“সেই অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত”—এই শব্দগুলোর মধ্যে এক ধরনের শীতল, নির্মম, কিন্তু আশ্চর্যভাবে সান্ত্বনাময় সত্য লুকিয়ে আছে। ইবলিস যখন অবকাশ চাইল, তখনও সে আল্লাহর দরবারের বাইরে দাঁড়িয়ে শর্ত চাপাতে পারেনি; সে কেবল এমন এক সীমার ভেতরই সময় পেল, যা আল্লাহ আগেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। অর্থাৎ অবাধ্যতার উল্লাসও এখানে স্বেচ্ছাচার নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত এক মেয়াদ। মানুষ যখন দেখে শয়তান ছুটে বেড়ায়, পথভ্রষ্ট করে, ফাঁদ পাতে, তখন মনে হতে পারে সে বুঝি স্বাধীন। কিন্তু এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়—তার শ্বাস, তার চলা, তার প্রভাব, সবই একটি সীমার ভেতরে বন্দী; আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত এক মুহূর্তও তার ক্ষমতা নেই।
সূরা আল-হিজরের এই প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে ভারী। আগের আয়াতগুলোতে আদম-ইবলিসের সেই আদি দ্বন্দ্বের ছায়া দেখা যায়—সিজদার আদেশ, অহংকারের পতন, আর লাঞ্ছনার পরও বিদ্রোহের জেদ। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো ও সবচেয়ে পুনরাবৃত্ত সত্যের উন্মোচন: অহংকারের জন্ম, অবাধ্যতার পরিণতি, আর আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে সব সৃষ্টির অসহায় সীমা। এই অবকাশ আসলে ইবলিসের সম্মান নয়; এটি পরীক্ষা চলার জন্য নির্ধারিত একটি সময়। আর এই সময়-নির্ধারণই কুরআনের আরেকটি গভীর বার্তা জাগায়—রবের পরিকল্পনা হঠাৎ বদলায় না, কুরআনও কোনো প্রকার হুমকি বা ইতিহাসের ঝড়ে হারিয়ে যায় না; বরং সবকিছুই এক নিখুঁত ও সংরক্ষিত বিধানের ভেতর এগোয়।
নবীদের জন্যও এই আয়াত এক নীরব সান্ত্বনা। যারা সত্যের পথে মানুষকে ডাকেন, তাদের সামনে যখন অবাধ্যতা, বিদ্রূপ, অস্বীকার আর ষড়যন্ত্রের অন্ধকার ঘনীভূত হয়, তখন মনে হতে পারে মিথ্যার শক্তি বুঝি অন্তহীন। কিন্তু না—ইবলিসেরও একটি মেয়াদ আছে, জাতির পতনেরও একটি সীমা আছে, পৃথিবীরও একটি পরিমিত সময় আছে। যে হাতে অবকাশ দেওয়া হয়েছে, সেই হাতই অবধারিত দিনের পর তা কেটে নেবে। তাই এই আয়াত মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য নয় শুধু, বরং হৃদয়কে জাগানোর জন্য: তুমি যার কাছে আত্মসমর্পণ করছ, তিনি সময়েরও মালিক; আর যার ফাঁদে পড়তে ভয় পাচ্ছ, সেও তাঁরই হুকুমের অধীন। এখানে তাসবিহের মতো এক নির্মল সত্য উঠে আসে—সব প্রশংসা, সব কর্তৃত্ব, সব ফয়সালা আল্লাহরই; আর এই স্মরণই ভাঙা হৃদয়কে স্থির করে, বিভ্রান্ত যুগকে সতর্ক করে, এবং কিয়ামতের অবধারিত সীমানার দিকে মানুষকে নীরবে ফিরিয়ে আনে।
