নূহ (আ.)-এর কণ্ঠে এই বাক্যটি যেন দীর্ঘ আহাজারির পরও স্থির থাকা এক নবীর অন্তর থেকে উঠে আসা শেষ সতর্কবার্তা। তিনি তাঁর জাতিকে নসীহত করছিলেন, কিন্তু একান্ত সত্য এই যে, নসীহত সব সময় শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে না; কখনো অন্তর এত কঠিন হয়ে যায় যে উপদেশের আলোও সেখানে মৃদু হয়ে যায়। এই আয়াত আমাদের শেখায়, হেদায়েত কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, আর গোমরাহিও কেবল বাহ্যিক যুক্তির খেলায় নির্ধারিত হয় না। আল্লাহর অনুমতি ও ইচ্ছার বাইরে কারও হৃদয়ে আলোও স্থায়ী হয় না, অন্ধকারও চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায় না। তাই নূহ (আ.)-এর এই কথা নিছক হতাশার স্বীকারোক্তি নয়; বরং তা তাওহীদের গভীর ঘোষণা—আল্লাহই রব, তিনি মানুষকে হেদায়েত দেন, আবার যার অন্তর বেঁকে যায় তাকে তার বিদ্রোহের ফলও ভোগ করান।

এখানে কোনো নির্দিষ্ট শানে নুযূলের ঘটনা নয়, বরং সূরা হূদের নূহ (আ.)-সংক্রান্ত বিস্তৃত কাহিনির অংশ হিসেবে এই বাণী এসেছে। এটি এমন এক সমাজের কথা স্মরণ করায়, যেখানে বারবার ডাকা হয়েছিল এক আল্লাহর দিকে, কিন্তু তারা সত্যকে মেনে নেওয়ার বদলে উপহাস, অস্বীকার ও গর্বে নিজেকে কঠিন করে তুলেছিল। নবীর দাওয়াহ তখন সামাজিক সংঘর্ষের রূপ নেয়—একদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সতর্কতা, অন্যদিকে মানুষের অহংকার ও কুপ্রবৃত্তির প্রতিরোধ। এই আয়াত সেই বাস্তবতাকেই উন্মোচন করে: নসীহত তখনই ফল দেয়, যখন অন্তর সত্যের সামনে নত হতে প্রস্তুত থাকে; আর অন্তর যদি হঠকারিতায় অন্ধ হয়ে যায়, তবে ভাষা, প্রমাণ, মমতা—সবই দুর্বল হয়ে পড়ে।

আয়াতের শেষভাগে যে ঘোষণা আসে, তা এক আশ্চর্য ভারসাম্য তৈরি করে: ‘তিনি তোমাদের রব, আর তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।’ অর্থাৎ মানুষের জীবন তার নিজের হাতে সমাপ্ত নয়; সে মালিকহীন কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, বরং এক রবের অধীন, যার দিকে প্রত্যাবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এই স্মরণে ভয়ের সঙ্গে আশা জেগে ওঠে—কারণ যার কাছে ফিরে যেতে হবে, তিনি-ই সৃষ্টি করেছেন, রক্ষা করেছেন, বিচার করবেন। নূহ (আ.)-এর এই কথায় নবীদের ধৈর্যের মহিমা আছে, আছে অবিশ্বাসীদের জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা, আর আমাদের জন্যও এক গভীর আয়না: আমরা কি সত্যকে শুনে নরম হচ্ছি, নাকি বারবার শুনেও নিজের অন্তরকে পাথর করে নিচ্ছি? এই প্রশ্নই সূরা হূদের হৃদয়বিদারক শিক্ষা—শেষ পর্যন্ত মানুষকে ফিরতেই হবে, এবং সেই ফিরে যাওয়ার আগে হেদায়েতের দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁপতে জানা-ই ঈমানের সৌভাগ্য।

নূহ (আ.)-এর এই বাক্যে মানুষের সীমা আর আল্লাহর কর্তৃত্বের ব্যবধান অগ্নিরেখার মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নবী নসীহত করেন, ডাকেন, বোঝান, কাঁদেন; কিন্তু অন্তরের দরজা খোলার ক্ষমতা তাঁর হাতে নয়। তাই এই আয়াত আমাদের অহংকার ভেঙে দেয়—আমরা কাউকে সত্যের দিকে আহ্বান করতে পারি, কিন্তু হৃদয়কে বদলে দিতে পারি না। হেদায়েত কোনো মানুষের কৌশলের পুরস্কার নয়, আর গোমরাহিও শুধু বাহ্যিক প্রমাণের ঘাটতিতে জন্ম নেয় না; সবকিছুর ওপরে আছেন সেই রব, যাঁর জ্ঞান ও ইচ্ছা ছাড়া কোনো আত্মা স্থির হয় না। এই সত্য মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে না, বরং বিনয়ী করে। কারণ দায়িত্ব আমাদের, ফল আল্লাহর।

