সূরা আল-হাজ্জের এই আয়াতটি মানুষের অন্তরের এক করুণ দুর্বলতার দিকে আঙুল তোলে। মানুষ যখন আল্লাহকে ছেড়ে এমন কিছুর দিকে হাত বাড়ায়, যা না ক্ষতি দূর করতে পারে, না কল্যাণ দিতে পারে, তখন সে শুধু বাহ্যিক কোনো ভুল করে না; সে নিজের হৃদয়ের দিকনির্দেশনাই হারিয়ে ফেলে। কী বিচিত্র এই বিভ্রম—যার কাছে ডাকা হচ্ছে, সে সাহায্যের মালিকও নয়, প্রতিরোধের শক্তিও নয়; তবু মানুষ তাকে আশ্রয় ভাবে, ভরসা ভাবে, প্রয়োজনের ঠিকানা ভাবে। আয়াতের ভাষা এখানে খুবই তীক্ষ্ণ: এ-সব আহ্বান শূন্যের দিকে ছুটে যাওয়া, আর সেই ছুটে যাওয়ার নামই চরম পথভ্রষ্টতা।
এই বক্তব্যের পেছনে যে নৈতিক ও তাওহীদী প্রেক্ষাপট, তা সর্বজনীন। মক্কার বহু মানুষ বিভিন্ন মূর্তি, কল্পিত আশ্রয়, মধ্যস্থতা-নির্ভর উপাসনা ও আল্লাহবিমুখ ভরসার ভেতর নিজেদের নিরাপদ ভাবত। কুরআন বারবার সেই ভাঙা ভরসাগুলোকে উন্মোচিত করেছে, যেন মানুষ বুঝতে পারে—স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে যা কিছু ডাকা হয়, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের অসহায়তাকেই বাড়ায়। এ আয়াতে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার নাম স্পষ্ট করা হয়নি; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত সামাজিক সত্য খুব বড়: মানুষ যখন উপকার-অপকারের মালিককে ভুলে গিয়ে নিষ্ফল শক্তির সামনে নত হয়, তখন তার ইবাদতও বিকৃত হয়, দিকও বিকৃত হয়, হৃদয়ও ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যায়।
হজের সূরায় এমন কথা আসা আরও গভীর অর্থবহ। কারণ হজের কেন্দ্রেই আছে তাওহীদের ডাক—মানুষের সব কৃত্রিম নির্ভরতা ভেঙে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। কা‘বা, কুরবানি, ইহরাম, ভিড়, সমতা, দাসত্বের ভাঙন—সবই যেন এক ঘোষণার চারদিকে ঘোরে: আল্লাহই একমাত্র সত্য আশ্রয়। তাই এই আয়াত শুধু মূর্তিপূজার নিন্দা নয়; এটি প্রতিটি হৃদয়ের জন্য আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের ভেতরের ‘ডাকা’র শুদ্ধতা যাচাই করি। আমি কাকে ডাকছি? কার কাছে অন্তরের নিরাপত্তা খুঁজছি? যে সত্তা ক্ষতি ঠেকাতে পারে না, উপকার দিতেও পারে না, তার দিকে ঝুঁকে পড়া আসলে হৃদয়ের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ প্রতারণা; আর সেই প্রতারণা থেকে ফিরে আসাই তাওহীদের প্রথম জাগরণ।
মানুষের অন্তর কখনও কখনও এমন এক শূন্যতার কাছে নত হয়ে যায়, যাকে সে নিজেই অর্থ দিয়ে বসে। সে ভাবে, এই নামটি আমাকে রক্ষা করবে, এই প্রতিমা, এই ভরসা, এই কল্পিত আশ্রয় আমাকে ধরে রাখবে। অথচ আল্লাহ তা স্মরণ করিয়ে দেন—যাকে ডাকা হচ্ছে, সে ক্ষতি দূর করারও ক্ষমতা রাখে না, কল্যাণ দেওয়ারও মালিক নয়। তাহলে তার দিকে প্রসারিত এই হাত, তার দিকে ছুটে যাওয়া এই হৃদয়, আসলে কাকে খুঁজছে? সে কি সত্যিই আশ্রয় খুঁজছে, নাকি নিজের দুর্বলতাকে ভুলে থাকার জন্য একটি মিথ্যা অবলম্বন তৈরি করছে? এটাই সেই ভ্রান্তির গভীরতা, যেখানে মানুষ উপাসনার ভাষা ব্যবহার করে কিন্তু ভরসার আসনটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে দিয়ে দেয়।
কিন্তু কুরআন এখানে কেবল ভর্ৎসনা করে না; সে জাগিয়ে তোলে। যেন বলছে, হে অন্তর, ফিরে এসো—যার হাতে তোমার ক্ষতিও, সুস্থতাও, অভাবও, পূর্ণতাও, তাঁর দিকেই ফিরে এসো। কারণ যে সত্তা তোমার কোনো উপকারও করতে পারে না, তোমার কোনো ক্ষতিও দূর করতে পারে না, সে কখনো তোমার ইলাহ হতে পারে না। আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন মানে কেবল ভুল ভাঙা নয়, নিজের হৃদয়কে তার প্রকৃত কিবলার দিকে ফিরিয়ে আনা। তাওহীদ তাই শুধু বিশ্বাসের ঘোষণা নয়; তা ভয়, আশা, প্রার্থনা, নির্ভরতা—সব কিছুকে এক সুমহান সত্যে জড়ো করে দেয়। আর সেই সত্য হলো: আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই, যিনি সত্যিকার অর্থে ডাকার যোগ্য, ভরসা করার যোগ্য, এবং আত্মাকে মুক্তি দেওয়ার যোগ্য।
মানুষের অন্তর যখন আল্লাহ ছাড়া অন্য কোথাও ভরসা বাঁধে, তখন সে শুধু একটি ভুল ঠিকানায় যায় না; সে নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্রই হারিয়ে ফেলে। এ আয়াত আমাদের চোখের সামনে এক করুণ দৃশ্য তুলে ধরে—যাকে ডাকা হচ্ছে, সে না পারে কোনো ক্ষতি ঠেকাতে, না পারে কোনো কল্যাণ ডেকে আনতে। তবু মানুষ তার দিকে হাত বাড়ায়, তার সামনে কাকুতি-মিনতি করে, তার কাছে নিরাপত্তা খোঁজে। কী বিস্ময়কর আত্মবিভ্রান্তি! যে সত্তা নিজেরই কোনো ক্ষমতার মালিক নয়, তাকে আশ্রয় ভাবা হৃদয়ের এমন অন্ধকার, যেখানে তাওহীদের আলো ঢুকতে কষ্ট পায়।
এই ভ্রান্তি ব্যক্তিগত সীমায় থেমে থাকে না; সমাজের চেহারাতেও তার ছাপ পড়ে। যখন মানুষ আল্লাহর বদলে শূন্য ভরসা আঁকড়ে ধরে, তখন বিচারবুদ্ধি দুর্বল হয়, ইমানের দৃঢ়তা নরম হয়ে যায়, আর দোয়া-ভরসা-উদ্দেশ্য—সবকিছু ছড়িয়ে পড়ে নিষ্ফলতার দিকে। হজের পথে যাত্রী যেমন সব মিথ্যা ভরসা ঝেড়ে ফেলে একমাত্র রবের দিকে ফিরে যায়, তেমনি মুমিনের হৃদয়ও বারবার এই আয়াত শুনে জেগে ওঠে: তুমি যাকে ডাকছ, সে কি তোমার কান্না শুনতে পারে? সে কি তোমার বিপদ সরাতে পারে? সে কি তোমাকে একটি নিঃশ্বাসও দিতে পারে? যদি না পারে, তবে তার কাছে নতি স্বীকার করে কী লাভ, আর নিজের আত্মাকে কী শূন্যতার হাতে তুলে দেওয়া!
এই আয়াত আমাদের আত্মসমালোচনার এক নীরব দরজা খুলে দেয়। আমরা কি কখনো এমন কিছুতে মন বেঁধে ফেলি, যা বাস্তবে উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও ঠেকাতে পারে না—অর্থাৎ আল্লাহর স্মরণের বদলে দুনিয়ার ছায়া, মানুষের প্রশংসা, বস্তুগত নিরাপত্তা, বা কোনো ভেঙে পড়া আশ্রয়কে হৃদয়ের আসন দিই? এখানে ভয় আছে, কিন্তু সে ভয় হতাশার নয়; বরং জাগরণের। আর আশা আছে, কিন্তু সে আশা অলস স্বপ্নের নয়; বরং সত্যে ফিরে আসার আহ্বান। যে অন্তর একবার বুঝে যায়, কাকে ডাকলে সব দরজা খুলে যায়, সে আর চরম পথভ্রষ্টতার অন্ধ গলিতে ফিরতে চায় না। সে বলে, হে আল্লাহ, আমি ভুল পথে ডেকেছিলাম; এখন আমি তোমারই দিকে ফিরছি—যিনি ক্ষতি করেন না, উপকারও কেবল তোমার অনুমতিতেই আসে, এবং যাঁর দিকে ফিরে আসাই শেষ আশ্রয়।
মানুষের অন্তর কত সহজে প্রতারিত হয়—যাকে ডাকা হয়, তার যদি না থাকে উপকার করার শক্তি, না থাকে ক্ষতি ঠেকানোর ক্ষমতা, তবে তাকে আশ্রয় বানানো আসলে নিজের হৃদয়কে শূন্যতার হাতে তুলে দেওয়া। এই আয়াত যেন আল্লাহর দরবার থেকে একটি কাঁপিয়ে দেওয়া প্রশ্ন নিয়ে আসে: তুমি কাকে ডাকছ? কিসের দিকে ঝুঁকছ? কার কাছে এমন আশা বাঁধছ, যে তোমার দুঃখও কমাতে পারে না, আনন্দও বাড়াতে পারে না? তাওহীদের সৌন্দর্য এখানেই—আল্লাহ ছাড়া সব ভরসা ছোট, সব আহ্বান দুর্বল, সব আশ্রয় শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। আর যে ভাঙা আশ্রয়কে শক্ত মনে করে, তার পথভ্রষ্টতা কেবল ভুল নয়; তা গভীর, দীর্ঘ, এবং অন্তরকে স্তব্ধ করে দেওয়া বিভ্রম।
এই আয়াত আমাদের শুধু মূর্তির দিকে নয়, অন্তরের লুকানো মূর্তিগুলোর দিকেও তাকাতে শেখায়। কখনও তা মানুষ, কখনও সম্পদ, কখনও সুনাম, কখনও নিজের ক্ষমতা—যা কিছু আমরা মনে মনে এমনভাবে ধরে নিই যেন সেটাই আমাদের রক্ষা করবে, সেটাই আমাদের পূর্ণ করবে। কিন্তু কুরআন নির্মম মমতায় বলে দেয়: আল্লাহ ছাড়া কিছুই তোমার অন্তরের শেষ ঠিকানা হতে পারে না। তাই আজ যদি হৃদয়ে কোনো মিথ্যা ভরসা থেকে থাকে, তাকে ভেঙে ফেলো; যদি কোনো অসার আহ্বান জেগে থাকে, তাকে নীরব করো; আর যদি সত্যিই বাঁচতে চাও, তবে তোমার ডাক কেবল সেই রবের দিকে ফিরিয়ে দাও, যিনি ক্ষতিও করেন ন্যায়ের সঙ্গে, কল্যাণও দেন দয়ার সঙ্গে, এবং যাঁর দরজায় ফিরলে পথ হারানো মানুষও আবার নিজের নাম খুঁজে পায়।