নূহ (আ.)-এর দীর্ঘ দাওয়াতের জবাবে তাঁর জাতির মুখ থেকে যে কথাটি বেরিয়ে আসে, এ আয়াত তা আমাদের সামনে জীবন্ত করে তোলে: তারা বলে, হে নূহ, তুমি আমাদের সঙ্গে অনেক তর্ক করেছ, অনেক কথা বলেছ; এবার যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে যে আযাবের ভয় দেখাও তা নিয়ে এসো। এই কথার ভেতরে শুধু অস্বীকার নেই, আছে ক্লান্তি প্রকাশের ভান, আছে সত্যের আহ্বানকে বিরক্তিকর মনে করার ঔদ্ধত্য, আর আছে এমন এক হৃদয়ের কঠিনতা—যে হৃদয় বারবার শুনেও শোনে না। নবীকে তারা জবাব দিচ্ছে না যুক্তি দিয়ে; দিচ্ছে অবজ্ঞা দিয়ে।

এই আয়াতের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক ঐতিহাসিক ক্ষণ নয়, বরং নূহ (আ.)-এর দীর্ঘ সংগ্রামের সামগ্রিক দৃশ্যমান বাস্তবতা। তিনি বহুদিন ধরে এক জাতিকে তাওহীদের দিকে ডাকছিলেন, শিরকের অন্ধকার থেকে বের করে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দাওয়াত যত দীর্ঘ হয়েছে, তাদের বিদ্রূপও তত ঘনীভূত হয়েছে। মানুষ যখন হকের সামনে মাথা নত করতে চায় না, তখন তারা সত্যের ভাষাকে ‘তর্ক’ বলে, সতর্কতাকে ‘ঝগড়া’ বলে, আর আল্লাহর রাহমতস্বরূপ নসীহতকে বোঝা মনে করে। এ এক ভয়াবহ মানসিক অবস্থা, যেখানে কানে শোনা হয়, কিন্তু অন্তর সাড়া দেয় না।

এখানে নবীদের সংগ্রামের একটি গভীর শিক্ষা আছে: দাওয়াত সব সময় সঙ্গে সঙ্গে ফল দেখায় না, আর সত্যকে প্রত্যাখ্যানকারীরা প্রথমে যুক্তি নয়, অহংকার দিয়েই প্রতিরোধ করে। নূহ (আ.)-এর কণ্ঠে ছিল করুণা, আর তাঁর জাতির জবাবে ছিল ঔদ্ধত্য। এ আয়াত আমাদের শেখায়, হকের পথে যারা ডাকে, তাদের জীবনে অনেক সময় এমন সময় আসে যখন তারা অবহেলা, ব্যঙ্গ, এমনকি বিদ্রূপের মুখোমুখি হয়। তবু নবীর পথ থামে না; কারণ তিনি মানুষের প্রশংসা চান না, আল্লাহর সন্তুষ্টি চান। আর যারা আযাবকে ঠাট্টা করে, তারা আসলে নিজেদের অন্তরের মৃত্যুই ঘোষণা করে।

এই কথার মধ্যে এক অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনা আছে। মানুষ যখন সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না, তখন সে সত্যের দীর্ঘ দাওয়াতকেও সহ্য করতে পারে না; নসীহতকে মনে করে ক্লান্তিকর, সতর্কতাকে মনে করে বিরক্তিকর, আর নবীর করুণ আহ্বানকে নাম দেয় ‘তর্ক’। অথচ নূহ (আ.) তাদের সঙ্গে কেবল জেদ করেননি; তিনি তাদের হৃদয়ের দরজায় বারবার কড়া নেড়েছেন, আল্লাহর দিকে ফিরতে বলেছেন, শিরকের জঞ্জাল থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছেন। কিন্তু যাদের অন্তর বক্র, তারা আলোর দিকে না তাকিয়ে আলোবাহীকে দোষ দেয়। সত্যকে অস্বীকার করার এই ভঙ্গি শুধু যুক্তির পরাজয় নয়; এটি আত্মার বিকৃতি, যেখানে মানুষ ন্যায়ের শব্দ শুনে লজ্জিত হওয়ার বদলে ক্রুদ্ধ হয়।