এখানে নূহ (আ.)-এর কণ্ঠে এক অদ্ভুত মায়া আছে—তিনি তিরস্কার করছেন না, তিনি শেষবারের মতো জানিয়ে দিচ্ছেন যে সত্যের দরজা অবজ্ঞা করে বন্ধ করলে নসীহতের আলো আর উপকারে আসে না। মানুষের অন্তর যখন বারবার অস্বীকারে শক্ত হয়ে যায়, তখন সে নিজেরই ভিতরকার অন্ধকারকে আশ্রয় দেয়। আয়াতটি সেই ভাঙা হৃদয়ের বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে: বারবার ডাকা সত্ত্বেও না-শোনা, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও না-বোঝা, আর শেষ পর্যন্ত এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে উপদেশও হয়ে ওঠে তিরস্কারস্বরূপ ভারী। কিন্তু নূহ (আ.)-এর ভাষা আমাদের শেখায়, নবীসুলভ দাওয়াহর মধ্যে তিক্ততা নেই; আছে করুণা, ধৈর্য, এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে নিখাদ সমর্পণ।
আর শেষে যে সত্যটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তা হলো—‘তিনিই তোমাদের পালনকর্তা এবং তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।’ এই একটি বাক্যে জীবনের সমস্ত দম্ভ নীরব হয়ে যায়। মানুষ যতই নিজেকে প্রভু মনে করুক, যতই সত্যকে এড়িয়ে চলুক, একদিন তাকে ফিরতেই হবে; সেদিন অজুহাত থাকবে না, পালানোর পথ থাকবে না, তর্কের জোরও থাকবে না। প্রত্যাবর্তনের এই অনিবার্যতা হৃদয়কে জাগ্রত করে: আমরা কি এমন এক রবের কাছে ফিরতে প্রস্তুত, যিনি আমাদের প্রতি মুহূর্তে দেখছেন? নূহ (আ.)-এর এই সতর্কবাণী তাই শুধু প্রাচীন এক জাতির জন্য নয়; এটি প্রত্যেক যুগের ঘুমন্ত আত্মার জন্য, যেন মানুষ বুঝে—আল্লাহর ডাককে অবহেলা করে সাময়িক নিরাপত্তা পাওয়া যায়, কিন্তু চূড়ান্ত নাজাত পাওয়া যায় না।

নূহ (আ.)-এর এই কথা আমাদের অন্তরকে এক গভীর কাঁপুনিতে ফেলে দেয়। নসীহত তিনি করতে চেয়েছিলেন, হৃদয়ের দরজা খুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মানুষ যখন সত্যের সামনে থেকেও নিজেকে বাঁচাতে চায়, তখন উপদেশও যেন পথ হারায়। এই আয়াত বলে, দোষ সবসময় কথার নয়; কখনো শ্রোতার ভেতরের জমাট অন্ধকারই নসীহতের আলোকে ঢেকে দেয়। তাই বান্দা যখন আল্লাহর দিকে ফিরতে দেরি করে, তখন তার নিজের আত্মাই ধীরে ধীরে সত্যের স্বাদ হারাতে থাকে। এখানে এক ভয় আছে, আবার এক রহমতের ইশারাও আছে: মানুষকে তার অবস্থার জন্য জবাবদিহি করতে হবে, কিন্তু হেদায়েতের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ—এই উপলব্ধি হৃদয়কে অহংকার থেকে ভেঙে নম্রতায় নামিয়ে আনে।

