সূরা আল-ফুরকানের এই আয়াত যেন কিয়ামতের প্রান্তর থেকে ভেসে আসা এক করুণ আর্তনাদ। সেখানে জালেম নিজের দুই হাত কামড়ে ধরবে, আর এই হাতই হবে তার লজ্জা, তার সাক্ষী, তার অপরাধের স্মারক। দুনিয়ায় যে হাত দিয়ে সে সত্যকে ঠেলে সরিয়েছে, যে হাত দিয়ে সে অহংকারের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, যে হাত দিয়ে সে রাসূলের ডাকে সাড়া দেয়নি—সেই হাতই সেদিন তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। মানুষ তখন বুঝবে, রসূলের পথ কেবল একটি ধর্মীয় আহ্বান ছিল না; তা ছিল মুক্তির সরল সোজা সড়ক, আর তা থেকে সরে যাওয়া মানে নিজের বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে আগুন জমিয়ে রাখা।
এই বাক্যে যে আফসোস উচ্চারিত হয়, তা হালকা অনুতাপ নয়; তা এমন অনুশোচনা, যা আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। "হায়, আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম"—এই কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ সত্য: সত্যকে চিনেও যে তাকে পিছনে ফেলে, সে একদিন নিজের ভুলের মূল্য হাতের মাংসে কামড় দিয়ে বুঝবে। কুরআন বারবার আমাদের সামনে এই দৃশ্য এঁকে দেয়, যাতে দুনিয়ার জৌলুসে বিভ্রান্ত না হই, যাতে মুহূর্তের সঙ্গীকে চূড়ান্ত পথপ্রদর্শক ভেবে না বসি। রাসূলের সঙ্গ মানে কেবল তাঁর সময়ের মানুষ হওয়া নয়; তাঁর দেখানো সত্য, তাঁর আখলাক, তাঁর আনুগত্যের ছায়ায় বেঁচে থাকা।
এই সূরার সামগ্রিক সুরের সঙ্গে এই আয়াত গভীরভাবে মিলে যায়, কারণ এখানে কুরআন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে, আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্ত্বনা দেয়—মানুষের অস্বীকৃতি চূড়ান্ত নয়, চূড়ান্ত হবে আখিরাতের বিচার। মক্কার পরিবেশে যারা অহংকারে সত্যকে অস্বীকার করত, যারা নবীকে একা করে দিতে চাইত, তাদের জন্য এ ছিল কঠিন সতর্কবার্তা; আর মুমিনের জন্য ছিল কোমল কাঁপুনি, যেন সে আজই নিজের পথ যাচাই করে নেয়। কারণ সেদিন কোনো বানানো অজুহাত থাকবে না, থাকবে শুধু তীব্র অনুতাপ—আর সত্যের পথে ফিরে আসার সুযোগটি তখন চিরতরে পেছনে পড়ে থাকবে।
এই আয়াতের ভাষা কেবল ভবিষ্যতের বর্ণনা নয়, এ তো অন্তরের গভীরতম আদালতে এক আগাম ঘোষণা। আজ যে মানুষ সত্যের সামনে নীরব থাকে, রসূলের ডাকে হৃদয় খুলে না, সে-ই কিয়ামতের দিন নিজেকেই দোষারোপ করতে বাধ্য হবে। তখন অন্ধকার আর অজুহাতের দেয়াল ভেঙে যাবে; স্পষ্ট হয়ে উঠবে, রসূলের পথ মানে ছিল আল্লাহর দিকে পৌঁছানোর সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে সরল, সবচেয়ে সোজা পথ। কিন্তু মানুষ যখন নিজের ইচ্ছাকে সত্যের ওপরে বসায়, তখন সে আসলে পথ হারায় না শুধু, নিজের ভেতরেই এমন এক শূন্যতা জমিয়ে রাখে, যা মৃত্যুর পর আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে।
এই আয়াত আমাদের আজও জাগিয়ে দেয়, কারণ আজও মানুষের সামনে সত্যের ডাক আসে নানা রূপে—কুরআনের আয়াতে, নেককারের নসীহতে, অন্তরের অস্থিরতায়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের নীরব ধাক্কায়। রসূলের পথ মানে শুধু ইতিহাসের একটি স্মৃতি নয়; তা হলো দুনিয়ার ধোঁকা পেরিয়ে আখিরাতের আলোর দিকে হেঁটে যাওয়ার জীবন্ত রাস্তা। যে এ পথকে অবহেলা করে, সে শেষ বিচারে বুঝবে, জীবনের আসল ক্ষতি ছিল সম্পদ হারানো নয়, সুনাম হারানো নয়, বরং সত্যের সংগ হারানো। আর তখন অনুশোচনা থাকবে, কিন্তু আর ফিরে আসার দরজা থাকবে না।
