সূরা হূদ ১১:৩৮ আমাদেরকে এক অদ্ভুত, কিন্তু চিরন্তন দৃশ্যের সামনে দাঁড় করায়। নূহ (আ.) নৌকা বানাতে লাগলেন—আর সেটি ছিল এমন এক কাজ, যা সেই সমাজের চোখে ছিল হাস্যকর, অস্বাভাবিক, প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই নির্মাণযাত্রা ছিল কেবল কাঠ, পেরেক আর পরিকল্পনার কাজ নয়; এটি ছিল ঈমানের এমন এক দৃশ্যমান ঘোষণা, যেখানে আল্লাহর আদেশ মানুষের বিদ্রূপের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। কওমের নেতারা পাশ দিয়ে যেতে যেতে তাঁকে উপহাস করত, কারণ তারা দেখছিল শুধু একটি নৌকা, কিন্তু দেখছিল না আগত সত্যের ছায়া; তারা দেখছিল হাতে-কলমে শ্রম, কিন্তু বুঝতে পারছিল না আসমানি ফয়সালার নীরব পদধ্বনি। আর নূহ (আ.)-এর কণ্ঠে যে জবাব আসে, তা ক্ষুদ্র মানুষের রাগ নয়, বরং নববী স্থিরতা: তোমরা যদি আমাদেরকে উপহাস কর, আমরাও এমন এক পরিণতির মুখোমুখি তোমাদের দেখব, যা তোমাদের এই হাসিকে ধ্বংসের সামনে নিস্তব্ধ করে দেবে।
এই আয়াতের ভেতরে শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নেই; আছে একটি জাতির নৈতিক পতনের চিত্র, আছে সত্যকে তুচ্ছ করার সামাজিক মানসিকতা, আছে আল্লাহর দূতকে অবজ্ঞা করার ভয়ংকর দুঃসাহস। কুরআন এখানে নূহ (আ.)-এর সংগ্রামকে এমনভাবে তুলে ধরে, যেন প্রতিটি যুগের মানুষ বুঝতে পারে—যে সমাজ নবীর সতর্কবার্তাকে বিদ্রূপের খোরাকে পরিণত করে, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের পতনের পথই প্রশস্ত করে। এই প্রসঙ্গের কোনো পৃথক, নির্ভরযোগ্য নির্দিষ্ট কারণ-নির্দেশ আমাদের সামনে নেই; তবে সূরা হূদের বৃহত্তর ধারায় নূহ (আ.)-এর কাহিনি মানবজাতির প্রথম বড় অস্বীকৃতি, তাওহীদের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান, এবং অবশেষে আল্লাহর শাস্তি ও মুমিনদের রক্ষার এক গভীর শিক্ষা হিসেবে এসেছে। এখানে সামাজিক বাস্তবতাও স্পষ্ট: ক্ষমতাবানরা প্রায়ই সত্যকে হেয় করে, কারণ সত্য তাদের অহংকারে আঘাত করে।
আর তাই এই আয়াত আমাদের অন্তরে এক কঠিন প্রশ্ন ফেলে দেয়—আমি কি সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে অবিচল থাকতে পারি, যখন চারপাশের লোকেরা হাসে? নূহ (আ.)-এর নৌকা নির্মাণ ছিল ধৈর্যের দীর্ঘ ইবাদত, এক অবিরাম আমল, যা তাড়াহুড়ো চায়নি, অভিযোগ চায়নি; সে চেয়েছিল আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা। এর মধ্যেই তাওহীদের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়: মানুষের দৃষ্টির রায় চূড়ান্ত নয়, আল্লাহর আদেশই চূড়ান্ত। বাহ্যিকভাবে নূহ (আ.) একা, অবহেলিত, ব্যঙ্গের পাত্র; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সঠিক পক্ষের মানুষ। এই আয়াত বিদ্রূপের শব্দকে অতিক্রম করে আমাদের শেখায়—সত্যের পথ কখনো কখনো হাসির পাত্র হয়, কিন্তু শেষ বিজয় সবসময় আল্লাহরই।
