“ওয়াআন্নাস্-সাআতা আতিয়াহ্”—কিয়ামত আসবেই, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই এক বাক্যেই আল্লাহ যেন মানুষের সময়-ভাবনার ওপর আঘাত করেন। আমরা যাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই, যাকে স্মৃতির কোণে ঢেকে দিতে চাই, সেই দিনটি দূরে নয়; তা প্রতীক্ষমাণ, অবধারিত, আল্লাহর অমোঘ প্রতিশ্রুতির মতোই নিশ্চিত। মানুষ যখন নিজের শক্তি, পরিকল্পনা, সম্পদ আর অল্প আয়ুর মোহে ডুবে যায়, তখন এই আয়াত তাকে জাগিয়ে দেয়—তুমি যা-ই করো, তুমি ফিরে যাবে; তুমি যা-ই জমাও, একদিন সব হিসাব খুলে যাবে।
এরপর আল্লাহ বলেন, “ওয়াআন্নাল্লাহা ইয়াবআথু মান ফিল ক্বুবূর”—কবরে যারা আছে, আল্লাহ তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন। কবর এখানে নিছক মাটির গহ্বর নয়; এটি এমন এক অস্থায়ী আবাস, যেখানে দেহ নীরব, কিন্তু আল্লাহর সামনে কোনো প্রাণ বিলীন নয়। যে স্রষ্টা প্রথমবার শূন্য থেকে মানুষকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর জন্য পুনরায় জাগিয়ে তোলা কোনো অসাধ্য বিষয় নয়। এই সত্য তাওহীদেরই অন্তর্গত—কারণ যিনি সৃষ্টি করেছেন, রক্ষা করেছেন, মৃত্যুদান করেছেন এবং পুনরুত্থিত করবেন, তিনি ছাড়া আর কারও হাতে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব নেই।
সূরা আল-হাজ্জের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা কেবল তত্ত্ব নয়; এটি ঈমানকে কর্মে নামিয়ে আনার আহ্বান। এই সূরায় হজ, তাওহীদ, কুরবানি, জিহাদ, উম্মাহর দায়িত্ব এবং আল্লাহর নিদর্শনগুলো একে অপরের সঙ্গে বোনা হয়েছে—যেন বোঝানো হয়, যে জাতি কিয়ামতকে স্মরণ রাখে, সে জাতি আল্লাহর সামনে জবাবদিহির ভয়ে শুদ্ধ হয়। এখানে কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনার নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সব ব্যাখ্যায় একমত নয়; তবে স্পষ্টতই মক্কি- মাদানির সন্ধিক্ষণে নেমে আসা এই বক্তব্য মানুষকে আখিরাতের নিশ্চিত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। কবরের নীরবতা শেষ কথা নয়; শেষ কথা আল্লাহর আদেশ, আর সেই আদেশেই সমস্ত মৃত আত্মা আবার জেগে উঠবে।
মানুষের জীবন যেন এক দীর্ঘ বিস্মৃতি, আর এই আয়াত সেই বিস্মৃতির বুক চিরে দেওয়া আলোর রেখা। আল্লাহ ঘোষণা করেন—কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমরা যে দিনকে দূরে ঠেলে দিতে চাই, যে দিনকে ভাবলেই অন্তরে শিহরণ জাগে, সেই দিন আসবেই; তার আগমন অনিশ্চিত নয়, সে আল্লাহর অটল সত্যের অন্তর্ভুক্ত। দুনিয়ার কোলাহল, সম্পদের মোহ, পদ-মর্যাদার অহংকার, পরিকল্পনার ভিড়—সবকিছুর ওপরে এই একটি সত্য দাঁড়িয়ে আছে: সময় একদিন শেষ হবে, আর মানুষকে তার রবের সামনে উপস্থিত হতে হবে। সূরা আল-হাজ্জের প্রসঙ্গে এই স্মরণ আরও গভীর হয়ে ওঠে, কারণ হজের প্রতিটি আহ্বান মানুষকে দুনিয়ার ছলনা থেকে ফিরিয়ে এনে তাওহীদের শুদ্ধ কেন্দ্রে দাঁড় করায়, যেখানে জীবনের শেষ কথা আল্লাহরই কাছে ফিরে যাওয়া।