“ফওরব্বিকা লানাসআলান্নাহুম আজমাঈন”—আপনার রবের কসম, তাদের সবাইকে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এই বাক্যে কেবল একটি ভবিষ্যদ্বাণী নেই, আছে কিয়ামতের অমোঘ দরজায় মানুষের হাঁপিয়ে ওঠা নীরবতা। এখানে আল্লাহ তাআলা নিজের পবিত্র নামে শপথ করে জানিয়ে দিচ্ছেন—কেউ বাদ যাবে না, কেউ আড়াল পাবে না, কোনো মুখোশ স্থায়ী হবে না। দুনিয়ার প্রশস্ততা, ক্ষমতার দম্ভ, অস্বীকারের সাহস—সবই একদিন সংকুচিত হয়ে যাবে সেই প্রশ্নের সামনে, যা অদৃশ্য সাক্ষীর মতো হৃদয়ের গভীরতম কোণে এসে দাঁড়াবে।

সূরা আল-হিজরের এই অংশে আগের আয়াতগুলোর সঙ্গে একটি কঠিন, কিন্তু সত্যের আলোয় দীপ্ত রেশ জড়িয়ে আছে। এখানে এমন এক বাস্তবতার কথা বলা হচ্ছে, যেখানে আল্লাহর বাণীকে টুকরো করে দেখার, সত্যকে খণ্ডিত করার, অহংকারের চোখে ওহিকে ভিন্নভাবে দাঁড় করানোর মানুষদেরও শেষ বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এটি কোনো কল্পিত শাস্তির ভাষা নয়; এটি জবাবদিহির চূড়ান্ত ঘোষণা। ইতিহাসের পাতা হোক, সামাজিক অন্যায় হোক, দ্বীনের প্রতিরোধ হোক—মানুষ যতই জবাবদিহি এড়াতে চায়, আসমানের রবের সামনে তার প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি উচ্চারণ, প্রতিটি অবস্থান একদিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

এই আয়াত মুমিনের অন্তরে ভয় নয়, জাগরণ সৃষ্টি করে। কারণ জিজ্ঞাসাবাদ মানে শুধু ভীতিকর আদালত নয়; বরং সত্যকে ভালোবাসার শেষ পরীক্ষা। নবীদের জন্য ছিল সান্ত্বনা, কারণ তাদের পথে অস্বীকার ও উপহাসের ভার কম ছিল না; আর উম্মতের জন্য ছিল সতর্কবাণী, যেন মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করে—আমি কেমন করে বাঁচছি, কাকে খুশি করতে চাইছি, আমার আমল কি আল্লাহর সামনে টিকে থাকার মতো? যখন কুরআন বলে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তখন প্রকৃত ঈমানের প্রথম সাড়া হয় আত্মসমালোচনা, তাওবা, আর সেই হৃদয়-কম্পন, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে শেখায়।

ফওরব্বিকা লানাসআলান্নাহুম আজমাঈন—আপনার রবের কসম, তাদের সবাইকে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এই শপথে যেন আকাশের নীরবতা কেঁপে ওঠে। আল্লাহ তাআলা এখানে কোনো অনুমান করেন না, কোনো সম্ভাবনার ভাষা ব্যবহার করেন না; তিনি নিশ্চিত করে ঘোষণা দেন। মানুষ দুনিয়ায় কত কিছু আড়াল করতে পারে, মুখোশ পরতে পারে, ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে, যুক্তির জাল বুনতে পারে—কিন্তু কিয়ামতের আদালতে কোনো আড়াল থাকবে না। সেখানে স্মৃতি, নিঃশ্বাস, কাজ, নিয়ত, নীরবতা—সবই সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। যাকে আজ তুচ্ছ মনে করা হয়, যাকে কেউ জিজ্ঞাসা করে না, যাকে সমাজের চোখ এড়িয়ে যায়, সে-ও একদিন মহান রবের সামনে দাঁড়াবে; আর যাদের ক্ষমতা ছিল, প্রভাব ছিল, ভাষা ছিল, বাহাদুরি ছিল—তাদেরও থামতে হবে একেবারে নিরস্ত্র হয়ে।

এই আয়াতের ভেতরে একটি গভীর সান্ত্বনাও আছে, আবার একটি কাঁপনও আছে। নবীদের জন্য সান্ত্বনা—কারণ সত্যকে খণ্ডিত করা, ওহিকে অবজ্ঞা করা, পথের মানুষদের বিভ্রান্ত করা কোনো চূড়ান্ত ক্ষমতা নয়। আর মানবতার জন্য কাঁপন—কারণ জবাবদিহি মানে শুধু শাস্তির ভয় নয়; জবাবদিহি মানে নিজের অস্তিত্বকে সত্যের আয়নায় দাঁড় করানো। সেদিন কেউ বলতে পারবে না, আমি জানতাম না, আমি দেখিনি, আমি শুনিনি, আমি বুঝিনি। যা কিছু অন্তরে জমা ছিল, যা কিছু আমলে রূপ নিয়েছিল, যা কিছু নিয়তকে কলুষিত করেছিল—সবই খুলে যাবে। তাই মুমিনের হৃদয় আজ থেকেই নিজেকে প্রশ্ন করে: আমি কেমন করে বেঁচে আছি, কাদের সঙ্গে দাঁড়াচ্ছি, কোন সত্যকে লুকোচ্ছি, কোন অবহেলাকে জীবন ভেবে নিয়েছি?
যে মানুষ দুনিয়ার সামান্য হিসাবেই অস্থির হয়ে যায়, সে যদি আখিরাতের হিসাবকে অন্তরে ধারণ করতে পারত, তবে তার পা কাঁপত, চোখ নরম হতো, জিহ্বা তসবিহে ভিজে যেত। এই সূরার ধারাবাহিকতা আমাদের শেখায়—অস্বীকারের যুগ যত দীর্ঘই হোক, আল্লাহর জিজ্ঞাসা তার চেয়ে দীর্ঘতর; মানুষের ইতিহাস যতই উঁচু হোক, রবের আদালত তার চেয়েও উচ্চতর। তাই এই আয়াত কেবল ভয় দেখায় না, জাগিয়ে তোলে। এটি বলে, আজই নিজের ভেতর একটি ছোট আদালত কায়েম করো; দিনের শেষে নিজেকে জিজ্ঞাসা করো, আমি আল্লাহর কাছে কী নিয়ে যাব? কারণ একদিন সত্যিই প্রশ্ন হবে—আর সেই প্রশ্নের উত্তরে ধন, বংশ, পরিচয় নয়; দরকার হবে সৎ অন্তর, ভাঙা তাওবা, এবং সেই ঈমান, যা জবাবদিহির আগেই নিজেকে আল্লাহর সামনে নত করেছে।

