তখন তাদের উপার্জন তাদের কোনো উপকারে আসল না। এই একটিমাত্র বাক্যে এমন এক মহাশিক্ষা লুকিয়ে আছে, যা মানুষের অহংকারকে নিঃশব্দে ভেঙে দেয়। মানুষ ভাবে—তার ধন, তার কারিগরি, তার শক্তি, তার নগর, তার নিরাপত্তা, তার সঞ্চিত কীর্তি তাকে টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু আল্লাহর সামনে যখন সত্যের পরিমাপ দাঁড়ায়, তখন দেখা যায়, যা কিছু সে গড়েছিল, যা কিছু সে জমিয়েছিল, যা কিছু দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে শক্ত করে ভাবছিল, তা-ই তার বিপদের মুহূর্তে কেবল নীরব বস্তু হয়ে থাকে। অর্জন মানুষকে অনেক কিছু দিতে পারে, কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতাকে আড়াল করার ঢাল দিতে পারে না।

সূরা আল-হিজরের এই অংশে আল্লাহ পূর্ববর্তী অবাধ্য জাতিগুলোর পরিণতির দিকে দৃষ্টি ফেরান। এখানে কোনো কৃত্রিম কাহিনি নয়, বরং মানবসভ্যতার পুনরাবৃত্ত এক সত্যের ইশারা: যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে হৃদয় সরে যায়, যখন রাসূলদের সতর্কবাণীকে তুচ্ছ করা হয়, তখন সভ্যতার সৌন্দর্যও শেকড়হীন পাতার মতো কাঁপতে থাকে। তাদের সঞ্চয়, তাদের ক্ষমতা, তাদের গড়ে তোলা ব্যবস্থা—কোনো কিছুই পতন ঠেকাতে পারেনি। এই আয়াত তাই কেবল অতীতের ধ্বংসগাথা নয়; এটি বর্তমানের মানুষকেও জিজ্ঞেস করে, তুমি যা সঞ্চয় করছ, তা কি সত্যের পক্ষে, না সত্যের বিরুদ্ধে?

সুরাটি সামগ্রিকভাবে নবীদের সান্ত্বনার সুরও বহন করে। যারা সত্যের পথে ডাকে, তাদের প্রতি অবজ্ঞা, উপহাস, অস্বীকার নতুন কিছু নয়; অতীতেও ছিল। কিন্তু তাদের পরিণতি দেখিয়ে আল্লাহ যেন বলেন, হে মুমিন, হে দাঈ, হে অন্তরের ভেতর কাঁপতে থাকা মানুষ—তুমি দুনিয়ার বাহ্যিক সাফল্যে বিভ্রান্ত হয়ো না। উপার্জন নিজে দোষী নয়, কিন্তু উপার্জনের উপর ভরসা করে রবকে ভুলে যাওয়াই ধ্বংসের শুরু। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে হৃদয় নরম হয়: যা কিছু আছে, তা আল্লাহর; আর বাঁচাতে পারে কেবল তাঁর দিকে ফিরে আসা, তাসবিহে ভেজা জিহ্বা, তাওবায় ভাঙা হৃদয়।

তখন তাদের উপার্জন তাদের কোনো উপকারে আসল না—এই বাক্যটি যেন মানুষের সমস্ত ভরসার ওপর আল্লাহর নীরব কিন্তু চূড়ান্ত মুদ্রা। মানুষ জমায়, গড়ে, হিসাব করে; মনে করে সঞ্চয়ই নিরাপত্তা, কীর্তিই স্থায়িত্ব, আর অর্জনই জীবনের বর্ম। কিন্তু যখন সত্যের আহ্বানকে অস্বীকার করা হয়, যখন অহংকার হৃদয়কে পাথর বানিয়ে ফেলে, তখন সেই সব অর্জন কেবল বস্তু হয়ে থাকে—উদ্ধারক নয়, সঙ্গীও নয়। সূরা আল-হিজরের এই সতর্কতা আমাদের শেখায়, মানুষের পরিশ্রম নিজে দোষ নয়; দোষ হলো সেই অর্জনকে রবের সামনে দাঁড়ানোর বিকল্প ভাবা, সেই অর্জনের ওপর এমন আস্থা রাখা যেন তা ধ্বংসের দিনও রক্ষা করবে। অথচ আল্লাহর সামনে ধন, শক্তি, নগর, প্রযুক্তি, ঐশ্বর্য—সবই নিঃশব্দ, সবই দুর্বল।