এই “অবধারিত সময়” আসলে শয়তানের জন্য কোনো মুক্ত আকাশ নয়; এটা তার শৃঙ্খলই, শুধু শৃঙ্খলের রূপটা চোখে দেখা যায় না। সে যতই মানুষের অন্তরে অন্ধকার ঢালুক, যতই কুমন্ত্রণা ছড়াক, তবু তার শেষ গন্তব্য আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। এ আয়াতের মধ্যে এক অদ্ভুত সান্ত্বনা আছে: মুমিন জানে, যে শক্তি তাকে বিপথে টানতে চায়, সে সর্বশক্তিমান নয়; সে সীমাবদ্ধ, মজলুম না-হলেও বন্দী এক সীমানার ভেতরে ঘুরছে। তাই ভয় পেয়ে নয়, বরং তাওহীদের দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে বলা যায়—আল্লাহ যেখানে সীমা টানেন, সেখানে ইবলিসের পা আর এক কদমও বাড়ে না।
আর মানুষের জন্য এই আয়াত এক নীরব আঘাত। আমরা কত সহজে মনে করি—অবকাশ মানেই স্বাধীনতা, ক্ষমতা মানেই স্থায়িত্ব, বিলম্ব মানেই পরাভব নয়। কিন্তু আল্লাহ জানিয়ে দেন, অবকাশও তাঁরই হিকমতের অংশ; এর শেষে আছে বিচার, জবাবদিহি, এবং সেই দিন, যখন সব অহংকার ঝরে যাবে। ইবলিসের দীর্ঘ মেয়াদ আমাদের শেখায় না যে সে শক্তিমান; শেখায় যে অবাধ্যতাও একদিন হিসাবের মুখোমুখি হবে। তাই মুমিনের অন্তর কাঁপে, আবার আশ্বস্তও হয়: কাঁপে এই ভেবে যে আল্লাহর আদেশ অমান্য করা কত ভয়ংকর; আর আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে আল্লাহর রাজত্বে কোনো বিদ্রোহ চিরস্থায়ী হতে পারে না।
“সেই অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত”—এই কথাটি শুধু ইবলিসের সীমা ঘোষণা করে না, মানুষের অহংকারেরও কবর রচনা করে। যে সত্তা নিজেকে এত বড় মনে করে, তার অবকাশও আসলে একটি মেয়াদ; তার ক্ষমতাও একটি অনুমতিপ্রাপ্ত ছায়া। আল্লাহ যখন চান, তখন অবাধ্যতাও দৌড়াতে পারে না, আর যে হৃদয় আল্লাহকে ভুলে শয়তানের কণ্ঠে সাড়া দেয়, সে-ও অজান্তে এক বন্দি জীবনের ভেতর হাঁটে। বাহিরে প্রতাপ, ভিতরে শূন্যতা—এই হলো অবাধ্যের ভাগ্য। সূরা আল-হিজরের ধারাবাহিকতায় এই আয়াত যেন গোপনভাবে বলছে, কুরআনের সংরক্ষণ কেবল আয়াতের শব্দরক্ষাই নয়; এটি সত্যের সেই দেয়াল, যার সামনে শয়তানের প্রলোভন শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে।
এ কারণেই এই আয়াত নবীদের জন্য সান্ত্বনা, আর যুগে যুগে সত্যের পথে দাঁড়ানো মুমিনদের জন্যও এক দৃঢ় আশ্বাস। যারা দেখে বাতিল কত সহজে ছড়ায়, পাপ কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়, আর সমাজ কত নিষ্ঠুরভাবে সত্যকে উপহাস করে—তাদের মনে হতে পারে, অন্ধকারই বুঝি চিরস্থায়ী। কিন্তু না, অন্ধকারেরও এক সময় আছে; অবকাশ আছে, স্থায়িত্ব নেই। আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে কোনো বিদ্রোহ টিকতে পারে না। তাই এই আয়াত আমাদের অন্তরে ভয় জাগায়, আবার একই সঙ্গে আশা জাগায়: শয়তান যতই ফিসফিস করুক, তার শেষ কথাটি নয়; শেষ কথা আল্লাহর। মানুষ যদি নিজেকে জিজ্ঞেস করে, আমি কাকে অনুসরণ করছি, কার কণ্ঠে আমার হৃদয় নরম হচ্ছে, তবে এই আয়াত তাকে নিজের অন্তরের আদালতে দাঁড় করায়।
