এই আয়াতটি খুব গভীর, কারণ এখানে কেবল এক জাতির অবাধ্যতার ইতিহাস বলা হয়নি; বরং সত্যের সাথে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার এক ভয়ংকর রূপ উন্মোচন করা হয়েছে। আগের আয়াতগুলোতে আমরা দেখেছি-বনী ইসরাঈল একের পর এক নিদর্শন দেখেছে, অলৌকিক ঘটনা দেখেছে, মৃত মানুষ জীবিত হতে দেখেছে, তূরের ওজনের নিচে অঙ্গীকার করেছে, তবু তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। এখন এ আয়াতে কুরআন আরও এক ধাপ গভীরে গিয়ে জানাচ্ছে-সমস্যা শুধু অজ্ঞতা না; অনেকের সমস্যা ছিল, তারা শুনত, বুঝত, তারপরও বিকৃত করত।

এখানেই আয়াতের কম্পন।

“তবে কি তোমরা আশা কর…”

এটি মূলত এক বাস্তববাদী প্রশ্ন। অর্থাৎ, হে মুমিনরা, তোমরা কি এখনো এমন সরল আশা করছ যে, যারা বারবার সত্যের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করেছে, তারা খুব সহজে তোমাদের কথায় সাড়া দেবে? এখানে হতাশা শেখানো হয়নি; বরং মানুষকে সত্যের পথে চলার একটি কঠিন বাস্তবতা শেখানো হয়েছে-সবাই সত্যকে অস্বীকার করে না কারণ তারা জানে না; অনেকেই অস্বীকার করে কারণ তারা সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায় না।

দার্শনিকভাবে এটি খুব গভীর। আমরা অনেক সময় ভাবি, যদি সত্য স্পষ্ট করে বলা যায়, সবাই মেনে নেবে। কুরআন শেখায়-না, সত্যের সমস্যা সবসময় স্পষ্টতায় না; অনেক সময় গ্রহণকারীর অন্তরে। মানুষ কখনো কখনো আলোকে অস্বীকার করে অন্ধকারের জন্য না, বরং আলো মানলে তাকে বদলাতে হবে বলে।

তারপর আয়াতের সবচেয়ে ভারী অংশ:

“অথচ তাদের একদল আল্লাহর কালাম শুনত…”

এখানে ঘটনাটি ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। তারা আল্লাহর কালাম থেকে দূরে ছিল না। তারা শুনত। ওহীর সংস্পর্শে ছিল। শব্দ তাদের কানে পৌঁছাত। অর্থাৎ তারা এমন লোক ছিল না, যাদের কাছে সত্য পৌঁছায়নি। বরং তারা সত্যের খুব কাছাকাছি ছিল। এই জায়গাটি আমাদের জন্য খুব বড় সতর্কতা। কারণ সত্যের কাছে থাকা আর সত্যের মানুষ হওয়া এক জিনিস না। কুরআনের শব্দ জানা, ধর্মীয় ভাষা জানা, পবিত্র বয়ানের পরিবেশে থাকা- এসবের পরও মানুষ পথ হারাতে পারে, যদি অন্তর সৎ না থাকে।

তারপর বলা হলো:

“তারপর তা বুঝে নেওয়ার পর…”

এই অংশটি আরও ভয়ংকর। অর্থাৎ তারা শুধু শুনেনি, বুঝেছেও। তাদের সমস্যা অজ্ঞতা না। তাদের সমস্যা ভুল বোঝা না। সমস্যা ছিল-বোঝার পরও সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত না থাকা।

দার্শনিকভাবে এ এক বিরাট নৈতিক শিক্ষা:

জানার পর মানুষের দায় বেড়ে যায়। না-জানা এক অবস্থা, কিন্তু জানার পর বিকৃতি আরেক অবস্থা। অজ্ঞের ভুল ও জেনেশুনে বদলে দেওয়া মানুষের ভুল এক না। কারণ দ্বিতীয়জনের অপরাধ শুধু কাজের মধ্যে না; নৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যেও। এই আয়াত তাই বিশেষভাবে জ্ঞানীদের ভয় দেখায়। কারণ যিনি জানেন, তাঁর পক্ষে বিকৃতি আরও বড় অপরাধ। সত্যিকার জ্ঞান বিনয় বাড়ায়। কিন্তু যদি জ্ঞান অহংকার, স্বার্থ, দলীয়তা, বা ক্ষমতার খেলায় ঢুকে যায়, তবে সেই জ্ঞানই বিকৃতির অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।

তারপর আয়াতের চূড়ান্ত আঘাত:

“জেনেশুনে বিকৃত করত।”

এখানে শুধু ভুল বলা হয়নি; বিকৃতি বলা হয়েছে। অর্থাৎ সত্যকে যেমন আছে তেমন রাখেনি। শব্দ পাল্টেছে, অর্থ ঘুরিয়েছে, ব্যাখ্যা বদলেছে, প্রয়োগ বিকৃত করেছে, অথবা এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যাতে হক তার আসল রূপ হারায়। আরও ভয়ংকর হলো-“জেনেশুনে।” এটি ছিল সচেতন কাজ। অর্থাৎ অন্তর জানত, তবু জিহ্বা বদলেছে। বিবেক জানত, তবু স্বার্থ জিতেছে। ওহী সামনে ছিল, তবু নফস তাকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে। আধ্যাত্মিকভাবে এটি মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগগুলোর একটি। কারণ সাধারণ পাপ মানুষকে লজ্জিত করতে পারে, কিন্তু সত্য বিকৃতি মানুষকে এমন জায়গায় নেয়, যেখানে সে নিজের অপরাধকেও সত্যের ভাষায় সাজিয়ে ফেলতে পারে। তখন রোগ গভীরে ঢুকে যায়। মানুষ শুধু বিপথে যায় না; অন্যকেও নিয়ে যায়। এই আয়াত আজও খুব জীবন্ত।

আজও মানুষ আল্লাহর কালাম শোনে। আজও কুরআন তিলাওয়াত হয়। আজও ধর্মীয় ভাষা উচ্চারিত হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- সত্য কি যেমন আছে তেমন রাখা হচ্ছে? নাকি স্বার্থ, দল, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা, সামাজিক চাপ, বা ব্যক্তিগত প্রবৃত্তির কারণে তা বেঁকে যাচ্ছে? কেউ আয়াত পড়ে, কিন্তু অস্বস্তিকর অংশ চেপে যায়। কেউ হাদীস জানে, কিন্তু নিজের অবস্থানের পক্ষে টেনে নেয়। কেউ সত্য বোঝে, কিন্তু মানুষের খুশির জন্য অন্য কথা বলে। কেউ দ্বীনের ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু ভেতরে দুনিয়ার হিসাব চালায়।

এগুলোর সবই এই আয়াতের ছায়ার মধ্যে পড়ে। এখানে মুমিনের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা আছে। একদিকে, দাওয়াত দিতে হবে, সত্য পৌঁছাতে হবে, আশা ছাড়লে চলবে না। অন্যদিকে, মানুষ কেন মানছে না-তা নিয়ে সরল বিভ্রান্তিতেও থাকা যাবে না। সব অস্বীকার অজ্ঞতার অস্বীকার না। কিছু অস্বীকার হলো অহংকারের, কিছু স্বার্থের, কিছু বিকৃত নৈতিকতার।

এই আয়াত আমাকে খুব গভীরভাবে জিজ্ঞেস করে:
আমি কি সত্য শুনে বদলাই,
নাকি শুধু জানি?
আমি কি যা বুঝি, তার প্রতি বিশ্বস্ত?
নাকি সুবিধামতো তার ব্যাখ্যা বদলাই?
আমার জ্ঞান কি আমাকে নরম করছে?
নাকি আমাকে সত্যের কারিগর বানিয়ে দিচ্ছে?
আমি কি কখনো নিজের নফসের জন্য সত্যকে একটু মোচড় দিই?

ঈমান জাগানিয়া দিক থেকে এই আয়াতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-

সত্যের কাছে থাকা যথেষ্ট না;
সত্যের প্রতি সৎ থাকা জরুরি।
ওহী জানা যথেষ্ট না;
ওহীকে বিকৃত না করা জরুরি।
আল্লাহর কালাম শোনা বড় নিয়ামত,
কিন্তু তা বুঝেও যদি মানুষ বিশ্বস্ত না থাকে,
তবে সেই নিয়ামত তার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে যেতে পারে।
একজন মুমিনের দোয়া হওয়া উচিত:
হে আল্লাহ, আপনার কালামের প্রতি আমাদের অন্তরকে বিশ্বস্ত রাখুন। আমরা যেন সত্য শুনে শুধু মুগ্ধ না হই, বদলাইও। আমরা যেন বুঝে তা বিকৃত না করি। আমাদের জ্ঞানকে নূর বানান, স্বার্থের হাতিয়ার নয়। আমাদেরকে সত্যের বাহক বানান, সত্যের বিকৃতকারী নয়।
আমরা যেন আপনার কথাকে যেমন আছে তেমন রাখি-ভাষায়, ব্যাখ্যায়, আর জীবনে।

সুরা বাকারার ৭৫ নং আয়াতের গভীরতম শিক্ষা বোধহয় এই-মানুষের বড় বিপদ সবসময় সত্য না শোনা না; সত্য শুনে, বুঝে, তারপরও তার প্রতি বিশ্বস্ত না থাকা। আল্লাহর কালামের পাশে থেকেও মানুষ বিপথে যেতে পারে, যদি অন্তর সৎ না থাকে। শেষ পর্যন্ত, ওহীর কাছে থাকার সম্মান ওহীর প্রতি সততার দাবি করে। আর যে মানুষ এই সততা হারায়, সে শুধু নিজে পথ হারায় না- সত্যের রূপও বিকৃত করতে শুরু করে।