আল্লাহ বলছেন, কত জনপদকে তিনি অবকাশ দিয়েছেন, অথচ তারা ছিল জুলুমে ডুবে থাকা; তারপর হঠাৎ তাদেরকে পাকড়াও করেছেন। এই আয়াতের ভাষা খুবই সোজা, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে কিয়ামতের মতোই ভারী এক সতর্কতা। মানুষ যখন দেখে অবাধ্যতা চলছে, শক্তি চলছে, গাফিলতি চলছে—তখন সে ভেবে নেয়, বোধহয় সবই নিরাপদ। কিন্তু কুরআন সেই ভ্রান্ত নিরাপত্তাকে ভেঙে দেয়। আল্লাহর অবকাশ মানে কখনোই গোনাহের স্বীকৃতি নয়; বরং তা এক রহস্যময় সুযোগ, এক নীরব ডাক, যাতে হৃদয় জেগে ওঠে, ফিরে আসে, অনুতপ্ত হয়।
সূরা আল-হাজ্জের ভুবনে এই আয়াত আরও গভীর হয়ে ওঠে। এই সূরায় হজের শুদ্ধ আহ্বান, কুরবানির তাওহীদ, আল্লাহর নিদর্শন, মুমিনের আত্মসমর্পণ এবং কিয়ামতের কম্পমান বাস্তবতা—সবকিছুই এক সুতোয় বাঁধা। এখানেও সেই একই সত্য ধরা পড়ে: দুনিয়ার ইতিহাস আল্লাহর হাতে। কোনো জনপদ, কোনো শক্তি, কোনো সভ্যতা তাঁর সীমা অতিক্রম করে চিরকাল টিকে থাকতে পারে না। অবকাশ পেয়ে জুলুম বাড়লে, ক্ষমতার মোহে সত্যকে উপেক্ষা করলে, একদিন এমন পাকড়াও আসে যা পূর্বাভাসহীন হলেও মোটেই আকস্মিক নয়—কারণ তা আল্লাহর ন্যায়বিচারেরই প্রকাশ।
আর শেষে যে বাক্যটি দাঁড়িয়ে আছে, ‘আমার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে’—এটাই এই আয়াতের অন্তর্গত কম্পন। মানুষের সব ভ্রম, সব জমিনি দম্ভ, সব সামাজিক শক্তি, সব জনপদের উত্থান-পতন শেষ পর্যন্ত এক দরজার দিকে যায়। সেখানেই মিথ্যা উন্মোচিত হয়, সত্য স্থির হয়, জুলুমের হিসাব নেওয়া হয়। তাই অবকাশকে বিলম্ব ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া মুমিনের পথ নয়। মুমিন এই আয়াত থেকে শিখে, আল্লাহ ধৈর্যশীল বলেই ভয় জাগে; আর আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে বলেই তওবা তীক্ষ্ণ, হৃদয় নরম, এবং জীবন জবাবদিহির আলোয় জেগে ওঠে।
আল্লাহর অবকাশ অনেক সময় আমাদের চোখে দয়া-নির্ভার নিরাপত্তা বলে ধরা দেয়। জনপদ দাঁড়িয়ে থাকে, বাজার মুখর থাকে, প্রাসাদ উঁচু হয়, অন্যায় চলতেই থাকে—আর মানুষ ভাবে, কিছুই তো হল না। কিন্তু কুরআন এই ভ্রান্ত নিশ্চিন্ততাকে কাঁপিয়ে দেয়। কারণ অবকাশ মানে ক্ষমা হয়ে যাওয়া নয়; অবকাশ মানে পরীক্ষা দীর্ঘ হওয়া। জুলুম যখন সীমা ছাড়ায়, গোনাহ যখন স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়, তখন আল্লাহ ধৈর্য ধরেন—যাতে শেষ মুহূর্তে সত্যের ডাক শোনার মতো একটি দরজা খোলা থাকে। এই অবকাশের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে রহমতের নরম স্পর্শ, আবার লুকিয়ে থাকে সতর্কতার কঠিন ছায়া।
শেষ বাক্যটি একেবারে নির্দয়ভাবে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়: وَإِلَيَّ الْمَصِيرُ—ফিরে আসতে হবে আমারই কাছে। এ যেন কিয়ামতের আগুনঝরা স্মরণ, তাওহীদের নিঃসঙ্গ উচ্চারণ, এবং মুমিন হৃদয়ের জন্য এক আশ্চর্য মুক্তি। কারণ সবকিছু যদি মানুষের কাছেই ফেরত যেত, তবে দুনিয়ার জবরদস্তিই শেষ কথা হয়ে থাকত। কিন্তু যখন প্রত্যাবর্তন আল্লাহর দিকে, তখন মিথ্যা প্রতিষ্ঠার দিনও অস্থায়ী, আর সত্যের আদালতই স্থায়ী। এই আয়াত মুমিনকে কাঁদিয়ে আবার দাঁড় করায়—যেন সে বুঝে যায়, অবকাশের দিনের প্রতিটি শ্বাসই ফিরে আসার সুযোগ; আর যে তা হারায়, তার জন্য শেষ ঠিকানা হবে সেই প্রভুর সামনে, যাঁর সামনে কোনো জনপদ, কোনো শক্তি, কোনো গোপন অন্যায় কিছুই লুকোতে পারবে না।
আল্লাহর অবকাশকে মানুষ কত সহজে ভুল বোঝে। শক্তি পেয়ে, সময় পেয়ে, সুযোগ পেয়ে সে ভাবে—সব বুঝি নিরাপদ, সব বুঝি স্থায়ী। অথচ এই আয়াত আমাদের কানের কাছে নীরবভাবে বলে দেয়, নিরাপত্তার মতো দেখালেও অবকাশ অনেক সময় পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। জনপদ যখন জুলুমে ডুবে যায়, যখন সমাজের বুকের উপর অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখনও আল্লাহ তাড়াহুড়ো করেন না; তিনি সময় দেন। এই সময়ই কারও জন্য তাওবার দরজা, আর কারও জন্য আরও গভীর গাফিলতির অন্ধকার।
কিন্তু অবকাশের এই দুনিয়া চিরকাল নয়। এরপর আসে আকস্মিক পাকড়াও—যেন দীর্ঘ নীরবতার পর আকাশের বজ্রধ্বনি। ইতিহাসের ভাঙা জনপদগুলো আমাদের শেখায়, আল্লাহর ধৈর্য অসীম, কিন্তু বিচারহীন নয়। মানুষ যখন নিজেকে নিজের শক্তির মালিক মনে করে, তখনই এই আয়াত তার কাঁধে হাত রেখে সতর্ক করে: তোমার জন্য আসল আশ্রয় ক্ষমতা নয়, সম্পদ নয়, সংখ্যাবলও নয়; আসল আশ্রয় কেবল আল্লাহর ক্ষমা, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি।
সূরা আল-হাজ্জের আলোয় এই কথাটি আরও বেশি ভারী হয়ে ওঠে, কারণ এখানে হজের আহ্বান মানুষকে শুদ্ধতার দিকে ডাকছে, কুরবানি তাওহীদের কথা স্মরণ করাচ্ছে, আর কিয়ামতের দৃশ্য অন্তরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তাই এই আয়াত শুধু অন্যদের ইতিহাস নয়; এটা আমার, আপনার, প্রতিটি হৃদয়ের আয়না। আল্লাহ যদি আজ অবকাশ দিয়ে থাকেন, তবে তা অবহেলার ছুটি নয়—ফিরে আসার আহ্বান। আর যদি আমাদের সমাজে জুলুম, অহংকার, হক নষ্ট করা, গাফিলতি জমে ওঠে, তবে ভয় করা উচিত, কারণ শেষ গন্তব্য তো আল্লাহর কাছেই—আর সেই المصير থেকে কেউ পালাতে পারে না।
আল্লাহর এই কথা আমাদের স্বস্তি কেড়ে নেয়, আবার রহমতের দরজাও খুলে দেয়। কারণ অবকাশের মধ্যে লুকিয়ে থাকে পরীক্ষা—কে জেগে ওঠে, আর কে আরও অন্ধকারে ডুবে যায়। মানুষ ভাবে, দেরি মানেই ক্ষমা; সময় পেলে মানেই নিরাপত্তা। কিন্তু কুরআন শেখায়, দেরি অনেক সময় কেবল হুঁশ ফেরানোর জন্য দেওয়া নীরব সুযোগ। জুলুম যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, গোনাহ যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, আর অন্তর যখন আর ফিরে তাকায় না—তখন পাকড়াও আসে এমনভাবে যে, তখন আর কোনো শক্তি, কোনো পরিকল্পনা, কোনো জনপদের গর্ব কাজে লাগে না।
এই আয়াত আমাদের দুনিয়ার রঙিন নিশ্চয়তাকে কাঁপিয়ে দেয়। আমরা যারা নিজেদেরকে স্থায়ী ভেবে বসি, যাদের ঘর, সম্পদ, সম্মান, সংখ্যা, প্রযুক্তি, রাষ্ট্র—সবকিছুর ওপর ভরসা জন্মায়, তাদের জন্য এ এক গভীর সতর্কতা: আল্লাহর সামনে কারও অবস্থান চিরস্থায়ী নয়। অবকাশের শেষে যদি তাওবা না থাকে, নরম হয়ে পড়া হৃদয় না থাকে, জুলুম থেকে ফিরে আসা না থাকে, তাহলে প্রত্যাবর্তন হয় সেই সত্তার দিকে, যাঁর কাছে সব গোপন উন্মোচিত। আর সেই মুখোমুখি হওয়া কিয়ামতের দিনের মতোই ভয়ের। তাই আজই দরকার বিনয়, আজই দরকার কান্না, আজই দরকার ফিরে আসা। কারণ অবশেষে আমাদের সবারই যেতে হবে আল্লাহরই দিকে—المصير।