যখন আল্লাহ বলেন, তিনি যাকে চান তাকে গোমরাহ করেন, তখন তা অন্যায় নয়; বরং মানুষের জিদ, কুফর, অবাধ্যতা ও সত্য অস্বীকারের ফলকে আল্লাহর পূর্ণ কর্তৃত্বের মধ্যে দেখা। বান্দা নিজের সীমিত ক্ষমতাকে বড় করে দেখে, অথচ তার অন্তরের দরজা খুলে রাখা বা বন্ধ করে রাখা, সত্যের সামনে নরম করে দেওয়া বা কঠিন করে দেওয়ার ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত রব্বুল আলামীন-এর হাতে। এ যেন সমাজেরও আয়না: যখন কোনো জাতি বারবার সতর্কবার্তা শুনেও গর্বে, তাচ্ছিল্যে, অনুসরণপ্রিয়তায় ও নৈতিক পতনে ডুবে যায়, তখন পতন কেবল বাহ্যিক শাস্তি নয়; বরং অন্তরের দিক থেকেও তারা আল্লাহর দিক থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। নূহ (আ.)-এর যুগের সেই দৃশ্য আজও নতুন—সত্য কথা শুনেও যে জাতি নিজেকে শোধরায় না, সে ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

আরবী বাণীর শেষ অংশে যে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটিই সবকিছুর সমাপ্তি ও সবকিছুর শুরু। হে মানুষ, তুমি কোথায় যাবে? শেষে তো তোমাকে ফিরতেই হবে সেই রবের কাছে, যিনি তোমার রব, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, লালন করেছেন, সুযোগ দিয়েছেন, আবার হিসাবও নেবেন। এই প্রত্যাবর্তনের স্মরণই হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে—আজ নসীহত শুনলে কাজ করো, আজ তাওবাহ করলে বাঁচো, আজ অশ্রু ঝরালে অন্তর নরম হবে। কারণ কাল যখন ফিরে যেতে হবে, তখন অজুহাত থাকবে না, কেবল আমল থাকবে; কেবল সত্য থাকবে, কেবল রবের সামনে দাঁড়ানো থাকবে। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়: দুনিয়ার গর্জনে নয়, আল্লাহর রায়েই শেষ কথা; আর সেই শেষ কথার আগে যে অন্তর জেগে ওঠে, সে-ই আসলে বেঁচে যায়।

এখানে নূহ (আ.) যেন আমাদের হৃদয়ের দরজায় এক অদ্ভুত নীরবতা নিয়ে দাঁড়ান। তিনি নসীহত করেছেন, ডাক দিয়েছেন, ভেঙে পড়া আশা নিয়েও মানুষকে সত্যের পথে ফেরাতে চেয়েছেন; তবু শেষ কথাটি তিনিই উচ্চারণ করছেন: সব ফল মানুষের হাতে নয়, আল্লাহর হাতে। এই বাক্যে নবীর ব্যর্থতা নেই, আছে বান্দার অসহায়তার স্বীকার। আমরা কত সহজে মনে করি, কথার জোরে, যুক্তির ধারালো অস্ত্রে, বা নিজের সদিচ্ছার দাপটে অন্যের অন্তর বদলে দেওয়া যাবে। কিন্তু কোরআন মনে করিয়ে দেয়—হৃদয়ের চাবি মানুষের পকেটে নয়; তা রবের কর্তৃত্বে। তাই কারও হেদায়েত পেয়ে গেলে অহংকারের সুযোগ নেই, আর কারও বক্রতা দেখে হতাশারও জায়গা নেই। সবকিছুই শেষ পর্যন্ত এক মহান পরিচালনার ভেতর বাঁধা।

এই আয়াত আমাদের ভেতরের এক ভয়ংকর ভ্রান্তি ভেঙে দেয়: আমি চাইলেই বুঝি বুঝে যাই, আমি চাইলেই বুঝি ফিরি, আমি চাইলেই বুঝি সত্য আপন হয়ে ওঠে। না, মানুষ নিজের দুর্বলতার ভারে এতটাই নত যে সে আল্লাহর সহায়তা ছাড়া এক কদমও নিশ্চিত নয়। আর তাই দয়া চাওয়া ছাড়া উপায় নেই, ক্ষমা চাওয়া ছাড়া উপায় নেই, অন্তরকে নরম করার জন্য কাঁপতে কাঁপতে রবের দরবারে ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। হেদায়েতের পথে হাঁটা মানে নিজের সাফল্য উদ্‌যাপন করা নয়; বরং প্রতিটি শ্বাসে স্বীকার করা—হে আল্লাহ, তুমি না চাইলে আমি কিছুই নই, তুমি না ফেরালে আমি ফেরার পথই খুঁজে পাব না। তিনিই আমাদের রব, আর তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে—এ সত্যটি যদি আজ হৃদয়ে নেমে আসে, তবে অহংকার গলে যাবে, গাফিলতি ভাঙবে, আর বান্দা তার আসল ঠিকানার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।