সূরা আল-হিজরের এই আয়াতে এক গভীর ও তীক্ষ্ণ নির্দেশ শোনা যায়: শেষরাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্রস্থান করো, পিছনে ফিরে তাকিয়ো না, আর যেখানে আদেশ দেওয়া হয়েছে সেখানেই চলতে থাকো। বাহ্যত এটি একটি যাত্রার নির্দেশ; কিন্তু অন্তরে এটি নাজাতের বিধান। যখন কোনো জনপদ আল্লাহর অবাধ্যতায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে যায়, যখন গুনাহ চারদিক থেকে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন মুমিনের জন্য বাঁচার পথ কখনোই ভিড়ের সঙ্গে ভিড় করা নয়—বরং আল্লাহর নির্দেশকে নীরবে, দ্রুত, নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করা। এই আয়াতে আমরা দেখি, রহমত কখনো কখনো প্রথমে হুকুমের রূপ নেয়, আর হুকুমের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে রক্ষা।
এখানে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা লূত আলাইহিস সালামের জাতির পরিণতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কুরআনের সামগ্রিক বয়ানে দেখা যায়, এক সম্প্রদায় যখন প্রকাশ্য অশ্লীলতা, সীমালঙ্ঘন ও সত্যকে অমান্য করার ভেতর নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন নবীকে ও তাঁর অনুসারীদের আলাদা হয়ে যেতে বলা হয়—ধ্বংসের ঢেউ যখন নেমে আসে, তখন আল্লাহর সুরক্ষা অনেক সময় একান্ত বিচ্ছেদের পথেই প্রকাশ পায়। এ আয়াতের পেছনে নির্ভরযোগ্যভাবে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনাপ্রবাহকে সীমাবদ্ধ করা জরুরি নয়; বরং এর বৃহত্তর পাঠ হলো—আল্লাহর আদেশ মানা মানে নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে হাঁটা, যদিও সেই পথ মানুষের চোখে অন্ধকার, নিঃসঙ্গ এবং অস্বস্তিকর মনে হয়।
আরও সূক্ষ্ম যে শিক্ষা এখানে জ্বলজ্বল করে, তা হলো: পিছনে না তাকানো। কারণ ধ্বংসের দিকে ফিরে তাকানো শুধু চোখের কাজ নয়, তা কখনো হৃদয়ের দুর্বলতাও হয়—অতীতের মোহ, ভয়ের টান, অভ্যাসের শেকড় মানুষকে ফেরাতে চায়। আল্লাহ যখন বলেন ‘যেখানে আদেশপ্রাপ্ত হচ্ছো সেখানে যাও’, তখন তিনি আসলে বান্দাকে শেখান—মুমিনের গন্তব্য তার আবেগ নয়, তার রবের নির্দেশ। এই আয়াত নবীদের সান্ত্বনার সুরও বহন করে: সত্যের পথে একা মনে হলেও আল্লাহ একা নন, আর তাঁর নির্দেশই সবচেয়ে বড় আশ্রয়। অল্প শব্দে এখানে আনুগত্য, ত্যাগ, নিরাপত্তা এবং তাওহীদের কঠিন সৌন্দর্য একসাথে নেমে এসেছে।
আল্লাহ যখন বলেন, শেষরাতে পরিবারসহ বেরিয়ে যাও, তখন এই নির্দেশ শুধু এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়ার কথা বলে না; এটি বলে, অবাধ্যতার অন্ধকার থেকে রহমতের ছায়ায় সরে আসতে হবে। রাতের শেষপ্রহর—যে সময় চারপাশ নীরব, ভীতি গভীর, আর মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন—সেই সময় প্রস্থান যেন শেখায়, নাজাত অনেক সময় শব্দ করে আসে না; তা আসে আল্লাহর হুকুমের প্রতি নিঃশব্দ সমর্পণে। মুমিনের বড় শক্তি এখানে: সে ভিড়ের দিকে তাকায় না, কারণ সে জানে ভিড় সবসময় সত্যের পথ দেখায় না; সে সামনে তাকায়, কারণ তার দিশা নির্ধারণ করেন রব্বুল আলামীন।
আর ‘যেখানে আদেশ দেওয়া হয়েছে সেখানেই যাও’—এই বাক্যে যেন বান্দার সারা জীবনের নীতি লুকিয়ে আছে। আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, কোথায় নিরাপত্তা? কোথায় আশ্রয়? কুরআন মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দেয়: যেখানে আল্লাহ পাঠান, সেখানেই নিরাপত্তার দিগন্ত শুরু হয়। হয়তো পথ অচেনা, হয়তো গন্তব্য অনির্বাচিত, তবু আল্লাহর নির্দেশিত যাত্রাই শেষ পর্যন্ত নাজাতের যাত্রা। এভাবেই কুরআন নবীদের সান্ত্বনা দেয়: যখন সত্যের পথ একাকী মনে হয়, যখন বিপদ চারদিকে ঘিরে ধরে, তখনও আল্লাহর পরিকল্পনা নীরবে কাজ করে। অবাধ্য জনপদ পতনের দিকে এগোয়, আর মুমিন—আল্লাহর আদেশ ধরে—অন্ধকার ভেদ করে আলোর দিকে।
