হে আমার জাতি! আমি তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না—এই একটি বাক্যে নবীদের দাওয়াতের পবিত্রতা কত নিঃশব্দে, কত গভীরভাবে প্রকাশিত হয়। নূহ আলাইহিস সালামের কণ্ঠে এই ঘোষণা যেন কেবল একটি অস্বীকৃতি নয়, বরং সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বচ্ছ আত্মার সাক্ষ্য। তিনি মানুষকে ডেকেছেন, কিন্তু মানুষের সম্পদ, প্রশংসা, ক্ষমতা বা আনুগত্যের বিনিময়ে নয়। তাঁর আহ্বান ছিল স্রষ্টার দিকে; তাই তাঁর শ্রমের প্রতিদানও সেই স্রষ্টার কাছেই ন্যস্ত। এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর পথে ডাকা যদি সত্যিই আল্লাহর জন্য হয়, তবে তার অন্তরটা থাকতে হবে লোভশূন্য, অহংকারশূন্য, দুনিয়ামুক্ত।
আমি এজন্য তোমাদের কাছে কিছু চাই না—এই কথার ভেতরে তাওহীদের এক উজ্জ্বল শিক্ষা লুকিয়ে আছে। যিনি আমাকে পয়দা করেছেন, পুরস্কারও তাঁর কাছেই। অর্থাৎ আমার জীবন, আমার যোগ্যতা, আমার ডাক, আমার ধৈর্য—সবকিছুর মূলও তিনি, গন্তব্যও তিনি। এখানে মানুষের ভেতরের সেই ভ্রান্ত মানসিকতার জবাব আছে, যেখানে সত্য-বক্তাকে আগে তার লাভ-লোকসানের খাঁচায় বন্দি করে দেখা হয়। নবীর কণ্ঠ বলে, সত্যের মূল্য মানুষের বাজারে নির্ধারিত হয় না; সত্যের প্রতিদান সেই আল্লাহর কাছে, যিনি সৃষ্টি করেন, লালন করেন, পথ দেখান। তাই দাওয়াত যদি আন্তরিক হয়, তার শক্তি হয় আকাশের মতো নির্লোভ, আর তার স্থায়িত্ব হয় পাহাড়ের মতো অটল।
তবু তোমরা কেন বোঝ না?—এই প্রশ্নে শুধু বুদ্ধির আহ্বান নেই, হৃদয়ের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা আছে। এ কথায় নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর জাতির এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনার দিকে আঙুল তুলেছেন: তারা সত্যকে শুনছে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতা বুঝতে চাইছে না; তারা একজন নিঃস্বার্থ আহ্বানকারীকে দেখছে, কিন্তু তাঁর আহ্বানের উৎস চিনছে না। সূরা হূদের বৃহৎ পরিসরে এটি সেই অবিচল সংগ্রামেরই অংশ, যেখানে নবীগণ বারবার তাওহীদের দিকে ডাক দেন, আর জাতিগুলো বারবার দুনিয়ার অহংকার, গোঁড়ামি ও অন্ধ অনুকরণে আটকে থাকে। এই আয়াত তাই শুধু ইতিহাসের কথা বলে না; আজও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রাখে—আমরা কি সত্যকে বুঝছি, নাকি ব্যক্তিস্বার্থ, পক্ষপাত আর কুপ্রবৃত্তির কুয়াশায় তাকে অস্বীকার করছি?
এই আয়াতে নবীর কণ্ঠে এমন এক নির্মলতা শোনা যায়, যা দুনিয়ার সমস্ত কৃত্রিমতা ভেদ করে অন্তরে গিয়ে আঘাত করে। তিনি যেন বলছেন, সত্যের পথে দাঁড়ানো কোনো ব্যবসা নয়, কোনো দরকষাকষি নয়, কোনো মানুষের মন জয়ের কৌশলও নয়। দাওয়াতের ভাষা যখন লেনদেনমুক্ত হয়, তখন সেটি মানুষের ওপর নয়, সরাসরি হৃদয়ের ওপর কাজ করে। কারণ যে ডাক নিজের স্বার্থে উচ্চারিত হয়, তা শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে যায়; আর যে ডাক স্রষ্টার জন্য উচ্চারিত হয়, তা সময়ের উল্টো স্রোতেও টিকে থাকে। নূহ আলাইহিস সালামের এই ঘোষণা তাই শুধু এক নবীর জবাব নয়, বরং প্রত্যেক সত্য-অভিযাত্রীর জন্য এক নীরব মানদণ্ড—আমি কি মানুষকে ডাকছি, নাকি মানুষের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য গড়ছি?
