আল্লাহ বলেন, তিনি চাইলে প্রত্যেক জনপদে একজন করে সতর্ককারী পাঠাতে পারতেন। এই একটি বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে কুদরতের এমন বিস্তার, যা মানুষের কল্পনাকে নরম করে দেয়। পৃথিবীর কোনো কোণই তাঁর ক্ষমতার বাইরে নয়; কোনো জনপদই তাঁর হিদায়াতের দৃষ্টি থেকে দূরে নয়। কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের সামনে কেবল তাঁর শক্তি দেখান না, দেখান তাঁর হিকমতও। তিনি যেমন চাইলে একসঙ্গে বহু নবি পাঠাতে পারতেন, তেমনি চাইলে প্রতিটি জনপদে পৃথক সতর্ককারীও প্রেরণ করতে পারতেন। তবু তিনি একটি বিশেষ ব্যবস্থায় দাওয়াতকে প্রবাহিত করেছেন, যাতে সত্য একটিই কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, আর মানুষ বুঝে নেয়—হেদায়াত সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব, পরীক্ষা এবং দয়া।
সূরা আল-ফুরকান মক্কি প্রেক্ষাপটে নাজিল হওয়া একটি সূরা, আর এই আয়াতের সুরও সেই মক্কি বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে যখন অস্বীকার, ঠাট্টা, ও অবিশ্বাসের তীব্র চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছিল, তখন কুরআন বারবার তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছে—তোমার একার ওপরই মানুষের সব দৃষ্টি নির্ভর করছে না, আর তোমার দাওয়াতই দুনিয়ার একমাত্র দরজা নয়। আল্লাহ চাইলে আরও সতর্ককারী পাঠাতে পারতেন; তিনি যাকে খুশি যেখানে খুশি পাঠানোর ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু এই উম্মাহর জন্য তিনি এক কেন্দ্রীয় বার্তা নির্ধারণ করেছেন, যেন নবীর ওপর ঈমান মানে হয় কেবল সংবাদ মানা নয়, বরং সেই সত্যের কাছে নত হওয়া, যা হৃদয়কে জাগায় এবং অহংকারকে ভেঙে দেয়।
এখানে মানুষের কাছে একটি নীরব কিন্তু তীব্র প্রশ্নও রেখে দেওয়া হয়েছে: যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তোমাদের প্রতিটি জনপদে পৃথকভাবে সতর্কতা এসে যেত—তবে এখন যখন এক কিতাব, এক রসূল, এক স্পষ্ট আহ্বান তোমাদের সামনে এসেছে, তখন অস্বীকারের কী অজুহাত থাকে? এই আয়াত মানুষকে দায়মুক্ত করে না; বরং দায়িত্বের সামনে দাঁড় করায়। যে সত্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তা নির্জন মরুভূমির মতো অনাদৃত নয়; তা ইতিহাসের রাস্তায়, সমাজের দ্বারে, হৃদয়ের ভিতরে এসে কড়া নাড়ছে। তাই এই আয়াত কেবল কুদরতের ঘোষণা নয়, এটি হেদায়াতের মর্যাদার ঘোষণা, নবীর সান্ত্বনার ঘোষণা, আর মানুষের জন্য সেই গভীর সতর্কবার্তা—যে আল্লাহ চাইলে পথের সংখ্যা বাড়াতে পারতেন, কিন্তু তিনি এক পথকে এমনভাবে স্পষ্ট করেছেন, যাতে সত্যের সামনে আর কোনো অন্ধকারই অজুহাত হয়ে না দাঁড়ায়।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহর কুদরত মানুষের বাস্তবতার সীমায় বাঁধা নয়। তিনি চাইলে প্রতিটি জনপদে একজন করে সতর্ককারী পাঠাতে পারতেন; কোনো ভূখণ্ড, কোনো জনপদ, কোনো হৃদয়ের অন্ধকার তাঁর হিকমতের বাইরে নয়। কিন্তু তিনি তা করেননি এমনভাবে, যেমন মানুষ কল্পনা করে কাজের ছড়িয়ে পড়া; বরং তিনি দাওয়াতকে একটি দায়িত্বপূর্ণ ধারায় এগিয়েছেন, যাতে সত্য কেবল বার্তার আধিক্যে নয়, বরং তার ঐশী ওজন, তার নুর, তার কর্তৃত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের কাছে হেদায়াত আসা কোনো দৈব ঘটনা নয়; এটা আল্লাহর পরিকল্পিত দয়া, যেখানে সতর্কবাণীও রহমত, আর ভয়ও একধরনের অনুগ্রহ—কারণ জাগিয়ে না তুললে আত্মা জাগে না।
