আল্লাহ তাআলা বলেন: “তিনি বললেনঃ তোমরা তো অপরিচিত লোক।” — এই এক বাক্যেই কত স্তর! এক নবীর অন্তরের সতর্কতা, অচেনা আগমনের সামনে মুহূর্তের বিস্ময়, আর মানবহৃদয়ের সেই স্বাভাবিক সজাগতা, যা অজানাকে অবহেলা করে না। কুরআনের ভাষায় এখানে কোনো অযথা আতঙ্ক নেই; আছে শালীন আশঙ্কা, আছে সীমার বোধ, আছে চিনে নেওয়ার অধিকার। সব আগমনই আশীর্বাদ নয়, সব অপরিচিত মুখই নিরাপত্তা নয়—তাই একজন আল্লাহ-নির্দেশিত মানুষের অন্তরও পরিস্থিতিকে বিচার করে, নিঃশব্দে জাগ্রত থাকে।

সূরা আল-হিজরের বৃহত্তর সুরের সঙ্গে এই আয়াতের সম্পর্ক গভীর। এ সূরায় একদিকে আল্লাহর সংরক্ষিত কুরআনের ঘোষণা, অন্যদিকে নবীদের প্রতি সান্ত্বনা—তাদের পথকে যে সত্যই ঘিরে আছে, তাতে প্রতিরোধ, অস্বীকার, উপহাস এবং সামাজিক পতন বারবার ফিরে আসে। এই প্রেক্ষাপটে অপরিচিত আগন্তুকদের আগমন শুধু একটি অতিথি-গ্রহণের ঘটনা নয়; এটি পরীক্ষারও ইশারা। মানুষের সমাজে যখন সত্যের পথ সংকুচিত হয়, তখন অচেনা উপস্থিতি কখনো রহমতের বার্তা নিয়ে আসে, কখনো আবার অন্তরকে পরীক্ষা করে—কে জাগ্রত, কে উদাসীন, কে প্রজ্ঞাবান, কে প্রতারিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত।

এই আয়াত আমাদের শেখায়, মুমিনের হৃদয় যেন নরম হয়, কিন্তু নির্বোধ না হয়; আতিথ্যশীল হয়, কিন্তু অন্ধ না হয়; আল্লাহর ফয়সালায় আত্মসমর্পণ করে, কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত বোধকে অবহেলা না করে। অচেনা মানুষকে দেখে এই নবীর সংক্ষিপ্ত বাক্য আমাদের জানিয়ে দেয়—ভেতরের সতর্কতাও ইমানের অংশ হতে পারে, যখন তা অহংকারে রূপ নেয় না, বরং দায়িত্ববোধে স্থির থাকে। সূরা আল-হিজর জুড়ে যে তাসবিহ, সংরক্ষণ, নবীসান্ত্বনা ও জাতির পতনের সতর্ক সুর প্রবাহিত, এই আয়াত তারই মানবিক ও আধ্যাত্মিক দরজায় প্রথম টোকা।

অচেনা মানুষ দেখলেই যে হৃদয় একটু থমকে যায়, তা ভয়ের জন্যই নয়—তা হলো আল্লাহর দেওয়া এক প্রাকৃতিক জাগরণ। এই আয়াতে নবী-হৃদয়ের সেই নির্মল সতর্কতা ধরা পড়ে: তিনি বললেন, “তোমরা তো অপরিচিত লোক।” কত সংক্ষিপ্ত বাক্য, অথচ কত গভীর সংযম! এতে আতঙ্ক নেই, আছে শিষ্ট বিবেচনা; সন্দেহ নেই, আছে সীমার বোধ; অন্ধ বিশ্বাস নেই, আছে পরীক্ষা করে দেখার জ্ঞান। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এমনই হন—তাঁরা সরল, কিন্তু অসতর্ক নন; মমতাবান, কিন্তু নিরীহতার নামে অন্ধ নন। ইমান মানুষকে অন্তরে কোমল করে, আর সেই কোমলতাই আবার তাকে ফিতনার সামনে জাগিয়ে রাখে।

সূরা আল-হিজরের বৃহত্তর সুরও যেন এই জায়গায় এসে হৃদয়কে আরও গভীর করে। কুরআনের সংরক্ষণ, নবীদের সান্ত্বনা, সত্য অস্বীকারের জেদ, সমাজের পতনের করুণ ইতিহাস—সবকিছুর মাঝে মানুষকে আল্লাহ একটি সূক্ষ্ম শিক্ষা দেন: প্রত্যেক আগমনকে বুঝে নিতে হবে, প্রত্যেক মুখকে যাচাই করতে হবে, প্রত্যেক পরিস্থিতির নীরব ইশারা শুনতে হবে। কারণ কখনো অপরিচিত আগমন পরীক্ষার দরজা, কখনো মেহমানের বেশে রহমত, আবার কখনো অন্তরের গাফিলতির সামনে দাঁড় করানো আয়না। যে হৃদয় আল্লাহর সাথে জাগ্রত থাকে, সে অচেনাকে দেখে শুধু মানুষ দেখে না; সে দেখে সময়ের ইশারা, নাফসের দুর্বলতা, এবং রবের হিকমতের সূক্ষ্ম চাল।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ইমান মানে নির্বিচার স্নেহ নয়, বরং আল্লাহ-দত্ত বিবেকের আলোয় মানুষকে ও বাস্তবতাকে দেখা। সমাজ যখন ভেঙে পড়তে থাকে, তখন প্রথমে ভাঙে না দেয়াল—ভাঙে সজাগ হৃদয়, ভাঙে বিচারবোধ, ভাঙে সীমার অনুভব। আর নবীদের পথ হলো ঠিক তার উল্টো: তাঁরা সীমা জানেন, শিষ্টতা জানেন, সতর্কতাও জানেন; তবু আল্লাহর উপর ভরসায় কখনোই অস্থির হন না। এ এক অদ্ভুত ভারসাম্য—ভয়ের মধ্যে সাহস, কোমলতার মধ্যে দৃঢ়তা, অপরিচিতের মুখে আল্লাহর পাঠানো পরীক্ষাকে চিনে নেওয়ার মতো হৃদয়।