অবশেষে আয়াতটি আমাদের দিকে তাকিয়ে এক নীরব প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—তুমি কি সময়কে নিজের সম্পদ ভেবেছ, নাকি আল্লাহর সামনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি? কারণ “অবধারিত সময়” শুধু শয়তানের নয়, মানুষেরও। একদিন প্রত্যেক আত্মাকে তার নির্ধারিত মিলনের মুহূর্তে পৌঁছাতে হবে; তখন না আছে বাহানা, না আছে অহংকারের আড়াল। তাই মুমিনের কাজ হলো তসবিহে অন্তর ভেজানো, গাফিলতির আঁধার ভাঙা, আর প্রতিটি শ্বাসকে তওবার দিকে ফেরানো। যে সমাজ আল্লাহর সীমাকে হালকা করে দেখে, সেখানে শয়তানের পদচারণা জোর পায়; আর যে হৃদয় আল্লাহর শাসনকে মানে, সেখানে বিদ্রোহের আগুন নিভে যায়। এই আয়াত আমাদের শেখায়—আমরা নিয়ন্ত্রক নই, আমরা নিয়ন্ত্রিত; আমরা স্থায়ী নই, আমরা প্রত্যাবর্তনকারী। আর এই প্রত্যাবর্তনের সত্যই বান্দার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা, সবচেয়ে গভীর ভয়ের জায়গা, এবং সবচেয়ে বিশুদ্ধ মুক্তি।
এই আয়াত তাই কেবল শয়তানের ব্যাপার নয়; এটি মানবহৃদয়ের গভীরে গাঁথা এক সতর্কতা। যারা কুরআনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যারা সত্যকে ঠাট্টা করে, যারা অবাধ্যতাকে স্বাধীনতা বলে ভুল করে, তাদের জন্যও সময় আছে—কিন্তু চূড়ান্ত ক্ষমতা নেই। জাতির পতন সাধারণত বড় কোনো শব্দে শুরু হয় না; শুরু হয় অন্তরের নরম জায়গায়, যেখানে তাসবিহের বদলে আত্মপ্রশংসা বাসা বাঁধে, আর আল্লাহর স্মরণের বদলে নিজের শক্তির গান গাওয়া শুরু হয়। তখনই মানুষ ভুলে যায়—তার সামনে যে সময়, সেটিও আল্লাহর।
তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে হৃদয় নিচু হয়ে আসে। আমরা কত সহজে নিজেদের স্থায়ী ভাবি, অথচ আমাদের চারপাশের সবকিছুই ‘অবধারিত সময়’-এর দিকে এগোচ্ছে। নবী-রাসূলগণ অবিচার, বিদ্রূপ ও একাকীত্বের মাঝেও ধৈর্য ধরেছিলেন, কারণ তারা জানতেন—সময় শেষ কথা নয়; আল্লাহই শেষ কথা। আজও যে মুমিন এই সত্য হৃদয়ে রাখে, সে ভেঙে পড়ে না। সে তওবায় ফিরে আসে, তাসবিহে জেগে ওঠে, আর নিজের ভেতরের ইবলিসী অহংকারকে চিনে ফেলে। যে দিন আসবেই, সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে আজই বিনয়ী হতে হবে; কারণ অবকাশ দীর্ঘ মনে হলেও শেষপর্যন্ত তা কেবল একটি নির্ধারিত সীমা—আর সীমার ওপারে শুধু রবের বিচার, শুধু তাঁর ন্যায়, শুধু তাঁর রহমত।