তারা যেন বলছে, ‘আর কত বলবে? আর কত সতর্ক করবে? এখন যদি সত্য হও, তবে আযাব এসেই পড়ুক।’ এই ঔদ্ধত্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে আল্লাহর ধৈর্যকে ভুল বোঝার বিপদ। মানুষ দেখে না, আল্লাহ তাআলা অবকাশ দেন বলে ক্ষমা করেন না—অবকাশ দেন যেন ফিরে আসার সুযোগ থাকে। নবী-রাসূলদের সংগ্রাম এমনই: তারা হকের কথা বলে যান, আর জাতির অবাধ্যতা ধীরে ধীরে নিজেদের জন্য ফাঁদ পাতে। নূহ (আ.)-এর কওমের এই জবাব আমাদের শেখায়, সত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মানুষ শেষ পর্যন্ত সত্যকেই ঠাট্টার বস্তু বানিয়ে ফেলে; কিন্তু অবিচল নবী থামে না, কারণ তাঁর দাওয়াত মানুষের প্রতিশোধের জন্য নয়, মানুষের মুক্তির জন্য।
আজও এ আয়াত হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। কারণ নূহ (আ.)-এর কওমের মুখে যে উচ্চারণ ছিল, তা কেবল অতীতের নয়; তা সেই সব হৃদয়ের ভাষা, যারা নসীহত শুনে বলে ‘বাস, আর নয়’, যারা হকের ডাককে বিলম্বিত করতে করতে দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকে, যারা আখিরাতের সতর্কবাণীকে দূরের শব্দ মনে করে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সত্য বারবার উপেক্ষিত হলে মানুষ এক সময় নিজেরই ভিতরে ধ্বংসের বীজ বপন করে। এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভয়ংকর আয়না ধরে: আমরা কি নূহ (আ.)-এর আহ্বানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে শুনছি, নাকি অন্তরের কপাট বন্ধ করে ‘তর্ক’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছি? যে হৃদয় আল্লাহর নসীহতে নরম হয়, সে-ই বাঁচে; আর যে হৃদয় ঔদ্ধত্যে কঠিন হয়, তার জন্য আযাবের আগমন হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী সতর্কঘণ্টা।

নূহ (আ.)-এর দীর্ঘ আহ্বানের সামনে দাঁড়িয়ে তার জাতি বলল, “তুমি তো আমাদের সঙ্গে বহু তর্ক করেছ, অনেক কথা বলেছ।” এই একটি বাক্যের ভেতরে কত গভীর এক আত্মপ্রবঞ্চনা লুকিয়ে আছে! যখন হৃদয় সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না, তখন নসীহতও তার কাছে বিরক্তি হয়ে ওঠে, করুণা হয়ে ওঠে ক্লান্তি, আর সতর্কবাণী হয়ে ওঠে বিদ্রূপের কারণ। তারা যুক্তির কাছে নত হলো না, বরং নিজেদের অহংকারকে ভাষা দিল। নবীর কণ্ঠে যে তাওহীদের ডাক, সে ডাক তাদের কাছে যেন সমাজের স্বাভাবিক কথাবার্তার বাইরে এক অস্বস্তিকর হস্তক্ষেপ। অথচ নূহ (আ.)-এর সংগ্রাম কোনো সামান্য তর্ক ছিল না; তা ছিল মানুষের অন্তরকে এক আল্লাহর দিকে ফেরানোর দীর্ঘ, সহিষ্ণু, করুণাময় আহ্বান।

এরপর তারা বলল, “এবার আমাদের সেই আযাব নিয়ে এসো, যদি তুমি সত্যবাদী হও।” কী ভয়ংকর ঔদ্ধত্য! যে হৃদয় বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও জাগে না, সে শেষ পর্যন্ত সত্যের বিরুদ্ধে সাহসী ভঙ্গি নেয়। এ সাহস আসলে শক্তি নয়; এ অন্ধতার শেষ পর্যায়। মানুষ যখন আল্লাহর হুঁশিয়ারিকে খেলায় পরিণত করে, তখন তার ভেতরে অবিশ্বাস শুধু বসে থাকে না, সে বাড়তে থাকে, পাথর হয়ে যায়। এই আয়াত আমাদের সমাজের চেহারা দেখায়: একদল মানুষ সত্যকে দীর্ঘদিন শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তারপর তাকে আর আহ্বান বলে মনে করে না; মনে করে এক ধরনের বিরক্তিকর পুনরাবৃত্তি। কিন্তু আল্লাহর সতর্কতা কখনো নিষ্প্রাণ শব্দ নয়। নবীদের মুখে উচ্চারিত প্রত্যেকটি সতর্কবার্তা মানুষের জন্য রহমত, কারণ তা পতনের আগেই ফিরে আসার দরজা খুলে দেয়।