মানুষের পতন অনেক সময় শূন্য হাতে আসে না; আসে ভরা হাতে, কিন্তু তবু ফাঁপা অন্তরে। তারা কুক্ষিগত করেছিল, নির্মাণ করেছিল, জমিয়েছিল—কিন্তু হৃদয়ে তাসবিহ ছিল না, তাওবা ছিল না, বিনয় ছিল না। তাই তাদের উপার্জন তাদের বাঁচায়নি; বরং তাদের অন্তর্গত অন্ধতার সাক্ষী হয়ে রইল। এই আয়াত আমাদের কানে কানে বলে, যা কিছু আমরা অর্জন করি, তা যদি আল্লাহর আনুগত্যে না জড়ায়, তবে তা একদিন আমাদের বিরুদ্ধেই দাঁড়াবে নীরব প্রমাণ হয়ে। তাই আসল নিরাপত্তা সম্পদে নয়, সিজদায়; আসল স্থায়িত্ব প্রাচীরে নয়, ইমানে; আসল আশ্রয় জমায়েতে নয়, আল্লাহর রহমতে। আজও যে হৃদয় এই কথাটি বুঝে, সে ধ্বংসের আগেই জেগে ওঠে; আর যে হৃদয় বুঝেও গাফিল থাকে, সে নিজের হাতে নিজের অসহায়তাকে লিখে রাখে।
তখন তাদের উপার্জন তাদের কোনো উপকারে আসল না। এই বাক্যটি মানুষের ভেতরের সবচেয়ে নরম অথচ সবচেয়ে কঠিন সত্যকে স্পর্শ করে। আমরা কত কিছু জড়ো করি—অর্থ, সম্মান, প্রভাব, নিরাপত্তা, সম্পদ, কৃতিত্ব, স্থাপনা, নামডাক—আর মনে করি এগুলোই বুঝি আমাদের ঢাল। কিন্তু যখন আল্লাহর ফয়সালা আসে, তখন দেখা যায় এসব কেবল হাতের মুঠোর বালি; আঙুল শক্ত করে চেপে ধরলেও তা রক্ষা করে না। যে হৃদয় তাসবিহে ভিজে না, যে আত্মা তওবায় ফিরে না, যে সমাজ অহংকারে ফুলে থাকে, তার সঞ্চিত জিনিসও শেষ পর্যন্ত তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে না।

সূরা আল-হিজরের এই আহ্বান নবীদের সান্ত্বনাও বটে, আবার উম্মতের জন্য সতর্ক ঘণ্টাও বটে। রাসূলদের প্রতি অস্বীকারের পথ যেভাবে আগে জাতিদের পতনে পৌঁছে দিয়েছে, আজও মানুষের ভেতরের সেই একই প্রবণতা ধ্বংস ডেকে আনে—সত্যকে চাপা দেওয়া, নসীহতকে তুচ্ছ করা, শক্তিকে চূড়ান্ত ভরসা মনে করা। আল্লাহ মানুষকে তার অর্জনের দাস হতে দেন না; তিনি দেখিয়ে দেন, অর্জন যত বড়ই হোক, তা রবের সামনে বিনীত না হলে উপকারী নয়। তাই এই আয়াত আমাদের ধন নিয়ে নয়, হৃদয় নিয়ে ভাবতে শেখায়; গড়ে তোলা জিনিসের চেয়ে গড়ে ওঠা ঈমানের মূল্য কত বেশি, তা চোখের সামনে দাঁড় করায়।

যখন সমাজ তার উপার্জনকে নিরাপত্তা ভাবে, তখনই সে সবচেয়ে অনিরাপদ হয়ে পড়ে। কিন্তু যে অন্তর জানে—আল্লাহই রক্ষাকর্তা, আল্লাহই অবকাশ দেন, আল্লাহই পাকড়াও করেন—সে অন্তর ধ্বংসের খবর শুনেও ভেঙে পড়ে না; বরং আরও বেশি করে ফিরে যায় রবের দিকে। এই আয়াত আমাদের শিখায়, মানুষের অর্জন শেষ কথা নয়, আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই শেষ আশ্রয়। অতএব, যা কিছু আমরা গড়ছি, তা যেন অহংকারের প্রাসাদ না হয়; বরং তা যেন বিনয়, কৃতজ্ঞতা আর তাসবিহের ছায়ায় দাঁড়ায়। কারণ যে মুহূর্তে সত্য মাটিতে নেমে আসে, তখন উপার্জনের জৌলুস নয়, কেবল আল্লাহর রহমতই মানুষকে বাঁচাতে পারে।

মানুষের জীবনে এই আয়াত একটি নীরব কিয়ামত। আমরা যা জমাই, যা গড়ি, যা অর্জন করি—সবকিছুর ভেতরেই এক অদৃশ্য আশ্বাস খুঁজি: এগুলো আমাকে বাঁচাবে, এগুলো আমাকে দাঁড় করাবে, এগুলো আমাকে অন্তত কিছুদিন টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু আল্লাহ যখন তাঁর নিদর্শন দেখান, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়—অর্জন নিজে কোনো আশ্রয় নয়। হৃদয় যদি সত্যকে অস্বীকার করে, তাওহিদের আহ্বানকে এড়িয়ে যায়, তবে সম্পদও কেবল সম্পদই থাকে, শক্তিও কেবল বাহ্যিক শক্তি হয়, আর নগর, প্রাচীর, পরিকল্পনা, কৃতিত্ব—সবই একদিন ভেঙে পড়ে নীরব সাক্ষ্য হয়ে যায়।

এইজন্য কুরআন আমাদের বারবার ফিরিয়ে আনে বিনয়, তাসবিহ ও তাওবার দিকে। কারণ মানুষের নিরাপত্তা তার সঞ্চয়ে নয়, তার রবের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে। সূরা আল-হিজরের এই শিক্ষায় ভেসে ওঠে নবীদের সান্ত্বনাও: সত্যের পথে একা মনে হলেও, আল্লাহর বাণীই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে; আর যারা অহংকারে নিজেদের অর্জনকে ঢাল বানায়, তাদের ঢালই একদিন তাদের সামনে অকার্যকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই আজ যদি অন্তর একটু কেঁপে ওঠে, সেটাই রহমতের দরজা। যা কিছু আমাদের আছে, তার ওপর ভরসা নয়; বরং যিনি সবকিছুর মালিক, তাঁর কাছেই ফিরে যাওয়া—এটাই বাঁচার জায়গা, এটাই স্থায়ী আশ্রয়।