ফওরব্বিকা লানাসআলান্নাহুম আজমাঈন—আপনার রবের কসম, তাদের সবাইকেই আমি জিজ্ঞাসাবাদ করব। এ কোনো সাধারণ ঘোষণা নয়; এ হলো আকাশের উচ্চতা থেকে নেমে আসা চূড়ান্ত সত্যের ধ্বনি, যেখানে মানুষের সব অজুহাত, সব সাজানো ব্যাখ্যা, সব লুকোনো অপরাধ এক মুহূর্তে নিঃস্ব হয়ে যায়। যে সমাজ সত্যকে টুকরো করতে অভ্যস্ত, যে হৃদয় হিদায়াতকে ইচ্ছেমতো গ্রহণ-অস্বীকার করে, যে মানুষ নিজের কৃতকর্মকে সময়ের ধুলায় চাপা দিতে চায়—সে-ও এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াবে। আল্লাহর জিজ্ঞাসাবাদ মানে কেবল তথ্য জেরা নয়; তা হলো অন্তরের গোপন, নিয়তের অন্ধকার, জুলুমের ভার, অবহেলার ক্ষত—সবকিছুর খোলাসা হয়ে যাওয়া।

এই আয়াত মুমিনের হৃদয়ে একসাথে ভয় ও আশ্রয় জাগায়। ভয়, কারণ একদিন এমন এক আদালত আসবে যেখানে কণ্ঠস্বর কম্পিত হবে, মুখোশ খুলে যাবে, এবং বান্দা নিজের আমল ছাড়া আর কিছুই সামনে আনতে পারবে না। আর আশ্রয়, কারণ যে রব জিজ্ঞাসা করবেন, তিনিই তো দয়ালু, তিনিই তো তওবার দরজা খোলা রেখেছেন, তিনিই তো নবীদের সান্ত্বনা দিয়েছেন যখন তাদের জাতি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই মুমিন দুনিয়ার ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করে: আমি কী জবাব দেব, যখন আমার রব আমার জীবন, আমার নীরবতা, আমার চোখের পানি, আমার গোপন পাপ, আমার লোক দেখানো ইবাদত—সবকিছুর হিসাব চাইবেন?

এই আয়াত আমাদের শেখায়, আত্মসমীক্ষা বিলাসিতা নয়, ইমানের শ্বাস। আজ যে হিসাব আমরা নিজেরা না করি, কাল তা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাই হৃদয়ের দরজা খোলা রাখা, জিহ্বাকে তাসবিহে ভিজিয়ে রাখা, গুনাহের পরে ভেঙে পড়ে তাওবা করা, এবং আল্লাহর কিতাবকে সম্মানের সঙ্গে আঁকড়ে ধরা—এগুলোই বান্দার নিরাপদ পথ। মানুষের ইতিহাসে কত জাতি শক্তি, সম্পদ, কণ্ঠস্বর আর সংখ্যার অহংকারে ডুবে গিয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে আছে শুধু সেই নাম, যে নাম আল্লাহর সামনে বিনয়ী ছিল। এ আয়াত আমাদের কাঁপিয়ে বলে: জবাবদিহি আসবেই, আর সেই দিনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

এই আয়াত আমাদের ভিতরে এক নিঃশব্দ কাঁপন জাগায়। কারণ আজ আমরা যেটাকে সামান্য বলে উড়িয়ে দিই, কাল সেটিই হিসাবের পৃষ্ঠায় অক্ষরে অক্ষরে উপস্থিত হবে। একটি কথা, একটি দৃষ্টি, একটি গোপন নিয়ত, একটি অবহেলা, একটি অবিচার, একটি ভুল জেদ—সবই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই মুমিনের জীবন মানে শুধু ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা নয়; তা হলো প্রতিদিন নিজের ভেতরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করা, আমি কাকে সন্তুষ্ট করতে বাঁচছি? আমি কি এমন জীবন গড়ছি, যা প্রশ্নের দিনে আমাকে লজ্জিত করবে, নাকি এমন হৃদয়, যা তাওবা করে নরম হয়ে গেছে? যেদিন মানুষ বলবে, হায়, যদি আমি প্রস্তুতি নিতাম; সেদিনের আগেই আজকের অশ্রু, আজকের সিজদা, আজকের ইস্তিগফারই আমাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি।