আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁরা পথপ্রদর্শিত হয়েছিল সৎবাক্যের দিকে এবং পরিচালিত হয়েছিল প্রশংসিত আল্লাহর পথপানে। এই একটি আয়াতে যেন হৃদয়ের ভেতর খুলে যায় হিদায়াতের দুই দরজা: মুখের ভাষা এবং জীবনের পথ। সৎবাক্য শুধু শিষ্টাচারী কথা নয়; এটি সেই পবিত্র উচ্চারণ, যেখানে মিথ্যার গন্ধ নেই, শিরকের ছায়া নেই, বিদ্বেষের আগুন নেই। তাওহীদের স্বচ্ছ শব্দ, সত্যের স্বীকারোক্তি, কৃতজ্ঞতার বাক্য, দোয়ার মিনতি, কুরআনের আলো—সব মিলিয়ে বান্দার জবান যখন পরিশুদ্ধ হয়, তখন বুঝতে হয় অন্তরেও আল্লাহর দয়া নেমে এসেছে। ভাষা যেমন অন্তরের দর্পণ, তেমনি সৎবাক্য আল্লাহর অনুগ্রহে জেগে ওঠা হৃদয়ের প্রথম চিহ্ন।
এরপর আয়াতটি আরও গভীরে নিয়ে যায়: তাঁরা পরিচালিত হয়েছিল ‘সিরাতুল হামিদ’-এর দিকে, অর্থাৎ সেই পথের দিকে যিনি স্বয়ং প্রশংসিত। এখানে পথ আর গন্তব্য আলাদা নয়; আল্লাহর দিকে ফেরার প্রতিটি পদক্ষেপই প্রশংসার দিকে, পবিত্রতার দিকে, নিরাপত্তার দিকে। সূরা আল-হাজ্জের সামগ্রিক সুরে আমরা দেখি হজ, কুরবানি, কিয়ামত, উম্মাহর ঐক্য, আল্লাহর নিদর্শন—সবকিছু মানুষকে নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝিয়ে দেয় এবং রবের মহত্ত্বে নত করে। তাই এই আয়াত যেন বলছে, যে হৃদয় আল্লাহর নিদর্শনে নরম হয়, সে আগে সত্য বলতে শেখে, তারপর সত্যের পথে হাঁটে।
এখানে কোনো কৃত্রিম গল্পের প্রয়োজন নেই; কুরআনের নিজস্ব প্রেক্ষিতই যথেষ্ট। একদিকে অবাধ্যতা ও অস্বীকারের অন্ধকার, অন্যদিকে ঈমান ও সিজদার আলো—এই সংঘর্ষের মাঝখানে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের শেখান, হিদায়াতের ভাষা কেমন হয়। সৎবাক্য বান্দাকে ভদ্র করে না শুধু, তাকে ঈমানি করে; আর প্রশংসিত পথ বান্দাকে সফল করে না শুধু, তাকে আল্লাহমুখী করে। যে মুখে জিকির আসে, যে অন্তরে তাওহীদ স্থির হয়, যে জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠা পায়, সেই পথই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দেয় প্রশংসার মালিকের দরজায়।
সৎবাক্যের দিকে হিদায়াত পাওয়া—এ এক সাধারণ কথা নয়; এ হলো অন্তরের ভেতর আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক পরিবর্তন, যেখানে জিহ্বা আর অবাধ্যতার বাহন থাকে না, বরং ইমানের সজল সাক্ষী হয়ে ওঠে। যে হৃদয় কাবার দিকে ছুটে যায়, কুরবানির অর্থ বোঝে, কিয়ামতের ভয়কে বুকের মাঝে জাগিয়ে রাখে, তার মুখে এমন বাক্যই শোভা পায় যা সত্যকে ঢাকে না, মিথ্যাকে সাজায় না, মানুষকে ভাঙে না। আল-طيّب, সেই পবিত্র, কোমল, পরিচ্ছন্ন বাক্য—এ শুধু ভদ্রতার সৌন্দর্য নয়; এটি তাওহীদের শ্বাস, কৃতজ্ঞতার স্বর, দোয়ার নরম আলো। বান্দা যখন বুঝে ফেলে যে সে আল্লাহর নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তখন তার ভাষাও পবিত্র হতে শুরু করে, কারণ হৃদয়ের অশুদ্ধতা মুখের প্রতিটি শব্দে ছাপ ফেলে, আর হৃদয়ের পরিশুদ্ধি আল্লাহর অনুগ্রহে জবানকে আমানতের মতো করে দেয়।
আল্লাহর দেওয়া সৎবাক্য কেবল জবানের সৌন্দর্য নয়; এটি আত্মার শুদ্ধতা, আমলের সততা, সম্পর্কের পবিত্রতা। যে সমাজে সত্যের বদলে প্রতারণা, যিকিরের বদলে গিবত, ইনসাফের বদলে পক্ষপাত, তাওহীদের বদলে মানুষের প্রশংসা ও ভয়ের শিকড় গেঁথে বসে, সেখানে ভাষা ধীরে ধীরে বিষে ভরে ওঠে। আর যখন আল্লাহ বান্দাকে হিদায়াত দেন, তখন তার মুখে ফিরে আসে সেই الطيّب—যা নরম, সত্য, পরিচ্ছন্ন, কল্যাণময়। এই সৎবাক্য মানুষকে শুধু অন্যের সামনে সুন্দর করে না; সে মানুষকে নিজের রবের সামনে লজ্জাবনত করে, নিজের অন্তরকে প্রশ্ন করতে শেখায়: আমি কি যা বলছি, তা-ই কি আমি বিশ্বাস করি? আমি কি যা স্বীকার করছি, তা-ই কি আমি বয়ে চলছি?