কিয়ামতের সেই দিন মানুষ নিজের হাতকেই শত্রু মনে করবে। যে হাত দিয়ে সে সত্যকে ঠেলে সরিয়েছে, যে হাত দিয়ে সে জুলুমকে স্বাভাবিক করেছে, যে হাত দিয়ে সে রাসূলের ডাকে সাড়া না দিয়ে নিজের ইচ্ছাকে বড় করেছে—সেই হাতই তখন কামড়ানোর বস্তু হয়ে দাঁড়াবে। এ কেবল দেহের যন্ত্রণা নয়; এ হলো আত্মার ভেতরে জমে থাকা অবজ্ঞা, অবহেলা, এবং ভুল নির্বাচনের আগুন। দুনিয়ায় অনেক পথ থাকে, অনেক কণ্ঠস্বর থাকে, অনেক প্রলোভন থাকে; কিন্তু রসূলের পথ একটাই, সহজ হলেও ভারী, সোজা হলেও কঠিন—কারণ সেখানে নফসের কাছে নয়, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়।
এই আয়াত আমাদের সমাজকেও আয়নার সামনে দাঁড় করায়। যখন সত্যের আহ্বান শোনা হয়েও মানুষ দুনিয়ার চাপ, দলীয় অহংকার, সামাজিক ভয়, কিংবা নিজের কামনার পাশে দাঁড়ায়, তখন সে আসলে ধীরে ধীরে সেই আফসোসের দিকেই হাঁটে, যা কিয়ামতে আর লুকোনো যাবে না। এখানে জালেম শুধু অন্যের ওপর জুলুমকারী নয়; সে নিজ আত্মার প্রতিও জালেম, কারণ সে জানে সত্য কী, তবু সত্যের সঙ্গে পথ মেলায় না। রসূলের সঙ্গ মানে কেবল কথার সমর্থন নয়; মানে জীবনকে এমনভাবে সাজানো, যাতে সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, ব্যবসা, ন্যায়, ক্ষমা, বিনয়—সবকিছুর ওপর আল্লাহর নির্দেশের ছায়া পড়ে।
তবে এই ভয়াবহ দৃশ্যের ভেতরেও আছে জাগরণের দাওয়াত। কুরআন আমাদের ভয় দেখায়, যাতে আমরা ধ্বংসের আগে থেমে যাই; আবার আশা দেখায়, যাতে ফেরা অসম্ভব মনে না করি। আজই যদি আমরা নিজের ভুল স্বীকার করি, হৃদয়ের দরজা খুলে দিই, এবং রাসূলুল্লাহর দেখানো পথে ফেরার নিয়ত করি, তাহলে এই আয়াত আমাদের বিরুদ্ধে নয়, আমাদের জন্য রহমতের ডাক হয়ে উঠতে পারে। কারণ আল্লাহর কাছে ফিরে আসা কখনো দেরি হয়ে যায় না, যতক্ষণ প্রাণ বাকি আছে, ততক্ষণ তাওবার দরজা খোলা আছে। তাই আজ, এই মুহূর্তেই, অন্তরকে জিজ্ঞেস করতে হয়—আমি কি সত্যিই রসূলের পথের সঙ্গী, নাকি ভবিষ্যতের আফসোসকে নিজের হাতে লালন করছি?
রসূলের সঙ্গে পথ অবলম্বন করা মানে শুধু একটি পরিচয় বহন করা নয়; মানে আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর সঠিক দিশা গ্রহণ করা। কুরআন আমাদেরকে বারবার এটাই শেখায়, সত্য একা যথেষ্ট নয়—সত্যকে মান্য করতে হয়, সত্যের সঙ্গে হাঁটতে হয়, সত্যের জন্য নিজের পছন্দকে নত করতে হয়। যে মানুষ নিজের অহংকারকে ছাড়ে, সে-ই বাঁচে; আর যে মানুষ নিজের অহংকারকে বাঁচিয়ে সত্যকে ছাড়ে, সে একদিন নিজের হাতের ভেতরেই অনুশোচনার দাঁত বসাবে। সেই মুহূর্তে আর কেউ থাকবে না আশ্রয় দিতে, আর কোনো ব্যাখ্যা থাকবে না টিকিয়ে রাখার মতো।
অতএব আজই হৃদয়কে নরম করতে হয়, আজই তওবার দরজা খুঁজে নিতে হয়, আজই কুরআনের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হয়: হে আল্লাহ, আমি যেন রসূলের পথ থেকে বিচ্যুত না হই। এ দোয়াই মানুষের রক্ষাকবচ, এ ভয়ই ঈমানের জীবন, এ অনুশোচনার আয়াতই আমাদের জাগিয়ে দেয়—যেন পরকালের সেই অসহ্য ‘হায় আফসোস’ আমাদের জীবনের ভাষা না হয়। যিনি দুনিয়ায় সত্যকে আঁকড়ে ধরেন, তিনি আখিরাতে লজ্জার হাত-কামড়াতে বসেন না; তিনি তখন নূরের পথে চলতে চলতে শান্ত হৃদয়ে রবের দিকে ফিরে যান।