সূরা আল-হিজরের এই আয়াতটি একেবারে সরল, অথচ অন্তরে নেমে আসে বজ্রের মতো: “আপনার রবের ইবাদত করুন, যতক্ষণ না আপনার কাছে ইয়াকীন এসে যায়।” এখানে ইয়াকীনকে অনেক মুফাসসির মৃত্যুর নিশ্চয়তা হিসেবে বুঝেছেন—কারণ মৃত্যুই সেই অটল সত্য, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরা নেই। অর্থাৎ মুমিনের জীবন কোনো এক পর্যায়ে ইবাদত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার গল্প নয়; বরং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রবের সামনে নত থাকার নামই তার পথ। এই বাক্যে আল্লাহ যেন হৃদয়কে জাগিয়ে বলেন: তুমি যতই ক্লান্ত হও, যতই সময় বদলাক, যতই দুনিয়ার চাপ ঘিরে ধরুক—ইবাদত ছাড়ার অধিকার তোমার নেই; কারণ তুমি এখনো সেই নিশ্চিত দরজায় পৌঁছেনি, যেখানে হিসাব শুরু হবে।

এই আয়াতের আগে সূরা আল-হিজরে বারবার এক তীব্র স্মরণ জেগে ওঠে—অহংকারের কারণে কত জাতি মাটিতে মিশে গেছে, আর কুরআন কীভাবে সংরক্ষিত থেকেছে, কীভাবে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শক্তিগুলো ভেঙে পড়েছে। আদম-ইবলিসের কাহিনি এখানে মানুষের ভেতরের চিরন্তন সংঘর্ষের কথাও মনে করায়: আল্লাহর সামনে অবনত হওয়া, নাকি অহংকারে সরে যাওয়া। নবীদের জীবনের দুঃখ, তাদের প্রতি উপহাস, সত্যের আহ্বানে মানুষের উদাসীনতা—এসবের মাঝখানে এই আয়াত এক সান্ত্বনার বাণী হয়ে নাজিলের সুরে দাঁড়িয়ে আছে: দাওয়াতের পথ দীর্ঘ হতে পারে, প্রতিক্রিয়া কঠিন হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমার কাজ হলো রবের ইবাদতে অবিচল থাকা।

তাই এই আয়াত কোনো খণ্ডিত নসিহত নয়; এটি পুরো সূরার হৃদস্পন্দনের সঙ্গে জড়িত এক শেষ-স্বর। এখানে জীবনকে দেখা হচ্ছে অনিত্যতার চোখে, আর বন্দেগিকে দেখা হচ্ছে স্থায়িত্বের পথে একমাত্র আশ্রয় হিসেবে। যখন চারদিকে পতনের দৃষ্টান্ত, তখন ইবাদতই মানুষের ভাঙা অস্তিত্বকে জোড়া দেয়; যখন হৃদয় দুর্বল হয়, তখন তাসবিহ তাকে নতুন শ্বাস দেয়; যখন ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন ইয়াকীন আমাদের শেখায়—নিশ্চিত সত্য আসবে, আর তার আগে পর্যন্ত রবের দরজাই হলো একমাত্র নিরাপদ ঠিকানা। এই আয়াত তাই শুধু সময়ের সীমা টানে না; বরং জীবনের অর্থকে পবিত্র করে দেয়, যেন বান্দা দুনিয়ার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আল্লাহমুখী হয়ে বেঁচে থাকে।

এই আয়াতের ভাষা ছোট, কিন্তু এর ভার আকাশের মতো বিস্তৃত। “আপনার রবের ইবাদত করুন”—এ যেন মানুষের পুরো অস্তিত্বকে একটিমাত্র কেন্দ্রের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। ইবাদত এখানে কেবল কিছু আচার নয়; এটি হৃদয়ের আনুগত্য, চিন্তার নতজানুতা, অহংকারের পতন, এবং প্রতিটি নিঃশ্বাসকে রবের সামনে জবাবদিহিময় করে তোলা। আর “যতক্ষণ না আপনার কাছে ইয়াকীন আসে” —এই বাক্যে দুনিয়ার সকল বিভ্রান্তি ম্লান হয়ে যায়। মৃত্যু, আল্লাহর সাক্ষাৎ, চূড়ান্ত সত্য—সবই এমন এক নিশ্চিত আগমন, যাকে কেউ ঠেকাতে পারে না। তাই মুমিনের পথ সাময়িক উচ্ছ্বাসের পথ নয়; এটি শেষ সীমা পর্যন্ত ইবাদতের অগ্নিপথ, যেখানে হৃদয় বারবার ভাঙে, আবার আল্লাহর দিকে ফিরে দাঁড়ায়।