হে আমার জাতি! আমি তোমাদের কাছে কোনো মজুরি চাই না—এই বাক্যটি শুধু একটি ঘোষণা নয়, এটি অন্তরের পবিত্রতার সাক্ষ্য। যে ডাকে পার্থিব লাভের গন্ধ লেগে থাকে, সে ডাকে সন্দেহ জাগে; কিন্তু নবীর আহ্বান আসে এমন এক অন্তর থেকে, যা নিজের জন্য কিছু চায় না, মানুষের প্রশংসাও নয়, ক্ষমতাও নয়, ভোগও নয়। তিনি ডাকেন, কারণ সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না। তিনি বোঝান, কারণ জাতির অন্ধত্ব তার নিজের ক্ষতি। আর এই আয়াতে সেই নির্মলতা আমাদের বিব্রত করে, কারণ আমরা কতবার সত্যকেও হিসাবের পাতায় মেপেছি, কতবার নেক আমলকেও প্রতিদানের খাঁচায় বন্দি করেছি। অথচ আল্লাহর পথে দাঁড়ানো মানে নিজের হৃদয়কে এমনভাবে শুদ্ধ করা, যেন সেখানে ব্যক্তিগত লেনদেনের ছায়াও না থাকে।
আমার মজুরী তাঁরই কাছে যিনি আমাকে পয়দা করেছেন—এই একটি বাক্যে তাওহীদের আকাশ খুলে যায়। সৃষ্টি যার, রিজিক যার, হৃদয় যার, ফিরিয়ে নেওয়াও যার; তবে পুরস্কার কেন মানুষের হাতে খুঁজব? নবীর যুক্তি এখানে সরল, কিন্তু আঘাতকারী: যদি তোমরা আমাকে মানুষ ভেবে ছোট করো, তবে আমাকে সৃষ্টি করা রবকে কীভাবে ভুলে থাকো? যিনি আমাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তিনিই আমার শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করবেন। এ কথা শুধু নবীর জন্য নয়, প্রতিটি বিশ্বাসীর জন্য আত্মজিজ্ঞাসা। আমরা কি দুনিয়ার মাপে আল্লাহর কাজ করছি, নাকি আল্লাহর জন্য দুনিয়াকে ত্যাগ করছি? আমাদের নিয়ত কি নির্মল, না ভেতরে লুকিয়ে আছে সুনাম, স্বীকৃতি, স্বার্থের ক্ষুদ্র দাবী?
তবু তোমরা কেন বোঝ না?—এই প্রশ্নের মধ্যে করুণা আছে, কঠোরতাও আছে। কারণ বোঝার দরজা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ প্রমাণের অভাবে নয়, হৃদয়ের অসুস্থতায় হেরে যায়। সমাজ যখন নবীর কথা শুনে না, তখন আসলে সে নিজের ভবিষ্যৎকেই অস্বীকার করে। এই না বোঝাই শেষ পর্যন্ত জাতির পতনের কারণ হয়: সত্যের সতর্কবাণীকে অবহেলা, আল্লাহর একত্বকে তুচ্ছ করা, এবং আত্মাকে জবাবদিহির বাইরে ভাবা। অথচ প্রত্যেকেরই ফিরে যেতে হবে সেই রবের দিকে, যিনি পয়দা করেছেন এবং যাঁর কাছেই সব হিসাব জমা। এই আয়াত তাই আমাদের জাগিয়ে দেয়—অন্তরকে পরীক্ষা করো, নিয়তকে পরিষ্কার করো, সত্যের সামনে নত হও। কারণ যে সত্য নিঃস্বার্থ, সে সত্যই মানুষকে বাঁচায়; আর যে হৃদয় বুঝে নেয়, সে হৃদয় আর অন্ধকারে থাকে না।
নূহ আলাইহিস সালামের এই বাক্য আমাদের ভেতরের বহু অজুহাতকে ভেঙে দেয়। মানুষ যখন সত্য শোনে, তখন অনেক সময় প্রথম প্রশ্ন হয় না—এটা কি আল্লাহর কথা? প্রথম প্রশ্ন হয়—এর পেছনে কার লাভ আছে? কার স্বার্থ? কে কী পাচ্ছে? অথচ নবীদের দাওয়াত এমন এক পবিত্রতা নিয়ে আসে, যেখানে পার্থিব চুক্তির কোনো স্থান নেই। তারা মানুষকে ডাকেন, কিন্তু মানুষের সামনে হাত পাতেন না। তারা হৃদয়কে জাগান, কিন্তু হৃদয়ের উপর দখল চান না। এ কারণেই তাদের কণ্ঠে সত্য এত ভারী, এত নিরাভরণ, এত অমলিন। যিনি সৃষ্টি করেছেন, প্রতিদানও তাঁর কাছেই; আর যে অন্তর এই সত্য বুঝতে পারে, সে আর দুনিয়ার মাপে আখিরাতকে মাপতে পারে না।
তবু তোমরা কেন বোঝ না?—এই প্রশ্নটি কেবল সেই জাতির জন্য নয়; এটি প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য আয়নার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা কি সত্যিই বুঝি, নাকি কেবল শুনি? আমরা কি স্রষ্টার ডাকের সামনে নত হই, নাকি দুনিয়ার কোলাহলে তা হারিয়ে ফেলি? এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় খুব নরম হয়ে যায়, কারণ এখানে নবীর নিষ্কলুষতা যেমন দেখা যায়, তেমনি মানুষের কৃতঘ্নতার ছায়াও ধরা পড়ে। আজও আল্লাহর পথের প্রতিটি সত্য আহ্বানকে যদি আমরা সন্দেহের চোখে দেখি, যদি দাওয়াতকে লাভ-ক্ষতির পাল্লায় মাপি, তবে আমাদের ভেতরের অন্ধত্বই প্রকাশ পায়। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়—সত্যকে গ্রহণ করো বিনয়ের সঙ্গে, হৃদয় খুলে, কারণ যিনি তোমাকে বুদ্ধি দিয়েছেন, তিনিই তোমাকে হিদায়াতের আলোও দিতে পারেন।