সূরা আল-হিজরের এই আয়াতে মানুষের অন্তরের এক ভয়ংকর রোগ উন্মোচিত হয়: সত্য সামনে এলেও সবকিছুকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার সাহস না থাকা। আল্লাহ বলেন, তারা তখনও বলবে, আমাদের দৃষ্টি যেন বিভ্রান্ত করা হয়েছে, বরং আমরা তো জাদুগ্রস্ত এক জাতি। অর্থাৎ যে হৃদয় আগে থেকেই অস্বীকারে অভ্যস্ত, তার কাছে স্পষ্ট নিদর্শনও ন্যায্যতা পায় না; সে নতুন ব্যাখ্যা খোঁজে, যাতে নিজের ভেতরের বিপর্যয়কে অস্বীকার করা যায়। চোখ দেখছে, কিন্তু আত্মা মানতে চাইছে না। মানুষ তখন শুধু বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না, নিজের অবস্থাকেও রক্ষা করতে চায়—আর সেখানেই পর্দা ঘন হয়।
এই বাক্যগুলোকে সূরা আল-হিজরের আগের-পরের আয়াতের আলোয় দেখলে বোঝা যায়, এখানে কেবল একটি মুহূর্তের কথা নয়; এটি মানুষের চিরন্তন মনস্তত্ত্বের কথা। উপরের দিক থেকে তাদের জন্য যদি কোনো দ্বার খুলেও দেওয়া হয়, কোনো বিস্ময়কর নিদর্শন তাদের সামনে আনা হয়, তবু তাদের জিহ্বা সত্যের কাছে নত হয় না; বরং তারা অভিযোগের ভাষা আঁকড়ে ধরে। এ হল সেই আত্মরক্ষামূলক অন্ধতা, যা বহু জাতির পতনের পূর্বে দেখা গেছে। যখন মানুষকে সত্য ডাকে, কিন্তু সে নিজের অহংকার, অভ্যাস, নেতা-অনুসরণ, অথবা পাপের আরাম ছেড়ে উঠতে চায় না, তখন সে প্রমাণকে নয়, প্রমাণের বিরুদ্ধে অজুহাতকে ভালোবাসে।
এ আয়াত আমাদেরও আয়না দেখায়। কারণ কুরআন কেবল অতীতের অবিশ্বাসীদের মুখোশ খুলে দেয় না, আজকের অন্তরের পর্দাও স্পর্শ করে। কখনো আমরা সত্য শুনি, কিন্তু তাকে ‘অতিরঞ্জন’ বলে পাশ কাটাই; কখনো আত্মাকে ডাক আসে, কিন্তু আমরা বলি—এ শুধু আবেগ। অথচ হিদায়াত এমন জিনিস নয় যা চোখের জোরে ধরা যায়; তা আসে বিনয়ী হৃদয়ে। তাই এই আয়াত নীরবে আমাদের প্রশ্ন করে: আমি কি সত্যের সামনে নত হচ্ছি, নাকি নিজের ভিতরের অস্বীকারকে বাঁচাতে নতুন নাম খুঁজছি? যে হৃদয় ‘মাসহূরূন’—অর্থাৎ বিভ্রান্ত, আচ্ছন্ন, পর্দাগ্রস্ত—অবস্থাকে চিনে ফেলে, সে-ই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথও খুঁজে পায়।
সত্য যখন দরজায় কড়া নাড়ে, আর অন্তর তবু খুলতে চায় না—তখন মানুষের ভাষা এমনই হয়ে ওঠে। সে বলে, চোখের বিভ্রাট ঘটেছে, কিছু একটা আমাদের দৃষ্টি আড়াল করেছে; না, এটা সত্য হতে পারে না, নিশ্চয়ই আমরা যাদুগ্রস্ত। কত করুণ এই আত্মরক্ষার বাক্য! সত্যকে মেনে নেওয়ার বদলে মানুষ আগে নিজের অহংকারকে বাঁচাতে চায়। হৃদয় যখন ঈমানের আলো হারায়, তখন স্পষ্টতম নিদর্শনও তার কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, আর বিস্ময় ধীরে ধীরে অস্বীকারে রূপ নেয়।
আল্লাহর কালাম আমাদের শেখায়, হিদায়াত কেবল চোখের ব্যাপার নয়; এটি আত্মসমর্পণের ব্যাপার। চোখ খোলা থাকা সত্ত্বেও যদি অন্তর বন্ধ থাকে, তবে মানুষ সত্যের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও পথ হারায়। তাই এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরেই প্রশ্ন জাগে: আমি কি কোনোদিন সত্যকে অস্বীকার করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে যাব, যেখানে আমার হৃদয় নিজেই নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে? হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমন পর্দা থেকে রক্ষা করুন, যে পর্দা সত্যকে বিকৃত করে, আর আমাদের এমন বিনয় দান করুন, যা বিস্ময়ের মুহূর্তে নয়, সত্যের মুহূর্তে সিজদায় নামতে শেখায়।