নূহ (আ.)-এর নৌকা নির্মাণের এই দৃশ্য আসলে তাওহীদের এক নীরব কিন্তু প্রচণ্ড ঘোষণা। চারপাশের লোকজনের চোখে তা ছিল একটি অদ্ভুত কাজ, যেন মরুভূমির মাঝে আশা-নির্মাণের হাস্যকর আয়োজন। কিন্তু নবীর চোখে তা ছিল আল্লাহর হুকুমের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। মানুষ যখন বাহ্যিক দৃশ্য দেখে, তখন সে কেবল কাঠ, শ্রম আর সময় দেখে; আর নবী দেখেন অদৃশ্য সত্য, আসন্ন ফয়সালা, এবং সেই রবের প্রতিশ্রুতি, যাঁর কথা সত্যে পরিণত হওয়া অবধারিত। তাই এ আয়াত আমাদের শেখায়—ঈমান সবসময় তৎক্ষণাৎ প্রশংসা পায় না; কখনও কখনও তা বিদ্রূপের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের সত্যতা প্রমাণ করে, আর সেই বিদ্রূপই আসলে বাতিলের অন্তর্গত ভয়।
তিনি বললেন, তোমরা যদি আমাদেরকে উপহাস কর, তবে তোমাদের উপহাসের জবাব তোমাদেরই কাছে ফিরে আসবে—এমন এক পরিণতিতে, যা হাসিকে লজ্জায় রূপান্তরিত করবে। এ জবাব প্রতিশোধের আবেগী উক্তি নয়; বরং আল্লাহর ন্যায়ের সামনে অবিচল এক আত্মবিশ্বাস। এখানে শেখানো হচ্ছে, সত্যকে অবজ্ঞা করে কেউ স্থায়ীভাবে বিজয়ী থাকতে পারে না। আজ যে ব্যক্তি ঈমানদারকে দেখে হাসে, কাল সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে তারই অন্তর কেঁপে উঠতে পারে। সুতরাং এই আয়াত আমাদের হৃদয়ে এক কঠিন সতর্কতা গেঁথে দেয়: মানুষের দৃষ্টিতে হাস্যকর হলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে যদি কোনো কাজ আনুগত্যের হয়, তবে সেটিই পরিণামে নাজাতের নৌকা। আর যে সমাজ আল্লাহর সতর্কবার্তাকে উপহাস করে, তার জন্য বিদ্রূপ একদিন ফিরে আসে নিরব, নিস্তব্ধ, ভাঙা জগৎ হয়ে।
নূহ (আ.)-এর এই নৌকা নির্মাণ একাকী কোনো কারিগরি কাজ ছিল না; তা ছিল এক নবীর দীর্ঘ ধৈর্যের জীবন্ত সাক্ষ্য। চারদিকে যখন উপহাসের শব্দ, তখনও তিনি কাঠ কেটে যাচ্ছেন, খুঁটি বসাচ্ছেন, আল্লাহর নির্দেশের প্রতি একেবারে নত হৃদয়ে এগিয়ে চলছেন। মানুষ তখন চোখে দেখছিল শুধু একটি অসময়ে বানানো নৌকা; কিন্তু আসমান দেখছিল এক অবিচল বান্দাকে, যে বিদ্রূপের ঘূর্ণিতে নিজের কর্তব্য ভুলে যায়নি। এ-ই তো ঈমানের আসল সৌন্দর্য—পরিস্থিতি যখন বিপরীত, তখনও আল্লাহর হুকুমকে ছোট না দেখা; মানুষ যখন হাসে, তখনও সত্যকে বিক্রি না করা। নবীদের পথ সবসময়ই এমন: এক হাতে তাওহীদের পতাকা, অন্য হাতে অসম্ভবের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ।