আল্লাহর আদেশ যখন আসে, তখন তা কেবল একটি গন্তব্যের নির্দেশ নয়; তা হৃদয়ের পরীক্ষা। শেষরাতে প্রস্থান—এ এক গোপন রহস্যের মতো। মানুষের ভিড় ঘুমিয়ে আছে, অন্ধকার নেমে এসেছে, চারপাশে ভয় ও অস্থিরতা ঘনীভূত; আর ঠিক সেই সময়ে মুমিনকে বলা হচ্ছে, নীরবে চলে যাও, পিছনে ফিরো না। যেন শিক্ষা এটাই—যে আত্মা আল্লাহর ডাকে সত্যিই সাড়া দেয়, সে বিপদের শব্দে স্থির হয় না, আর ধ্বংসের নগরীতে দাঁড়িয়ে নিজের নিরাপত্তা নিজে বানাতে চায় না। সে জানে, নাজাতের রাস্তা অনেক সময় চিৎকারে নয়, বরং নিঃশব্দ আনুগত্যে খুলে যায়।
পিছনে না তাকানো—এটিও কেবল দৃষ্টি ফিরিয়ে না নেওয়ার কথা নয়; এটি এক অন্তরের শৃঙ্খলা। যে গুনাহের সমাজে পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আল্লাহর নির্দেশে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাকে আর পুরোনো জীবনের টান, ভাঙা সম্পর্কের মায়া, ধ্বংসপ্রায় পরিবেশের আবেগে থেমে গেলে চলবে না। মুমিনকে যেতে হয় যেখানে তাকে যেতে বলা হয়েছে; তার পদক্ষেপ নির্ধারণ করেন তিনিই, যিনি পথও তৈরি করেন, আশ্রয়ও দেন। এই আয়াতে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয় হতাশার নয়—এ ভয় এমন, যা আত্মাকে জাগায়। আর আশা আছে, কিন্তু সেই আশা শর্তহীন নিরাপত্তার নয়—এ আশা সেই করুণার, যা সঠিক সময়ে বান্দাকে উঠিয়ে নেয় বিপর্যয়ের আগেই।
তাই এই আয়াত আমাদের কাছে আজও এক আয়নার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সমাজ যখন অন্যায়ের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন প্রত্যেক মুমিনকে নিজের ভেতরে প্রশ্ন করতে হয়—আমি কি আল্লাহর হুকুমের সাথে আছি, না অভ্যাসের সাথে? আমি কি সত্যের পথে আছি, না পিছনে ফেরা আর দ্বিধার নরম অন্ধকারে? এই প্রশ্নের মধ্যেই তাওবার দরজা খুলে যায়। কারণ আল্লাহর নির্দেশ মানা মানে কেবল শরীরের চলা নয়; হৃদয়েরও প্রস্থান। গুনাহ থেকে, গাফিলতি থেকে, অহংকার থেকে, মানুষের ভয় থেকে বেরিয়ে এসে যখন বান্দা রবের দিকে মুখ ফেরায়, তখন শেষরাতের সেই যাত্রা প্রতিটি মুমিন আত্মার জন্য এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে—ধ্বংসের মাঝেও আল্লাহর পথে চলাই নাজাত।
মানুষ অনেক সময় ভেবে নেয়, ফেরার দরজা খোলা থাকবে; সময় থেমে যাবে; আল্লাহর সতর্কবার্তা বারবার একইভাবে ফিরে আসবে। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, কিছু মুহূর্ত আছে যখন সিদ্ধান্তের দেরি নিজেই বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই আয়াতের গভীরে আমরা শুধু এক নবীর হিজরত দেখি না, দেখি প্রত্যেক মুমিনের জীবনের মানচিত্র: গুনাহের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা, অবাধ্যতার অভ্যাস ত্যাগ করা, তওবার ডাকে দেরি না করা, এবং আল্লাহ যেখানে যেতে বলেন সেখানেই নির্বাক ভরসায় অগ্রসর হওয়া। নাজাতের পথ কখনো ভিড়ের পথ নয়; তা হলো সেই পথ, যেখানে বান্দা নিজের কাঁধের ভার নামিয়ে রেখে রবের নির্দেশকে নিজের একমাত্র দিশা বানায়।
হে অন্তর, তুমি কি এখনো পিছনে তাকিয়ে আছ? কোনো হারানো привычা, কোনো ভাঙা অহং, কোনো পাপের স্মৃতি, কোনো নিরাপত্তাহীন ভালোবাসা কি তোমাকে থামিয়ে রেখেছে? এই আয়াত কেবল এক জাতির পতনের সংবাদ নয়; এটি প্রতিটি ভীত হৃদয়ের জন্য এক করুণ কিন্তু মুক্তিদানকারী আহ্বান। আল্লাহর হুকুম যখন আসে, তখন তর্ক নয়, পাল্টা হিসাব নয়—অবশ্যই আনুগত্য চাই। আর যে বান্দা সত্যি সত্যি পিছনে না তাকিয়ে এগোয়, সে বুঝে যায়: আল্লাহর দিকে যাত্রা মানে সবকিছু হারানো নয়, বরং যা কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার, তার কবল থেকে বাঁচা।