মানুষের ইতিহাসে বারবার এই একই সত্য ফিরে আসে: আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া নির্দেশনা সংখ্যার খেলায় জেতে না, আত্মসমর্পণের গভীরতায় জেতে। তাই যে জনপদে একজন সতর্ককারী এসেছেন, সে জনপদ আর অজুহাতের নিরাপদ আশ্রয় পায় না; তার সামনে সত্য এসে দাঁড়ায়, মিথ্যার মুখোশ খুলে যায়, আখিরাতের হিসাব অদৃশ্য থেকে দৃশ্যের মতো ঘন হয়ে ওঠে। এই আয়াতের নীরব ভয় এখানেই—হেদায়াত সামনে এসে গেলে তা উপেক্ষা করা মানে কেবল একটি কথা অমান্য করা নয়, বরং আল্লাহর দয়া যে রূপে দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া। আর মুমিনের জন্য এর মধ্যে এক সূক্ষ্ম আশা আছে: যদি আল্লাহ চাইতেন, তিনি দূরে দূরে সতর্ককারী পাঠিয়ে আমাদের আরও আগেই জাগিয়ে দিতে পারতেন; তিনি যে এখনো আমাদের কানে কুরআনের আওয়াজ পৌঁছে দিয়েছেন, এ-ও তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ।
আল্লাহ চাইলে প্রতিটি জনপদে একজন করে সতর্ককারী পাঠাতে পারতেন—এই বাক্যটি শুধু কুদরতের ঘোষণা নয়, এটি মানুষের অহংকারে ভাঙা এক আঘাত। মানুষ ভাবে, সত্য যদি সত্য হয়, তবে তা আমার পছন্দমতো, আমার শহরে, আমার ভাষায়, আমার তাড়নায়ই আসবে; কিন্তু আল্লাহর দাওয়াত মানুষের রুচির দাস নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা নবুয়ত দান করেন, যেভাবে ইচ্ছা হিদায়াতের পথ গড়ে দেন, আর যাদের কাছে সত্য পৌঁছেছে তাদের ওপর দায়িত্বও ততটাই ভারী হয়ে ওঠে। তাই যে যুগে কুরআন এসেছে, সে যুগের লোকদের জন্য যেমন পরীক্ষা, তেমনি আজ আমাদের জন্যও; কারণ বার্তা পৌঁছে গেলে আর অজুহাতের দেয়াল আগের মতো শক্ত থাকে না। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়—আমি কি সতর্কবাণী শুনে কেঁপে উঠলাম, নাকি কেবল শব্দ শুনে পাশ কাটিয়ে গেলাম?
এই আয়াত নবীকে সান্ত্বনা দেয়, আবার সমাজকেও আয়না দেখায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াত একা হয়ে যায়নি; বরং আল্লাহর পরিকল্পনায় তাঁর মাধ্যমে এমন এক আহ্বান উঠেছে, যা সীমান্তে থেমে যায় না, সময়ের গায়ে আটকে থাকে না। মানুষ যতই সত্য-মিথ্যার রেখা মুছে ফেলতে চায়, কুরআন ততই সেই রেখাকে স্পষ্ট করে তোলে—কে আল্লাহর দিকে ফিরছে, কে দুনিয়ার ধুলোয় নিজেকে হারাচ্ছে, কে আখিরাতকে স্মরণ করে নরম হচ্ছে, আর কে গাফলতের শীতে শক্ত হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় মুমিনের হৃদয় কেবল আশার নয়, জবাবদিহিরও হৃদয়; সে জানে, হিদায়াত পেয়েও যদি আত্মসমর্পণ না আসে, তবে প্রাপ্তি শূন্যের মতোই। তাই আল্লাহর এই কথা আমাদের অন্তরে এক নীরব কাঁপন জাগাক: আমি কি সত্যের সাক্ষ্য বহন করছি, নাকি শুধু সত্যের নাম উচ্চারণ করছি?
মানুষের জনপদ বদলায়, ভাষা বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, কিন্তু অন্তরের প্রয়োজন বদলায় না—একজন সতর্ককারী, একখানা স্মরণ, একটুকরো জাগরণ আজও মানুষকে তার রবের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারে। এই আয়াতে আশার দিকও আছে: আল্লাহ চাইলে আরও বেশি সতর্ককারী পাঠাতে পারতেন, অর্থাৎ তাঁর করুণা সংকীর্ণ নয়; কিন্তু তিনি যে ব্যবস্থাই নিলেন, তাতেই মানুষের জন্য যথেষ্ট নিদর্শন, যথেষ্ট দলিল, যথেষ্ট নরম হওয়ার সুযোগ রেখে দিলেন। এখন প্রশ্ন আমাদের—আমরা কি নিজেদের জীবনকে নিছক অভ্যাসের ধারায় বয়ে যেতে দেব, নাকি কুরআনের সতর্কতায় থেমে যাব, ভেবে দেখব, আমি কোথা থেকে আসছি, কোথায় যাচ্ছি, আর আমার রবের সামনে কী নিয়ে দাঁড়াব? যে হৃদয় এই প্রশ্নকে ভয় পায়, সে-ই বেঁচে আছে; আর যে হৃদয় একে এড়িয়ে যায়, সে ধীরে ধীরে নিজেরই জনপদে এক অচেনা নির্বাসিত হয়ে পড়ে।
আল্লাহ চাইলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতেন—এই বাক্যটি মানুষের অহংকারের উপর এক নীরব আঘাত। আমরা কত সহজে ভাবি, হেদায়াত যেন আমাদের ধারণক্ষমতা, আমাদের সমাজ, আমাদের সময়, আমাদের পছন্দের সঙ্গে বাঁধা। অথচ আয়াতটি মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার প্রতিটি জনপদ, প্রতিটি হৃদয়, প্রতিটি দরজার মালিক আল্লাহ। তিনি চাইলে প্রত্যেক ঘরে আলাদা করে সত্যের আহ্বান পৌঁছে দিতে পারতেন; তিনি চাইলে অস্বীকারের অন্ধকারকে মুহূর্তে সরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমনভাবে আহ্বান পাঠান, যাতে মানুষের অন্তর প্রকাশ পায়—কে শুনে, কে মুখ ফেরায়, কে নরম হয়, আর কে নিজের আত্মাভিমানকে আল্লাহর কথার ওপরে বসায়।
এই সত্যটি নবীকে সান্ত্বনা দেয়, আর আমাদেরও কাঁপিয়ে তোলে। দাওয়াতের পথে অবহেলা, বিরোধ, ব্যঙ্গ, একাকীত্ব—এসব কিছুই রাসূলের দায়িত্বকে ছোট করতে পারে না; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হিকমতকেই আরও উজ্জ্বল করে। আমাদের জীবনে যখন সত্যের ডাক আসে, তা কোনো সাধারণ শব্দ নয়, তা হলো করুণার দরজা। কুরআনের প্রতিটি সতর্কতা আসলে হারানোর ভয় দেখিয়ে দুঃখ দিতে নয়, বরং ডুবতে থাকা মানুষকে তীরে ফিরিয়ে আনতে। তাই আজ এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সাথে বলতে হয়: হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে এমন করবেন না যে আমরা সতর্কবাণী শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। আমাদের এমন বানিয়ে দিন, যারা দেরি হলেও ফিরে আসে, ভুল করলেও ভাঙে, আর আপনার হিদায়াত পেলে জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলে।