আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদেরকে ছেড়ে দিন—তারা খেয়ে নিক, ভোগ করে নিক, আর দীর্ঘ আশায় ডুবে থাকুক; অচিরেই তারা জেনে নেবে। এই বাক্যে নিষেধেরও ভাষা আছে, অবকাশেরও ভাষা আছে, আর গোপন এক মহাবিচারেরও সুর আছে। মানুষ যখন শুধু খাওয়া, ভোগ, আর ভবিষ্যতের অসীম কল্পনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন সে আসলে জীবনের মূল প্রশ্নটি ভুলে যায়—আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছি? এই আয়াত দুনিয়ামুখী হৃদয়ের উপর এক নির্মম আয়না; সেখানে ভোগের চাকচিক্য নেই, আছে আত্মবিস্মৃতির ভয়াবহতা।
সূরা আল-হিজরের বৃহৎ সুরে এই আয়াত শুধু একক কোনো নৈতিক উপদেশ নয়; এটি অবিশ্বাসী ও সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী সমাজের প্রতি আল্লাহর ধৈর্যশীল কিন্তু অমোঘ ঘোষণা। সূরাটি কুরআনের সংরক্ষণ, নবীদের সান্ত্বনা, এবং সত্য অস্বীকারের পরিণতি—এই সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধেছে। রাসূলদের যখন কষ্ট দেওয়া হচ্ছিল, তাদের সত্যকে ঠাট্টা করা হচ্ছিল, তখন আল্লাহ জানিয়ে দিলেন: মানুষের ভোগলিপ্সা ও লম্বা আশার মোহ শেষ কথা নয়; শেষ কথা হলো, যা অনিবার্য, তা এসে পড়বে। কোনো নির্দিষ্ট এক ঘটনার সনদ এখানে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, তবে মক্কার সেই সামগ্রিক বাস্তবতা—অস্বীকার, অহংকার, এবং দুনিয়ায় ডুবে থাকা জীবন—এই আয়াতের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটকে উন্মুক্ত করে।
‘الأمل’—আশা—এখানে এমন আশা, যা মানুষকে জাগায় না; বরং ঘুম পাড়ায়। সে ভাবে সময় অনেক, তওবা পরে হবে, হিসাব পরে হবে, মৃত্যু তো এখনো দূরে। কিন্তু কুরআন এমন আশার মোহকে হৃদয়ের রোগ হিসেবে উন্মোচন করে। মানুষ যখন জীবনকে শুধু ভোগের সুযোগ মনে করে, তখন তার অন্তরে তাসবিহের বদলে গাফলত গেঁথে বসে; আর গাফলত ধীরে ধীরে এমন এক জাতিগত ও ব্যক্তিগত পতনের দিকে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। তাই এই আয়াত কেবল ভয় দেখায় না—এটি জাগিয়ে তোলে। এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে করুণার এক তীব্র ধাক্কা: এখনো সময় আছে, কিন্তু সময়কে অসীম ভাবো না; এখনো দরজা খোলা আছে, কিন্তু অবহেলাকে আশ্রয় বানিও না।
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলার ভাষা যেন করুণার আড়ালে লুকোনো এক কঠোর সতর্কতা। “ছেড়ে দিন তাদেরকে”—এ কথা শুনতে নীরবতার মতো, কিন্তু এর ভেতর আছে আসমানের ফয়সালা। মানুষ যখন খাওয়া, ভোগ, আর আরেকটু সময়ের আশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন সে বুঝতেই পারে না—আশা কখনো জীবনকে এগিয়ে নেয়, আর কখনো জীবনকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ আশা হৃদয়কে নরম করে না; অনেক সময় তা হৃদয়ের উপর ধুলো জমায়, এমনভাবে যে সত্যের ডাকও আর কানে পৌঁছায় না। দুনিয়ার টেবিল সাজানো থাকে, ভোগের পেয়ালা ভরা থাকে, কিন্তু অন্তর খালি থেকে যায়—কারণ অন্তরকে পরিতৃপ্ত করতে পারার ক্ষমতা খাদ্যের নেই, কেবল স্মরণের আছে, কেবল রবের দিকে ফিরে যাওয়ার আছে।