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের অহংকার খুব ছোট হয়ে যায়। যে দেহ একদিন মাটিতে নত হবে, সে দেহের জন্যই যদি আল্লাহ পুনরুত্থানের দিন নির্ধারণ করে থাকেন, তবে মানুষ কিসের জন্য এত উচ্ছ্বাস, কিসের জন্য এত গাফিলতি? এ সত্য হৃদয়ে নেমে এলে জীবন বদলে যায়: হালাল-হারামের হিসাব, অন্তরের পবিত্রতা, জুলুম থেকে বাঁচা, তাওবায় দ্রুত ফেরা—সবই তখন কিয়ামতের ছায়ায় নতুন অর্থ পায়। কিয়ামত কেবল ভবিষ্যতের সংবাদ নয়; এটি বর্তমানের নৈতিক জাগরণ, আখিরাতের জন্য দুনিয়াকে সোজা করে নেওয়ার ডাক। আর যে হৃদয় এই ডাক শুনে কেঁপে ওঠে, সে হৃদয়ই ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়াই জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত গন্তব্য, আর সেই গন্তব্যের প্রস্তুতিই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।
এই আয়াতের ভেতরে মানুষের সমস্ত অহংকারের বিরুদ্ধে এক নীরব, অথচ অপ্রতিরোধ্য ঘোষণা আছে। কিয়ামত আসবেই—এতে সন্দেহ নেই। অর্থাৎ সত্যকে বিশ্বাস করা এখন আর অনুমানের বিষয় নয়, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিত সংবাদ। মানুষ কত সহজে দিনগুলোকে গুনে, কিন্তু নিজের শেষ ঠিকানা গোনে না; কত সাবধানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে, কিন্তু সেই চূড়ান্ত দিনের প্রস্তুতিকে পিছিয়ে দেয়। অথচ আয়াতটি হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে—তুমি যে সময়কে স্থায়ী ভেবে বসে আছ, তা ক্ষণস্থায়ী; আর যে আখিরাতকে দূরে ভাবছ, তা অবধারিতভাবে আসছে। এ সত্য স্মরণ করলে গুনাহের স্বাদও ভেঙে পড়ে, দম্ভের দেয়ালও কেঁপে ওঠে, আর বান্দা বুঝে যায়—নিজের দিকে ফিরে তাকানোই ইমানের প্রথম শর্ত।
এরপর আল্লাহ বলেন, কবরবাসীদের তিনি পুনরুত্থিত করবেন। কবর এখানে নিঃশব্দ সমাপ্তি নয়; বরং আল্লাহর হুকুমে অপেক্ষমাণ এক বাস্তবতা। মানুষের সমাজে মৃত্যু প্রায়ই পর্দার আড়ালে রাখা হয়, যেন এ নিয়ে ভাবলে আনন্দ নষ্ট হবে; কিন্তু কুরআন সেই আড়াল সরিয়ে দেয়, কারণ বিস্মরণই মানুষকে সবচেয়ে বেশি বিপথে নেয়। যে দেহ মাটিতে মিশে যাবে, সে দেহও আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে নয়। যে প্রাণ পৃথিবীতে ভালো-মন্দ, হক-নাহক, জুলুম-ইনসাফের সাক্ষী হয়ে বেঁচেছে, সে প্রাণও একদিন ডাকা হবে। এই পুনরুত্থান শুধু ভয় নয়, এটি ন্যায়বিচারের আশা; শুধু কাঁপন নয়, এটি মুমিনের জন্য সে সান্ত্বনাও—যা নিপীড়িতের অশ্রু, নিরপরাধের দীর্ঘশ্বাস, ও গোপন আমলের পুরস্কার সবকিছুকে অর্থ দেয়।