আর তারপর আসে আরও বড় সত্য—তাদের পরিচালিত করা হয়েছে প্রশংসিত আল্লাহর পথের দিকে। অর্থাৎ হিদায়াত শুধু কথা শেখায় না, দিশা শেখায়; শুধু বাক্য নয়, গন্তব্যও নির্ধারণ করে। প্রশংসিত পথ সেই পথ, যেখানে বান্দা নিজের অহংকারের কেন্দ্র থেকে সরে আসে, কিবলার দিকে ফিরে দাঁড়ায়, আল্লাহর নিদর্শন দেখে কেঁপে ওঠে, কুরবানি দিয়ে শেখে যে প্রেমের নাম আত্মসমর্পণ, আর হজের ভিড়ে শেখে যে মানুষের মর্যাদা রং, বংশ, ভাষা বা সম্পদে নয়—বরং রবের সামনে একই দাসত্বে। এই পথ প্রশংসিত, কারণ এতে মিথ্যার ভার নেই, শিরকের ধুলো নেই, জুলুমের অন্ধকার নেই; আছে শুধু সেই আলো, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে, আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে, এবং শেষ বিচারের দিনের প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যায়।
সুতরাং এ আয়াত আমাদের অন্তরে এক নীরব তিরের মতো এসে লাগে। আমরা কি সৎবাক্যের দিকে পরিচালিত হচ্ছি, নাকি এখনও আমাদের মুখে আল্লাহর পছন্দের শব্দ, আর অন্তরে দুনিয়ার গোপন দরকষাকষি? আমরা কি প্রশংসিত পথে হাঁটছি, নাকি নিজের ইচ্ছাকে পথ বানিয়ে নিয়েছি? কিয়ামতের ভয় এবং রহমতের আশা—দুটিই এই আয়াতের ভেতর মিশে আছে। কারণ আল্লাহর পথে ফেরা মানে ভেঙে পড়া নয়, বরং সত্যের সামনে নত হওয়া; হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং রবের দিকে ফিরে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। যে বান্দা আজ নিজের ভাষাকে, নিজের সংকল্পকে, নিজের চলনকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়, সে-ই ধীরে ধীরে সেই প্রশংসিত পথে উঠে আসে—যে পথে শেষে আছে ক্ষমা, প্রশান্তি, এবং সেই রবের সন্তুষ্টি, যাঁর পথই সমস্ত প্রশংসার উৎস।
এই আয়াতের ভেতর এক অদ্ভুত কোমলতা আছে—আল্লাহ যাদের হিদায়াত দেন, তাদের জীবনে প্রথম বদলায় জিহ্বা, তারপর বদলায় গন্তব্য। মানুষ যখন সত্যকে ভালোবাসে, তখন তার কথা আর কাঁটার মতো বিঁধে না; সে কথা হয়ে ওঠে সেতু, দোয়া, সাক্ষ্য, এবং আল্লাহমুখী এক নীরব আহ্বান। সৎবাক্য তখন শুধু সুন্দর ভাষা নয়, তা হয়ে দাঁড়ায় ঈমানের শ্বাস। যে হৃদয় আল্লাহর নিদর্শনে জাগে, সে আর মিথ্যার উপর ভর করে বাঁচতে পারে না; কারণ সত্যের আলো একবার অন্তরে ঢুকলে, বান্দা নিজেই বুঝতে শেখে—কী বলা উচিত, কী বলা অনুচিত, কোথায় নরম হতে হবে, আর কোথায় দৃঢ়ভাবে তাওহীদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
আর ‘প্রশংসিত পথ’—এ পথের শেষেও প্রশংসা, মাঝেও প্রশংসা, শুরুতেও প্রশংসা। এটি সেই পথ, যেখানে বান্দা নিজের অহংকারকে কাঁধে নিয়ে হাঁটে না; বরং নিজের দুর্বলতা, তাওবা, কৃতজ্ঞতা আর নির্ভরতা আল্লাহর সামনে রেখে অগ্রসর হয়। সূরা আল-হাজ্জের বিস্তৃত আকাশে হজের ডাক, কিয়ামতের ভয়, কুরবানির ত্যাগ, উম্মাহর মিলন, তাওহীদের ঘোষণা—সবকিছুই যেন শেষে এসে এই কথাই বলে: তোমার জবানকে পবিত্র করো, তোমার পথকে সোজা করো, এবং হৃদয়কে সেই রবের দিকে ফিরিয়ে দাও যিনি হামিদ, যিনি প্রশংসার একমাত্র যোগ্য। হে আল্লাহ, আমাদের কথাকে সৎ করো, আমাদের পথকে সরল করো, এবং এমন জীবন দাও যা তোমার প্রশংসিত পথের সাক্ষী হয়ে ওঠে—আমিন।