তাই এই আয়াত শুধু অবিশ্বাসীদের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্যও এক হৃদয়কাঁপানো আয়না। আমরা কি আশার নামে গাফলতের চাষ করছি? আমরা কি ভোগকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছি? আমরা কি তাসবিহের জায়গায় পরিকল্পনার শব্দকে বসিয়ে দিয়েছি, আর রবের স্মরণের জায়গায় নিজের ভবিষ্যৎ-কল্পনাকে? মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন তার দিনগুলো পূর্ণ মনে হয় কিন্তু আত্মা শূন্য হয়ে যায়; আর যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন ক্ষুধা কম থাকলেও অন্তর তৃপ্ত হয়, জীবন ছোট হলেও অর্থবহ হয়। এই আয়াত আমাদের বলে—ভোগের শেষ নেই, কিন্তু ভোগের ঘোরের শেষ আছে; আশার ডানায় ভেসে চলা যায়, কিন্তু মাটিতে ফিরে আসা একদিন অনিবার্য। আর সেই ফিরে আসার দিনই সত্যের মুখোমুখি হওয়ার দিন।
এই আয়াত যেন দুনিয়ার বাজারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নিঃশব্দ ঘোষণা—তাদের ছেড়ে দাও; তারা খাক, ভোগ করুক, আর দীর্ঘ আশার নেশায় ডুবে থাকুক। কত মানুষ আছে, যারা সকাল-সন্ধ্যা শুধু পেট, পসার, আর পরের দিনের কল্পনায় বাঁচে; মনে করে সময় তাদের অনুকূলে, মৃত্যু দূরে, হিসাব অনিশ্চিত, আর সত্যের ডাক কেবলই বিলম্বিত। কিন্তু ‘الأمل’—আশা—যখন আল্লাহর স্মরণহীন হৃদয়ে বসতি গড়ে, তখন তা আর নির্মল আশা থাকে না; তা হয়ে ওঠে আত্মবিস্মৃতির মোলায়েম শৃঙ্খল। মানুষ তখন নিজেকেই প্রতারণা করে, কারণ সে ভাবে আরও সময় আছে, আরও সুযোগ আছে, আরও পরে তাওবা করা যাবে—অথচ পরে যে কত কাছে, তা সে টেরও পায় না।
সূরা আল-হিজরের বড় সুরে এই কথা আরও ভারী হয়ে ওঠে। কুরআনকে আল্লাহ নিজেই সংরক্ষণ করবেন—এই আশ্বাসের পাশে, নবীদের প্রতি সান্ত্বনার পাশে, সত্য অস্বীকারকারী জাতির পতনের স্মৃতির পাশে এই আয়াত যেন বলে: আল্লাহর ফয়সালা দেরি করতে পারে, কিন্তু নিঃশেষ হয় না। ভোগের ঘোরে মানুষ যখন নৈতিকতার সেতু পুড়িয়ে ফেলে, সমাজ যখন দীর্ঘ আশার অজুহাতে অন্যায়কে স্বাভাবিক করে, তখন পতন বাইরে থেকে নয়—ভেতর থেকে শুরু হয়। তাই এই আয়াত ভয় জাগায়, কিন্তু হতাশ করে না; বরং হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে—যেন আমরা নিজের হিসাব নিজেই নিই, লোভের ঘুম থেকে জেগে উঠি, এবং মনে রাখি: অচিরেই তারা জেনে নেবে। সেই জানা হবে তখন, যখন দুনিয়ার মোহ আর থাকবে না, কিন্তু আমল রয়ে যাবে; মিথ্যা আশ্রয় আর থাকবে না, কিন্তু সত্যের সামনে দাঁড়াতে হবে।
মানুষের বড় প্রতারণা বোধহয় এই—সে ভাবে, সময় তার পক্ষে; জীবন এখনও অনেক বাকি; পাপের হিসাব পরে হবে; তাওবা করার অবসর আছে আরও। কিন্তু এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা যেন সেই মধুর বিভ্রমের উপর বজ্রপাত করেন। খেয়ে নাও, ভোগ করে নাও, আশার জালে ডুবে থাকো—তারপরও একদিন জেনে যাবে, যেটাকে উপেক্ষা করেছিলে, সেটাই ছিল সত্য। এ “জেনে নেওয়া” কোনো শান্ত জ্ঞান নয়; তা হবে উন্মোচনের মুহূর্ত, যখন পর্দা সরে যাবে, অজুহাত ভেঙে পড়বে, আর দুনিয়ার পুরো কোলাহল এক মুহূর্তে নীরব হয়ে যাবে। তখন বোঝা যাবে, আয়ু ছিল পরীক্ষা; আর আমরা সেটাকে ভোজসভা ভেবেছিলাম।
এই কারণেই সূরা আল-হিজর শুধু ভয় দেখায় না, হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। আল্লাহ তাঁর কিতাবকে সংরক্ষণ করেন, নবীদের সান্ত্বনা দেন, গর্বিত জাতিগুলোর পতন স্মরণ করিয়ে দেন, আর মানুষের ভিতরের ইবলিসি আত্মপ্রবঞ্চনাকেও উন্মোচন করেন। যে হৃদয় আজও নরম হতে পারে, তার জন্য এই আয়াত দয়ার দরজা। কারণ সতর্কবাণীও একরকম রহমত—যাতে বান্দা পতনের আগেই ফিরে আসে, দীর্ঘ আশার ঘুম ভাঙে, এবং দুনিয়ার তুচ্ছ আলোর বদলে আখিরাতের সত্য আলোকে বেছে নেয়। আল্লাহ যেন আমাদের এমন হৃদয় দেন, যা ভোগে নয়, তাসবিহে শান্তি খোঁজে; এমন চোখ, যা এই দুনিয়ার চকচকে পর্দার আড়ালে শেষ বিচারের দিনটিকে দেখতে পায়; এবং এমন জীবন, যা “অচিরেই তারা জেনে নেবে” শোনার আগেই “হে আমার রব, আমি ফিরে এলাম” বলতে শিখে যায়।