নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই স্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। এই একটি বাক্যেই যেন আকাশের সব দরজা খুলে যায়, আর মানুষের অন্তরের সব শঙ্কা একটু একটু করে গলে পড়ে। “الخَلَّاق” — তিনি শুধু সৃষ্টি করেন না; অবিরাম, অসীম, পরিপূর্ণ সৃষ্টির অধিপতি তিনি। আর “العليم” — তিনি শুধু জানেন না; যা আছে, যা ছিল, যা হবে, যা প্রকাশ পেয়েছে, যা গোপন থেকেছে, সবই তাঁর জ্ঞানের সামনে উন্মুক্ত। মানুষ যখন নিজেকে খুব বড় ভাবতে থাকে, তখন এই আয়াত তাকে আবার মাটিতে নামিয়ে আনে; আর যখন হৃদয় ভেঙে যায়, তখন এই আয়াত তাকে বলে: তোমার রব সৃষ্টি করতে পারেন, তাই পুনর্গঠনও তাঁর কাছে কঠিন নয়।
সূরা আল-হিজরের এই অংশে নবী ﷺ-কে যেমন সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে, তেমনি এক গভীর বাস্তবতাও স্মরণ করানো হচ্ছে—যে রব কুরআন নাযিল করেছেন, তিনিই তার হেফাজতকারী; যে রব মানবজীবনের সূচনা করেছেন, তিনিই মানুষের প্রত্যাখ্যান, বিদ্রূপ, অস্বীকার—সবকিছুর ভিতরকার কারণও জানেন। সূরাটির সামগ্রিক ধারায় আদম-ইবলিসের ঘটনা, অবাধ্যতার পরিণতি, অবিশ্বাসী জাতিগুলোর পতন, আর ফেরেশতাদের তাসবিহ—সবকিছু মিলিয়ে এক মহা-দৃশ্য দাঁড়ায়: সৃষ্টির ইতিহাস কেবল ঘটনাপুঞ্জ নয়, বরং আল্লাহর প্রজ্ঞা, পরীক্ষা, এবং ন্যায়ের এক সুসংহত প্রকাশ। এই আয়াত সেই বড় ছবির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে, যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি অজ্ঞ নন; তাই তাঁর ফায়সালা কদাপি অন্ধ নয়।
এখানে কোনো নির্দিষ্ট স্বতন্ত্র কারণ-নুযূল বর্ণনা না করাই নিরাপদ; বরং আয়াতটিকে সূরার বৃহত্তর সুরের মধ্যে বুঝতে হয়। মক্কী পরিবেশে যখন সত্যকে ঘিরে উপহাস, অস্বীকার, এবং নবীদের প্রতি মানসিক চাপ বাড়ছিল, তখন এ ধরনের বাণী হৃদয়ে অবতীর্ণ হত এক আসমানি আশ্বাস হয়ে: তোমার রবের ক্ষমতা কেবল সৃষ্টির সূচনায় সীমিত নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার অন্তর্গত জ্ঞানও তাঁর। তাই বান্দা যখন আল্লাহকে “স্রষ্টা” বলে চিনে, তখন সে বুঝতে শেখে—আমার ভাঙনও তাঁর অজানা নয়, আমার প্রতীক্ষাও তাঁর পরিকল্পনার বাইরে নয়, আমার অশ্রুও তাঁর জ্ঞানের বাইরে পড়ে না। আর এখানেই মুমিনের তাসবিহ গভীর হয়: “তিনি সৃষ্টি করেন, তিনি জানেন, তিনি রক্ষা করেন।”
যে রব সৃষ্টি করেন, তিনি কেবল অস্তিত্ব দান করেন না; তিনি প্রতিটি অস্তিত্বের মাপ, সীমা, সময়, প্রয়োজন আর পরিণতিও জানেন। এই আয়াত যেন মানুষের সকল অজ্ঞতার মুখে আল্লাহর জ্ঞানের এক নীরব, অথচ দুর্দান্ত ঘোষণা। মানুষ ভাবে, যা চোখে পড়ে না তা বোধহয় হারিয়ে গেছে; যা ভেঙে গেছে তা বোধহয় আর উঠবে না। কিন্তু আল্লাহ তো الخَلَّاق; তাঁর সৃষ্টিশীলতা থামে না, ক্লান্ত হয় না, সীমাবদ্ধও নয়। তিনি আবার গড়ে তুলতে পারেন, আবার জীবন্ত করতে পারেন, আবার সোজা করতে পারেন—কারণ সৃষ্টি তাঁর কাছে শুধু একবারের কাজ নয়, বরং এক অবিরাম ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার প্রকাশ।
এই আয়াতকে বুকের ভেতর নামিয়ে আনলে বুঝি, জাতির পতন হঠাৎ আসে না; তা শুরু হয় অন্তরের এক অদৃশ্য বিচ্যুতি থেকে। যখন মানুষ সত্যকে জেনে অগ্রাহ্য করে, যখন নিয়ামতের মাঝেও কৃতজ্ঞতা হারায়, যখন গায়েবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সীমা ভুলে যায়—তখন ধ্বংস আসে যেমন করে শুকনো পাতায় আগুন লাগে। কিন্তু একই আয়াতের আলোতে হৃদয় শান্তও হয়: তোমার রব জানেন তুমি কতটা দুর্বল, জানেন তুমি কতটা ক্লান্ত, জানেন কোন দুঃখ তুমি প্রকাশ করোনি। তাই তাঁর কাছে ফিরো; কারণ যিনি পরিপূর্ণভাবে সৃষ্টি করেন, তিনি পরিপূর্ণভাবে রক্ষা-ও করতে পারেন। আর এই জ্ঞানের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তর অবশেষে তাসবিহে নত হয়—সুবহানাল্লাহ, যে রব এমন স্রষ্টা, এমন সর্বজ্ঞ, তাঁর সিদ্ধান্তই সত্য; তাঁর হেফাজতই নিরাপত্তা; তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া-ই হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর শান্তি।