অচেনা মুখ দেখলেই হৃদয় কেমন থমকে যায়—এই আয়াত সেই মানবস্বভাবকেই আল্লাহর বাণীর আলোয় এনে দাঁড় করায়। “তিনি বললেনঃ তোমরা তো অপরিচিত লোক।” এ কথা শুধু পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এ কথা সতর্ক হৃদয়ের ভাষা। নবীদের জীবন কোনো নির্বিকার কাহিনি নয়, বরং এমন এক জাগ্রত জীবন, যেখানে চোখ দেখে, অন্তর বিচার করে, আর আত্মা আল্লাহর শেখানো সীমা মনে রাখে। অপরিচিতের আগমন অনেক সময় নিছক সফর, কিন্তু কখনো তা পরীক্ষার দরজাও হয়। তাই কুরআন আমাদের শেখায়—সবকিছুকে সরল বিশ্বাসের নামে অন্ধভাবে গ্রহণ করা নয়, আবার অহংকারের কঠোরতাও নয়; বরং সত্যিকারের মুমিনের মতো প্রজ্ঞা, শালীনতা ও হুশিয়ারি নিয়ে জেগে থাকা।

সূরা আল-হিজরের বৃহৎ সুর আমাদের আরও গভীরে নিয়ে যায়। এখানে কুরআনের সংরক্ষণ আছে, নবীদের প্রতি সান্ত্বনা আছে, আর মানবসমাজের ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হয়ে যাওয়ার করুণ চিত্রও আছে। যে সমাজ সত্যকে অচেনা মনে করে, পবিত্রতা থেকে দূরে সরে যায়, তার সামনে অপরিচিত আগমন কেবল বাইরের ঘটনা থাকে না—তা অন্তরের অবস্থাও প্রকাশ করে। আজও মানুষের হৃদয়ে কত অচেনা প্রবেশ করে: সন্দেহ, ফিতনা, মোহ, গাফলত। এই আয়াত যেন বলে, নিজের ভেতরের অতিথিদেরও চিনে নাও। কোন চিন্তা তোমাকে আল্লাহর দিকে নেয়, আর কোন চিন্তা তোমাকে বিস্মৃতির পথে টেনে নেয়—সেটিই আসল পরিচয়। বান্দা যখন নিজের আত্মাকে জিজ্ঞেস করতে শেখে, তখন তার অন্তর নরম হয়, ভয় আর আশার মাঝখানে ভারসাম্য পায়, এবং শেষ পর্যন্ত সে বুঝে—সব পথের শেষ ফিরে যাওয়া একমাত্র আল্লাহর দিকেই।

অচেনা আগমনকে আমরা সাধারণত বাহ্যিক চোখে দেখি; কিন্তু কুরআন শেখায়, অচেনা মুহূর্ত অনেক সময় অন্তরের গভীরতম দরজায় কড়া নাড়ে। যে হৃদয় আল্লাহকে স্মরণে জাগ্রত, সে নতুন আগন্তুক দেখে শুধু মুখ নয়—পরিস্থিতির ভাষাও পড়ে। সে জানে, মানুষের চেহারা চেনা সহজ; কিন্তু নিয়তের ছায়া, সময়ের ফিতনা, আর আল্লাহর লুকোনো হিকমত চেনা সহজ নয়। তাই এক নবীর মুখে এই সংক্ষিপ্ত বাক্য আমাদেরও থামিয়ে দেয়: সবকিছুকে আপন বলে ধরে নিও না, সবকিছুকে নিরাপদ ভেবো না, বরং হৃদয়ের ভেতর সতর্কতার দীপ জ্বালিয়ে রাখো।

সূরা আল-হিজর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দুনিয়ায় সত্যের পথ কখনো একাকী নয়, কিন্তু সহজও নয়। কুরআন সংরক্ষিত—তবু মানুষ বারবার অস্বীকার করে; নবীরা সান্ত্বনা পান—তবু তারা কষ্টের ভিতর দিয়ে যান; সমাজে পতন নেমে আসে—তবু আল্লাহর আয়াত থেমে থাকে না। এই আয়াতের সরল বাক্যে সেই বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে: আমরা যতই চেনা পরিবেশে থাকি, হৃদয়কে কখনো অসতর্কের ঘুমে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ কিছু আগমন বাইরে থেকে অপরিচিত হলেও ভেতরে আসলে তা আমাদের ঈমান, আদব, ভয়, আর তাওয়াক্কুলকে পরখ করার জন্যই আসে। আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন, তাকে কেবল বিপদ থেকে নয়—অহংকার থেকেও রক্ষা করেন। আর আল্লাহ যাকে জাগিয়ে দেন, তাকে একটি বাক্যেই জাগিয়ে দেন; একটি দৃষ্টিতেই নত করে দেন; একটি আয়াতেই জীবনের পথ বদলে দেন।