তাই এই আয়াত মানুষের অন্তরে একসাথে ভয় ও আশা জাগায়। ভয় এই জন্য যে হিসাব সত্য, এবং আশা এই জন্য যে রব অগণিত ভাঙা হৃদয়েরও রব; তিনি মৃতকে জাগাবেন, পথভ্রষ্টকে ডাকবেন, অবহেলিত আমলকে প্রকাশ করবেন। যে হৃদয় আজও গাফেল, সে যেন বুঝে—কবরের নীরবতা শেষ কথা নয়; শেষ কথা আল্লাহর ডাক। আর যে হৃদয় সত্যকে আঁকড়ে ধরতে চায়, সে যেন জানে—তার পরিণতি অন্ধকার নয়, যদি সে তার রবের সামনে নত হয়। কিয়ামতের এই নিশ্চিত সংবাদ আমাদের জীবনকে হালকা করে না; বরং ভারসাম্য দেয়। কারণ যে মানুষ ফিরে যাওয়ার দিনকে বিশ্বাস করে, সে আর পৃথিবীর মিথ্যা স্থায়িত্বে বন্দি থাকে না; সে প্রতিটি শ্বাসকে জবাবদিহির আলোয়, প্রতিটি কাজকে আখিরাতের মানদণ্ডে দেখতে শেখে।
এই আয়াত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—কবর শেষ নয়, পর্দা মাত্র; মৃত্যু চূড়ান্ত নীরবতা নয়, আল্লাহর নির্ধারিত এক বিরতি। মানুষ যতই নিজেকে স্থায়ী ভেবে নিক, যতই ঘর-সম্পদ-পরিচয়কে অমরতার মতো আঁকড়ে ধরুক, কবরের মাটির নিচে তার সব অহংকার ঝরে পড়ে। সেখানে থাকে শুধু এক নিঃসঙ্গ প্রশ্ন: আমি কার জন্য বেঁচেছিলাম? আমার রবের সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি কি ছিল? কিয়ামতের সংবাদ তাই ভয় জাগায় শুধু ধ্বংসের জন্য নয়, জাগরণের জন্যও; কারণ এই ভয়ই গুনাহের ঘুম ভাঙায়, এই স্মরণই অন্তরকে নরম করে, এই বিশ্বাসই মানুষকে নিজের সীমা চিনতে শেখায়।
আর যে আল্লাহ কবরে থাকা সবাইকে তুলে দাঁড় করাবেন, তাঁর কাছে হারিয়ে যায় না একটি কণাও, ভোলাও পড়ে না একটি নিঃশ্বাসও। আজ যেসব চোখ অশ্রুতে ভিজে প্রিয়জনের কবরের দিকে তাকায়, যেসব হৃদয় হারিয়ে যাওয়া মানুষটির জন্য নিঃশব্দে ভাঙে, এই আয়াত তাদের কাছে সান্ত্বনাও বয়ে আনে, আবার দায়িত্বের চাপও এনে দেয়। সান্ত্বনা এই যে, আল্লাহর কাছে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত নয়; দায়িত্ব এই যে, সেই দিনের জন্য ঈমানকে জীবিত রাখতে হবে। তাই কবর ও কিয়ামতের এই স্মরণ আমাদের অহংকার ভেঙে দিক, গাফলত ভেঙে দিক, আর মনে করিয়ে দিক—ফিরে যাওয়ার একটাই রাস্তা আছে: তওবা, সৎকর্ম, আর রবের রহমতের ওপর ভরসা। সেই দিনের আগে আজই হৃদয় নরম হোক, জিহ্বা ক্ষমা চাইতে শিখুক, আর জীবন আল্লাহর দিকে ফিরুক; কারণ পুনরুত্থান যখন সত্য, তখন সবচেয়ে বুদ্ধিমান সেই, যে আজই সেই দিনের জন্য প্রস্তুত হয়।