর তোমাদের আসল সম্মান তাঁর ইবাদতে নত হওয়া। যে জাতি ইস্তিগফার হারায়, সে নিজের ভবিষ্যৎ হারায়; আর যে তাওবা গ্রহণ করে, সে ভাঙনের মধ্যেও আল্লাহর রহমতের পথ খুঁজে পায়। এই আয়াত তাই আজও হৃদয়কে জিজ্ঞেস করে: তুমি কিসের ওপর দাঁড়িয়ে আছ, আর কাদের দিকে ফিরে যাচ্ছ?
কিন্তু আল্লাহর নবীর কণ্ঠ সেখানে দরজা খুলে দেয়—ইস্তিগফার করো, তারপর তাওবা করো। এ যেন ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে ডুবে যাওয়া মানুষকে উদ্দেশ করে বলা, এখনও দেরি হয়নি; এখনও তোমার রব কাছে আছেন, শুনেন, গ্রহণ করেন। এই ‘কাছেই আছেন’ বাক্যটি দূরের আকাশকে ভেঙে এনে অন্তরের খুব কাছে বসিয়ে দেয়। যে রব মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জানেন মাটির সন্তানের দুর্বলতা; তাই তাঁর দিকে ফেরা লজ্জার নয়, বাঁচার রাস্তা।
সামুদের সামনে দাঁড়িয়ে সালেহ (আ.) আমাদেরও দাঁড় করিয়ে দেন। আমরা কি আজও শক্তির মোহে, স্বাচ্ছন্দ্যের নেশায়, গাফিলতির ঘুমে রবকে ভুলে যাচ্ছি? যদি ভুলে গিয়ে থাকি, তবে এই আয়াতের দরজা এখনো খোলা। আল্লাহর ইবাদতে ফিরে আসা, ক্ষমা চাওয়া, তাওবা করা—এগুলো কোনো পরাজয়ের ভাষা নয়; এগুলো আত্মাকে পুনর্জন্ম দেওয়ার ভাষা। যে অন্তর এই ডাক শুনে নরম হয়, সে-ই আসলে জেগে ওঠে। আর যে বান্দা সত্যিই ফিরে আসে, তার জন্য রব শুধু ক্ষমাকারী নন, নিকটবর্তী, সাড়া-দাতা, আশ্রয়দাতা।