সত্য যখন চোখের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, তখন মানুষের ভাষা কত অদ্ভুত হয়ে ওঠে! এই আয়াতে তাদের কণ্ঠে যে কথা শোনা যায়, তা শুধু এক সময়ের মানুষের কথা নয়; এ হলো অস্বীকারের চিরন্তন মানসিকতা। তারা দেখে, তবু মানে না; স্পর্শ করে, তবু স্বীকার করে না। কারণ হৃদয়ের ভেতরে আগে থেকেই যদি অহংকারের পর্দা নেমে থাকে, তবে নিদর্শনও সেখানে আলো হয়ে ঢোকে না—বরং অভিযোগের ধোঁয়া হয়ে ফিরে আসে। তাই তারা বলে, আমাদের দৃষ্টিই যেন ভ্রান্ত করা হয়েছে, কিংবা আমরা তো জাদুগ্রস্ত। অর্থাৎ, সত্যকে মেনে নেওয়ার চেয়ে নিজের অন্তরের দুর্বলতাকে অন্য নামে ডাকা সহজ মনে হয় তাদের কাছে।
কিন্তু এই আয়াত আমাদেরও থামিয়ে দেয়। আমরা কি কখনও সত্য শুনেও তাকে পাশ কাটাতে চাইনি? আমরা কি কখনও জানি যে পথ সোজা, তবু অন্য কোনো ব্যাখ্যার আড়ালে নিজের নফসকে বাঁচাতে চাইনি? সমাজের রোগও এখানেই শুরু হয়—যেখানে মানুষ নিজের ভুলকে ভুল বলতে ভয় পায়, সেখানে কল্যাণের দরজা বন্ধ হতে থাকে। কুরআন মানুষের সামনে আয়নার মতো দাঁড়ায়; সে শুধু বাহিরের চেহারা দেখায় না, অন্তরের অবস্থা প্রকাশ করে। আর যে অন্তর সত্যকে অস্বীকারে অভ্যস্ত, সে শেষ পর্যন্ত নিজেরই বিরুদ্ধে সাক্ষ্য বহন করে। তখন চোখের সামনে আলোর রেখা থাকলেও হৃদয় অন্ধকারের সঙ্গে আপস করে।
তাই এই আয়াত ভয়ও জাগায়, আবার আশাও জাগায়। ভয় এই কারণে যে, অস্বীকার মানুষের ভেতরে এমন এক পর্দা টেনে দেয়, যা তাকে সত্যের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। আর আশা এই কারণে যে, আল্লাহ বান্দাকে এখনো ফিরতে ডাকছেন; এখনো দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি; এখনো অনুতাপের অশ্রু হৃদয়ের মরুভূমিতে বৃষ্টি হতে পারে। হে অন্তর, নিজের প্রতিরক্ষার ভাষা কমাও, রবের সামনে নত হও। চোখের বিভ্রান্তি নয়, হৃদয়ের সংশোধন চাও। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে বাঁচায় না বাহ্যিক ব্যাখ্যা, বাঁচায় সিজদার ভেঙে পড়া, তাওবার সততা, আর আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করা। সত্যকে মেনে নেওয়াই মুক্তি; আর অস্বীকারের পর্দা ভেদ করেই ফিরে আসে বান্দা তার রবের দিকে।
মানুষ যখন সত্যকে ভয় পায়, তখন সে সত্যকে অস্বীকার করার জন্য কত অদ্ভুত ভাষা খুঁজে নেয়! সামনে স্পষ্ট নিদর্শন, তবু বলে—চোখের বিভ্রাট ঘটেছে; হৃদয়ে আঘাত লাগা সত্য, তবু বলে—আমরা যাদুগ্রস্ত। এ এক করুণ আত্মরক্ষা, যেখানে জেদ নিজেরই কবর খুঁড়ে। আল্লাহর আয়াতের সামনে দাঁড়িয়েও যদি বান্দা নিজের অহংকারকে আঁকড়ে ধরে, তবে অন্ধত্ব শুধু চোখে নয়, অন্তরেও নেমে আসে। তখন বাস্তবতা বদলায় না, শুধু বদলে যায় তার ব্যাখ্যা; আর সেই ব্যাখ্যার ধোঁয়ায় মানুষ নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরই ঈমানকে ক্ষয় করে।
এই জন্যই কুরআনের বার্তা এত নরম আবার এত কঠিন: হে মানুষ, দেখার ক্ষমতা থাকলেই দেখা হয় না; মানার ক্ষমতা চাই। নবীদের জীবন আমাদের শেখায়—আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত এসে পৌঁছালে, হৃদয়ের দরজা না খুললে মানুষ তাকেও অস্বীকারের এক নতুন নাম দেয়। অতএব আজ যদি কোনো সত্য তোমার সামনে এসে দাঁড়ায়, তাকে জাদু বলে সরিয়ে দিও না, অভ্যাসের অন্ধতায় হারিয়ে দিও না। বরং কম্পিত হৃদয়ে বলো—হে আল্লাহ, আমার চোখকে নয়, আমার অন্তরকেই সোজা করে দাও। কারণ যে অন্তর নত হতে শিখে, তার জন্যই আলোর পথ খুলে যায়; আর যে অন্তর নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে সত্যকে দূরে ঠেলে, তার সামনে অন্ধকারও একদিন সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।