আজ এই আয়াত আমাদের অন্তরকে জিজ্ঞেস করে—আমরাও কি কখনো সত্য শুনে শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়ি? নসীহতকে কি আমরা তর্ক বলে এড়িয়ে যাই, নিজের ভুলকে কি আমরা যুক্তির পোশাক পরাই? নূহ (আ.)-এর উম্মতের এই ঔদ্ধত্য শুধু অতীতের ঘটনা নয়; তা প্রতিটি আত্মার জন্য এক আয়না, যেখানে অবাধ্য হৃদয়ের বিকৃত ছায়া দেখা যায়। কিন্তু আয়াতের ভেতরে ভয়াবহতার সঙ্গে করুণাও আছে: যতক্ষণ আযাব আসে নি, ততক্ষণ তাওবা সম্ভব। যতক্ষণ কানে পৌঁছায়, ততক্ষণ ডাকা হচ্ছে। তাই ঈমানদার হৃদয় ভয়ে কেঁপে ওঠে, আবার আশায়ও ভরে ওঠে—কারণ আল্লাহর রাস্তা কখনো বন্ধ হয় না। যে অন্তর আজও নরম আছে, সে যেন এই কথায় জেগে ওঠে: সত্যকে তর্কের ভেতর হারিয়ে ফেলো না, কারণ শেষ পর্যন্ত তর্ক নয়, কেবল আল্লাহর সামনে ফিরে যাওয়াই বাঁচায়।

কখনো কখনো মানুষের ঔদ্ধত্য এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে তারা সত্যকে আর সত্য হিসেবে দেখে না; দেখে বিরক্তি, অনবরত কণ্ঠস্বর, অস্বস্তিকর এক হুঁশিয়ারি হিসেবে। নূহ (আ.)-এর জাতির এই কথা সেই হৃদয়-শুষ্কতারই ভাষা: তারা তর্ককে বোঝা মনে করল, নসীহতকে ক্লান্তিকর ভাবল, আর আযাবের সতর্কবার্তাকে ঠাট্টার বস্তু বানাল। কিন্তু নবীর দাওয়াত কখনো ব্যক্তিগত জেদ ছিল না; তা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি করুণা। যে কথা রাগ থেকে আসে, তা থামে; আর যে কথা হিদায়াত থেকে আসে, তা মানুষের তামাশার পরও আকাশে ঝুলে থাকে—একদিন তার সত্যতা ভয়াবহভাবে প্রকাশ পায়।

এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভাঙা দরজার মতো দাঁড়িয়ে আছে: যখন বান্দা সত্য শোনার পরও সত্যের কাছে নত হয় না, তখন তার জিহ্বা সাহসী হয়, কিন্তু তার অন্তর নিস্তেজ হয়ে যায়। নূহ (আ.)-এর যুগে যেমন হয়েছিল, তেমনি আজও মানুষের ভেতরে একই রোগ কাজ করে—সতর্কতা শুনে সে সংশোধিত হয় না, বরং আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অথচ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সতর্কবাণী কখনো ফাঁকা ভয় দেখানো নয়; তা অনুগ্রহের শেষ ডাক, ধ্বংসের আগে ফিরে আসার সুযোগ। তাই এই আয়াত কেবল প্রাচীন জাতির গল্প নয়, এটি আমাদের নিজের আত্মার আয়না: আমি কি সত্যের সামনে বিনীত, নাকি আড়ালে আড়ালে বলছি, ‘যদি সত্যই হয়, তবে এসো’? এমন কথা মুখে না বললেও, গাফিল হৃদয় প্রায়ই সেটাই বলে। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে নরম করো, অহংকারকে ভেঙে দাও, আর তাওহীদের ডাককে আমাদের কাছে বিরক্তি নয়—রহমত হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দাও।