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের অহংকারের গায়ে যেন মৃদু কিন্তু অমোঘ এক আঘাত লাগে। আমরা কত কিছু জানি বলে দাবি করি, কত পরিকল্পনা করি, কত হিসাব কষি; কিন্তু আমাদের জ্ঞান আসলে ভাঙা কাচের মতো—টুকরো টুকরো, সীমাবদ্ধ, ভুলে ভরা। আর আমাদের রব? তিনি الخَلَّاق, পরম স্রষ্টা; তিনি শুধু একবার সৃষ্টি করে ছেড়ে দেন না, বরং প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, সাজানো, প্রতিস্থাপন, পুনর্গঠন—সবই তাঁর এক মহাপ্রজ্ঞার প্রকাশ। মানুষের জীবনে যা এলোমেলো মনে হয়, আল্লাহর জ্ঞানে তা এলোমেলো নয়। যে হৃদয় আজ ক্লান্ত, যে সমাজ আজ পথ হারিয়েছে, যে উম্মাহ আজ নিজের ভারে অবনত—সবকিছুর পর্দার আড়ালে তিনি জানেন কেন এমন হচ্ছে, কোথায় শূন্যতা জন্ম নিয়েছে, কোন অবাধ্যতা হৃদয়ের আলো নিভিয়ে দিয়েছে।
সূরা আল-হিজরের এই সুরে নবী ﷺ-কে সান্ত্বনা দেওয়ার ভেতরে উম্মতের জন্যও এক নির্মল শিক্ষার আলো আছে। কুরআনকে অস্বীকার করা, সত্যকে তুচ্ছ করা, অবাধ্যতার পথে জেদ ধরে রাখা—এসব কোনো অন্ধকারে হারিয়ে যায় না; আল্লাহর দৃষ্টি থেকে কিছুই লুকায় না। আদম ও ইবলিসের কাহিনি মনে করিয়ে দেয়, সিজদা শুধু শরীরের নয়, আত্মারও; অহংকার যখন নতি স্বীকার করে না, তখন পতন শুরু হয়ে যায়। আর ফেরেশতাদের তাসবিহের পাশে মানুষের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়: সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো রবের মহিমা জানা, তাঁর সামনে নত হওয়া, নিজের সীমা বুঝে ফিরে আসা। তাই এই আয়াত আমাদের বুকের মধ্যে ভয় জাগায়—যে ভয় অবাধ্যতাকে ছোট করে না দেখে, নিজের আমলকে হালকা ভাবে না—আবার একই সঙ্গে আশা জাগায়—যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি পথহারা হৃদয়কেও ফিরিয়ে আনতে পারেন, ভগ্ন সমাজকেও নতুন করে দাঁড় করাতে পারেন, আর তাঁর জ্ঞানের বাইরে আমাদের একটি অশ্রুও পড়ে না।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষ বুঝতে পারে, তার অস্তিত্ব কোনো এলোমেলো ধুলোর নাম নয়। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি ব্যর্থ হন না; যিনি জানেন, তাঁর কাছে কোনো অশ্রু অচেনা নয়, কোনো নিঃশব্দ আহাজারি হারিয়ে যায় না, কোনো অন্তর্গত ভাঙন অদেখা থাকে না। সূরা আল-হিজরের গোটা ধারা যেন এ সত্যকেই হৃদয়ে গেঁথে দেয়—আদমের সন্তান যখন অহংকারে পড়ে, ইবলিসের পথ ধরে দূরে সরে যায়, তখনও আল্লাহর জ্ঞান তাকে ছেড়ে যায় না; আর যখন কোনো জাতি সত্যকে অস্বীকার করে, তখন তাদের পতনও তাঁর অজ্ঞতার কারণে নয়, বরং তাঁর ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণতারই প্রকাশ।
নবী ﷺ-কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে এই সূরা যেন আমাদেরও কানে কানে বলে: তোমার রব তোমার কষ্টের কারণও জানেন, তোমার দাওয়াতের প্রতিরোধও জানেন, তোমার ধৈর্যের ওজনও জানেন। আর কুরআন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি—এই মহাসত্যের পেছনে রয়েছে সেই রবের শক্তি, যাঁর জন্য সৃষ্টি করা যেমন সহজ, রক্ষা করাও তেমনি সহজ। মানুষের স্মৃতি দুর্বল হতে পারে, মানুষের প্রতিশ্রুতি ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান ও কুদরত কখনো ক্লান্ত হয় না।
তাই এই আয়াতের সামনে অহংকার নয়, নতশির হওয়াই ইমানের শোভা। নিজের ভেতরের ইবলিসি সুরকে চিনে নিয়ে তওবা করো, অবাধ্যতার অন্ধকার থেকে ফিরে এসো, আর তাসবিহে হৃদয় ভরিয়ে দাও—কারণ যে রব সবকিছু সৃষ্টি করেন, তিনি তোমাকে নতুন করে গড়তেও সক্ষম। তাঁর কাছে ফিরলে ক্ষতি কিছুই নয়; আর তাঁর থেকে দূরে গেলে, মানুষের ভিড়ে থেকেও মানুষ একা হয়ে যায়। আল্লাহই الخلّاق, আল-আলীম—তিনি সৃষ্টি করেন, তিনি জানেন; আর এই দুই সত্যের মাঝে লুকিয়ে আছে বান্দার সব নিরাপত্তা, সব ভয়মোচন, সব ফিরে আসা।