আল্লাহ তাআলা এখানে এমন এক কথা বলছেন, যা শুনলে হৃদয় থমকে যায়: “আপনার প্রাণের কসম, তারা আপন নেশায় প্রমত্ত ছিল।” এই শপথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের মর্যাদা যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি প্রকাশ পায় অস্বীকারকারীদের ভয়ংকর মানসিক অবস্থা। সত্য তাদের সামনে ছিল, কিন্তু তাদের অন্তর ছিল ঘোরের ভেতর। তারা কেবল ভুল করেছিল—তা নয়; বরং তারা এমন এক আত্মপ্রবৃত্তির আবরণে ঢেকে গিয়েছিল, যেখানে সত্যের আলোও তাদের কাছে অস্বস্তিকর, ভারী, অবাঞ্ছিত হয়ে উঠেছিল। গুনাহ, অহংকার, এবং জিদ যখন হৃদয়কে মত্ত করে তোলে, তখন মানুষ নিজের চোখেও অন্ধ হয়ে যায়।

এই আয়াতের ভেতরে নবীদের জন্যও সান্ত্বনা আছে। দাওয়াতের পথ সবসময়ই সহজ নয়; অনেক সময় মানুষ শুধু অস্বীকারই করে না, তারা সত্যকে এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে যেন তাদের ভেতরে শুনবার ক্ষমতাই নিভে গেছে। তখন নবীর কষ্ট হয়, দাওয়াতের দায় বাড়ে, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এই গভীর সান্ত্বনা: তোমার কথা ব্যর্থ হয়নি; তাদের বিভ্রান্তি এত প্রবল যে তারা নিজেরাই বাস্তবতা থেকে ছিটকে পড়েছে। সূরা আল-হিজরের বৃহৎ ধারাবাহিকতায় আদম-ইবলিসের ঘটনা, শয়তানের প্রতারণা, এবং মানবজাতিকে সতর্ক করার বার্তা এক সুতোয় গাঁথা; এখানে সেই সুতোর আরেকটি কঠিন প্রান্ত দেখা যায়—যে ব্যক্তি অহংকারে ডুবে যায়, সে কেবল হকের বিরোধিতা করে না, নিজের পতনের পথও নিজেই প্রশস্ত করে।

এই আয়াতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক শানে নুযূল নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; তবে এর ভাষা মক্কার সেই সামগ্রিক বাস্তবতাকে ধারণ করে, যেখানে বহু মানুষ অহংকার, উপহাস, এবং জিদে সত্যকে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই এটি শুধু এক অতীত ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য এক আয়না। যখন হৃদয় আল্লাহর তাসবিহ থেকে দূরে সরে যায়, যখন নফস নিজের ইচ্ছাকে সত্যের মাপকাঠি বানিয়ে নেয়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে “সَكْرَة” অর্থাৎ বিভ্রান্তির মাতাল ঘোরে ঢুকে পড়ে। আর সেই ঘোরে দাঁড়িয়ে সত্য যতই পরিষ্কার হোক, সে আর তাকে চিনতে পারে না—এটাই পতনের শুরু, আর এটাই আল্লাহর সতর্কবার্তার কঠিন সৌন্দর্য।

لَعَمْرُكَ—আপনার প্রাণের কসম। এই এক শপথে আল্লাহ তাআলা যেন নবী ﷺ-এর মর্যাদাকে আকাশের নিকটতম আলো করে তুলেছেন, আর একই সঙ্গে প্রকাশ করে দিয়েছেন অস্বীকারকারীদের অন্তর্দৃষ্টি কতটা মৃত হয়ে গিয়েছিল। তারা সামনে সত্য দেখেছিল, কিন্তু সত্যকে গ্রহণ করার যোগ্যতা তাদের ভেতরে আর অবশিষ্ট ছিল না। এটি কেবল ভুলের গল্প নয়; এটি আত্মার এমন এক পতন, যেখানে গুনাহ, অহংকার, বিদ্বেষ আর জিদের ঘন মেঘে হৃদয় এমনভাবে আচ্ছন্ন হয় যে নুরের আলোও তখন ভারী মনে হয়। মানুষের বিপর্যয় কখনো কেবল জ্ঞানের অভাবে আসে না; কখনো আসে জানা সত্ত্বেও না মানার অভ্যাস থেকে, আর সেই অভ্যাসই ধীরে ধীরে এক ধরনের সَكْرَتِهِمْ—নেশা, ঘোর, বিবেচনাহীন মত্ততা—হয়ে ওঠে।

এই আয়াত নবীদের জন্য সান্ত্বনার এক গভীর দরজা। দাওয়াতের পথের কষ্টে যখন হৃদয় ভাঙে, যখন সত্যের ডাক মানুষের কানে পৌঁছে দিয়েও প্রাণে পৌঁছায় না, তখন মনে হয়—কেন তারা বোঝে না, কেন তারা থামে না, কেন তারা ফিরে আসে না? আল্লাহ তাআলা যেন বলছেন: তাদের অস্বীকার তোমার কথার দুর্বলতা নয়; তাদের অন্তরের ঘোরই তাদের সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। নবীর দায়িত্ব সত্য পৌঁছে দেওয়া, আর মানুষের অন্তরের তালা খোলা আল্লাহর হাতে। এই বোধের মধ্যে একদিকে দায়িত্বের ভার আছে, অন্যদিকে আছে অবিচলতার শক্তি—কারণ সত্যের পথে হাঁটা মানে ফলের মালিকানা নিজের হাতে নেওয়া নয়, বরং আমানতকে নিষ্ঠার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া।
আর আমাদের জন্য এ আয়াত এক কঠিন আয়না। আমরা কি কখনো পাপ, অহংকার, দুনিয়ার আসক্তি, নিজের মতের মোহে এমন মত্ত হয়ে যাই না যে হক কথা শুনলেও কেঁপে উঠি না? সত্য যখন অস্বস্তি জাগায়, তখন বুঝতে হবে হৃদয়ের কোথাও ঘন অন্ধকার জমেছে। তাই এই আয়াত কেবল অতীতের এক জাতির পতনের বর্ণনা নয়; এটি আজকের মানুষের জন্যও সতর্কবার্তা—সত্যকে বারবার ফিরিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত সত্যকে অস্বীকার করা সহজ হয়ে যায়, আর একদিন নিজের ভেতরের নেশাই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। কুরআন আমাদের জাগাতে এসেছে, ঘুম পাড়াতে নয়; স্মরণ করাতে এসেছে, হারিয়ে যেতে নয়।