সূরা আল-হিজরের সামগ্রিক সুরের ভেতরে এই নির্দেশ যেন নবীদের জন্য এক গোপন সান্ত্বনা। তাদেরকে অস্বীকার করা হয়েছিল, ঠাট্টা করা হয়েছিল, সত্যকে ঘিরে মানুষের অহংকার বারবার প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়েছিল; কিন্তু আল্লাহ মনে করিয়ে দেন, সত্যের দায়িত্ব হলো অবিচল থাকা, ফল নির্ধারণ করা নয়। যে জাতিগুলো সীমালঙ্ঘন করেছে, তারা উড়ে যায়নি—তারা নিজেদের অন্তরের বিদ্রোহে ভেঙে পড়েছে। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের জীবনের শক্তি ছিল এই একটিই: রবের ইবাদতে স্থির থাকা। কুরআন সংরক্ষিত থাকল, সত্যের পথ মুছে গেল না, কারণ আল্লাহর কিতাব শুধু বুকে নয়, ইতিহাসের ওপরও তাঁর হিফাজতের মোহর নিয়ে নেমেছে।
এই আয়াত যেন শেষ নিঃশ্বাসের আগের প্রতিটি মুহূর্তকে পবিত্র করে দেয়। মানুষ কত কিছু জমায়, কিন্তু “ইয়াকীন” এসে গেলে সব হিসাব উল্টে যায়—শুধু সে-ই টিকে থাকে, যা আল্লাহর জন্য করা হয়েছে। তাই মুমিনের সৌন্দর্য হলো তার অবিরাম ফিরে যাওয়া; তার জিহ্বায় তাসবিহ, তার চোখে বিনয়, তার অন্তরে ভয় ও আশা, তার হাতে দায়িত্ব, তার পায়ে অবিচলতা। আদম-ইবলিসের সেই প্রথম পরীক্ষার পর থেকে মানবজীবন আসলে একটিই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে: আমি কাকে মান্য করব? এই আয়াত সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত জবাব—শেষ পর্যন্ত রবকেই। ইবাদত তাই কোনো সময়ের কাজ নয়; এটি মৃত্যুর দ্বার পর্যন্ত প্রসারিত এক প্রেম, এক আনুগত্য, এক আত্মসমর্পণ, যেখানে হৃদয় বলে: হে আল্লাহ, তুমি যতদিন জীবন দিয়েছ, আমি ততদিন তোমারই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে চাই।

এই আয়াতটি মুমিনের জীবনের ওপর এক নরম, অথচ অটল হাত রেখে দেয়—শেষ পর্যন্ত তুমি ইবাদতের পথ ছাড়বে না। ইয়াকীন যখন আসবে, তখন দায়িত্বের সময় শেষ হবে; কিন্তু যতক্ষণ তা আসেনি, ততক্ষণ হৃদয়ের কিবলা বদলাবে না। এ যেন রবের পক্ষ থেকে এক গভীর তাগিদ: দুনিয়ার ক্লান্তি, সময়ের ব্যস্ততা, দুঃখের ভার, কিংবা সফলতার মোহ—কিছুই তোমাকে সিজদার পথ থেকে সরাতে পারবে না। কারণ ইবাদত শুধু নামাজের কয়েকটি রাকাত নয়; ইবাদত হলো জীবনের ভেতরে আল্লাহর সামনে বিনয়ের অবিরাম অবস্থান, নিজের সীমা বুঝে তাঁর দিকে ফিরে থাকা, এবং অন্তরকে প্রতিদিন আবার তাওহীদের আলোয় দাঁড় করানো।

সূরা আল-হিজরের সামগ্রিক সুরও এই কথাকেই আরো ভারী করে তোলে। এখানে কুরআনের সংরক্ষণ যেমন আল্লাহর অটুট ওয়াদা হয়ে জ্বলে ওঠে, তেমনি আদম-ইবলিসের প্রাচীন সংঘর্ষ আমাদের ভেতরের অহংকারকে চিনিয়ে দেয়। যে অহংকারে ইবলিস নত হয়নি, সেই অহংকারই বহু জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে; আর যে হৃদয় নত হয়েছে, সে-ই বেঁচে গেছে। তাই নবীদের প্রতি সান্ত্বনার এই সূরায় এই শেষ আহ্বান যেন আরো স্পষ্ট: সত্যের পথে হাঁটা মানুষের কাজ ফলের হিসাব করা নয়, বরং আমলের শুদ্ধতা ধরে রাখা। সমাজ যখন উদাসীন হয়, যখন পাপ স্বাভাবিক হয়ে যায়, যখন মানুষের মুখে শক্তি আর অন্তরে শূন্যতা জমে, তখন এই আয়াত মুমিনকে স্মরণ করায়—তুমি শেষ নিশ্চিত সত্যের আগে দাঁড়িয়ে আছো; সুতরাং তোমার দাঁড়ানোর ভঙ্গি হোক ইবাদতের, তোমার নীরবতা হোক তাসবিহের, তোমার চলা হোক আল্লাহমুখী।