কওমের নেতারা যে হাসাহাসি করছিল, তা কেবল নূহ (আ.)-কে নিয়ে নয়; তা ছিল আসলে ওহির সতর্কবাণীকে অবজ্ঞা করা, পরকালকে তুচ্ছ ভাবা, এবং নিজেদের ক্ষমতাকেই স্থায়ী মনে করার গর্ব। সমাজ যখন সত্যের সামনে নুয়ে পড়তে শেখে না, তখন উপহাসই তার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে। আজও মানুষের ভিড়ে এমন কত মুখ আছে, যারা আল্লাহর দীন, নামাজ, পর্দা, হালাল-হারাম, তাওবা—এসবকে হালকা করে দেখে; কিন্তু এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, হাসির আড়ালে অনেক সময় ধ্বংসের ঘণ্টা বেজে ওঠে। যে সমাজ আল্লাহর রাসূলকে, তাঁর পথকে, তাঁর সতর্কতাকে তুচ্ছ করে, সে সমাজ ভিতরে ভিতরে পচে যায়—আর বাইরের উল্লাস তার পতন ঢেকে রাখতে পারে না।
নূহ (আ.)-এর জবাবে ক্রোধের উন্মাদনা নেই, আছে সত্যের নির্ভার দৃঢ়তা। তিনি যেন বলেন, তোমাদের এই বিদ্রূপ সাময়িক; সত্যের পাল্লায় এর ওজন নেই। এ বাক্য আমাদেরও নিজেদের দিকে ফিরিয়ে আনে: আমি কি আল্লাহর নির্দেশ শুনে তুচ্ছ করছি, নাকি নূহের মতো নীরবে প্রস্তুত হচ্ছি? আমি কি অন্যকে নিয়ে হাসছি, নাকি নিজের আমল, নিজের অন্তর, নিজের আখিরাত নিয়ে কাঁপছি? এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মা বুঝে যায়—দুনিয়ার বিদ্রূপ শেষ কথা নয়, আল্লাহর ফয়সালাই শেষ কথা। তাই যে হৃদয় সত্যকে ধারণ করে, সে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার সময়েও ধীরে ধীরে তার ঈমানের নৌকা গড়ে; কারণ প্লাবন আসবে কি না তা মানুষের ধারণায় নেই, কিন্তু আল্লাহর সতর্কবাণী কখনো শূন্যে ঝুলে থাকে না।
এই আয়াত যেন আমাদের অন্তরকে প্রশ্ন করে: আমরা কি এমন সময়েও দৃঢ় থাকি, যখন দ্বীনকে পুরোনো, কঠিন, অচল, বা হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়? নূহ (আ.)-এর ধৈর্য আমাদের শেখায়, মুমিনের কাজ হলো সত্যের ওপর অবিচল থাকা—পরিস্থিতি অনুকূল হোক বা না হোক, মানুষের ভাষা কোমল হোক বা তির্যক হোক। আজও বহু হৃদয় আল্লাহর সতর্কবাণীকে হালকা ভাবে, বহু চোখ আখিরাতের সংবাদকে অবজ্ঞা করে, বহু মানুষ পাপকে স্বাভাবিক আর আনুগত্যকে দুর্বলতা ভাবে। কিন্তু হুঁশিয়ারি চুপ করে থাকে না; শুধু মানুষ তার ডাকে কান দেয় না।
শেষ পর্যন্ত এই দৃশ্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর রহমতও: আল্লাহ সত্যকে প্রকাশ করেন ধীরে, দৃঢ়ভাবে, অমোঘভাবে। তাই যে ব্যক্তি বিদ্রূপের ভিড়ে ঈমান আঁকড়ে ধরে, সে পরাজিত নয়—সে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আর যে ব্যক্তি নিজের হাসিকে নিরাপত্তা ভাবে, সে হয়তো জানেই না, তার হাসির আড়ালেই কত বড় হিসাব নিকটবর্তী। এই আয়াত আমাদের নরম করে, ছোট করে, লজ্জিত করে; তারপর তাওবার দিকে টানে। হে হৃদয়, বিদ্রূপ নয়, নূহের নৌকায় উঠো; অবহেলা নয়, আল্লাহর বাণীকে আঁকড়ে ধরো; কারণ যেদিন সত্যের বন্যা আসে, সেদিন মানুষের উপহাস টিকবে না, টিকবে শুধু ঈমান, ধৈর্য, আর আল্লাহর ওপর ভরসা।