আল্লাহ তাআলা যখন বলেন, “আপনার প্রাণের কসম, তারা আপন নেশায় প্রমত্ত ছিল”—তখন যেন আকাশের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। এটি কেবল অস্বীকারের বর্ণনা নয়; এটি এক অন্তর্দহনের ছবি, যেখানে মানুষ নিজের অহংকার, জিদ, গুনাহ ও ভ্রান্ত অভ্যাসে এমনভাবে ডুবে যায় যে সত্য তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও সে তাকে চিনতে পারে না। নেশা এখানে শুধু পানীয়ের নেশা নয়; বরং আত্মপ্রবৃত্তির নেশা, প্রভাব-প্রতিপত্তির নেশা, গোমরাহির ঘোর, যার মধ্যে মানুষ নিজের হৃদয়ের কণ্ঠস্বরও হারিয়ে ফেলে। তখন উপদেশ তার কানে পৌঁছায়, কিন্তু স্পর্শ করে না; কুরআনের আলো সামনে আসে, কিন্তু চোখে লাগে কেবল তীব্রতা।

এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে দেয়। কারণ ইতিহাসের সেই মুখগুলো আজও নতুন পোশাকে ফিরে আসে—কখনো অবহেলার মধ্যে, কখনো অহংকারে, কখনো নফসের পক্ষে অজুহাত বানিয়ে। মানুষ যখন নিজের ভেতরের সত্য-ভীতিকে চাপা দিতে দিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে ধীরে ধীরে সঠিককে ভুল, ভুলকে স্বাভাবিক মনে করতে শেখে। এ কারণেই এই আয়াতে নবীদের সান্ত্বনাও আছে, উম্মতের সতর্কতাও আছে। দাওয়াতের পথের সবচেয়ে কষ্টকর দিক হলো, অনেক সময় সত্য অজানা থাকে না; বরং হৃদয়ের দুর্বলতা তাকে গ্রহণ করতে দেয় না। তাই প্রতিটি পাঠকের জন্য প্রশ্ন জেগে ওঠে: আমার ভেতরে কি এমন কোনো সাকরাহ্ আছে, এমন কোনো ঘোর আছে, যা আমাকে আল্লাহর দিকে ফিরতে বাধা দিচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিলে হৃদয় কেঁপে ওঠে, কিন্তু সেই কাঁপনই রাহমাহর দরজা খুলে দেয়। কারণ যে নিজের বিভ্রান্তি চিনে ফেলে, তার জন্য ফেরার পথ বন্ধ নয়। সূরা আল-হিজর আমাদের শেখায়—অস্বীকারকারীর পতন যতই ভয়ংকর হোক, মুমিনের কাজ হলো নিজের অন্তরকে জাগিয়ে রাখা, গুনাহের ঘোর থেকে আল্লাহর স্মরণে ফিরে আসা, আর সত্যকে এমনভাবে ভালোবাসা যেন তা শুনলেই হৃদয় নত হয়ে যায়। মানুষ ধ্বংস হয় তখনই, যখন সে সত্যকে হারিয়ে ফেলে; আর বাঁচে তখনই, যখন সে নিজের অন্ধত্ব স্বীকার করে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হয়।

এখন আমাদের জন্য প্রশ্নটি আর “তারা কেন মানল না” নয়; প্রশ্ন হলো, আমাদের ভেতরেও কি এমন কোনো স্রোত আছে, যা সত্যকে শুনেও শুনতে দেয় না? গুনাহের স্বাদ, অহংকারের নেশা, দুনিয়ার মোহ, নিজের মতকে আঁকড়ে থাকার জিদ—এসবও একেকটি সেক্রেট, একেকটি ঘোর। মানুষ যখন নিজের ভেতরের এই মত্ততাকে ভালবাসতে শুরু করে, তখন কুরআনের আলোও তার কাছে তীব্র লাগে; হেদায়াত তখন উপহার নয়, বোঝা বলে মনে হয়। সূরা আল-হিজরের এই কঠিন বাক্য আমাদের জানিয়ে দেয়, হেদায়াত কেবল তথ্যের নাম নয়; হেদায়াতের জন্য চাই ভাঙা হৃদয়, সতর্ক আত্মা, আর আল্লাহর সামনে নত হওয়ার সাহস।

তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম কাজ হলো আত্মসমালোচনা, তারপর তাওবা। যেন আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্পর্কে এমন না হয়ে যাই, যাদের বিষয়ে পরে বলা হয়—তারা আপন নেশায় প্রমত্ত ছিল। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে বিভ্রান্তির ঘোর থেকে রক্ষা করুন, সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দিন, আর আপনার নবীর সম্মানিত জীবনের কসমে উচ্চারিত এই সত্যবাণীকে আমাদের জন্য জাগরণের কারণ বানিয়ে দিন। কুরআন যে কেবল শোনার জন্য নয়, জেগে ওঠার জন্য; এই আয়াত যেন আমাদের হৃদয়কে তা আবারও শিখিয়ে দেয়।