এই একটি বাক্যে আশা ও ভয় একসাথে জেগে ওঠে। ভয়, কারণ মৃত্যু এমন দরজা যেখান থেকে ফেরার সুযোগ নেই; আশা, কারণ সেই দরজার আগ পর্যন্ত তওবার জন্য আকাশ খোলা, সিজদার জন্য জমিন প্রশস্ত, আর রবের রহমত মানুষের গুনাহের চেয়েও বেশি প্রসারিত। যে মুমিন নিজের হিসাব নিজেই নেয়, সে জানে—আজকের ইবাদতকে হালকা করে দেখার সময় নেই। আজই ফিরতে হবে, আজই কাঁদতে হবে, আজই আল্লাহকে ডাকতে হবে। কারণ শেষ সত্য আসলে শুধু দুনিয়া নয়, মানুষের অহংকারও থেমে যাবে; আর সেদিন যার হৃদয় ইবাদতে বেঁধে ছিল, সে-ই প্রশান্ত হবে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, আল্লাহ আমাদের কর্মজীবনের শেষ সীমানা চিহ্নিত করে দিলেন। জীবন যতই দীর্ঘ হোক, তার শেষ শব্দটি ইবাদতবিমুখতা নয়; বরং রবের সামনে অটুট বিনয়। ইয়াকীন যখন এসে যাবে, তখন আর আমল করার সময় থাকবে না—সুতরাং এখনই সেই সময়, যখন সিজদা, দোয়া, ইস্তিগফার, তাসবিহ আর কুরআনের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ককে জীবন্ত রাখতে হয়। সূরা আল-হিজর আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, জাতিদের পতন হঠাৎ নয়; অহংকার, অস্বীকৃতি, আর হেদায়েত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ পরিণতি। আর মুমিনের উত্থানও হঠাৎ নয়; তা ইবাদতে, ধৈর্যে, এবং আল্লাহর স্মরণে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
আদম-ইবলিসের সেই আদিম দৃশ্য আজও মানুষের বুকে ফিরে আসে: কে আদেশের সামনে নত হবে, আর কে নিজের ভেতরের অহংকারকে উপাস্য বানাবে। এই আয়াত যেন বলে, যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ প্রত্যাবর্তনের দরজা খোলা। যে হৃদয় নিজেকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করে, সে-ই সবচেয়ে বিপদে পড়ে; আর যে হৃদয় জানে, এখনো ইয়াকীন আসেনি, সে-ই আল্লাহর রহমতের দিকে দৌড়ায়। তাই নবীদের মতোই আমাদেরও সান্ত্বনা এটাই—সত্যের পথে একাকিত্ব এলে ভেঙে পড়ো না, কারণ আল্লাহর কথা সত্য, তাঁর সংরক্ষণ সত্য, তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য; আর সেই সত্যের সামনে একদিন সব শব্দ, সব শক্তি, সব অহংকার নিঃশেষ হয়ে যাবে।
অতএব শেষ কথা এই নয় যে, জীবন আমাদের কী দিল; শেষ কথা এই যে, আমরা জীবনের প্রতিটি দিনে রবকে কতটা ডাকলাম। যে ব্যক্তি নিজের অন্তরকে জীবন্ত রাখতে চায়, সে প্রতিদিন নিজেকে বলে: এখনো সময় আছে, এখনো তওবা সম্ভব, এখনো ইবাদত ছেড়ে দেওয়ার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। সূরা আল-হিজরের এই শেষ আহ্বান হৃদয়কে কোমল করে, কাঁদায়, আবার দাঁড় করায়—যেন আমরা জানি, দুনিয়ার ক্লান্তি চূড়ান্ত নয়, চূড়ান্ত হলো আল্লাহর সাক্ষাতের মুহূর্ত। তার আগে পর্যন্ত, শুধু একটিই পথ: রবের ইবাদত, বিনয়, তাসবিহ, এবং এমন এক জীবন, যা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাঁর দিকে ফিরে থাকে।